স্বাধীনতার পর শিল্পায়নের প্রেক্ষাপট
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল করুণ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় শূন্য। অধিকাংশ শিল্প কারখানা যুদ্ধের কারণে ধ্বংসপ্রাপ্ত বা বন্ধ হয়ে পড়ে। বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল আবুল কালাম মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান সে সময়ের চিত্র বর্ণনা করে বলেন, ‘আমাদের অর্থনীতি তখন পুরোপুরি নির্ভর করত কৃষি, বৈদেশিক ঋণ আর বিদেশী সহায়তার ওপর। কিন্তু এভাবে নতুন দেশ এগোতে পারে না। অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে হলে শিল্পায়নের কোনো বিকল্প ছিল না।’
ইপিজেডের ধারণা ও বেপজার জন্ম
বেপজা নির্বাহী চেয়ারম্যানের ভাষায়, দেশে তখন বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ছাড়া বিনিয়োগ আকর্ষণের আর কিছুই ছিল না। শিল্পায়নের মাধ্যমে অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে সবচেয়ে বেশি যেটির দরকার ছিল তা হলো বিদেশী ও দেশী উদ্যোক্তা এবং তাদের আকৃষ্ট করার জন্য পরিকল্পিত পরিবেশ। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য কী কী করা যেতে পারে এ ভাবনার মধ্যেই ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে আসে ইপিজেড স্থাপনের ধারণা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালে প্রণীত হয় বাংলাদেশ রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ আইন এবং ১৯৮১ সালে গঠিত হয় বেপজা। ১৯৮৩ সালে চালু হয় দেশের প্রথম ইপিজেড- চট্টগ্রাম ইপিজেড।
‘শুরুর পরবর্তী দুই বছরের মধ্যেই আমরা দেখতে পাই চট্টগ্রামে বিদেশী বিনিয়োগকারী বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করেছেন। এখান থেকেই তৈরি পোশাক খাতের আসল যাত্রা শুরু হয়, যা এখন আমাদের রফতানি আয়ের প্রধান স্তম্ভ।’—বলেন বেপজা নির্বাহী চেয়ারম্যান।
সাফল্যের ধারাবাহিকতা ও সম্প্রসারণ
চট্টগ্রামের সাফল্যের পর ১৯৯৩ সালে সাভারের আশুলিয়ায় দেশের দ্বিতীয় ইপিজেড-ঢাকা ইপিজেডের যাত্রা শুরু হয়। সে সময় সাভার-আশুলিয়া ছিল অনুন্নত ও নীরব একটা এলাকা। ইপিজেড চালুর পর দ্রুত নগরায়ণ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের বিস্তার ঘটে।
এরপর ১৯৯৮-২০০৬ সালের মধ্যে মোংলা, কুমিল্লা, ঈশ্বরদী, উত্তরা, কর্ণফুলী ও আদমজী ইপিজেড প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালে শুরু হয় চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, যেটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। বর্তমানে আটটি ইপিজেড ও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল মিলিয়ে বেপজার অধীন পরিচালিত জোনগুলোর মোট জমি মাত্র ১৩ দশমিক ৯৫ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের আয়তনের মাত্র ০.০০১ শতাংশ।
ক্ষুদ্র জমি, এফডিআইয়ের ছয় ভাগের এক ভাগ
বেপজা নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৮৩ থেকে বেপজাধীন জোনগুলোয় এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি।’
তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন আসতে পারে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ৪৫ বছরে ৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ কতটা বড় অর্জন? একভাবে দেখলে সংখ্যাটা হয়তো সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু আরেক দিক থেকে দেখলে চিত্র ভিন্ন। ১৯৭১ থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট এফডিআই হয়েছে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে বেপজার জোনগুলোতে বিনিয়োগ ৭ দশমিক শূন্য ৮ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে এফডিআই ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থাৎ দেশের মোট এফডিআইয়ের ছয় ভাগের এক ভাগ এসেছে মাত্র ০.০০১ শতাংশ জমিতে। এ পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে ক্ষুদ্র আয়তনেও বেপজার অবদান কতটা বড়।’
তার মতে, আমাদের ছোট ভূখণ্ডে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক সম্পদ বা কাঁচামাল নেই। অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, তাই অন্য দেশের সঙ্গে সরাসরি তুলনা সংগত নয়। যেখানে অনেক দেশের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ নিজস্বভাবে পূরণ হয়, সেখানে বাংলাদেশকে প্রায় সব কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। এ সীমাবদ্ধতা নিয়েই যে বিনিয়োগ এসেছে, এটাই বেপজার জন্য এক বড় সাফল্য।
প্রতি একরে বছরে সাড়ে ১০ কোটি টাকার অবদান
বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘অনেকে প্রশ্ন করেন সরকার জমি কিনে উন্নয়ন করল, বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এসে উৎপাদন করল, রফতানি থেকে আয় করল, সেটা তারা নিয়ে চলে যাচ্ছে। তাহলে ইপিজেড থেকে দেশের লাভ কী?’
