গৃহঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে এনআরবিসি ব্যাংকের প্রডাক্টগুলো কী? কত শতাংশ সুদে গ্রাহকরা ঋণ পাচ্ছেন?
নিজস্ব একটি বাড়ি বা ফ্ল্যাট সব মানুষেরই স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এনআরবিসি ব্যাংক গ্রাহকদের পাশে আছে সবসময়। গ্রাহকদের আবাসন চাহিদা বিবেচনায় আকর্ষণীয় ‘এনআরবিসি হোমলোন’ প্রডাক্টের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ঋণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। অ্যাপার্টমেন্ট ক্রয়, বাড়ি নির্মাণ, ভবন ক্রয় ও আধাপাকা বাড়ি তৈরিতে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রবাসীদের আবাসনের চাহিদা পূরণে ‘এনআরবিসি প্রবাস বন্ধু’ প্রকল্পের আওতায় ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। একদিকে গ্রাহকদের মৌলিক চাহিদা পূরণ, অন্যদিকে সিকিউরড হওয়ায় আমরা হোমলোন প্রদানে গুরুত্ব দিচ্ছি।
আবেদনের কতদিনের মধ্যে গ্রাহকরা ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণে ঋণ পান?
ব্যাংকিং প্রক্রিয়া এখন অনেকটাই ডিজিটাল। আবেদন গ্রহণের পর পরবর্তী প্রক্রিয়া ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় অটোমেটিক লোন প্রসেসিং সিস্টেমে (এলপিএস) সম্পাদিত হয়। এজন্য আগের তুলনায় এখন অনেক কম সময়ের প্রয়োজন হয়। যদি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক ও সম্পূর্ণ থাকে, তাহলে সাধারণত সাত কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা সম্ভব হয়। তবে জমির কাগজ যাচাই, মূল্যায়ন ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর সময় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে।
এনআরবিসির হোম লোনের মেয়াদ ও সুদহার সম্পর্কে জানতে চাই।
হোম লোনের সর্বনিম্ন মেয়াদ পাঁচ বছর এবং সর্বোচ্চ ২০ বছর। বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাসমান সুদহার প্রযোজ্য, যা বাজারের সুদের হার ও রেফারেন্স রেটের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারিত হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফিক্সড রেট সুবিধাও দেয়া হয়। বাজার পরিস্থিতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রাহকরা ১১ শতাংশ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে হোম লোন সুবিধা পাচ্ছেন। তবে সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের আয়, পেশা, ক্রেডিট হিস্ট্রি, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা এবং জামানতের মান বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়।
সুদের হার বাজারদরের সঙ্গে ওঠানামা করায় গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি চিন্তা করেই মুক্তবাজার অর্থনীতির আলোকে ব্যাংক খাতে বাজারভিত্তিক সুদহার কার্যকর রয়েছে। বাজারের চাহিদা অনুসারে সুদ বাড়লে গ্রাহকের ঋণের সুদ বৃদ্ধি পাবে, এতে গ্রাহকরা চাপে পড়েন। আবার বাজার পরিস্থিতির কারণে সুদহার কমে গেলে ঋণের সুদহারও কমে যায়। এতে গ্রাহকরা বাড়তি সুবিধা পান। সুদহার নির্ধারণের বিষয়টি শুধু ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল নয়, বাজারের অন্যান্য অনুঘটকের প্রভাবের কারণে সুদহার বৃদ্ধি বা হ্রাস পায়। তবে আমরা চেষ্টা করি গ্রাহকদের ওপর চাপ কমাতে স্বচ্ছভাবে সুদের হার নির্ধারণ করতে এবং প্রয়োজন হলে কিস্তি পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠন সুবিধা দিতে। গ্রাহকদের ওপর কোনোভাবেই যেন সুদের বোঝা না চাপে সেই বিষয়ে আমরা সতর্ক। কারণ সুদহার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
ফ্ল্যাট কেনায় কত টাকা পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছেন? এক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহককে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে?
হোম লোন মূলত ভোক্তা ঋণ। ভোক্তা ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। হোম লোনের ক্ষেত্রেও পৃথক নীতিমালা অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। নীতিমালা অনুসারে প্লট, ফ্ল্যাট নির্মাণ বা ক্রয়ের ক্ষেত্রে মোট খরচের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে ব্যাংক। তবে প্রবাসীরা ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ পান। আগের নীতিমালা অনুযায়ী, আমরা এতদিন ২ কোটি টাকা পর্যন্ত হোম লোন সুবিধা দিয়েছি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নীতিমালা জারি করেছে। ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়সম্পন্ন চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও প্রবাসী আয়ের গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে সিআইবি পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
পর্যাপ্ত বন্ধকি সুবিধা থাকার পরও ব্যাংকগুলো কেন হোম লোন প্রদানে বেশি আগ্রহী হচ্ছে না?
আগেই বলেছি হোম লোন ভোক্তা ঋণ ক্যাটাগরির। এটি মূলত অনুৎপাদনশীল খাতের ঋণ। এজন্য হোম লোন নীতিমালা অনুসরণ করে এ ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। হোম লোন দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হওয়ায় ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করে। এরপরও ঋণ প্রাপ্যতা যাচাই-বাছাই করে ভালো গ্রাহকদের হোম লোন বিতরণে উৎসাহিত করা হয়। হোম লোন বিতরণে ব্যাংক উৎসাহ কম দেখাচ্ছে এ অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয়। যাবতীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করাকে উৎসাহ কমা দেখানো হচ্ছে এটি বলা ঠিক হবে না।
গৃহঋণ খাতে আপনাদের অনাদায়ী ঋণের বর্তমান চিত্রটি কেমন? বিশেষ করে কোন পেশার গ্রাহকদের মধ্যে খেলাপি হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে?
আমাদের ব্যাংকে হোম লোনে খেলাপির হার তুলনামূলকভাবে কম। এ হার ৯ শতাংশ। তবে আমাদের নিয়মিত মনিটর এবং লোন দেয়ার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছি। আশা করি, খেলাপির এ হার কমে আসবে। তবে যেসব গ্রাহকের আয় অনিয়মিত বা ব্যবসাভিত্তিক, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কিছুটা বেশি দেখা যায়। নিয়মিত বেতনভুক্ত চাকরিজীবীদের মধ্যে খেলাপির হার খুবই কম। আমরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেখেছি, গার্মেন্টস অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে গার্মেন্টস বা কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, ভাড়াটিয়া কমে যাওয়ায় বাড়ির মালিকরা ঋণ প্রদানে অনিয়মিত হয়ে পড়েছেন। সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় হোম লোন গ্রাহকদের মাসিক কিস্তির পরিমাণ (ইএমআই) বেড়ে গেছে। ফলে গ্রাহকও মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়ছেন।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি হোম লোনের সর্বোচ্চ সীমা ২ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকায় উন্নীত করেছে। এ সিদ্ধান্ত বাজারে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?
এটি একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। তবে সর্বোচ্চ সীমা বৃদ্ধি মানেই সবাই সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত ঋণ পাবেন বিষয়টি এমন নয়। যারা ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে পরিশোধ করার যোগ্যতা রাখেন এবং এ মূল্যের ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ রয়েছে, তাদের জন্য এ সুযোগটি দরকার ছিল। ব্যাংকের হোম লোন বিতরণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।