আমাদের বিভিন্ন প্রজেক্ট মিলিয়ে নতুন করে প্রায় তিন হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে

এনভয় লিগ্যাসি ও শেলটেক গ্রুপ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো পোশাক ও বস্ত্র শিল্প, রিয়েল এস্টেট, সিরামিক টাইলস, এসপিসি পোল, শিরিষ কাগজ, মাংস প্রক্রিয়াকরণ, স্টক ব্রোকারেজ ফার্ম, নির্মাণ শিল্প, হোটেল ইন্ডাস্ট্রি, বিভিন্ন এয়ারলাইনসের জিএসএ, মিডিয়া, চা বাগান, প্ল্যানিং অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ইত্যাদি।

গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, রিয়েল এস্টেট, শক্তি, আইটিসহ বিভিন্ন খাতে এনভয় লিগ্যাসি ও শেলটেকের বর্তমান ব্যবসার পরিস্থিতি কেমন?

এনভয় লিগ্যাসি ও শেলটেক গ্রুপ বিভিন্ন খাতে ব্যবসা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো পোশাক ও বস্ত্র শিল্প, রিয়েল এস্টেট, সিরামিক টাইলস, এসপিসি পোল, শিরিষ কাগজ, মাংস প্রক্রিয়াকরণ, স্টক ব্রোকারেজ ফার্ম, নির্মাণ শিল্প, হোটেল ইন্ডাস্ট্রি, বিভিন্ন এয়ারলাইনসের জিএসএ, মিডিয়া, চা বাগান, প্ল্যানিং অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ইত্যাদি।

বর্তমানে রফতানিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যবসাগুলোর ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছি। রিয়েল এস্টেটের কথাই যদি ধরা যাক, অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির পরিমাণ যথেষ্ট পরিমাণে কমে এসেছে। এর একটি কারণ হলো, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্রেতারা আসন্ন নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে মনে করি। নির্মাণ শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কারণ জনগণ এখন নতুন করে বাড়িঘর করছে না। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ধীরগতিতে চলছে বিধায় এক্ষেত্রেও আমাদের প্রত্যাশিত আয় করা সম্ভব হচ্ছে না। শিরিষ কাগজ নানা পলিসিগত জটিলতার কারণে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হচ্ছে না। একইভাবে এসপিসি পোল ফ্যাক্টরির ক্ষেত্রে সরকারি কার্যক্রমে মন্থরগতি থাকায় একই অবস্থায় রয়েছে। জিএসএগুলো কাঙ্ক্ষিত আয় করতে না পারলেও আমরা সার্বিকভাবে লোকসানের সম্মুখীন হইনি। শেয়ারবাজারের ব্যাপারে আপনারা সবাই জানেন। শেয়ারবাজার চাঙ্গা হওয়ার আগ পর্যন্ত ব্রোকারেজ হাউজগুলোর ভালো করার সুযোগ নেই। চা বাগান আমাদের একটি নতুন প্রতিষ্ঠান, এখানে মুনাফা অর্জন একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।

এককথায় বলা যায়, আমাদের রফতানিমুখী শিল্পগুলো ভালো করছে এবং স্থানীয় ব্যবসাগুলো আশানুরূপ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সফলতার মুখ দেখছে না।

বিনিয়োগ ও ব্যবসায় কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে?

বিনিয়োগ ও ব্যবসার ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে পর্যাপ্ত গ্যাস, মানসম্মত (কোয়ালিটি) ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, ব্যাংকের সুদহার বৃদ্ধি (৯ থেকে এখন ১৪-১৫ শতাংশে ঠেকেছে), ঘুস বাণিজ্য, ট্রান্সপোর্টেশন চার্জ বৃদ্ধি, অন্যান্য দেশের তুলনায় পোর্টের অদক্ষতা, আমলাতন্ত্রের দীর্ঘসূত্রতা, কোনো কোনো সময় রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ইত্যাদি।

চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে উঠতে প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলগুলো সম্পর্কে জানতে চাই। সরকারের তরফ থেকে কোনো নীতিসহায়তার প্রত্যাশা রয়েছে?