তিনি বলেন, ‘এটিকে দুভাবে দেখা যায়-আর্থিক লাভ ও অর্থনৈতিক লাভ।’
‘প্রথমেই বলব, কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে আটটি ইপিজেড ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে ৫ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োজিত আছেন। প্রতি পরিবার গড়ে চারজন ধরলে প্রায় ২১ লাখ মানুষের জীবিকার একটা বন্দোবস্ত হচ্ছে। এ আয় সরাসরি আমাদের অর্থনীতিতে যোগ হচ্ছে। এটা একটা বড় অবদান।’
তিনি আরো জানান, ইপিজেডকে কেন্দ্র করে একটি বিশাল আকারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী চেইন গড়ে উঠেছে, যা অর্থনীতির চাকাকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘বিবিসির এক জরিপে দেখা গেছে, নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড চালুর ফলে আট বছরে ওই এলাকার দারিদ্র্যের হার ৫০ শতাংশ কমে গেছে।’
‘আর্থিক লাভও কম নয়’—বলেন তিনি। ‘বিনিয়োগকারীদের লাভের একটি বড় অংশ কর্মীদের বেতন হিসেবে যায়। অন্য অংশ দিয়ে তারা স্থানীয় বাজার থেকে কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ কেনে। ইপিজেডগুলোর ক্ষুদ্র আয়তন থেকে এভাবে প্রতি বছর গড়ে সাড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা সরাসরি অর্থনীতিতে (জিএনপি) যোগ হচ্ছে। এছাড়া প্রতি বছর বেপজা জমি ভাড়ার আয়ের ওপর ট্যাক্স দিচ্ছে; ৪৫ বছরে আমরা ১ হাজার ৩২১ কোটি টাকার বেশি প্রত্যক্ষ কর দিয়েছি এবং সরকারি তহবিলে জমা করেছি ১ হাজার ৩২৪ কোটির বেশি।’
তিনি সংক্ষেপে যোগ করেন, ‘ইপিজেডের প্রতি একর জমি থেকে বছরে গড়ে সাড়ে ১০ কোটি টাকা আমাদের অর্থনীতিতে যোগ হয়, এটাই বেপজার অনেক বড় একটি অবদান।’
পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণ ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং
‘ইপিজেড শুধু বিনিয়োগ নয়, দেশের ব্র্যান্ডিংও করছে’—বলেন বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান। ‘গাড়ির ক্ষেত্রে যেমন জাপানি টয়োটা বা ইলেকট্রনিকসে সনির নাম শোনা যায়, তেমনি অ্যাপারেলসে ‘‘মেইড ইন বাংলাদেশ’’ এখন একটি স্বীকৃত ব্র্যান্ড। এ সার্থকতার প্রথম দাবিদার ইপিজেড।’
দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক থেকে। এ নির্ভরতা কমিয়ে শিল্পে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে বেপজা। বর্তমানে ইপিজেডে ৪৫০টি চালু কারখানার মধ্যে ৫২ শতাংশ পোশাকসংশ্লিষ্ট, বাকিগুলোয় তৈরি হচ্ছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, ক্যামেরা লেন্স, প্রিন্টারের টোনার, বাইসাইকেল, চশমার ফ্রেম, উইগ, জুতা এমনকি কফিনও।
‘আমাদের ইকোনমিক জোনে এরই মধ্যে বাণিজ্যিক ড্রোন কারখানা গড়ে উঠছে। অলিম্পিকে ব্যবহৃত বাইসাইকেল, বিশ্ব আর্চারি প্রতিযোগিতার তীর, আর্মির এ্যান্টি–রেডিয়েশন ইউনিফর্ম তৈরি হচ্ছে আমাদের ইপিজেডে’—যোগ করেন তিনি।
উচ্চ প্রযুক্তি, শিল্পে প্রস্তুতি ও সীমাবদ্ধতা
বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘এখন এআইয়ের যুগ। বায়াররা শুধু পণ্যের মানই নয় আপনি আধুনিক প্রযুক্তি, এআই ও ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করছেন কিনা, সেটিও খোঁজেন। তাই আমরা প্যারাডাইম শিফট করছি। কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অটোমেশনেও জোর দিচ্ছি, যাতে প্রযুক্তি এলে আমাদের মানুষ সেটি শিখতে পারে এবং ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে দক্ষ কর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।’
এ প্রেক্ষাপটে তিনি সাম্প্রতিক একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। ‘কয়েকদিন আগে চাইনিজ কোম্পানি হান্ডা গার্মেন্টসের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ হাইটেক, অটোমেটেড শিল্প। তারা ম্যান–মেড ফাইবার থেকে হাই–এন্ড পণ্য তৈরি করবে এবং ১৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। জানুয়ারিতে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বেপজা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বড় জায়গা নিতে চায়। কিন্তু তখন একটি চ্যালেঞ্জ সামনে আসে পানি সরবরাহ। এখনো পর্যাপ্ত অবকাঠামো না থাকায় আমরা তৎক্ষণাৎ পানি দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারিনি।’
