দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদের হোম লোন নিশ্চিতে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল পুনরায় চালু করা দরকার

বাংলাদেশ ব্যাংক হোম লোনের সীমা ৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করায় নীতিগতভাবে এটি অত্যন্ত ইতিবাচক। এর মাধ্যমে বাজারে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ ব্যাংক হোম লোনের সর্বোচ্চ সীমা ৪ কোটি টাকা করলেও উচ্চ সুদহার ও বড় ডাউন পেমেন্টের কারণে মধ্যবিত্তরা বাস্তবে কতটা উপকৃত হচ্ছে বলে রিহ্যাব মনে করে, বিশেষ করে ঢাকার বাইরের বাজারে?

বাংলাদেশ ব্যাংক হোম লোনের সীমা ৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করায় নীতিগতভাবে এটি অত্যন্ত ইতিবাচক। এর মাধ্যমে বাজারে একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে বর্তমান বাজারে গৃহ ঋণের সুদহার ১০-১২ শতাংশের আশপাশে, কোনো কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর চেয়ে বেশি নিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে পরিবারের জন্য বড় আর্থিক চাপ তৈরি করে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলো সাধারণত ৩০ শতাংশের আশপাশে ডাউন পেমেন্ট চাইছে, যা অনেক সম্ভাব্য ক্রেতার জন্য বড় বাধা। ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে ফ্ল্যাটের দাম তুলনামূলক কম হলেও আয় কাঠামোও কম। ফলে ইএমআই পরিশোধের সক্ষমতা সীমিত। রিহ্যাব মনে করে কেবল ঋণের সীমা বাড়ানো যথেষ্ট নয়, সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে আনা, ডাউন পেমেন্ট কমানো এবং প্রথমবারের ক্রেতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জেলা শহর ও মফস্বল এলাকায় মধ্যবিত্তবান্ধব হোম লোন কার্যকর করতে হলে অঞ্চলভিত্তিক নীতিগত সমন্বয় অপরিহার্য। অনেক দিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়টি বিবেচনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে রিহ্যাবের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ।

সাধারণ ও প্রথমবারের ফ্ল্যাট ক্রেতাদের জন্য সহজ শর্তে হোম লোন নিশ্চিত করতে রিহ্যাব কি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কোনো বিশেষ বা যৌথ স্কিম নিয়ে আলোচনা করছে?

রিহ্যাব মনে করে, আবাসন খাতকে গতিশীল রাখতে ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য। সে লক্ষ্যে রিহ্যাব বিভিন্ন সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ হোম লোন স্কিম নিয়ে আলোচনা করছে। প্রস্তাবিত স্কিমগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা, প্রথম পাঁচ বছর কম সুদ এবং প্রথমবারের ক্রেতাদের জন্য ডাউন পেমেন্ট ছাড়। ব্যাংক যদি প্রকল্পভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করে এবং ডেভেলপারদের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বিবেচনায় আনে তাহলে সাধারণ ক্রেতাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে। তবে এসব বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা ও পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের বিস্তৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সময়মতো ফ্ল্যাট হস্তান্তর ও নির্মাণ মান নিশ্চিত করতে ডেভেলপারদের জবাবদিহির জন্য রিহ্যাব কি কোনো সার্টিফিকেশন বা গ্যারান্টি ব্যবস্থার কথা ভাবছে?

সময়মতো ফ্ল্যাট হস্তান্তর ও নির্মাণ মান নিশ্চিত করতে ডেভেলপারদের আমরা প্রায়ই উৎসাহ দিয়ে থাকি। আমাদের বেশির ভাগ ডেভেলপার সময়মতো ফ্ল্যাট হস্তান্তর করছেন। রিহ্যাবের সদস্য নয় এমন ডেভেলপার ফ্ল্যাট হস্তান্তরে সমস্যা করে বেশি। তাদের দায় আমরা নেব না। আমাদের মেম্বারদের ফ্ল্যাট হস্তান্তর নিয়ে সমস্যা হলে আমাদের কাস্টমার অ্যান্ড মেডিয়েশন সেল আছে। অনেক ক্রেতার সমস্যা আমরা রিহ্যাব থেকে সমাধান করে দিয়েছি।

‘গ্রুপ কনস্ট্রাকশন’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠাকে রিহ্যাব ডেভেলপারদের প্রতি অনাস্থার ফল হিসেবে দেখছে, নাকি উচ্চ ফ্ল্যাট মূল্যের প্রতিক্রিয়া হিসেবে?