সাম্প্রতিককালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত উচ্চ ট্যারিফ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াচ্ছিল। তবে সেটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে অনেকাংশেই কমিয়ে আনা গিয়েছে এবং এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আমরা এজন্য সাধুবাদ জানাই অন্তর্বর্তী সরকারকে। এরই মধ্যে দেখা গিয়েছে, দেশের নানা রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে। এর পেছনের রয়েছে আর্থিক চাপ, গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি। আমরা যে চ্যালেঞ্জগুলোর কথা উল্লেখ করেছি, সরকারের সাহায্য পেলে সেগুলো সমাধান করা সম্ভব। বিশেষ করে ঘুস বাণিজ্য অতিরিক্ত মাত্রায় বেড়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের জন্য অত্যন্ত খারাপ একটি দিক। ব্যবসাকে সহজীকরণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন, যেমন ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে সমস্ত লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ইত্যাদি সংযোগ প্রদানের ব্যবস্থা করা। ব্যাংকের সুদহার অচিরেই কমিয়ে আনা। ঋণখেলাপির সংখ্যা কমানোর মাধ্যমে ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড কমাতে হবে, যেন ক্যাশ ফ্লো অব্যাহত থাকে। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেয়া জরুরি, যা বেকারত্ব দূর করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য বাস্তবসম্মত নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা এরই মধ্যে সরকার অনেকাংশ করতে সমর্থ হয়েছে। তবে দেশের বাণিজ্য পরিস্থিতি আরো উন্নত করার জন্য দেশীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ করা প্রয়োজন, যেন তাদের দাবি ও পরামর্শগুলো জানা সম্ভব হয়। স্থানীয় উদ্যোক্তারা যদি ব্যবসা করার অনুকূল পরিবেশ না পান তাহলে বিদেশী বিনিয়োগ পাওয়া দুরূহ হবে।

আগামী পাঁচ বছরে কোন খাতে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ বিনিয়োগ বাংলাদেশের শিল্প খাতকে কীভাবে এগিয়ে নেবে?

আমাদের বস্ত্র শিল্পের সঙ্গে পোশাক শিল্পকে সংযুক্ত করতে চাই (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ), যেন একই ছাদের নিচে তুলা থেকে ফিনিশড গার্মেন্ট পর্যন্ত প্রস্তুত করতে পারি।

আমরা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শতভাগ রফতানিমুখী কৃষিজাত শিল্পের যাত্রা করাতে সক্ষম হয়েছি, যেখান থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি নাগাদ বাংলাদেশ থেকে সুইট কর্ন ও আনারস রফতানি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে ইনশাআল্লাহ।

টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কীভাবে সাহায্য করছে?

টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতে ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভল্যুশন এরই মধ্যে বড় পরিবর্তন এনেছে। অটোমেটেড কাটিং, ডিজিটাল প্রডাকশন প্ল্যানিং এবং (ইন্টারনেট অব থিংস) ভিত্তিক রিয়েল-টাইম মনিটরিং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে দ্রুত, নির্ভুল ও দক্ষ করে তুলছে। এর ফলে অপচয় কমছে, লিড টাইম কমছে, একই সঙ্গে উৎপাদনক্ষমতা বাড়ছে। ডাটা অ্যানালিটিকস ও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দ্রুত ডিজাইন তৈরি ও উৎপাদন সামঞ্জস্য করতে সহায়তা করছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, ইকোল্যাব টেকনোলজি বাংলাদেশী টেক্সটাইল শিল্পে টেকসই উৎপাদনের নতুন দিগন্ত খুলে লেজার ফিনিশিং খরচ সাশ্রয়ী সমাধান দিচ্ছে, ওজোন-ওয়াশ পানি ও রাসায়নিক খরচ নাটকীয়ভাবে কমাচ্ছে, আর E-Flow/Smart Foam অল্প পানিতেই ফিনিশিংয়ের মান উন্নত করছে। পাশাপাশি Eco-Performance Lab পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ার পরিবেশগত প্রভাব নির্ণয় করছে, যা EU-সহ বৈশ্বিক বাজারের কার্বন ট্রেসেবিলিটি ও ESG রিপোর্টিং সহজ করছে। এসব প্রযুক্তি শুধু ব্যবসার খরচই কমাচ্ছে না, বরং বাংলাদেশের টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস খাতকে একটি টেকসই, প্রতিযোগিতামূলক ও ভবিষ্যৎ-উন্মুখ শিল্পে রূপান্তর করছে।