তিনি জানান, সে সময় তারা কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিল। পরে বিডা ইনভেস্টমেন্ট সামিট করল, হান্ডার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হলো। ‘আমরা প্রস্তাব দিয়েছিলাম গার্মেন্টস ইউনিট মীরসরাইয়ে করা হোক, আর টেক্সটাইল অন্য কোথাও যেখানে পানির সহজলভ্যতা আছে। এতে বিনিয়োগকারীরও সুবিধা হবে এবং আমাদের অবকাঠামো চাপমুক্ত থাকবে’—বলেন বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান।
তিনি বলেন, ‘চীন, জাপানের বিভিন্ন শিল্প কারখানায় কর্মীর অভাব রয়েছে। আমরা যদি হাই এন্ড পণ্য এবং উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন বড় বড় কোম্পানিকে অনুমতি দিই, আমাদের কর্মীরা যদি হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজে অভিজ্ঞতা নিতে পারে, তাহলে একসময় আমরা এ দেশগুলোয় উচ্চ দক্ষ কর্মী পাঠিয়ে নতুন রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারব। এখন যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে মূলত অদক্ষ বা আধা–দক্ষ শ্রমিক যাচ্ছে, সেখানে হাই–স্কিল কর্মী পাঠানো সম্ভব হবে।’
বাজার বৈচিত্র্যে চাপ মোকাবেলার প্রস্তুতি
বেপজা পণ্যের বৈচিত্র্যায়ণের সঙ্গে রফতানি বাজার বৈচিত্র্যায়ণেও বিশেষ নজর দিচ্ছে। রফতানি বাজার সম্প্রসারণ করা গেলে আমাদের ওপর চাপ কমবে বলে মনে করেন বেপজা নির্বাহী চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ শুধু আমেরিকার বাজারে। এ নির্ভরশীলতা থাকায় তারা পাল্টা শুল্ক বা চাপ প্রয়োগের সুযোগ পায়। যদি এটি ২০ শতাংশ না হয়ে ৫ শতাংশ হতো, তাহলে হয়তো আমরা সহজেই উপেক্ষা করতে পারতাম।’
মেজর জেনারেল জিয়া বলেন, ‘আমরা এখন এমন বিনিয়োগকারী খুঁজছি, যারা ইউরোপ ও আমেরিকার বাইরেও জাপান, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকার মতো বাজারে লক্ষ রাখছে। নির্ভরশীলতা কমাতে পারলে চাপও কমবে।’
রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘তখন অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স, আরএসসি এসে কঠোর নজরদারি শুরু করে। প্রাথমিকভাবে এটি আতঙ্কের ছিল, কিন্তু এখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি আমাদের বর্তমান কারখানাগুলো বিশ্বমানের।’
পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন
দেশের ইপিজেডগুলোয় ২৬টি লিড সার্টিফায়েড কারখানা আছে, যার মধ্যে আটটি প্লাটিনাম সার্টিফায়েড। পরিবেশ সুরক্ষায় বেপজা চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ঢাকা ইপিজেডে কেন্দ্রীয় তরল বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) স্থাপন করেছে। যেখানে কেন্দ্রীয় ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বাণিজ্যিকভাবে সম্ভব নয়, সেখানে কারখানাগুলো নিজস্ব ইটিপি স্থাপন করছে। কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। বেপজা নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা দুটি আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ ল্যাবরেটরি পরিচালনা করছি। কোনো কারখানা পরিবেশ মানদণ্ড ভঙ্গ করলে আমরা তার রফতানি অনুমতি সঙ্গে সঙ্গে স্থগিত করি।’
ইপিজেডগুলোর মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০-৩৫ ভাগ সৌরশক্তির মাধ্যমে পূরণ সম্ভব বলে মনে করেন বেপজা নির্বাহী চেয়ারম্যান। বেপজা এ লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, প্রত্যেকটা ইপিজেডে সোলার প্যানেল বসছে। এছাড়া কারখানাগুলোয় রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিংয়ে কাজ চলছে। ‘কোনো ইপিজেডে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে পানি উঠবে না। মোংলায় পাশের নদী থেকে নিতে হবে অথবা রিচার্জ করতে হবে, গোমতী নদী থেকেও পানি নেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে’—বলেন মেজর জেনারেল জিয়া।
