ঢাকা ইপিজেড

আশুলিয়া-সাভারের শিল্পজাগরণ

আজকের যে আশুলিয়া আপনারা দেখছেন, ঢাকা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার আগে এ অঞ্চল এ রকম ছিল না—একটি অনুন্নত এলাকা হিসেবে পরিগণিত ছিল। এখানে ভালো রাস্তাঘাট, মার্কেট বা কোনো ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছিল না বললেই চলে।

নগরের প্রান্তে পরিকল্পিত শিল্পের বিস্তার

একসময়ের অনুন্নত সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে যখন সূর্যের আলোতেও নিস্তব্ধতা বিরাজ করত, তখন কেউ কল্পনাও করেনি এই জায়গা একদিন হবে শিল্পায়নের প্রাণকেন্দ্র। অবকাঠামোর ঘাটতি, অনুর্বর লালমাটি, অনুপযোগী পরিবেশ—সবকিছুই বাধা ছিল শিল্পায়নের পথে। সেই ছবিটাই পাল্টে দেয় ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ইপিজেড। সাভার-আশুলিয়া বর্তমানে যে শিল্পাঞ্চলে রূপ লাভ করেছে তার পেছনে প্রধান ভূমিকা ঢাকা ইপিজেডের। বাংলাদেশের দ্বিতীয় এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকাটি আজ রাজধানীসংলগ্ন একটি পরিবেশবান্ধব, বহুজাতিক শিল্প শহরের আদর্শ মডেল। এটি শুধু কর্মসংস্থান নয়, বরং আর্থসামাজিক রূপান্তরের এক অনন্য প্রতীক।

বদলে যাওয়া আশুলিয়া

চট্টগ্রাম ইপিজেডের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় রাজধানীর উপকণ্ঠে গড়ে ওঠে দেশের দ্বিতীয় ইপিজেড, ঢাকা ইপিজেড। শুরু থেকেই এর প্রভাব স্পষ্ট হতে থাকে। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগে গড়ে ওঠে রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, যোগাযোগ ও ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা। রাস্তার দুপাশের শূন্যতা ভরাট হতে থাকে শ্রমিক আবাসন, মার্কেট, ব্যাংক, হোটেল, লজিস্টিক সাপোর্ট, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও অ্যাকসেসরিজ শিল্পসহ ব্যবসাবান্ধব নানামুখী অবকাঠামোয়।

ঢাকা ইপিজেডে প্রতি মাসে প্রায় ২৫০ কোটি টাকা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বাবদ পরিশোধ করা হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রাণ জোগায়। ঢাকার কাছাকাছি অবস্থান ও বিমানবন্দরের সংযোগ, লিড টাইম কমানোর সুযোগ থাকায় দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি অন্যতম পছন্দের গন্তব্য।

চার বছরের মধ্যেই সম্প্রসারণ

১৯৯৩ সালে মাত্র ১৪১ একর জায়গা নিয়ে ঢাকা ইপিজেডের মূল জোনের কার্যক্রম শুরু হলেও বিনিয়োগকারীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে চার বছরের মাথায় ১৯৯৭ সালে আরো ২১৫ একর জমির ওপর ঢাকা ইপিজেডের সম্প্রসারিত জোনের কার্যক্রম শুরু হয়। নবীনগর থেকে চন্দ্রা অভিমুখী হাইওয়ের বাম পাশে ঢাকা ইপিজেডের পুরনো জোন এবং ডান পাশে সম্প্রসারিত জোন মিলিয়ে ঢাকা ইপিজেডের মোট আয়তন ৩৫৬ একর। দুই জোনের কোনোটিতেই বর্তমানে কোনো শিল্প প্লট খালি নেই। তবে বিনিয়োগকারীদের অনেকেই তাদের বিদ্যমান কারখানা ভবনের ফ্লোর সংখ্যা বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ ও বৈশ্বিক শুল্কনীতির পরিবর্তন ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিলেও ঢাকা ইপিজেড আগাম প্রস্তুতি নিচ্ছে। রাজধানীর কোলঘেঁষে এ ইপিজেড এখন শুধু শিল্পায়নের একটি সফল উদাহরণ নয়, বরং অর্থনীতির গতি, কর্মসংস্থান ও নগর উন্নয়নের অনুকরণীয় মডেল।

ঢাকা ইপিজেডকে ঘিরে আশুলিয়া স্যাটেলাইট শহরে পরিণত হয়েছে

মোঃ শরিফুল ইসলাম

নির্বাহী পরিচালক, ঢাকা ইপিজেড

আজকের যে আশুলিয়া আপনারা দেখছেন, ঢাকা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার আগে এ অঞ্চল এ রকম ছিল না—একটি অনুন্নত এলাকা হিসেবে পরিগণিত ছিল। এখানে ভালো রাস্তাঘাট, মার্কেট বা কোনো ধরনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ছিল না বললেই চলে। কিন্তু ১৯৯৩ সালে ঢাকা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পরে ধীরে ধীরে এ এলাকায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আসে। ইপিজেডে বিভিন্ন দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারী কারখানা স্থাপন করে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়। ইপিজেড সন্নিহিত এলাকায় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠে, বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়। ইপিজেডে অনেক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হলে তাদের আবাসনের ব্যবস্থা হয়। এ এলাকায় যাদের জায়গা জমি ছিল, বসতবাড়ি ছিল, তারা ধীরে ধীরে বহুতল ভবন গড়ে তোলে। অর্থাৎ ধীরে ধীরে এ ইপিজেডকে কেন্দ্র করে আশুলিয়া একটা স্যাটেলাইট শহরে পরিণত হয়।

ঢাকা ইপিজেডে বিনিয়োগকারীদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে এখানে কোনো শিল্প প্লট বা ফ্যাক্টরি বিল্ডিং খালি নেই। সবই বিনিয়োগকারীদের মাঝে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ফলে ইপিজেড এলাকা বৃদ্ধি করা না হলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও নতুন কোনো বিনিয়োগকারীকে আমন্ত্রণ জানানো যাচ্ছে না। তবে আমাদের যেসব কারখানা আছে, তাদের ভবনে ফ্লোর বাড়ানোর জন্য বলা হয়েছে। কোম্পানিগুলো তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী কারখানার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করে নিচ্ছে।

ঢাকা ইপিজেডের পশ্চিম পাশে প্রায় ২৫০ একর জমি খালি আছে। জমিটি অন্তর্ভুক্ত করে ইপিজেড সম্প্রসারণ করা হলে আরো অনেক নতুন বিনিয়োগকারীকে আমন্ত্রণ জানাতে পারব।

ঢাকা ইপিজেডে কারখানা স্থাপন আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল

জেসি ইয়াউ, ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর

অ্যাক্টর স্পোর্টিং লিমিটেড

আমরা ইপিজেড এলাকায় কাজ করে খুবই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি। এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বেপজার সহায়তার কথা না বললেই নয়। একটি কারখানায় যে ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে যেসব সুবিধা থাকা দরকার, তার সবই এ ইপিজেডে রয়েছে। এখানকার শ্রমিকরা দক্ষ, এটা উৎপাদনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকা ইপিজেডে কারখানা স্থাপন আমাদের সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। সুযোগ-সুবিধা এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের দিক বিবেচনায় এর চেয়ে ভালো অবস্থান ইপিজেডের বাইরে নেই। এখানে সবকিছুই রয়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সহজলভ্যতার জন্য যেকোনো বিদেশী বিনিয়োগকারী এখানে কারখানা করতে চাইছেন, চাইবেনও।

যখন ঢাকা ইপিজেডে কারখানা শুরু করি, তখন আমরাও অপেক্ষাকৃত নতুন ছিলাম। এখানকার কর্মকর্তারা ও শ্রমিকরাও ছিলেন নতুন। ফলে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ টেকনিশিয়ান নিয়ে এসে আমরা নিজেরাও শিখেছি, এখানকার শ্রমিক-কর্মচারীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছি। ১৩ বছরে এখন বাংলাদেশী শ্রমিক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা অর্জন করেছেন। বাংলাদেশী শ্রমিকদের দ্রুত শিখতে পারার দক্ষতা চমৎকার, যেটি আমি সবসময় বলি।

হাই এন্ড গার্মেন্টস উৎপাদনের কেন্দ্র

ঢাকা ইপিজেড প্রথমদিকে সাধারণ পোশাক তৈরির কারখানা দিয়ে শুরু হলেও এখন এখানে তৈরি হয় স্যুট, ব্লেজার, স্পোর্টসওয়্যার, থার্মাল জ্যাকেটসহ হাই এন্ড গার্মেন্টস। দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত ইয়াংওয়ান গ্রুপ চট্টগ্রাম ইপিজেডের পরে এখানেও বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে এখানে তাদের চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ‘টাইগার কো’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা ন্যাটোভুক্ত বিভিন্ন দেশ যেমন বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালির মিলিটারির জন্য ইউনিফর্ম তৈরি করে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্মান। কিছু উচ্চপ্রযুক্তির টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে যারা বিশ্বমানের ফেব্রিক তৈরি করছে। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ জনশক্তির সমন্বয়ে উৎপাদিত হাই এন্ড গার্মেন্টসের মাধ্যমে রফতানিতে উচ্চ মূল্য সংযোজন হচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখছে।

