দেশের আবাসন খাতে বিনিয়োগ তুলনামূলক নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত। এর পরও দেশের ব্যাংকগুলো আবাসন খাতে ঋণ বিতরণে অনুৎসাহী কেন?
আবাসন খাতে ঋণ বিনিয়োগকে শুধু জামানতের নিরাপত্তার দৃষ্টিতে দেখা হয়। বাস্তবে একটি শক্তিশালী হোম লোন পোর্টফোলিও গড়ে তুলতে হলে এর পেছনে একটি পূর্ণাঙ্গ বা ‘৩৬০-ডিগ্রি’ প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দরকার; যার মধ্যে দক্ষ রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, আইনি যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়াগত শৃঙ্খলা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকবে। এ সক্ষমতা রাতারাতি তৈরি হয় না বলেই অনেক প্রতিষ্ঠান এ খাতে বড় পরিসরে আসতে দ্বিধাবোধ করে। ব্যাংকগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের সংস্থান বা ‘ফান্ড মিসম্যাচ’ আরেকটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ, যার সমাধানে রি-ফাইন্যান্সিং বা বন্ড ইস্যুর মতো নীতিনির্ধারণী সহায়তা প্রয়োজন। তবে সিটি ব্যাংক হোম লোন নিয়ে প্রচলিত গতানুগতিক ধারণাগুলো বদলে দিয়েছে। আমরা প্রমাণ করেছি সঠিক দূরদৃষ্টি এবং শক্তিশালী অপারেশনাল কাঠামো থাকলে আবাসন খাতই হতে পারে ব্যাংকের অন্যতম নিরাপদ ও টেকসই বিনিয়োগের জায়গা। কেবল পলিসির অপেক্ষায় বসে না থেকে নিজস্ব উদ্ভাবনী সক্ষমতা দিয়েও এ খাতে সফল হওয়া সম্ভব।
এ খাতে সিটি ব্যাংকের কী কী প্রডাক্ট রয়েছে? গ্রাহকরা কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন সিটি ব্যাংক থেকে?
সিটি ব্যাংক গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিস্তৃত পরিসরে হোম লোন অফার সাজিয়েছে। আমাদের সেবার মধ্যে রয়েছে ফ্ল্যাট ক্রয়, নিজস্ব জমিতে বাড়ি নির্মাণ, বাড়ি বা ফ্ল্যাট সংস্কার এবং অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে লোন টেক-ওভার সুবিধা। এছাড়া আমাদের বিশেষায়িত ভ্যারিয়েন্ট হিসেবে সেমি-পাকা বাড়ি নির্মাণ, অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য হোম লোন রয়েছে। প্রচলিত বা কনভেনশনাল প্রডাক্টগুলোর পাশাপাশি আমাদের প্রতিটি হোম লোন প্রডাক্টেরই পূর্ণাঙ্গ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামিক সংস্করণও রয়েছে। বর্তমানে গ্রাহকের প্রোফাইল ও ঋণের মেয়াদ অনুযায়ী ১১-১২ শতাংশের আশপাশে সুদ বা মুনাফার হার নির্ধারণ করছে সিটি ব্যাংক।
আবাসন খাতে সিটি ব্যাংকের পোর্টফোলিও চিত্র কেমন?
সিটি ব্যাংকের ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি হোম লোন পোর্টফোলিও রয়েছে। এ খাতে আমাদের খেলাপি ঋণের হার বাজারের গড় হার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম এবং দীর্ঘ সময় ধরেই স্থিতিশীল রয়েছে। মূলত এ টেকসই ও মানসম্মত পারফরম্যান্সের কারণেই আমরা সেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তালিকায় স্থান পেয়েছি, যাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি হোম লোনের সর্বোচ্চ সীমা ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত উন্নীত করার সুযোগটি উন্মুক্ত করেছে। আমাদের লক্ষ্য কঠোর ক্রেডিট ডিসিপ্লিন বজায় রেখে এ খেলাপির হারকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ধরে রাখা। তবে হোম লোনের মতো দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ স্থিতিশীল পরিবেশ থাকলে গ্রাহকের আয় যেমন নিশ্চিত থাকে, তেমনি ব্যাংকের পোর্টফোলিও সুরক্ষিত থাকে।
দেশের জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, সে হারে সম্প্রসারণ হচ্ছে না আবাসন খাত। এতে নীতিগত কোনো প্রতিবন্ধকতা দেখছেন কি?