রিহ্যাবের দৃষ্টিতে শেয়ার বেসিস ফ্ল্যাট নির্মাণ বা গ্রুপ কনস্ট্রাকশন জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ তাদের ফ্ল্যাটে কর দিতে হয় না। আমাদের ডেভেলপার একটা প্রজেক্টে ২০টি ফ্ল্যাট ২০ কোটি টাকা বিক্রি করলে সেখান থেকে সরকার প্রায় সব মিলিয়ে ২ কোটি টাকার কাছাকাছি কর পায়। যারা শেয়ার বা ‘গ্রুপ কনস্ট্রাকশন’ করে তাদের কিন্তু সেই ট্যাক্স দিতে হয়নি। ফলে সেখানে ফ্ল্যাটের দাম কম পড়ত। মূলত সরকারের ট্যাক্স ফাঁকি দেয়ার কারণে কিন্তু সেখানে ফ্ল্যাটের দাম কম পড়ে। সেখানে ফ্ল্যাটের দাম কম পড়লেও নানা ধরনের আইনি ঝামেলা থাকে। মানের ক্ষেত্রে সঠিক হয় না। কারণ অভিজ্ঞতার একটা বিষয় থাকে। সেখানে সবাই অনভিজ্ঞ। তারা এ প্রকল্পগুলো সরকারের বা রাজউকের নিয়মগুলো ঠিকভাবে পালন করে না। নির্মাণের গুণগত মানও ঠিক রাখে না। অনিয়ন্ত্রিত গ্রুপ কনস্ট্রাকশন বা শেয়ার বিজনেস দীর্ঘমেয়াদে নগর পরিকল্পনা, নিরাপত্তা ও মানের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সংগঠিত আবাসন খাতকে স্বচ্ছ ও মধ্যবিত্তবান্ধব করা গেলে প্রবণতা ভারসাম্যে আসবে। শেয়ার বিজনেসে কোনো জবাবদিহিতা নেই। এ ধরনের ব্যবসাকে আমরা নিরুৎসাহিত করি।

অনানুষ্ঠানিক ও অনুমোদনহীন আবাসন খাতের ঝুঁকি কমাতে সরকার ও রাজউকের কী ধরনের নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে রিহ্যাব মনে করে?

অনানুষ্ঠানিক ও অনুমোদনহীন আবাসন খাতের বিস্তার নগর ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। ভবন নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বাড়ছে এবং সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। রিহ্যাব মনে করে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ, সময়সীমাবদ্ধ ও ডিজিটাল করতে হবে, যাতে মানুষ নিয়মের বাইরে না যায়। বৈধ ডেভেলপারদের জন্য কর ও ফি যৌক্তিক করা হলে আনুষ্ঠানিক খাত প্রতিযোগিতামূলক হবে। গ্রুপ কনস্ট্রাকশন ও শেয়ার প্রকল্প একটি ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে আনা উচিত। রিহ্যাবের মতে, সুশাসন ও সমন্বয় ছাড়া সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। রিহ্যাব সদস্যবিহীন যেসব ডেভেলপার এ ব্যবসায় জড়িত তারা সরকারের ঘোষিত নীতির বিরুদ্ধে কাজ করছে।

ফ্ল্যাটের দাম নির্ধারণে স্বচ্ছতা আনতে রিহ্যাব কি কস্ট ব্রেকডাউন বা প্রাইস ট্রান্সপারেন্সির উদ্যোগ নেবে?

ফ্ল্যাটের দাম নিয়ে ক্রেতাদের বিভ্রান্তি রয়েছে। কারণ একেক এরিয়ায় একেক দাম। এর মূল কারণ জমির মূল্য। জমির দাম ওপর ভিত্তি করেই মূলত ফ্ল্যাটের দাম নির্ভর করে। নির্মাণ ব্যয় সব জায়গায় কাছাকাছি। রিহ্যাবের পক্ষে কস্ট ব্রেকডাউন বা প্রাইস ট্রান্সপারেন্সি বের করে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ আগেই বলেছি জমির দাম একেক জায়গায় একেক রকম। একই এলাকায় লোকেশনের ওপর বা রাস্তার ওপর ভিত্তি করে জমির দাম আলাদা হয়। ফলে কস্ট ব্রেকডাউন বের করা কঠিন। তাছাড়া রিহ্যাব নিজে ব্যবসা করে না। ব্যবসা করে রিহ্যাবের সদস্যরা। একেকজনের একেক রকম ক্রেতা থাকে। একেকজনের ব্যবসা পলিসি একেক রকম। ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রেও একেকজনের চয়েস একেক রকম। ম্যান টু ম্যান ভেরি করে।

মধ্যবিত্তবান্ধব আবাসন বাড়াতে সরকারের কোন নীতি সহায়তাটি বেশি জরুরি মনে করেন?

মধ্যবিত্তবান্ধব আবাসন বাড়াতে সরকারের নীতি সহায়তা অপরিহার্য। প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদের হোম লোন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল পুনরায় চালু করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নিবন্ধন ব্যয়, স্ট্যাম্প ডিউটি ও ভ্যাট যৌক্তিক পর্যায়ে আনলে ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। তৃতীয়ত, রাজউকের অনুমোদন প্রক্রিয়া সময়মতো শেষ করা গেলে প্রকল্প ব্যয় ও ঝুঁকি কমবে। সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য আলাদা নীতিমালা ও প্রণোদনা থাকলে ডেভেলপাররা মধ্যবিত্তের জন্য প্রকল্প নিতে উৎসাহিত হবে। রিহ্যাব মনে করে, এসব নীতি সহায়তা একসঙ্গে কার্যকর হলে আবাসন খাতে আস্থা ফিরবে এবং শহরভিত্তিক টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে।

আরও