ইলেকট্রনিকস শিল্পের টেকসই বিকাশ ও বিনিয়োগ সুরক্ষায় নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি

দেশে ইলেকট্রনিকসের চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির সঙ্গে এ খাতের বার্ষিক বাজারের আকারও অনেক বড় হয়েছে।

ইলেকট্রনিকস খাতের বাজার দিন দিন বাড়ছে। উৎপাদক ও সরবরাহকারীদের মধ্যে আপনারা বড় জায়গা দখল করতে পেরেছেন। অবস্থান ধরে রাখাটা কীভাবে সম্ভব হলো?

দেশে ইলেকট্রনিকসের চাহিদা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধির সঙ্গে এ খাতের বার্ষিক বাজারের আকারও অনেক বড় হয়েছে। এ বিশাল বাজারে ক্রেতা চাহিদা পূরণ ও আস্থা অর্জন, উদ্ভাবনী ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদন, পণ্যের গুণগতমান, শক্তিশালী সেলস ও সার্ভিস নেটওয়ার্ক এবং মার্কেট শেয়ারের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে ওয়ালটন। এ সাফল্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ ভূমিকা রাখছে। প্রথমত, প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওয়ালটন পণ্যে প্রতিনিয়ত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, আইওটির মতো উদ্ভাবনী ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির স্মার্ট ফিচার সংযোজন। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মেশিনারিজ ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্যের উচ্চ গুণগতমান নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, ওয়ালটনের আন্তর্জাতিক মানের ইলেকট্রনিকস, ইলেকট্রিক্যাল ও প্রযুক্তিপণ্য গ্রাহকদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ডিস্ট্রিবিউটর, প্লাজা ও করপোরেট সেলসের আওতায় দেশজুড়ে শক্তিশালী ও সর্ববৃহৎ সেলস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। চতুর্থত, আইএসও সনদপ্রাপ্ত ওয়ালটন কাস্টমার সার্ভিস ম্যানেজমেন্টের আওতায় সারা দেশে বিস্তৃত সর্ববৃহৎ সার্ভিস নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের দ্রুত ও সর্বোত্তম বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান নিশ্চিত করা। মূলত এসব কারণেই স্থানীয় এ খাতে দীর্ঘ বছর ধরে সিংহভাগ ক্রেতার আস্থা এবং মার্কেট শেয়ার ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি আমরা। যার পরিপ্রেক্ষিতে ওয়ালটন দেশের সুপারব্র্যান্ডের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

প্রযুক্তি খাতে আপনারা বড় বিনিয়োগ করেছেন। বিনিয়োগের বিষয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতা জানতে চাই।

চলতি শতকের প্রথম দশকেও দেশের প্রযুক্তিপণ্য খাতের বাজার ছিল সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর। এ খাতের বাজারে গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলোর একচেটিয়া আধিপত্য থাকা সত্ত্বেও ওয়ালটনের উদ্যোক্তারা বিশাল ঝুঁকি নিয়ে ২০০৬ সালে দেশে প্রথম রেফ্রিজারেটর কারখানা স্থাপনে বিনিয়োগ করেন। কারখানায় প্রোডাকশন লাইন, মান নিয়ন্ত্রণ ও টেস্টিং বিভাগে স্থাপন করা হয় বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সব মেশিনারিজ। ২০০৮ সালে ওয়ালটন কারখানায় শুরু হয় ফ্রিজের বাণিজ্যিক উৎপাদন। এরপর স্থানীয় বাজারে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই গ্রাহকদের আস্থা ও মন জয় করে নেয় ওয়ালটন ফ্রিজ। এরই ধারাবাহিকতায় ওয়ালটন কারখানায় বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে এয়ার কন্ডিশনার, টেলিভিশন, কম্প্রেসার, হোম ও কিচেন অ্যাপ্লায়েন্স, ইলেকট্রিক্যাল অ্যাপ্লায়েন্সেস, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যাটেরিয়ালস ও কম্পোনেন্টসসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যের ম্যানুফ্যাকচারিং প্লান্টস স্থাপন করা হয়। ওয়ালটনের সাহসিকতাপূর্ণ বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে পাল্টে যায় আমদানিনির্ভর প্রযুক্তিপণ্য খাতের চিত্র। ওয়ালটনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রযুক্তিপণ্য খাতে বিনিয়োগ শুরু করেন আরো অনেক দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তা। ফলে দেশে প্রযুক্তিপণ্য শিল্প খাতের দ্রুত বিকাশ ঘটে। ইলেকট্রনিক ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ হয়েছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। শুধু তাই নয়, এক সময়ের সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর খাতটি এখন বিশাল সম্ভাবনাময় রফতানি খাতে পরিণত হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে ডলার সমস্যায় ভুগছেন আপনারা। ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে দেশীয় ইলেকট্রনিক শিল্প কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে?

ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইলেকট্রনিকস শিল্পের ওপর দুইভাবে প্রভাব পড়েছে। একটি হলো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পণ্যের বেসিক কাঁচামাল ক্রয়ে খরচ বেশি হওয়ায় পণ্যের উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে গ্রাহক পর্যায়েও পণ্যের মূল্যে তার প্রভাব পড়েছে। তবে গ্রাহকের কথা মাথায় রেখে খরচ বৃদ্ধির অনুপাতে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে লাগাম টেনে ধরেছি আমরা। অন্যদিকে বিদেশ থেকে পণ্যের বেসিক কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খুলতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। অতীতে রিজার্ভ সংকট থাকায় ব্যাকগুলোয়ও পর্যাপ্ত ডলার না থাকায় আমরা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট ও ফাইন্যান্স বিভাগের দক্ষ টিমের সুনিপুণ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে কখন কোন ম্যাটেরিয়ালস নিয়ে আসতে হবে তার একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে বিষয়টি ওভারকাম করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা বিষয়টি এখন ভালোভাবেই ম্যানেজ করতে পারছি।

গুণগত মানের জায়গায় বিদেশী পণ্যের সঙ্গে দেশীয় পণ্য কতটুকু প্রতিযোগিতায় সক্ষম?

বাংলাদেশের মানুষের হাতে সেরা দামে সেরা মানের পণ্য তুলে দিতে দেশীয় শিল্পোদোক্তারা পণ্য উৎপাদনে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। দেশীয় পণ্যের গুণগতমান অনেক উন্নত বলেই সম্পূর্ণ বিদেশী ব্র্যান্ডের দখলে থাকা স্থানীয় ইলেকট্রনিকস খাতের বাজারে অতি অল্প সময়ের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার করে নিতে সক্ষম হয়েছে দেশীয় পণ্য। এমনকি ইউরোপ-আমেরিকাসহ বাংলাদেশে তৈরি ইলেকট্রনিক পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। এটাই প্রমাণ করে যে বিদেশী পণ্যের চেয়ে বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্যের গুণগতমান কোনো অংশেই কম নয়, বরং ক্ষেত্রবিশেষে বেশি। উদাহরণস্বরূপ বলছি, ওয়ালটনের প্রতিটি পণ্য বিএবি অ্যাক্রেডিটেড আন্তর্জাতিক মানের টেস্টিং ল্যাব ‘নাসদাত-ইউটিএস’ থেকে মান যাচাই সনদ পাওয়ার পরই বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এছাড়া ওয়ালটনের বিদ্যুৎসাশ্রয়ী ফ্রিজ ও এসি অর্জন করেছে বিএসটিআইয়ের সর্বোচ্চ এনার্জি রেটিং সনদ। কিন্তু অনেক বিদেশী ব্র্যান্ডের পণ্যের গায়ে বিএসটিআইয়ের এনার্জি রেটিং সনদ থাকে না।

আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?

দেশীয় ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদন শিল্পের দ্রুত বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সরকারের নীতি সহায়তা। সরকারের কাছ থেকে পাওয়া নীতি সহায়তাকে আমরা সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে দেশে এ শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটিয়েছি। ওয়ালটনসহ যেসব কোম্পানি এগিয়ে এসেছে, তাদের প্রচেষ্টার ফলে এ খাত এখন ভালো অবস্থানের দিকে যাচ্ছে। এ খাতের আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় বছরে বিপুল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এ খাতে লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান হওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তি শিল্পের দক্ষ জনবল তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি আমদানির পরিবর্তে এখন ইলেকট্রনিক পণ্য রফতানির মাধ্যমে আমরা বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও আয় করছি। সুতরাং এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আগামী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে পলিসি সাপোর্ট অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। কিছু কিছু পণ্যের যেমন কমার্শিয়াল ভিআরএফ এসির বেসিক কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ হারে শুল্ক দিতে হচ্ছে। যার ফলে উচ্চপ্রযুক্তির ভিআরএফ এসি আমদানির তুলনায় দেশে উৎপাদনে খরচ বেশি পড়ছে। এ দিকটিতে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি দেয়া উচিত। আমাদানিকারকদের চেয়ে যেন স্থানীয় শিল্প বেশি সুবিধা পায় বাজেটে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

দেশের ইলেকট্রনিক খাতের বাজার এখন কত হাজার কোটি টাকার? দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি এ খাতে বিদেশী কোনো বিনিয়োগ রয়েছে কিনা।

দেশে ইলেকট্রনিক খাতের বার্ষিক বাজার প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল বাজারের ৯০ শতাংশের বেশি এখন দেশীয় ব্র্যান্ডের দখলে। বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক খাতের দ্রুত বিকাশে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে ওয়ালটনের বিপুল বিনিয়োগ। ইলেকট্রনিক খাতের বাজারে ওয়ালটনের অসাধারণ সাফল্য অর্জনে অনুপ্রাণিত হয়ে এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসেন আরো অনেকে। এ খাতে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগও আসতে শুরু করেছে।

আরও