নতুন বিনিয়োগ ও সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে আপনাদের প্রতিষ্ঠান কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে? ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই।

আমাদের বিভিন্ন এক্সপানশন প্রোজেক্ট মিলিয়ে নতুন করে প্রায় তিন হাজার মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এছাড়া কৃষক ও অন্যান্য লজিস্টিকসের সঙ্গে জড়িত কর্মীরাসহ আমাদের প্রোজেক্টগুলোর সঙ্গে জড়িত থাকবে প্রায় ২০ হাজার মানুষ, যার মধ্যে শতকরা প্রায় ৮০ ভাগই থাকবেন কৃষক।

পরিবেশবান্ধব কর্মপরিবেশের জন্য এনভয় টেক্সটাইলসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রয়েছে। পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপগুলো ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে কেমন ভূমিকা রাখছে?

পরিবেশবান্ধব কর্মপরিবেশ শুধু আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ নয়, বরং ব্যবসার প্রবৃদ্ধিরও প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। আমরা এরই মধ্যে ২ দশমিক ২ মেগাওয়াট (পিক) সোলার প্লান্ট চালু করেছি এবং ২০২৬ সালের মধ্যে এটিকে প্রায় সাত মেগাওয়াটে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে পল্লী বিদ্যুৎ খরচ কমছে, উৎপাদন স্থিতিশীল হচ্ছে এবং বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

এছাড়া রয়েছে বায়োগ্যাস প্লান্ট, যেখানে উৎপাদনের বর্জ্য ও খাদ্যের উচ্ছিষ্টকে আমরা শক্তিতে রূপান্তর করি। এতে জ্বালানির খরচ কমে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ হয়। একই সঙ্গে আমাদের ইটিপি ও ডব্লিউটিপি নিশ্চিত করছে পানি পুনঃশোধন ও পুনর্ব্যবহার। ইটিপির পরিশোধিত পানির কিছু অংশ খাওয়ার পানি হিসেবে সরবরাহ করা হয়, যা কিনা WHO-র শর্ত পূরণ করে। প্রতি বছর প্রায় ২ দশমিক ১ বিলিয়ন লিটার বিশুদ্ধ পানি সাশ্রয় করা হচ্ছে, যা সিঙ্গাপুরের জাতীয় পানি চাহিদার ১ দশমিক ৩ দিনের সমান। লক্ষ্য রয়েছে ২০২৭ সালের মধ্যে গ্রাউন্ডওয়াটার ব্যবহার ৯০ শতাংশ কমানোর। এটি শুধু পানির খরচই কমাচ্ছে না, বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর আস্থা অর্জনেও সাহায্য করছে।

আমরা প্রি ও পোস্ট-প্রডাকশন ওয়েস্টেজ প্রায় পুরোপুরি কাজে লাগাই। ‘প্রি’ বলতে বোঝায় তুলা ও সুতা থেকে ওয়েস্টেজ, আর ‘পোস্ট’ বলতে ওয়েস্টেজ কাপড় ও পুরনো পোশাক থেকে যেটা পাওয়া যায়। এছাড়া আমরা অন্যান্য কারখানা থেকেও ওয়েস্টেজ কাপড় (ঝুট কাপড়) কিনে ব্যবহার করি। আমাদের ওয়েস্টেজের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় থাকে, যা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্যাকেট হিট রিকভারি সিস্টেম, যা ইঞ্জিনের কুলিং জ্যাকেট থেকে অপচয় হওয়া তাপকে গরম পানিতে রূপান্তর করে। এ পানি ব্যবহার হয় প্রি-হিটিং, স্টিম জেনারেশন ও স্পেস হিটিংয়ে। এর ফলে এনার্জি এফিশিয়েন্সি বাড়ছে, অপারেশনাল খরচ কমছে এবং কার্বন নিঃসরণও কমে আসছে।

আমাদের আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো। ২০২৪ সালে আমাদের নিঃসরণ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার টনে, কিন্তু ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা তা ৫৬ শতাংশ কমিয়ে আনব এবং ২০৪০ সালের মধ্যে নিট জিরো এমিশন অর্জনের পরিকল্পনা আছে। এটা আমাদের বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোর টেকসই সাপ্লাই চেইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখছে।

