পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়
সুন্দরবন ও নদ-নদী ঘেঁষা এলাকা হওয়ায় মধু সংগ্রহ ও মাছ চাষই ছিল মোংলা ও বাগেরহাট অঞ্চলের মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস। নদীমাতৃক এ অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও শিল্পায়নের ঘাটতির কারণে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে ছিল। এ বাস্তবতায় ১৯৯৮ সালে মোংলা রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা প্রতিষ্ঠিত হয়, যার মাধ্যমে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক পরিবর্তনের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আগে যেসব দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ মাছ ধরা বা বনজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা এখন ইপিজেডের দেশী-বিদেশী কোম্পানিগুলোতে উন্নতমানের গার্মেন্টস, ম্যানিকুইন হেড ও উইগ, লাগেজ, গাড়ির সিট হিটার, সার্জিক্যাল গাউন, প্লাস্টিক পণ্য ইত্যাদি তৈরি করছে। ফলে বেকারত্ব কমেছে ব্যাপক হারে। এছাড়া বেপজার শ্রমিক কল্যাণে গৃহীত পদক্ষেপ যেমন বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের সামগ্রিক জীবনমানও উন্নত হচ্ছে।
বন্দর সুবিধা ও ঢাকা থেকে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, হ্রাসকৃত শুল্ক, চমৎকার প্রণোদনা প্যাকেজ এবং প্রচুর দক্ষ শ্রমশক্তি মোংলা অঞ্চলকে দক্ষিণের শিল্প কেন্দ্রে পরিণত করেছে, যা এখন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। তাই মোংলা ইপিজেড এখন কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়, এটি এ অঞ্চলের উন্নয়ন, সম্ভাবনা ও অগ্রগতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাড়ছে বিনিয়োগ, বাড়ছে কর্মসংস্থান
দেশের দ্বিতীয় সামুদ্রিক বন্দর মোংলা সমুদ্রবন্দর। এ বন্দরের পাশেই গড়ে ওঠা মোংলা ইপিজেডে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ। পদ্মা সেতুর ফলে সৃষ্ট উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থায় কম সময়ে ও কম খরচে তারা কাঁচামাল আমদানি ও পণ্য রফতানি করতে পারছে। ফলে বিনিয়োগ ও রফতানিও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা প্রতিষ্ঠিত করছে বৈচিত্র্যময় পণ্যের কারখানা। এসব কারখানায় কাজ করছে প্রায় ১৫ হাজার নারী-পুরুষ। এ ১৫ হাজার শ্রমিকের ওপর নির্ভর করে আছে তাদের পরিবারের কম-বেশি চার-পাঁচ সদস্য। সেই হিসাবে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ইপিজেডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত আছে। মোংলা ইপিজেডে কর্মচঞ্চলতার কারণে ইপিজেড সন্নিহিত এলাকায় অন্যান্য ব্যবসা যেমন, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, গণপরিবহন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান ইত্যাদির প্রসার ঘটেছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করছে।
ইপিজেডে কাজ করার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের মানুষের সামাজিক জীবনযাপনেও এসেছে অগ্রগতি। মোংলা পৌরসভার কালিবাড়ী এলাকার বাসিন্দা রুপা আক্তার মোংলা ইপিজেডের ভিআইপি লাগেজ কারখানায় চাকরি করেন। তিনি বলেন, ‘আগে বেকার ছিলাম। অন্যের বাড়িতে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। এখানে চাকরির সুবাদে জমি ক্রয় করে নিজের বাড়ি করেছি। এখন নিজের বাড়িতে থাকি। আগের চেয়ে অনেক ভালো আছি। এ ইপিজেডে কাজের পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর।’
আমরা ২০২৬ সালে ব্যবসার পরিসর আরো বাড়াব
ইয়ং ঝ্যাং
মহাব্যবস্থাপক, গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং
জিনলাইট বাংলাদেশ লিমিটেড
২০১৯ সালে আমরা মোংলা ইপিজেডে কারখানার কার্যক্রম শুরু করি। আমরা বিভিন্ন ধরনের জ্যাকেট তৈরি করি এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রফতানি করি। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানেও আমাদের পণ্যের ভালো চাহিদা রয়েছে।
আমাদের কারখানা ৮০ হাজার বর্গমিটার এলাকার, প্রায় সাত হাজার শ্রমিক কাজ করছে। ২০২৬ সালে আমরা উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা করছি। আমরা বিশ্বাস করি, বেপজা এ সম্প্রসারণে আগের মতোই আমাদের সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি চীনসহ বিশ্বের অনেক বিনিয়োগকারী যারা ইপিজেডের বাইরে কারখানা স্থাপন করেছেন তাদের তুলনায় ইপিজেডের ভেতরে যারা কারখানা পরিচালনা করছি, তারা অনেক বেশি সুবিধা পাচ্ছি। কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি তৈরি হলে আমরা বেপজাকে অবহিত করি। তারা তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধান করে। ফলে আমাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয় না।
আমাদের কর্মীবাহিনীর একটি বড় অংশ স্থানীয় বাসিন্দা, যাদের বাড়ি ইপিজেডের পাশেই। তারা অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করেন, যা আমাদের কর্মপরিবেশকে আরো ইতিবাচক করে তোলে। ফলে এখানে কাজ করা যেমন আরামদায়ক, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ও ব্যবসা পরিচালনার জন্যও একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
পরিকল্পিত শিল্পায়নে উন্নয়নের পথে
কালাম মোহাম্মদ আবুল বাসার
নির্বাহী পরিচালক, মোংলা ইপিজেড
মোংলা ইপিজেড এ অঞ্চলের জন্য একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ইপিজেডের মাধ্যমে শুধু কর্মসংস্থান বা রফতানি আয় বাড়েনি, বরং একটি অনুন্নত অঞ্চল কীভাবে পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ তৈরি করেছে। মোংলার মানুষ ছিল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। কিন্তু এখন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এবং তাদের জীবনযাপনের মানও বেড়েছে। ইপিজেডে কাজ করার মাধ্যমে এ অঞ্চলের একসময়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর ও সচ্ছল।
উৎপাদিত পণ্য
এগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি দিয়ে শুরু হলেও মোংলায় এখন উৎপাদিত হচ্ছে বিশ্বমানের ট্রাভেল ব্যাগ, ব্যাকপ্যাকসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যাগ, ম্যানিকুইন হেড ও উইগ, লাগেজ, গাড়ির সিট হিটার, সার্জিক্যাল গাউন, গার্মেন্টসের ফেলে দেয়া কাপড় থেকে সুতা, ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্রিক্যাল সামগ্রী, সিগার ও সিগারেট, পাটের সুতা ও ব্যাগ, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