দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান এমপি। পেশায় চিকিৎসক। ঢাকার সাভারে অবস্থিত এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। রানা প্লাজা ধসে আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে স্থাপন করেন দৃষ্টান্ত। দেশে মেডিকেল শিক্ষার নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তোফাজ্জল হোসেন
বাংলাদেশে দিন দিন বিদেশী শিক্ষার্থীদের মেডিকেল শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ছে। এ খাতে সম্ভাবনা কতটুকু দেখছেন?
আমাদের দেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ আছে প্রায় ৩০টি। সেখানে সার্ক কোটায় বিদেশী শিক্ষার্থী আসে। কিন্তু সংখ্যাটা খুবই কম, প্রায় ৮০ জন। আর বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ৬৬টি। সেখানে প্রায় ৫০ শতাংশ কলেজে বিদেশী শিক্ষার্থী আসে। সংখ্যাটি প্রায় দুই হাজার বা তার কিছু বেশি। এই সেশনেও প্রায় ২ হাজার ২০০ শিক্ষার্থী বিদেশ থেকে এসেছে। বেসরকারি খাতে ১৯৮৪ সালে প্রথম বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হলো। তার পরই দেশে বিদেশী শিক্ষার্থী আসা শুরু হয়। এনাম মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৪ সালে। ২০০৭ সালেই থেকেই এখানে বিদেশী শিক্ষার্থী আসা শুরু হয়।
আগে নিয়ম ছিল নির্ধারিত আসনের ৫০ ভাগ বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি হবে। দুই বছর ধরে এ নিয়ম পরিবর্তন করে বিদেশী শিক্ষার্থীদের জন্য ৪৫ শতাংশ আসন নির্ধারণ করা হয়েছে। আমাদের যারা কনসালট্যান্ট আছেন বিদেশী শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করেন, তাদের কিন্তু প্রতি বছরই চাহিদা বাড়ছে। তারা আমাদের বলছেন আসন বাড়াতে। দুই হাজারের মতো শিক্ষার্থী আমাদের এখানে আসে। কিন্তু চাহিদা থাকে ১২-১৪ হাজার। ফলে অন্য শিক্ষার্থীরা কিছু ভারতে, কিছু চীনে বা অন্য দেশগুলোয় চলে যায়। আমাদের এখানে যারা আসে তাদের সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতিক মিল রয়েছে। এছাড়া পড়াশোনার বিষয়াদিও মোটামুটি একই। বাংলাদেশ কিন্তু গত ২০ বছরে বেসরকারি খাতে অনেক এগিয়েছে। একাডেমিক মানেও এগিয়েছে।
এনাম মেডিকেলে বিদেশী কোটা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? বাংলাদেশে বিদেশী শিক্ষার্থীদের এত আগ্রহের কারণ কী?
এ বছর এনাম মেডিকেলের ২৬ শিক্ষার্থী অনার্স মার্ক পেয়েছে। একজন থার্ড স্ট্যান্ড করেছে। ৩৬ শিক্ষার্থী পোস্টগ্র্যাজুয়েশন পর্যায়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। অন্য মেডিকেল কলেজগুলোতেও শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করছে। ফলে দিন দিন বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজগুলোয় ভর্তির চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু কোটা ৪৫ শতাংশ হওয়া এবং আসন সীমিত হওয়ায় চাহিদার বিপরীতে আমরা ভর্তি নিতে পারছি না। একশ-দেড়শর মধ্যে আসন রয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এনাম মেডিকেলে রয়েছে ১৫৫টি আসন। কয়েক দিন আগে স্বাস্থ্য সচিব আইজুর রহমান এবং স্বাস্থ্য শিক্ষার মহাপরিচালক টিটু মিয়া আমাদের মেডিকেল কলেজ পরিদর্শন করেন। তারা কলেজের শিক্ষক, হাসপাতাল, রোগীর সংখ্যা দেখে বলেছিলেন আমাদের বিদেশী কোটা বাড়ানো উচিত।
বিদেশী শিক্ষার্থীদের আগমনে মেডিকেল কলেজগুলো দেশের অর্থনীতিতে কেমন ভূমিকা রাখছে?
অনেক বেসরকারি মেডিকেল কলেজ আছে যারা শতভাগ শিক্ষার্থী পায় না। এবারো যেমন অনেকের ২০-৩০ শতাংশ আসন খালি থাকবে। এ আসনগুলো যদি আমরা বিদেশী শিক্ষার্থী দিয়ে পূরণ করতে পারতাম, তাহলে মেডিকেল কলেজগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারত। সরকারও ডলার সংকটের এ সময়ে কিছুটা হলেও সুবিধা পেত। সরকার এ বিষয়গুলো অনুধাবন করছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা মেডিকেল কলেজগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছে। সেখানে তারা আসন বাড়ানো এবং বিদেশী শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয়া নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। এখন আমরা আমাদের অ্যাসোসিয়েশন থেকে আবেদন করব। এতে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর আসনও পূর্ণ হবে, আর্থিক ক্ষতিও কাটিয়ে উঠতে পারবে। ব্যক্তিগতভাবে আমার মতামত, বিদেশী কোটা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করা উচিত।
ভারতে মেডিকেল শিক্ষা অনেক দূর এগিয়েছে। চীন, রাশিয়ার অবস্থানও কাছেই। এসব দেশে না পড়ে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশকে বেছে নিচ্ছে। এ অঞ্চলে প্রতিযোগিতার জায়গায় বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়েছে?
এখানে বিদেশী শিক্ষার্থী ভারত আর নেপাল থেকেই বেশি আসে। ভুটান থেকে যেটা আসে সেটি সংখ্যায় খুবই কম। মধ্যপ্রাচ্যে অনেক ভারতীয় নাগরিক বসবাস করেন। তাদের সন্তানরা এখানে আসছে মেডিকেলে পড়তে। বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশ থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করে দেশে ফিরলেই কিন্তু চাকরি বা প্র্যাকটিসের অনুমোদন পায় না। প্রত্যেককেই নিজ নিজ দেশে একটা পরীক্ষা দিয়ে নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিতে হয়। যখন পরীক্ষার মাধ্যমে নিজ দেশের সরকারের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়, তখনই তারা চাকরি বা প্র্যাকটিসের অনুমোদন পায়। নেপাল, ভারত দুই দেশেই একই নিয়ম। এখন বাংলাদেশ থেকে যারাই পাস করে নিজ দেশে ফিরে গেছে তাদের সবাই এসব পরীক্ষায় পাস করে নিজ দেশে কাজ করছে। ভালো ভালো জায়গায় আছে। অনেকেই বাংলাদেশ থেকে পাস করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাজ করছে। সেই দিক থেকে আমরা মনে করি যে একাডেমিক মানের কথা যদি বলি তাহলে বলতে হবে, ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশ একটা সমপর্যায়ে এসেছে। অন্যদিকে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে মেডিকেলে পড়ার খরচ অনেক কম। ফলে শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মেডিকেল কলেজগুলোয় সম্প্রতি অটোমেশন পদ্ধতিতে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করেছে সরকার। এটি কতটা ইতিবাচক বলে মনে করেন?
সরকার স্বচ্ছতা আনার জন্যই ভর্তি প্রক্রিয়ায় অটোমেশন পদ্ধতি এনেছে। এতে মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য সুবিধা হয়েছে বলেই আমি মনে করি। এটিকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু প্রক্রিয়াটা একটু সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী অন্যত্র চলে যাচ্ছে। ফলে কিছুটা শিক্ষার্থী সংকট দেখা দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের আশ্বাস দেয়া হয়েছে, প্রতিটি মেডিকেল কলেজে যেন আসন পূর্ণ হয় সেজন্য তারা পদক্ষেপ নেবে।
এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষার ব্যয়ের তুলনাটা কীভাবে করবেন?
আমাদের বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোয় সরকার নির্ধারিত ফিতে ভর্তি নেয়া হয়। বর্তমানে সরকার নির্ধারিত ফি ২১ লাখ ২৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ইন্টার্ন বাবদ ফেরত দিতে হবে। একই মানের শিক্ষার ক্ষেত্রে ভারতে পড়তে গেলে দেড়-দুই কোটি রুপির প্রয়োজন পড়ে। নেপালেও প্রায় ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি নেপালি রুপির প্রয়োজন পড়ে। সেই তুলনায় আমি বলব, বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তায় মেডিকেলে পড়ার সুযোগ দিয়ে থাকে। এ কারণে ভারত ও নেপালের শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ বেশি। একটি মেডিকেল কলেজ তার প্রথম ব্যাচ পাস করে বের হওয়ার পর বিদেশী শিক্ষার্থী ভর্তি করার অনুমতি পায়।
বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকার বা বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আগামীতে কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?
চিকিৎসা বিজ্ঞান মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করে। চিকিৎসকদের সঠিক চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে রোগীর বাঁচা-মরা। পৃথিবীতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর পেশা এটি। এজন্য এখানে শিক্ষার মান শতভাগ উচ্চমানের হওয়া উচিত। এ মান বাড়ানোর জন্য বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন ২০২২ করা হয়েছে। গত বছর এটি সংসদে পাস হয়েছে। এ আইনে যেভাবে গাইডলাইন দেয়া আছে, সেভাবে যদি প্রতিটি মেডিকেল কলেজ পরিচালিত হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিম্নমানের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। একই সঙ্গে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল রয়েছে। তারা মেডিকেল শিক্ষার কারিকুলাম ও নিয়মকানুন তৈরি করে। অবস্থা অনুযায়ী তারা প্রতি বছরই গবেষণার মাধ্যমে এ নিয়মকানুনগুলোর উন্নয়ন করে। এক্ষেত্রে বিএমডিসিও একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমাদের উদ্যোক্তাদের আরো সচেতন হতে হবে। যদি আমরা এখনো সেভাবে ল্যাব, ভবন, অ্যাকোমোডেশন, শিক্ষক, টেকনিশিয়ান দিয়ে সাজাতে পারি তাহলে আরো উন্নতমানের শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা দিতে পারব।
বিদেশী শিক্ষার্থীদের থাকা, খাওয়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ ও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়েছে?
একজন শিক্ষার্থী ৭০-১০০ ডলারের মধ্যেই এসব করতে পারছে। খাওয়াদাওয়া তারা বেশির ভাগ নিজেদের আয়োজনেই করে। এটি আমাদের জীবনযাত্রার যা খরচ তাদের ক্ষেত্রেও আলাদা কিছু নয়।
বাংলাদেশে চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণা নিয়ে জানতে চাই।
ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ড. লোটে শেরিং বাংলাদেশের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা করেছেন। পরে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জন থেকে তিনি এফসিপিএস করে এখন সার্জন হিসেবে ভুটানে কাজ করছেন। এমন অসংখ্য বিদেশী ছাত্রছাত্রী পোস্টগ্র্যাজুয়েশন করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের কোনো নিষেধ নেই। কেউ যদি এখানে পিএইচডি করতে চায় বা কোনো বিষয়ে গবেষণা করতে চায় তাহলে তাকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আসতে হবে। তবে এ উদাহরণ কম। বেশির ভাগই নিজ দেশে ফিরে গিয়ে বাকি পড়াশোনা করছে।