কর হারে রেয়াত দেয়া হলে এনবিএফআইগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে

বাংলাদেশের ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, এসএমই অর্থায়ন ও গ্রিন ফাইন্যান্সিং খাতে।

আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রত্যাশা কী? আপনারা কেমন বাজেট চাইছেন?

বাংলাদেশের ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ, টেকসই প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, বিশেষত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, এসএমই অর্থায়ন ও গ্রিন ফাইন্যান্সিং খাতে। বর্তমান বৈশ্বিক ও স্থানীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে একটি বাস্তবমুখী ও নীতিসম্মত বাজেট সময়ের দাবি।

এনবিএফআইগুলোর দীর্ঘমেয়াদি তহবিল সংগ্রহে করমুক্ত বন্ড ইস্যুর অনুমোদন সহজীকরণ, রেগুলেটরি প্রক্রিয়ার দ্রুততা ও ইনভেস্টরদের করছাড় সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আবাসন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে কর প্রণোদনা এবং লাভের ওপর করহার হ্রাসের প্রয়োজন রয়েছে। এসএমই ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়নে উৎসাহ দিতে কর মওকুফ, ইনভেস্টমেন্ট ট্যাক্স ক্রেডিট ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পের সঙ্গে বাজেট সমন্বয়ের সুপারিশ করছি। এছাড়া আমানতের ওপর উৎসে কর বাস্তবসম্মত হারে নির্ধারণ, পেনশনভোগী ও ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য রেয়াত বৃদ্ধি এবং কর রিটার্ন দাখিলকারীদের জন্য রিফান্ড পদ্ধতি সহজ করা জরুরি। এনবিএফআই খাতের ভিন্ন কার্যপরিধি বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংকের মতো কঠোর কর কাঠামো থেকে সরে এসে খাতভিত্তিক করনীতি ও পৃথক গাইডলাইন প্রণয়নও সময়োপযোগী হবে। সার্বিকভাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট এমন হতে হবে, যা ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।

সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মাধ্যমে এনবিএফআইগুলো পুঁজিবাজারভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এক্ষেত্রে আপনারা বাজেটে কোনো করছাড় প্রত্যাশা করছেন কি?

এনবিএফআইগুলো তাদের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান যেমন মার্চেন্ট ব্যাংক, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি ও সিকিউরিটিজ হাউজের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি মূলধন গঠন সম্ভব হচ্ছে। তবে কর কাঠামোর জটিলতা, দ্বৈত কর এবং অনুকূল নীতির অভাবে এ খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারছে না।

সাবসিডিয়ারিগুলোর মুনাফার ওপর কর রেয়াত প্রদান, বিশেষ করে এসএমই ও গ্রিন কোম্পানিতে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত মুনাফার জন্য করছাড় প্রযোজ্য করা যেতে পারে। পাশাপাশি সাবসিডিয়ারি থেকে প্রাপ্ত ডিভিডেন্ডে দ্বৈত কর নিরসনের মাধ্যমে প্যারেন্ট কোম্পানির জন্য করছাড় এবং কর রিফান্ড পদ্ধতির সরলীকরণ প্রয়োজন। বাজার স্থিতিশীল রাখতে ঝুঁকি মোকাবেলায় করমুক্ত রিজার্ভ গঠনের সুযোগ এবং নির্ধারিত গাইডলাইনের মাধ্যমে তা ব্যবহারের অনুমতি দেয়া উচিত। এছাড়া কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনলে পুঁজিবাজারের ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে। যেমন ব্রোকারেজ হাউজগুলোর দৈনন্দিন লেনদেনের ওপর প্রযোজ্য এআইডি ০.০৫০% থেকে কমিয়ে তা সহনীয় মাত্রায় নিয়ে আসা যেতে পারে, ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে ডিভিডেন্ডের ওপর কর্তনকৃত আয়করকে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ রাখা যেতে পারে, মার্চেন্ট ব্যাংকের করপোরেট করহার ব্রোকারেজ হাউজের মতো করা যেতে পারে। পুঁজিবাজারে কালো টাকা বিনিয়োগে কর রেয়াত দিয়ে মূলধন প্রবাহ বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মার্জিন ঋণ অবলোপনের ক্ষেত্রে বিএসইসির নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আয়কর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে করযোগ্য আয়ের সমন্বয়ে স্পষ্টতা ও নীতিগত সমন্বয় প্রয়োজন।

সর্বোপরি পুঁজিবাজারের বিকাশে এনবিএফআইয়ের সাবসিডিয়ারিগুলো যাতে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, সেজন্য এবারের বাজেটে করছাড়, নীতিগত সমন্বয় ও প্রণোদনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি ও দেশের মূলধন বাজারকে আরো গতিশীল করা সম্ভব।

বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ চান কি? কোন খাতে এ সুযোগ দেয়া হলে অর্থনীতির জন্য ভালো হবে বলে মনে করেন?