কাঁচামাল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমরা টেকসইতার দিকে এগোচ্ছি। ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ টেকসই কাঁচামাল ব্যবহার করার লক্ষ্য রয়েছে। বর্তমানে আমাদের কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে BCI (৩৮%), কনভেনশনাল কটন (৩৩%), অর্গানিক (১৮%), রিসাইকেল (৭%) এবং CmiA (৪%)। এ ৬৭ শতাংশ টেকসই কটন (তুলা) কেবল পরিবেশ রক্ষাই করছে না, বরং আমাদের প্রিমিয়াম মার্কেটে জায়গা করে দিচ্ছে।

সবশেষে রাসায়নিক ব্যবহারে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। আমাদের ব্যবহৃত সব কেমিক্যাল আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষিত, যা পণ্যের মান, কর্মীদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য নিরাপদ। পাশাপাশি সব ইফ্লুয়েন্ট ওয়েস্ট ওয়াটার প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যার মধ্যে ৬৮ শতাংশ পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং করা হয়। প্রক্রিয়ায় যে কস্টিক সোডা ব্যবহার করা হয় তা রিকভারি প্লান্টের মাধ্যমে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়।

এসব উদ্যোগ এনভয় টেক্সটাইলকে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দিয়েছে, ঝুলিতে রয়েছে ৪০টিরও বেশি সম্মানজনক পুরস্কার। ক্রেতারা এখন পরিবেশবান্ধব সরবরাহকারীকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে এ পদক্ষেপগুলো সরাসরি নতুন অর্ডার পাওয়া, দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং ব্যবসার ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করছে।

বিদেশী বাজারে ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এনভয় কীভাবে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে, এবং এ প্রসঙ্গে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা কী?

আমরা নিয়মিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মেলা ও মিল উইকে অংশ নিয়ে থাকি, যেখানে বিদেশী বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কাছে সরাসরি আমাদের প্রডাক্ট উপস্থাপন করা হয়। এতে আমাদের ব্যবসা দ্রুত প্রসার পায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শর্ত মেনে কাজ করায় আমরা ২০১৬-২১ সালে মোট দুবার ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল কর্তৃক লিড প্লাটিনাম খেতাব পেয়েছি, যার মধ্যে প্রথমবার আমরা ৮০ স্কোর পাই আর দ্বিতীয়বার পেয়েছি ১০০। আমাদের প্রক্রিয়া ও পণ্যের মান নিশ্চিত করার জন্য আমরা বিদেশী কনসালট্যান্ট ও স্পেশালিস্ট পেশাজীবীদের নিয়োগ করে থাকি, যার মাঝে সিইও, মার্কেটিং ডিরেক্টর ও আরএনডির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও আছেন।

বিদেশী বাজার ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এনভয় টেক্সটাইল নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে মূলত টেকসই উন্নয়ন, মান ও বাজার সম্প্রসারণ কৌশলের মাধ্যমে।

আমরা বিশ্বের প্রথম লিড প্লাটিনাম সার্টিফায়েড ডেনিম মিল, যেখানে সোলার এনার্জি, বায়োগ্যাস, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট, ওয়েস্ট রিসাইক্লিং, ইকোল্যাব ও হিট রিকভারি সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ আমাদের টেকসই উৎপাদনকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করেছে।

পণ্যে বৈচিত্র্য আনার দিকেও আমরা কাজ করছি, যেমনটি আগে বলা হয়েছে। অর্গানিক, রিসাইকেলড ও বিসিআই কটনসহ নানা ধরনের টেকসই কাঁচামাল ব্যবহার করে ভ্যালু অ্যাডেড ডেনিম তৈরি করছি, যা প্রিমিয়াম মার্কেটে আমাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করছে।

গ্লোবাল উপস্থিতি আরো জোরদার করতে আমরা ঢাকা ও নিউইয়র্কে ডিজাইন ও ডেভেলপমেন্ট সেন্টার চালু করেছি, পাশাপাশি হংকংয়েও অফিস পরিচালনা করছি। এর ফলে গ্রাহকদের কাছ থেকে সরাসরি ফিডব্যাক পাওয়া এবং দ্রুত বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সাড়া দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় রয়েছে ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন মডেল তৈরি, নতুন বাজারে প্রবেশ এবং আরো ভ্যালু অ্যাডেড প্রডাক্ট ডেভেলপমেন্ট—এসবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমাদের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে।

আপনাদের প্রতিষ্ঠানের সিএসআর কার্যক্রম যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রাখছে বলে আপনি মনে করেন এবং এগুলোকে ভবিষ্যতে আরো প্রভাবশালী করতে কী পরিকল্পনা রয়েছে?

