কৃষি থেকে শিল্পের পথে যাত্রা
একসময় নীলফামারী ছিল একেবারে প্রান্তিক, কৃষিনির্ভর একটি জনপদ। মৌসুমি কৃষিকাজ ছিল এখানকার মানুষের একমাত্র জীবিকা। বছরের ছয় মাস কাজ থাকত, বাকি সময় ছিল দারিদ্র্যের ভয়াবহ স্মৃতি। দিনমজুরির ভিত্তিতে চলা পরিবারগুলোর জীবন ছিল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। হাতে কাজ না থাকায় কেউ হতো রাজধানী ঢাকামুখী, কেউবা দেশের অন্য কোনো প্রান্তে। এমন এক বাস্তবতায় নীলফামারী জেলার সংগলশী ইউনিয়নে স্থাপিত হয় উত্তরা ইপিজেড। ২০০১ সালে যখন উত্তরা ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন কেউ কল্পনাও করেনি এটি একদিন হবে উত্তরাঞ্চলের সবচেয়ে বড় রফতানিমুখী শিল্প কেন্দ্র। কেননা চট্টগ্রাম বন্দর বা রাজধানী থেকে ৫০০-৭০০ কিলোমিটার দূরের এ অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি করাই ছিল একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।
তবে সাহসী সেই পদক্ষেপ এখন বদলে দিয়েছে গোটা দৃশ্যপট। উত্তরা ইপিজেড এখন শিল্পায়নের অন্যতম মডেল, যা উত্তরাঞ্চলের জন্য এনেছে কর্মসংস্থান, স্থিতিশীল আয় ও সামাজিক রূপান্তরের সুযোগ।
দারিদ্র্য থেকে সম্মানে
ইপিজেড প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত এ এলাকার মানুষের দৈনিক গড় আয় ছিল ১৫০-২০০ টাকা। সেই জায়গায় এখন উত্তরা ইপিজেডে সরাসরি প্রায় ৩৫ হাজার শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছেন। আরো সাত হাজার শ্রমিক পরোক্ষভাবে ইপিজেডভিত্তিক বিভিন্ন কাজে যুক্ত রয়েছেন। প্রতি মাসে শ্রমিকদের বেতনের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ জুগিয়েছে। এ আয় শুধু পরিবার চালাচ্ছে না, বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবনমান। অনেকে ঘর তুলেছেন, ছোট ব্যবসা শুরু করেছেন, সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করছেন। ইপিজেড ঘিরে গড়ে উঠেছে নতুন হাটবাজার, পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন সুবিধা ও আধুনিক জীবনযাত্রার কাঠামো। একসময় যারা জীবনের নিশ্চয়তা খুঁজতেন মৌসুমি শ্রমে, এখন তারা সারা বছর নিশ্চিত আয়ের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে।
বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বেপজা উপযুক্ত জায়গা
ফেলিক্স ওয়াই. সি. চ্যাং
চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা
এভারগ্রিন প্রডাক্টস গ্রুপ লিমিটেড
২০০৯ সালে দুটি বিষয় আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। প্রথমত, দিন দিন শ্রমিকদের মজুরি বাড়ছে। অন্যটি হলো যে পরিমাণ মজুরি বাড়ছে সে পরিমাণ আউটপুট পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর ২০০৯ সালে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম বাংলাদেশে যাব। কারণ বাংলাদেশ হলো বৃহত্তম রফতানিকারক দেশগুলোর একটি।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আগে আমি দুবার এ দেশে আসি। সে সময় আমি সব ইপিজেড পরিদর্শন করি। তখন আমার কাছে মনে হয়েছে, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বেপজা উপযুক্ত জায়গা। কারণ এখানে কারখানা নির্মাণের জন্য জমি পুরোপুরি প্রস্তুত করে রাখা আছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সরকারি কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেন। আমরা বিভিন্ন ইপিজেডের ব্যাপারে আরো খোঁজখবর নিই, স্টাডি করি। দেখলাম উত্তরা ইপিজেডে যথেষ্ট জায়গা এবং শ্রমিক সুবিধাও আছে। ফলে ২০১০ সালে আমরা কারখানা নির্মাণ এবং কাজ শুরু করি।