শ্রমিক কল্যাণে বেপজার অঙ্গীকার
ইপিজেডের একজন কর্মী বাইরে থেকে গড়ে ৩০-৪০ শতাংশ বেশি বেতন পান; কিছু ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকের বেতন ১ লাখ টাকারও বেশি, বলেন বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান। ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেলেও কখনো পাওনা বকেয়া থাকে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাইরে তো বিনা প্রশ্নে কাউকে ছাঁটাই করা হচ্ছে, খারাপ করলে মালিক ফ্যাক্টরি বন্ধ করে দিয়ে চলে যাচ্ছে, বেতন নিয়ে শঙ্কায় থাকতে হচ্ছে। কিন্তু ইপিজেডের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত নেই যে কারখানা বন্ধ হয়ে শ্রমিক তাদের পাওনা পাননি। দেরি হলেও সব পরিশোধ করা হয়েছে। এমনকি কেউ কেউ ২৫-৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত এককালীন পেয়েছেন।
ইপিজেডের তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের আঘাতজনিত দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ বা এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম চালুর জন্য আমরা আইএলওর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। এছাড়া,
লেবার কমপ্লায়েন্সের ক্ষেত্রে আমি বলছি না যে এটা ১০০ ভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে কিন্তু বাইরের সঙ্গে তুলনা করলে অনেক ভালো। বেপজা নির্বাহী চেয়ারম্যান যোগ করেন।
অবকাঠামো ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ
প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা, জ্বালানি ও বন্দর তিনটি বিষয়কে বিনিয়োগের বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বেপজা নির্বাহী চেয়ারম্যান। তার ভাষায়, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা প্রাকৃতিক—প্রচুর কাঁচামাল নেই, জমি কম আর প্রায় ২০ কোটি মানুষের দেশে বিশাল এলাকা বরাদ্দ দেয়া সম্ভব নয়।’
রফতানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বন্দর সক্ষমতা ও জ্বালানি সরবরাহ। ‘এখনো মূলত একটি বন্দরের ওপর নির্ভর করছি, পায়রা ও মোংলার ব্যবহার সীমিত। মাতারবাড়ী চালু হলে সময় ও খরচ দুইই কমবে’—বলেন তিনি।
জ্বালানি প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘বিদ্যুতের জন্য গ্যাসই এখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস। এছাড়া কারখানার বয়লার চালাতেও গ্যাস লাগে। মীরসরাইয়ে পাইপলাইন তৈরি হলেও বিনিয়োগকারীদের এখনো গ্যাস সরবরাহের সময়সীমা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না।’
নীতিগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি আশাবাদী। বলেন, ‘এগুলো সময়ের সঙ্গে আপডেট করা যায়, আর অনেক ক্ষেত্রেই আমরা নীতিসহায়তায় এগিয়ে আছি।’
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মেজর জেনারেল আবুল কালাম মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান বলেন, ‘৪৫ বছরে আমরা একটি ইপিজেড থেকে আজ আটটি ইপিজেড ও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে পৌঁছেছি। যশোর ও পটুয়াখালীতে দুটি নতুন জোনের কাজ চলছে। আশা করছি ২০২৬ বা ২০২৭ সালের শুরুতে নতুন বিনিয়োগকারীদের জমি বরাদ্দ দিতে পারব। ২০২৯ সালের মধ্যে আরো দু-তিনটি নতুন ইপিজেড প্রকল্প শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।’
‘গাইবান্ধায় একটি ইপিজেড করার পরিকল্পনা আছে, যা হলে সেখানে বিশাল কর্মসংস্থান হবে। সিরাজগঞ্জে শহর রক্ষাবাঁধ এলাকায় প্রায় এক হাজার একর অলস জমি রয়েছে, সেটিও বিবেচনায় আছে’—বলেন তিনি।
‘এছাড়া হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জের দিকে আমরা প্রাথমিক কাজ করছি ওদিকে একটা ইপিজেড করা যায় কিনা’—যোগ করেন বেপজার নির্বাহী চেয়ারম্যান।