পরিশ্রমে পাল্টে যাওয়া জীবন

ঢাকা ইপিজেডে কর্মরত শ্রমিকদের অনেকেই এসেছেন দেশের দূর-দূরান্ত থেকে—জীবনের দায়ে, স্বপ্নের খোঁজে। এ শিল্পাঞ্চল বদলে দিয়েছে তাদের জীবনের গতিপথ। তাদেরই একজন আঞ্জুমান বানু। ২০০৯ সালে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থেকে অভাবের তাড়নায় ঢাকায় আসেন। শুরুতে ইয়াংওয়ান হাইটেক স্পোর্টসওয়্যার লিমিটেডে হেল্পার হিসেবে যোগ দেন, বর্তমানে একই প্রতিষ্ঠানে নিডল রেকর্ডার পদে কর্মরত।

স্বামী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, সন্তানদের বয়স যখন চার-পাঁচ বছর, তখন থেকেই সংসারের হাল ধরেন আঞ্জুমান। নিজের পরিশ্রমে বড় মেয়েকে ২০২৪ সালে বুয়েট থেকে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক করিয়েছেন। ছোট মেয়ে পড়ছেন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, বায়োকেমিস্ট্রিতে।

শুধু আঞ্জুমান বানুই নন, বরিশালের লিজা, ময়মনসিংহের আসমা আক্তারসহ অনেক শ্রমিকের জীবন বদলে দিয়েছে ঢাকা ইপিজেড।

পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার প্রয়াস

ঢাকা ইপিজেডে গড়ে তোলা হয়েছে একটি আধুনিক কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শিল্পবর্জ্য শোধন করা হয়। এখানে রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক মানের সুসজ্জিত পরিবেশ ল্যাবরেটরি, যেখানে তরল বর্জ্য, খাবার পানি প্রভৃতি পরীক্ষার মাধ্যমে গুণগত মান নিশ্চিত করা হয়। পরিবেশ কাউন্সেলররা নিয়মিত কারখানাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, ন্যূনতম শব্দমাত্রা, লাইট ইনটেনসিটি পরীক্ষা করে একটি শ্রমবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ভবনের ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। বর্তমানে ঢাকা ইপিজেডে প্রায় ৩ দশমিক ৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে সৌরশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে।

বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের উপস্থিতি

বিশ্বব্যাপী জিপারের এক নম্বর ব্র্যান্ডের কথা বললেই যে নামটি চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায় তা হলো ওয়াইকেকে। ২০০২ সাল থেকে বিশ্বের এক নম্বর এ জিপার ব্র্যান্ড ঢাকা ইপিজেডে তাদের উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। প্যাক্সার, মেইনেটির মতো বিশ্বখ্যাত অ্যাকসেসরিজ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতিও বৈচিত্র্যে যুক্ত করছে নতুন মাত্রা। পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস, জুতা সোল, লেন্স প্রভৃতি ভিন্নধর্মী পণ্যও উৎপাদিত হচ্ছে।

শ্রমবান্ধব উদ্যোগের এক অনন্য নজির

ঢাকা ইপিজেডে বর্তমানে প্রায় ৮৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন, যাদের গড় মজুরি ইপিজেডের বাইরের শ্রমিকদের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এ মজুরি কাঠামো শ্রমিকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ইপিজেড হাসপাতাল থেকে শ্রমিকরা বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকেন। প্রতিটি কারখানায় রয়েছে সুশৃঙ্খল পরিবেশে পরিচালিত ক্যান্টিন। নারী শ্রমিকদের জন্য রয়েছে মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং আইনগত সুরক্ষাসহ পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহের ব্যবস্থা, যা তাদের মাতৃত্বকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করে। এছাড়া শ্রমিক ও স্থানীয় জনগণের শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেপজা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, যা সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলের অন্যতম মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য এ প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ভর্তুকিযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থাও।

আরও