কারখানায় কাজ চলমান থাকাকালীনই আমরা আরো কিছু জমি ভাড়া নিই। সেখানে আবার কারখানা নির্মাণ করি। এখন আমাদের মন্তব্য হলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করাটা সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল এবং বিদেশী বিনিয়োগের জন্য বেপজা একটি সঠিক জায়গা।
তখন বিদেশী হিসেবে এ দেশে আমরা নতুন এসেছিলাম। সরকার আমাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেছে, নানা সহায়তা করেছে। এই ইপিজেডে এবং অন্যান্য জায়গায় আমার কিছু বন্ধুও আছে। তারা সবাই খুশি। সবাই ব্যবসার প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। প্রত্যেকের সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য সুন্দর পরিবেশ রয়েছে। সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
নারীর ক্ষমতায়নে রোল মডেল
উত্তরা ইপিজেডের সবচেয়ে গর্বের দিক হচ্ছে অধিক পরিমাণে নারীর অংশগ্রহণ। এখানে কর্মরত মোট শ্রমিকের ৫৩ শতাংশই নারী। যাদের অধিকাংশই আগে ছিলেন গৃহবধূ, কেউবা কৃষি শ্রমিক। এ নারীরাই এখন নিয়মিত বেতনের কর্মজীবী, অনেকেই পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস, পরিবার পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু।
শ্রমিকরা বলছেন, উত্তরা ইপিজেডে চাকরি পাওয়ার আগে তারা ছিলেন অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চয়তায়। কিন্তু এ ইপিজেড তাদের জীবন বদলে দিয়েছে। নিয়মিত আয় ও নানা সুযোগ-সুবিধা জীবনযাত্রায় এনেছে দৃশ্যমান পরিবর্তন।
এমনই একজন নারী শ্রমিক আমিনা খাতুন। কাজ করেন উত্তরা ইপিজেডের ভেনচুরা লেদারওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারিং (বাংলাদেশ) লিমিটেডের কারখানায়। তিনি বলেন, ‹১১ বছর ধরে এখানে কাজ করছি। একসময় খুব কষ্টে ছিলাম। স্বামীর অল্প কিছু আয়ে কোনো রকমে চলত আমাদের সংসার। কিন্তু ইপিজেডে কাজের সুবাদে আমাদের জীবনে পরিবর্তন এসেছে।’›
একসময় আমিনাদের বাড়িতে ছিল একটি মাত্র ঘর আর আড়াই শতক জমি। কিন্তু এখন সেই জমিতে তিনতলা ভবনের ফাউন্ডেশন দিয়ে বাড়ি করছেন। আমিনার মতো এমন গল্প ছড়িয়ে আছে হাজারো পরিবারে। অনেকেই নিজেদের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করেছে, বাড়িতে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা করেছে, কেউ কেউ আবার জমি কিনে ঘর তুলেছে। নারী শ্রমিকদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে, যা তাদের সামাজিক অবস্থানে প্রতিফলিত হয়েছে। বেপজা শ্রমিকদের জন্য আয়োজন করছে দক্ষতা উন্নয়ন কোর্স, জীবনমুখী প্রশিক্ষণ ও পেশাগত কর্মশালার, যা নারীর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করছে।
উত্তরবঙ্গের শিল্পায়নের সূতিকাগার
মোহাম্মদ আব্দুল জব্বার
নির্বাহী পরিচালক, উত্তরা ইপিজেড
উত্তরবঙ্গ একসময় মঙ্গাপীড়িত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু উত্তরা ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সে দৃশ্যপট বদলে গেছে। ইপিজেডকে ঘিরে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ উত্তরবঙ্গে এনেছে এক নতুন দিগন্ত।
ইপিজেড হওয়ার পরে এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে আমূল পরিবর্তন এসেছে। এখন আর কেউ মঙ্গার কথা বলে না। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা অনেকটাই কমেছে। মানুষ এখন সচ্ছল। কর্মসংস্থান হয়েছে ব্যাপক।
এ অঞ্চলে শ্রমিক সহজলভ্য, বিশেষ করে নারী শ্রমিক। উইগ ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো শ্রমনির্ভর শিল্পগুলোয় ৩০-৪৫ বছর বয়সী নারীরা কাজ করছেন। শুধু কর্মসংস্থান নয়, প্রতি মাসে প্রায় ৬০ কোটি টাকা বেতন হিসেবে শ্রমিকদের দেয়া হচ্ছে, যা এক ধরনের রেমিট্যান্স। কারণ এ অর্থ আসে এক্সপোর্ট আর্নিং ডলার থেকে।