বাজেটে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার একটি এককালীন সুযোগ দেয়া যেতে পারে। কারণ এ অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে এলে তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রাজস্ব বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এ সুযোগ যেন করফাঁকিকে উৎসাহিত না করে, সেজন্য এটি হতে হবে সীমিত সময়ের, উচ্চ হারে কর বা জরিমানাসহ এবং নির্দিষ্ট খাতে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের শর্তে। অপ্রদর্শিত অর্থ ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে উপযোগী খাতগুলো হতে পারে মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আবাসন, প্রবাসীদের পুনর্বাসন প্রকল্প, পুঁজিবাজারে নির্দিষ্ট মেয়াদের বাধ্যতামূলক বিনিয়োগ, গ্রিন এনার্জি ও এসএমই ফাইন্যান্সিং। এসব খাতে বিনিয়োগ হলে তা সামাজিক ভারসাম্য, শিল্পায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে ভূমিকা রাখবে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কালো টাকার বড় অংশ আবাসন ও জমির বাজারে গিয়ে প্রান্তিক জনগণের জন্য জীবনযাত্রা ব্যয়বহুল করেছে। ফলে এ সুযোগ যেন উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বারবার এ সুযোগ দেয়া হলে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন, যা কর নৈতিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। মোট কথা এককালীন, নীতিসম্মত ও কৌশলগত উদ্দেশ্যে এ ধরনের সুযোগ দেয়া যেতে পারে, তবে তা কঠোর নিয়ন্ত্রণ ও খাতভিত্তিক ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত।

এনবিএফআই খাতে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের পরিবর্তন বা উন্নয়ন করলে জাতীয় রাজস্বে আপনাদের অবদান বাড়বে বলে মনে করেন?

বর্তমানে এনবিএফআইগুলো সরাসরি উৎপাদন খাতে অর্থায়ন না করলেও এসএমই, গ্রিন ফাইন্যান্স, রিটেইল ও হাউজিং খাতের মতো মধ্যস্থ অর্থায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ ভূমিকা আরো প্রসারিত করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সুযোগ সহজ করা জরুরি। করমুক্ত বন্ড ইস্যুর অনুমতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য করহারে রেয়াত দেয়া হলে এনবিএফআইগুলো সহজেই দীর্ঘমেয়াদি অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে, যা ঋণনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তারল্য বাড়াবে এবং রাজস্ব প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি এনবিএফআইগুলোর পুঁজিবাজারভিত্তিক সাবসিডিয়ারিগুলোর মুনাফায় দ্বৈত কর আরোপ বর্তমানে বড় একটি প্রতিবন্ধকতা। সাবসিডিয়ারি থেকে প্যারেন্ট কোম্পানিতে ডিভিডেন্ডের ওপর পুনরায় কর বসানো বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে। এ দ্বৈত কর কাঠামো বাতিল করে রিজার্ভ গঠনের সুযোগ ও কর সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করা হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বাড়বে। সে অনুযায়ী করও বাড়বে। অন্যদিকে, বিএসইসির নিয়ম অনুযায়ী এনবিএফআইগুলোর মার্জিন ঋণ বাতিল করার সুযোগ থাকলেও আয়কর আইনের অসামঞ্জস্যতার কারণে এ বাতিলকৃত ঋণ করযোগ্য আয়ের সঙ্গে সমন্বিত হয় না, যা একটি দ্বিমুখী নীতির উদাহরণ। তাই কর কর্তৃপক্ষ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করে এ প্রক্রিয়াকে কর সুবিধার আওতায় আনা উচিত।

তাছাড়া এসএমই ও গ্রিন ফাইন্যান্স খাতে অর্থায়নে করছাড়, নেগেটিভ তালিকা থেকে অব্যাহতি এবং পুনঃঅর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি করা গেলে এসব উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়বে, উদ্যোক্তা তৈরি হবে। কর্মসংস্থানও বাড়বে, যা জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। সরকারের সুসমন্বিত নীতি ও কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে এনবিএফআই খাতকে একটি কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রবৃদ্ধিমুখী কাঠামোর আওতায় আনলে তা শুধু আর্থিক অন্তর্ভুক্তিই নয় বরং জাতীয় রাজস্ব বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

আরও