স্টিল মিল থেকে ইপিজেডে রূপান্তর
পতেঙ্গা সমুদ্র উপকূলে একসময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল চট্টগ্রাম স্টিল মিল-বাংলাদেশ ইস্পাত শিল্পের এক গর্বের প্রতীক। ১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ইস্পাতের চাহিদা পূরণে এই মিল স্থাপন করে, যা দীর্ঘদিন ধরে দেশের নির্মাণ ও অবকাঠামো খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। বিশাল কমপ্লেক্স, ধোঁয়ার চিমনি এবং উৎপাদনের গর্জন—সব মিলিয়ে স্টিল মিল ছিল পতেঙ্গার প্রাণকেন্দ্র।
তবে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকারী ঘুর্ণিঝড়ের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ এবং ব্যবস্থাপনার নানা সমস্যার কারণে মিলটি ধীরে ধীরে লোকসানের মুখে পড়ে। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে মিলে কার্যত উৎপাদন বন্ধ হয় এবং ১৯৯৯ সালে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। ফলে বহু শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। যে এলাকায় প্রতিদিন হাজারো শ্রমিকের পদচারণা ছিল, সেখানে নেমে আসে নীরবতা।
এই অচলাবস্থা দূর করে এলাকা পুনরুজ্জীবিত করতে সরকার বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বেপজার অধীনে পতেঙ্গার এই জায়গায় নতুনভাবে শিল্পায়নের উদ্যোগ নেয়। ২০০৪ সালে স্টিল মিলের জমি আনুষ্ঠানিকভাবে বেপজাকে হস্তান্তর করা হয়। শুরু হয় রূপান্তরের প্রক্রিয়া।
পুরনো স্টিল মিল ভেঙে ফেলা হয়, জমি উন্নয়ন করা হয়। গড়ে ওঠে একটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল-কর্ণফুলী রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (কর্ণফুলী ইপিজেড), যেখানে আধুনিক অবকাঠামো, কারখানা, ইউটিলিটি সুবিধা একত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। ২০০৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার পর থেকে কর্ণফুলী ইপিজেড দ্রুতই বিদেশী ও দেশী বিনিয়োগকারীদের কাছে হয়ে ওঠে বিনিয়োগের অন্যতম গন্তব্য।
একসময় যেখানে সর্বোচ্চ ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করত সেখানে বর্তমানে কাজ করছে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক। উৎপাদিত পণ্য রফতানি হচ্ছে বিশ্ববাজারে। এভাবেই স্টিলের স্মৃতি থেকে কর্ণফুলী ইপিজেডে রূপান্তরের এই যাত্রা একটি শিল্প এলাকার নবজন্মের গল্প হয়ে আছে।
কৌশলগত অবস্থান ও শিল্পের গতি
কর্ণফুলী ইপিজেডের প্রধান সুবিধা হলো এর বন্দরসংলগ্ন ভৌগোলিক অবস্থান। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় এখানে স্থাপিত শিল্প-কারখানাগুলো সহজেই পণ্য আমদানি-রফতানির কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারে। রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সময়ই মূল সম্পদ আর বন্দরসংলগ্নতা এ সময় সাশ্রয় নিশ্চিত করছে বহুগুণ।
এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্য দ্রুত শিপমেন্ট করতে পারছে শুধু এ অবস্থানের কারণে। বিদেশী ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী কর্ণফুলী ইপিজেডের শিল্প-কারখানাগুলো বন্দর থেকে খুব কম সময়ে কনটেইনারে পণ্য বোঝাই করে সরাসরি জাহাজে তুলে দিতে পারছে। লিড টাইম কম হওয়ায় দ্রুত পণ্য পৌঁছে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখছে।
আমদানিতেও এই সুবিধার প্রভাব স্পষ্ট-উৎপাদনের কাঁচামাল সহজেই দ্রুত কারখানায় পৌঁছে যাচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ কমাচ্ছে এবং সময় বাঁচাচ্ছে। বেপজার নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল শিল্পাঞ্চল ব্যবস্থাপনা বন্দর নিকটবর্তী এ এলাকায় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করেছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তাই কর্ণফুলী ইপিজেডকে তাদের রফতানি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে বেছে নিচ্ছেন, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