উত্তরা ইপিজেডের একটি বড় চ্যালেঞ্জ পোর্ট থেকে দূরবর্তী অবস্থান। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার এবং ঢাকা বিমানবন্দর থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে হওয়ায় এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে দুদিন আগে মালামাল পাঠাতে হয়। এ ট্রানজিট টাইম চ্যালেঞ্জ হলেও আমরা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে পেরেছি। উত্তরা ইপিজেড শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, এটি উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি, একটি সামাজিক বিপ্লবের সূতিকাগার।
শ্রমিক কল্যাণে মানবিক উদ্যোগের দৃষ্টান্ত
উত্তরা ইপিজেড কেবল পণ্য উৎপাদনের জায়গা নয়, এটি একটি মানবিক শিল্পাঞ্চল। এখানে রয়েছে বেপজা পরিচালিত আধুনিক মেডিকেল সেন্টার, যা সপ্তাহে সাতদিন ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও প্রাথমিক ওষুধ সরবরাহ করে। রয়েছে একটি মানসম্মত স্কুল, যেখানে শ্রমিকদের সন্তানেরা অর্ধেক টিউশন ফিতে লেখাপড়ার সুযোগ পাচ্ছে। আছে ডে-কেয়ার সেন্টার, ক্যান্টিনসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা, যা শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নত করছে। এসব সুযোগ শুধু শ্রমিকের কর্মজীবন নয়, পরিবারকেও নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পরিধিতে আনছে।
আর্থসামাজিক অগ্রগতির অনন্য মাইলফলক
একসময় অবহেলিত ও কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে আধুনিক শিল্পঘেঁষা নগর ব্যবস্থা। ইপিজেড কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র, নতুন পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন প্রকল্প এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় আধুনিক জীবনযাত্রার নানা সুবিধা।
আগে এ অঞ্চলে কাজ ছিল মৌসুমি কৃষিনির্ভর। ধান, পাট, আলুর মৌসুম শেষ হলেই কর্মসংস্থানও বন্ধ হয়ে যেত। ফলে স্থানীয় গ্রামীণ দরিদ্র্য ছিল স্থায়ী। কিন্তু ইপিজেডে অনেক কর্মসংস্থানের ফলে এখন সারা বছর আয় নিশ্চিত হচ্ছে। এখানকার শ্রমিকদের বেতন দেয়া হচ্ছে মাসে প্রায় ৬০ কোটি টাকা, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার করছে।
এ নিয়মিত আয়ের সুযোগের ফলে পরিবারগুলো এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে। মানুষ সঞ্চয় করছে, ছোট ছোট ব্যবসা গড়ে তুলছে।
এছাড়া শিক্ষার হার, স্কুলে ভর্তি হওয়ার হার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বাল্যবিবাহের হার কমেছে, শিশুশ্রম কমেছে, স্বাস্থ্য সচেতনতাও বেড়েছে।
বৈচিত্র্যময় পণ্যের সম্ভার
উত্তরা ইপিজেডে বিদেশী বিনিয়োগ এবং বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের যাত্রা শুরুর অন্যতম ব্যক্তি ফেলিক্স চ্যাং, হংকংভিত্তিক উইগ বা পরচুলা প্রস্তুতকারী কোম্পানি এভারগ্রিনের কর্ণধার। ২০০৯ সালে তিনিই প্রথম বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে উত্তরা ইপিজেডে উইগ তৈরি শুরু করেন, যা ছিল এ দেশের রফতানিমুখী প্রথম উইগ প্রস্তুতকারী কারখানা। পরবর্তী সময়ে আরো বহু বৈচিত্র্যময় পণ্য যুক্ত হয়েছে এ তালিকায়। প্রথাগত গার্মেন্টস ও গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ ছাড়াও উত্তরা ইপিজেডে এখন তৈরি হচ্ছে বিশ্বখ্যাত মাইকেল কোর্স ব্র্যান্ডের লেডিস ফ্যাশন ব্যাগ, চশমার ফ্রেম ও সানগ্লাস, মিনিয়েচার ও রেপ্লিকা টয়, কালেকটিবল আইটেমসহ প্লাস্টিক সামগ্রী, মোসকুইটো নেট, ফিশিং নেট, ফ্যাশন জুয়েলারি প্রভৃতি পণ্য। এখানে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব কফিন যার কাঁচামাল হিসেবে বেত ছাড়াও ব্যবহৃত হচ্ছে দেশীয় বাঁশ এবং কচুরিপানা। ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রতিদিন রফতানি হয় এসব পণ্য।