আমরা মনে করি, আবাসন খাতকে সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছে দিতে নীতিসহায়তার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর নিজেদেরও বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রোপার্টির রেজিস্ট্রেশন খরচ কমানো এবং মালিকানার নথিপত্র পুরোপুরি ডিজিটাল করা জরুরি। এছাড়া সাশ্রয়ী প্রি-ফাইন্যান্স এবং রি-ফাইন্যান্সিং সুবিধা হতে পারে এ খাতের গেম-চেইঞ্জার; যা ব্যাংকগুলোকে কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি ফান্ডের নিশ্চয়তা দেবে এবং সরাসরি গ্রাহকের ঋণের সুদহার কমিয়ে আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে এটাও সত্য শুধু নীতিসহায়তার অপেক্ষায় বসে থাকলে চলবে না। প্রোপার্টি যাচাইয়ের পাশাপাশি গ্রাহকের সক্ষমতা মূল্যায়নে তথ্যনির্ভর আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ঝুঁকি যেমন কমে, তেমনি প্রসেসিং টাইমও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। সিটি ব্যাংকে আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ ‘হোম লোন ইকোসিস্টেম’ গড়ার কাজ করছি। এখানে প্রোপার্টি নির্বাচনের পাশাপাশি লোন প্রসেসিংয়ের অংশ হিসেবে আমরা প্রোপার্টির টাইটেল বা মালিকানা-সংক্রান্ত নথিপত্র অত্যন্ত নিবিড়ভাবে যাচাই করি। এতে একদিকে যেমন ব্যাংকের বিনিয়োগ সুরক্ষিত হয়, অন্যদিকে গ্রাহকও তার কাঙ্ক্ষিত প্রোপার্টির আইনি বৈধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার একটি বাড়তি সুযোগ পান।
গৃহঋণের পরিসীমা উন্নয়ন-সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে কীভাবে দেখছেন?
আবাসন খাতে ঋণ পরিসীমা ২ কোটি থেকে ৪ কোটিতে উন্নয়ন অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। একদিকে নির্মাণসামগ্রীর ঊর্ধ্বমূল্য এবং জমির আকাশচুম্বী দামের কারণে আবাসন ব্যয় যেমন বেড়েছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাজারের বিদ্যমান চাহিদাও ছিল অনেক বেশি। এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পুরো আর্থিক খাতে একটি নীতি সমতা বা পলিসি প্যারিটি তৈরি হয়েছে, যা ব্যাংকগুলোকে আরো বড় পরিসরে ও দায়িত্বশীলভাবে গ্রাহকদের সেবা দেয়ার সুযোগ করে দেবে। বিশেষ করে মধ্য ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য পরিকল্পিত আবাসন অর্থায়নে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তন। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংক এবার এ সীমা বৃদ্ধির বিষয়টি পোর্টফোলিওর ‘হেলথ’ বা সুশৃঙ্খল পারফরম্যান্সের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সিটি ব্যাংক তার চমৎকার ট্র্যাক রেকর্ডের কারণেই এ বর্ধিত সীমা ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে, যা আমাদের সক্ষমতারই বড় স্বীকৃতি।
দেশের আবাসন খাত যেটুকুই সম্প্রসারণ হয়েছে, বাণিজ্যক হলেও তাতে ডেভেলপার কোম্পানিগুলোরও ভূমিকা আছে। এ খাত সম্প্রসারণে কোম্পানিগুলোর আরো কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত বলে মনে করেন?
গত কয়েক দশকে আমাদের আবাসন খাত এক অভাবনীয় বিবর্তন ও অগ্রগতির মধ্য দিয়ে গেছে। আমাদের আধুনিক স্থাপত্যশৈলী এবং নান্দনিকতা এখন আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সফলভাবে প্রতিযোগিতা করছে। শুধু তা-ই নয়, কয়েকশ লিংকেজ শিল্পের প্রসারের মাধ্যমে এ খাত দেশের কর্মসংস্থানে যে বিশাল ভূমিকা রাখছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। তবে হোম লোনের বাজার আরো বিস্তৃত করতে হলে ব্যাংক ও আবাসন কোম্পানিগুলোর মধ্যে পার্টনারশিপের ধরনকে আরো আধুনিক এবং কাঠামোগত করতে হবে। বাজার সম্প্রসারণের জন্য ডেভেলপারদের এখন শহরের মূল কেন্দ্রের বাইরে উপশহর এবং অত্যন্ত সীমিত পরিসরে হলেও গ্রামীণ এলাকায় মানসম্মত ও সাশ্রয়ী প্রকল্প গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের আইনি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং সময়মতো হস্তান্তরের সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এ জায়গাগুলোয় আস্থা তৈরি হলে গ্রাহক যেমন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, তেমনি ব্যাংকগুলোর জন্যও অর্থায়ন আরো সহজ ও নিরাপদ হয়।
আবাসন বাজার সম্প্রসারণ উদ্যোগের অংশ হিসেবে আমরা আরো একটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। আবাসন কোম্পানিগুলোকে এখন ‘অ্যাফোর্ডেবল গ্রিন হাউজিং’ এবং ‘ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্ট’ বা জলবায়ু সহনশীল আবাসন প্রকল্পের আইডিয়া বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ ও টেকসই অবকাঠামো কেবল পরিবেশ রক্ষা করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে আবাসন ব্যয় কমিয়ে প্রডাক্ট ভ্যারাইটি নিশ্চিত করবে। সিটি ব্যাংকের প্রডাক্ট ডিজাইন ও সেগমেন্ট কাস্টমাইজেশনের মাধ্যমে এমন টেকসই এবং বৈচিত্র্যময় প্রকল্পগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে চাই। আমাদের বিশ্বাস, আবাসন কোম্পানিগুলোর দূরদর্শী উদ্যোগ আর ব্যাংক খাতের দায়িত্বশীল ক্রেডিট ব্যবস্থাপনা একসঙ্গে কাজ করলে দেশের আবাসন খাত একটি নতুন ও আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক উচ্চতায় পৌঁছতে পারবে।