দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতে বাজেটের অপ্রতুলতার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। শিক্ষা খাতের উন্নয়নকে বাজেট সংকট কতটা প্রভাবিত করছে বলে মনে করেন?
শিক্ষা খাতে বাজেটের সীমাবদ্ধতা আজও আমাদের অগ্রগতির অন্যতম বড় বাধা। অর্থবছর ২০২৫-২৬-এর এখন পর্যন্ত প্রস্তাবমতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়বে, কিন্তু জিডিপির তুলনায় তা মাত্র ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ, যা ইউনেস্কোর প্রস্তাবিত ৪-৬ শতাংশের অনেক নিচে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২২ সালে ভুটান শিক্ষা খাতে জিডিপির ৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, মালদ্বীপ ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ, নেপাল ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ ব্যয় করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো ২ শতাংশের নিচে। এটি পরিবর্তনের সময় এখনই। এ ধরনের বাজেট সংকটের কারণে মানসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে বড়সড় ঘাটতি দেখা যায়। গত কয়েক দশকে শিক্ষক বেতন ও শিশু সুবিধাসংক্রান্ত ব্যয় বাড়লেও, স্কুল অবকাঠামো নির্মাণ খরচ এখনো বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছে। অথচ এ খাতকে অবকাঠামো বাজেটের আওতায় আনলে শিক্ষা বাজেটে প্রস্তাবিত অর্থ প্রকৃত শিক্ষা উন্নয়নে ব্যয় করা সম্ভব। কেবল বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং বাজেটের অভ্যন্তরীণ কাঠামো পুনর্গঠন ও অগ্রাধিকার নির্ধারণেই আমাদের মূল মনোযোগ দিতে হবে।
ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষা ও সুপারিশের ভিত্তিতেই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে। এ সরকারের কাছে কেমন বাজেট চান?
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষার্থীদের চেতনার প্রতিফলন। তাই এ সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা—এমন একটি বাজেট, যা হবে বৈষম্যহীন, ন্যায্য, দূরদর্শী ও টেকসই উন্নয়নমুখী। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট চলতি অর্থবছরের বাজেটের সমপরিমাণ কিংবা কিছুটা কম হতে পারে। কারণ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বার্ষিক বাজেটের আকার আর বাড়ানো হবে না। রাজস্ব আহরণে ধীরগতি, কর ও শুল্কে নিম্ন প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপের কারণে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হতে পারে। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। এ প্রেক্ষাপটে আমরা চাই, একটি লক্ষ্যভিত্তিক বাজেট—যেখানে অবকাঠামোগত উন্নয়নের বাইরে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং জবাবদিহিমূলক মূল্যায়ন ব্যবস্থার উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়ানো হবে। এ বাজেট যেন শিক্ষার প্রতিটি স্তরে—প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত—মানোন্নয়নে অগ্রাধিকার দেয়। একই সঙ্গে গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও দক্ষতা বিকাশে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের দেশের যুবসমাজ এখন উদ্যমী, যুক্তিবাদী ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সচেতন। তারা যেন এ বাজেটের মাধ্যমে তাদের স্বপ্নপূরণের একটি বাস্তব পথ খুঁজে পায়, সেটিই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
শিক্ষা খাতের জন্য বাজেটে বিশেষ কী প্রত্যাশা করছেন?
শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু এ অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে, সেটাই আসল প্রশ্ন। আমার মতে, শিক্ষা বাজেটের মূল ফোকাস হওয়া উচিত—শিক্ষকের গুণগত প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণীকক্ষের সম্প্রসারণ, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী মূল্যায়ন পদ্ধতির বিকাশ এবং দেশী-বিদেশী অংশীদারত্বের মাধ্যমে জ্ঞান উন্নয়ন। স্কুল অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত ব্যয়কে অবকাঠামো বাজেটের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। শিক্ষা বাজেট কেবল শিক্ষকের মান উন্নয়ন, মূল্যায়ন পদ্ধতির স্বচ্ছতা, প্রযুক্তি সংযোজন এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণমুখী অংশীদারত্বের জন্য বরাদ্দ হওয়া উচিত। শুধু ভবন নির্মাণে মান উন্নয়ন সম্ভব নয়, বরং শিক্ষকের দক্ষতা ও প্রাপ্যতার দিকে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। এ বাজেট যেন শিক্ষাকে কেবল পরিসংখ্যানের বিষয় না বানিয়ে, জাতি গঠনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বিগত এক দশকে দেশের শিক্ষা খাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও শিক্ষার মানের ক্ষেত্রে আশানুরূপ উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে কোন পদক্ষেপগুলো জরুরি?
এমন অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে যেখানে বিল্ডিং আছে, কিন্তু দক্ষ শিক্ষক বা যুগোপযোগী পাঠক্রম নেই। মানোন্নয়নে আমাদের গৃহীত পদক্ষেপগুলো হতে হবে তিনটি স্তরে—নীতি, প্রয়োগ ও পরিবীক্ষণ। শিক্ষার মানোন্নয়নে কয়েকটি পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষকের মানোন্নয়ন ও প্রশিক্ষণে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা ও ক্লাসরুম ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ডিজিটাল ক্লাসরুম, ওপেন লার্নিং প্লাটফর্ম ও ই-লাইব্রেরির প্রসার ঘটাতে হবে। মূল্যায়ন ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে। শুধু পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে গঠনমূলক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে হবে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে উৎসাহ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডিং ও সহায়তা চালু করতে হবে। শিক্ষা ও শ্রমবাজার সংযোগ স্থাপন করে শিক্ষার্থীরা যেন বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জন করে, সেজন্য কোর্স ও কারিকুলামেও সংশোধন জরুরি।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা বরাদ্দ কেমন হওয়া উচিত?
উন্নত, জ্ঞানভিত্তিক ও উদ্ভাবনী জাতি গঠনে গবেষণা একটি অপরিহার্য উপাদান। অথচ আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার জন্য বরাদ্দ এখনো খুবই অপ্রতুল। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল ভূমিকা শুধু পাঠদান নয়, জ্ঞান সৃষ্টি ও সমাজে সেই জ্ঞানের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় বাজেটের অন্তত ১৫-২০ শতাংশ গবেষণায় বরাদ্দ করা উচিত। বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বরাদ্দ ৫ শতাংশেরও কম, যা একটি উদ্ভাবনী জাতি গঠনের পথে বড় বাধা। গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হলে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং অর্থনৈতিক বিকাশ সম্ভব নয়। এর পাশাপাশি, প্রাইভেট সেক্টরের সঙ্গে অংশীদারত্বমূলক প্রকল্প, শিল্পভিত্তিক গবেষণা, আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুদান আহরণ এবং গবেষণার ফলাফলকে বাস্তব প্রয়োগের আওতায় আনার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের মোট বাজেটের বড় একটি অংশ গবেষণায় ব্যয় করে। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা ও উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে প্রায় ৪ শতাংশ জিডিপি সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়, যা তাদের টেকসই প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি গড়েছে। বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে গবেষণার পরিবেশ উন্নত করতে হবে, গবেষক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য সহজলভ্য অনুদান ও অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণার ফলাফলকে সমাজ, শিল্প ও নীতিনির্ধারণে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। আমরা এখন এমন একটি সময়ের মুখোমুখি, যেখানে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা বাস্তব হয়ে উঠছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা ও উদ্ভাবনের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল।