শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে চাই টেকসই বিনিয়োগ

বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে গত কয়েক দশকে ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলেও একটি দেশের উন্নয়ন তখনই সর্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হবে, যখন পুরুষের পাশাপাশি দেশের নারী জনগোষ্ঠীও উন্নয়নের মূলস্রোতে সম্পৃক্ত হবেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে গত কয়েক দশকে ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলেও একটি দেশের উন্নয়ন তখনই সর্বজনীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হবে, যখন পুরুষের পাশাপাশি দেশের নারী জনগোষ্ঠীও উন্নয়নের মূলস্রোতে সম্পৃক্ত হবেন। মোট জনসংখ্যার অর্ধাংশ নারী হলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণের হার এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছোয়নি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার ৪২ দশমিক ৭০ শতাংশ, যেখানে পুরুষের অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নারীর অংশগ্রহণে কিছুটা অগ্রগতি ঘটলেও তা স্থিতিশীল নয় এবং কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা এ অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে।

দেশের বৃহৎ একটি অংশের নারী শ্রমিক এখনো কৃষি খাতে নিয়োজিত। তবে এ খাতের বড় একটি অংশই অনানুষ্ঠানিক এবং অনেক ক্ষেত্রে অবৈতনিক হিসেবে বিবেচিত। মূলধারার শ্রমবাজারের পাশাপাশি গৃহস্থালি শ্রম অর্থনৈতিকভাবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় তা জাতীয় উৎপাদনে সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। অন্যদিকে পোশাক শিল্প, যেখানে একসময় নারীর অংশগ্রহণ ছিল ৮০ শতাংশের মতো, সেটি বর্তমানে অনেক কমে এসেছে। খাতটির প্রযুক্তিনির্ভরতা, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা এবং কর্মপরিবেশ-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এর পেছনে ভূমিকা রাখছে।

শিল্প ও সেবা খাতে বিশেষ করে উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখনো কম। অথচ এসব খাতেই অধিক দক্ষতা, উচ্চ মজুরি ও পেশাগত বিকাশের সুযোগ রয়েছে। এ খাতে নারীদের প্রবেশে দক্ষতার ঘাটতি, প্রশিক্ষণের অভাব, সামাজিক কাঠামো জেন্ডার সংবেদনশীল কর্মপরিবেশের অভাব এবং প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে শুধু অংশগ্রহণের হার নয়, বরং কাজের ধরন ও গুণগত মানও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। অধিকাংশ নারী এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। তাদের অনেকে দিনমজুর, গৃহকর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা পারিবারিক সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেন। এদের অধিকাংশই ন্যায্য মজুরি, সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত। ফলে এ বিশাল নারী শ্রমশক্তি দেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও শ্রম অধিকারের বিবেচনায় পিছিয়ে রয়েছে। পাশাপাশি উচ্চ মজুরির, উচ্চ দক্ষতার ও নীতিনির্ধারণী কাজ যেমন ব্যবস্থাপকের কাজে নারীদের অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম।

অন্যদিকে গৃহস্থালি শ্রম বাংলাদেশের প্রায় সব নারী কোনো না কোনো পর্যায়ে করে থাকেন তাও অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ এ শ্রম ছাড়া কোনো পরিবারের দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়। এ কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি না দিলে নারীর শ্রমশক্তির প্রকৃত অবদান পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের দিক থেকে নারীদের জন্য আরো বিস্তৃত পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) ভিত্তিক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। উচ্চ শিক্ষায় নারী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি, আবাসন, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়াতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি নয়, শ্রমবাজার-উপযোগী কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি ।

কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণে অন্যতম চ্যালেঞ্জ পরিবার ও কর্মজীবনের ভারসাম্য রক্ষা। এ পরিপ্রেক্ষিতে শহর ও গ্রামাঞ্চলে ডে-কেয়ার কেন্দ্র, মাতৃত্বকালীন ছুটি, কর্মস্থলে হয়রানি প্রতিরোধ নীতি এবং জেন্ডার সংবেদনশীল কর্মপরিবেশ অপরিহার্য। জেন্ডার সংবেদনশীল কর্মপরিবেশ ও শ্রম অধিকার নিশ্চিতে ব্যক্তি খাতকে সম্পৃক্ত করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি জেন্ডার বাজেটের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর অর্থনীতিক ক্ষমতায়নে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব।

শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এক্ষেত্রে নারীদের আরো বেশি সম্পৃক্ত করতে হলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ ইত্যাদির ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক নারী উদ্যোক্তা মূলধন, বাজার ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এগোতে পারেন না। এসব বাধা দূর করতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সাপ্লাই চেইনে অন্তর্ভুক্ত করা ও ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন ধাপ সহজ করা হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ। পাশাপাশি জনমিতির যে সুবিধাজনক অবস্থানে বাংলাদেশ এখনো রয়েছে সেটিকে কাজে লাগাতে হলে নারীদের প্রযুক্তি নির্ভর শ্রমবাজারের জন্য তৈরি করতে হবে এবং এজন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে এবং সহায়তা দিতে হবে সঠিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন কেবল নারী উন্নয়ন নয়, বরং দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা, মাথাপিছু আয় ও দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বাড়লে একটি দেশের জিডিপি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও এর ব্যতিক্রম নয়।

শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ও এর গুণগত পরিবর্তন কোনো একক খাত বা নীতিসংশ্লিষ্ট বিষয় নয়। এটি একটি সমন্বিত রূপান্তর প্রক্রিয়া, যার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, দক্ষতা, ন্যায্য মজুরি, কর্মস্থলের নিরাপত্তা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদির ইতিবাচক পরিবর্তন। রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তি খাতের যৌথ প্রয়াসেই এ রূপান্তর সম্ভব। (অনুলিখিত)

ড. সায়মা হক বিদিশা: উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও