দক্ষিণ এশিয়া

হেপাটাইটিসে মৃত্যুহারে মালদ্বীপের পরই বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশে ভাইরাল হেপাটাইটিস এখনো অন্যতম ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএইচও) প্রকাশিত গ্লোবাল হেপাটাইটিস রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুহারের দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় মালদ্বীপের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।

দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ১৮ দশমিক ৪ জন হেপাটাইটিস-সম্পর্কিত জটিলতায় মারা যান। একই সময়ে মালদ্বীপে এ হার ২২ দশমিক ৩, শ্রীলংকায় ১১ দশমিক ২, ভারতে ৮ দশমিক ৭, ভুটানে ৫ দশমিক ৫ ও নেপালে ৩ দশমিক ১।

ডব্লিউএইচওর তথ্য বলছে, হেপাটাইটিস বি ও সি বর্তমানে বিশ্বে সংক্রামক রোগজনিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে হেপাটাইটিস বি ও সি-সম্পর্কিত লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারে প্রায় ১৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের কারণে মারা গেছে প্রায় ১১ লাখ মানুষ এবং হেপাটাইটিস সি-সম্পর্কিত মৃত্যু হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার।

বাংলাদেশেও হেপাটাইটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দেশে লাখ লাখ মানুষ হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস বহন করলেও তাদের অনেকেই জানে না যে তারা সংক্রমিত। কারণ দীর্ঘদিন এ রোগের কোনো উপসর্গ নাও থাকতে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ে তখনই, যখন লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো জটিলতা তৈরি হয়।

এ প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবসের বার্তা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাপক স্ক্রিনিং, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হেপাটাইটিস বি টিকার বার্থ ডোজ নিশ্চিত করা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিয়মিত পরীক্ষা এবং সহজলভ্য চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিসকে জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূল করার বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৩ লাখ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণ নিয়ে বসবাস করছে। এর মধ্যে প্রায় ৭২ লাখ হেপাটাইটিস বি এবং ১০ লাখের বেশি হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্তদের বড় একটি অংশই জানে না তারা ভাইরাস বহন করছে। ফলে অনেকের রোগ ধরা পড়ে তখনই, যখন লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো জটিলতা তৈরি হয়ে যায়।

এ পরিস্থিতিতে লিভার ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফয়েজ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে এখনই আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশে প্রায় ৪ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস বি এবং ১ শতাংশের কম মানুষ হেপাটাইটিস সি ভাইরাসে আক্রান্ত। ধারণা করা হয়, এ দুই ভাইরাস মিলিয়ে প্রায় এক কোটি মানুষ সংক্রমণ বহন করছে। হেপাটাইটিস বি ও সি দীর্ঘমেয়াদে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী রোগের কারণ হয়। তাই ব্যাপক স্ক্রিনিং, সহজলভ্য ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। বর্তমানে অধিকাংশ পরীক্ষা ঢাকা ও বিভাগীয় শহরকেন্দ্রিক। এসব পরীক্ষা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণের পাশাপাশি জাতীয় কৌশলপত্র বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরকার, চিকিৎসক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ২০৩০ সালের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।’

ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বিশ্বে হেপাটাইটিস বি-জনিত মৃত্যুর ৬৯ শতাংশই মাত্র ১০টি দেশে ঘটে। দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, ঘানা, ইথিওপিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকা। অর্থাৎ হেপাটাইটিস বি-জনিত মৃত্যুর সবচেয়ে বেশি বোঝা বহনকারী দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। তবে ডব্লিউএইচও দেশগুলোর কোনো ক্রমিক র‍্যাংকিং প্রকাশ করেনি; কেবল উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি (ক্রনিক) হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি মালদ্বীপে, ৫ দশমিক ২ শতাংশ। এর পরই রয়েছে বাংলাদেশ, যেখানে এ হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। শ্রীলংকায় ২ দশমিক ২ শতাংশ, ভারতে ২ দশমিক ১ শতাংশ, ভুটানে ১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং নেপালে ১ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাস বহন করছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস সি সংক্রমণের হার মালদ্বীপ, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকায় সমান—প্রতিটি দেশে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ। ভারতে ও নেপালে এ হার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভুটানে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে হেপাটাইটিসজনিত মৃত্যুর অন্যতম কারণ রোগ শনাক্তে বিলম্ব। অধিকাংশ রোগীর প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ থাকে না। ফলে নিয়মিত পরীক্ষা না করায় তারা বছরের পর বছর অজান্তেই ভাইরাস বহন করে। পরে লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে চিকিৎসকের কাছে আসে। তখন অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

হেপাটাইটিস বি সম্পূর্ণরূপে টিকার মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য। জন্মের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবজাতককে হেপাটাইটিস বি টিকার বার্থ ডোজ দেয়া গেলে মা থেকে শিশুর সংক্রমণের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে গর্ভবতী নারীদের স্ক্রিনিং, উচ্চ ঝুঁকির জনগোষ্ঠীর নিয়মিত পরীক্ষা, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন, নিরাপদ ইনজেকশন ব্যবহার এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ডব্লিউএইচও।

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে হেপাটাইটিস চিকিৎসার বেশির ভাগ সুবিধা বড় শহর, বিশেষ করে ঢাকাকেন্দ্রিক। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষ গ্রামে বাস করে। একজন গ্রামের রোগীকে শুধু একটি পরীক্ষা করানোর জন্য বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে অনেক দূর ভ্রমণ করতে হয়। এতে সময়, অর্থ ও শ্রম—সবই ব্যয় হয়। অনেকেই এ কারণে চিকিৎসা শুরুই করতে পারেন না। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষকে চিকিৎসার জন্য শহরে না এনে চিকিৎসাকেই মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিকে ধাপে ধাপে হেপাটাইটিস পরীক্ষা, কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে রোগী দ্রুত শনাক্ত ও প্রয়োজনীয় রেফারেলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’

প্রতি বছর ২৮ জুলাই বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস। ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম জোরদার করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য Let’s Break It Down, যার আহ্বান হলো—হেপাটাইটিস নির্মূলে বিদ্যমান সব বাধা দূর করে পরীক্ষা, টিকাদান ও চিকিৎসা সবার জন্য সহজলভ্য করা।

আরও