কুমিল্লা ইপিজেড

পূর্বাঞ্চলের কর্মসংস্থানের বাতিঘর

দেশের লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কৌশলগত মধ্যবিন্দুতে অবস্থিত কুমিল্লা ইপিজেড এখন পূর্বাঞ্চলের শিল্পোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের এক শক্তিশালী উপকেন্দ্র।

কৌশলগত অবস্থানে বৃহৎ শিল্পায়ন

দেশের লাইফলাইন খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কৌশলগত মধ্যবিন্দুতে অবস্থিত কুমিল্লা ইপিজেড এখন পূর্বাঞ্চলের শিল্পোন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের এক শক্তিশালী উপকেন্দ্র। ২০০০ সালে কুমিল্লা শহরের অদূরে পুরনো বিমানবন্দরের রানওয়ের একাংশসহ ২৬৭.৪৬ একর জমিতে কুমিল্লা ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম ও ঢাকা ইপিজেডের সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে বেপজা এ অঞ্চলে ইপিজেড স্থাপন করে। রাজধানী ঢাকার নৈকট্য, অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কম সময়ে পণ্য আমদানি-রফতানির সুবিধা, যোগাযোগ ও লজিস্টিক সুবিধার এ অনন্য সমন্বয় বিনিয়োগকারীদের কাছে কুমিল্লা ইপিজেডকে করে তুলেছে এক আকর্ষণীয় গন্তব্যে।

ঐতিহাসিকভাবে কুমিল্লা শিল্প-সংস্কৃতির উর্বর ভূমি হলেও এখানে উৎপাদনমুখী শিল্পের অভাব ছিল। কুমিল্লা ইপিজেডের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ হয়েছে। স্থানীয় জনগণের জন্য শিল্পনগরীটি হয়ে উঠেছে কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান উৎস, যা এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক পরিবর্তনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

বিনিয়োগকারীরা লিড টাইমের ক্ষেত্রে একটা বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন

আবদুল্লাহ আল মাহবুব

নির্বাহী পরিচালক, কুমিল্লা ইপিজেড

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাঝামাঝি অবস্থানে হওয়ায় কুমিল্লা ইপিজেডের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই ভালো। সহজে এবং কম সময়ে পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে বিধায় বিনিয়োগকারীরা লিড টাইমের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন। এটি জাতীয় অর্থনীতিতেও যেমন অবদান রাখছে, তেমনি কুমিল্লার অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আমাদের এখানে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি পানি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংক্রান্ত সমস্যা নেই। বেপজার সহায়তা, সহজলভ্য শ্রমিক এবং নিরাপদ পরিবেশের কারণে তাই দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা কুমিল্লা ইপিজেডে বিনিয়োগে আগ্রহী।

তবে বর্তমানে কোনো প্লট খালি নেই। তাই নতুন কোনো বিনিয়োগকারীকে এখানে প্লট বরাদ্দ প্রদান সম্ভব হচ্ছে না। এর পাশে একটি বিমানবন্দর আছে এবং সরকারি জমি না থাকায় এর সীমানা বৃদ্ধি করাটাও কঠিন। বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের তাই তাদের কারখানা ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। নতুন বিনিয়োগকারীদের মিরসরাইয়ে আমাদের বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।

পণের বৈচিত্র্য ও গ্লোবাল কানেক্টিভিটি

পানি ও গ্যাসের সহজলভ্যতার কারণে অন্যান্য ইপিজেডের তুলনায় কুমিল্লা ইপিজেডে টেক্সটাইল শিল্পের প্রসার ঘটেছে। এ কারখানাগুলো বিশ্বমানের ডেনিম ফ্যাব্রিক তৈরি করছে। এ ইপিজেডে অত্যাধুনিক কিছু গার্মেন্টস কারখানা রয়েছে, যারা প্রথাগত গার্মেন্টস পণ্যের বাইরেও তৈরি করছে হাই এন্ড বিভিন্ন পণ্য যেমন: মোটরসাইকেল সেফটি জ্যাকেট, ওয়ার্কওয়্যার প্রভৃতি। এছাড়া তৈরি হচ্ছে গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, খেলনা, সেফটি স্যু, কিচেন ইউটেনসিল, মেডেল, চাবির রিং, টেক্সটাইল ডাইস, মেডিসিন বক্স, আই প্যাচ, হেয়ার ও ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজ ইত্যাদি।

এ বৈচিত্র্যময় উৎপাদন কুমিল্লা ইপিজেডকে শুধু একটি গার্মেন্টস জোন নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বহুমাত্রিক শিল্প কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলছে।

দক্ষতা উন্নয়ন ও শ্রমিক কল্যাণ

শুধু কর্মসংস্থান নয়, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নেও কুমিল্লা ইপিজেড একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। দেশী ও বিদেশী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মীদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় দক্ষ করে তোলা হচ্ছে। ফলে তৈরি হচ্ছে একঝাঁক প্রশিক্ষিত ও প্রযুক্তিপ্রবণ মানবসম্পদ। শ্রমিক কল্যাণেও অন্যান্য ইপিজেডের মতো কুমিল্লা ইপিজেড রেখেছে প্রশংসনীয় ভূমিকা। এখানে নিয়মিত বেতন-ভাতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা, সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম প্রভৃতি। ‘বেপজা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ’-এর মাধ্যমে শ্রমিকদের সন্তানরা ভর্তুকি মূল্যে শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক কারখানায় রয়েছে ডে-কেয়ার সেন্টার। এ ধরনের কল্যাণমুখী উদ্যোগের ফলে শ্রমিকদের স্থায়িত্ব বাড়ছে—অনেকে শুরু থেকেই এ ইপিজেডে কাজ করছেন।

কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির নবজাগরণ

কুমিল্লা ইপিজেডে বর্তমানে ৫০ হাজারের অধিক শ্রমিক কাজ করছেন, যাদের বেশির ভাগই কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা। এর ফলে স্থানীয় মানুষের আয়, জীবনমান ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বেড়েছে। ইপিজেডকে ঘিরে গড়ে উঠেছে রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, নির্মাণ, আবাসন, বিপণিবিতান, হাসপাতালসহ নানা খাত, যা একটি গতিশীল নগর অর্থনীতির রূপ নিয়েছে। তদুপরি এ ইপিজেডকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন অ্যাকসেসরিজ, কেমিক্যাল এবং অন্যান্য ফরওয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প, যা স্থানীয় উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়িয়েছে। ইপিজেডে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, নির্মাণসামগ্রী, খাদ্যদ্রব্য ও অফিসসামগ্রী সরবরাহের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণ ইপিজেড-ভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

পরিবেশ সংরক্ষণে নজর

শিল্পায়নের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে কুমিল্লা ইপিজেড। এখানে রয়েছে একটি আধুনিক কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি)। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্ধারিত মান বজায় রেখে এটি প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য রাসায়নিক ও জৈবিক পদ্ধতিতে শোধন করতে সক্ষম। পরিবেশ অধিদপ্তর ও বেপজার যৌথ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়।

আরও