আমাদের সিএসআর কার্যক্রম শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে দেশের প্রথম পেডিয়াট্রিক আইসিইউ/এইচডিইউ (বার্ন ইউনিট) স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিশেষ রোগীদের (যেমন ট্রি-ম্যান ডিজিজ) আর্থিক সহায়তা—এসব উদ্যোগ এরই মধ্যে সমাজে পরিবর্তন এনেছে। আমাদের ইটিএল পরিবারের সদস্য হিসেবে ১৮ জন শারীরিক প্রতিবন্ধী আমাদের সঙ্গে কাজ করছেন নিয়মিতভাবে। এছাড়া স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশিপ ও স্টাডি ট্যুর আয়োজন করা হয়। আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে সচেতনতা বাড়াতে পরিবেশ দিবসে শোভাযাত্রা, চিত্রাঙ্কণ প্রতিযোগিতা ও আলোচনার আয়োজন করা হয়। প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার চারা গাছ বিতরণ করা হয় এনভয় টেক্সটাইল থেকে, যা আমাদের পরিবেশের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকেই করা। একই সঙ্গে কর্মী ও স্থানীয় জনগণের জন্য নিরাপদ পানির বুথ, বায়োগ্যাস বিতরণ এবং অ্যাকুয়াপনিক্স গবেষণা প্রকল্প আমাদের টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দৃঢ় করেছে।

দুর্যোগকালে আমরা সবসময় পাশে থেকেছি—রানা প্লাজা ও তাজরীন ফ্যাশনস দুর্ঘটনায় ভুক্তভোগীদের সহায়তা থেকে শুরু করে পাহাড়ধস ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দানে অংশগ্রহণ করেছি। এসব উদ্যোগ শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তাই দেয়নি, বরং দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করেছে। দেশের যেকোনো দুর্যোগে আমরা পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব সবসময়ই।

ভবিষ্যতে আমরা এ কার্যক্রমগুলো আরো সম্প্রসারণ করতে চাই ডিজিটাল শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, নারীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ এবং টেকসই কৃষি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারের মাধ্যমে। আমাদের লক্ষ্য হলো সামাজিক কল্যাণকে ব্যবসার প্রবৃদ্ধির সঙ্গে একীভূত করে আগামী প্রজন্মের জন্য স্থায়ী ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিবেশে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোকে প্রায়ই ব্যবসা ও বিনিয়োগ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়। আপনাদের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে কোন খাতগুলোয় কাঠামোগত সংস্কার সবচেয়ে জরুরি বলে আপনি মনে করেন এবং সেই সংস্কার বাস্তবায়নে আপনারা কী পদক্ষেপ নিয়েছেন বা নিতে প্রস্তুত?

আমরা আমাদের প্রক্রিয়াগুলোয় ডিজিটালাইজেশন ও এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) জোরদার করার ব্যাপারে কাজ করে চলেছি। আমরা মনে করি, বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো দ্রুত সময়ে তথ্য আদান-প্রদান করা। এজন্য আমরা আমাদের ইআরপি সিস্টেমকে আরো উন্নত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সেই সঙ্গে অটোমেশন ও রোবোটিকসের ক্ষেত্রেও আমরা অনেকদূর অগ্রসর হয়েছি। এছাড়া হিউম্যান রিসোর্স ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

তবে এসবের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে, যেন বিটিএমএ বা বিজিএমইএ কর্তৃক বিভিন্ন প্রডাক্ট ডাইভার্সিফিকেশনের জন্য ডেভেলপমেন্ট সেন্টার খোলার ব্যবস্থা করা হয়।

আরও