কর্মসংস্থান ও শ্রমিক কল্যাণ
কর্ণফুলী ইপিজেডে কর্মসংস্থানের চিত্র দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে এক অনন্য উদাহরণ। এখানে মোট শ্রমিকের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী। সূক্ষ্ম ও মনোযোগী কাজে তাদের দক্ষতা এবং নিয়মিত উপস্থিতি শিল্প মালিকদের কাছে এই নারীদের অমূল্য সম্পদে পরিণত করেছে।
শ্রমিক কল্যাণে এখানে হয়েছে আধুনিক মেডিকেল সেন্টার, যেখানে প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৫০ জন চিকিৎসাসেবা পান। রয়েছে ২৪ ঘণ্টার ফ্রি হেল্পলাইন, মাতৃত্বকালীন পুষ্টি সহায়তা ও ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা। শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য মানসম্মত স্কুলে প্রায় ১,২০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে।
আজকের কর্ণফুলী ইপিজেড কেবল একটি শিল্পাঞ্চল নয়, এটি দেশের অর্থনীতির গতির প্রতীক। মানুষের শ্রম, স্বপ্ন ও অদম্য অগ্রযাত্রার প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের শ্রমিকরা দক্ষ এবং দ্রুত অভিযোজনক্ষম
সানাকা ডি জয়সা
মহাব্যবস্থাপক
এমএএস ইন্টিমেটস বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড
এমএএস প্রতিষ্ঠা করেন তিন ভাই—মহেশ, অজয় ও শরদ ১৯৮৭ সালে। তাদের নামের আদ্যক্ষর থেকেই এসেছে ‘এমএএস’। শুরুটা শ্রীলংকায় হলেও আমরা তখন থেকেই বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের স্বপ্ন দেখছিলাম।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ তৈরি হয় তিনটি প্রধান কারণে— প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং সরবরাহ চেইনের স্থিতিশীলতা। আমাদের গবেষণা বিভাগ বিশ্লেষণ করে দেখায়, ভবিষ্যতের জন্য বাংলাদেশই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় গন্তব্য।
২০১০ সালে কর্ণফুলী ইপিজেডে আমাদের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে কিছু নির্দিষ্ট বৈদেশিক ক্রেতার জন্যই উৎপাদন করতাম। কিন্তু এখানকার কর্মীদের কাজের মান, শৃঙ্খলা, উৎপাদনক্ষমতা ও সময়নিষ্ঠতা দেখে দ্রুত অনেক নতুন ক্রেতা যুক্ত হন। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় আমরা চট্টগ্রাম ইপিজেডে (সিইপিজেড) ‘এমএএস সুমান্ত্রা-২ (প্রা.) লিমিটেড’ নামে দ্বিতীয় ইউনিট চালু করি।
আমরা বিশ্বাস করি, কর্মীদের সন্তুষ্টি ছাড়া কোনো ব্যবসা টেকসই হতে পারে না। তাই আমাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রত্যেক সদস্যের জন্য রয়েছে ট্রান্সপোর্ট, পুষ্টিকর খাবার, প্রাথমিক চিকিৎসা, পুরস্কার এবং ক্যারিয়ার উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। বর্তমানে পাঁচ হাজারেরও বেশি কর্মী যেন একটি পরিবারের মতো একসঙ্গে কাজ করছেন—এটাই আমাদের সংস্কৃতি। এখানকার শ্রমিকরা দক্ষ এবং দ্রুত অভিযোজনক্ষম, যা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অনন্য করেছে।
বেপজার সহায়তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। এই সহায়তাই আমাদের বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সাহস জুগিয়েছে এবং আমরা উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পেরেছি।
বৈচিত্র্যময় শিল্পায়নে সম্ভাবনার দিগন্ত
মসিহ্উদ্দিন বিন মেসবাহ
নির্বাহী পরিচালক, কর্ণফুলী ইপিজেড
বাংলাদেশের রফতানিমুখী শিল্পায়নের মানচিত্রে কর্ণফুলী ইপিজেড এক উজ্জ্বল নাম। চট্টগ্রামে অবস্থিত এই শিল্পাঞ্চল কেবল গার্মেন্টসেই সীমাবদ্ধ না থেকে বৈচিত্র্যময় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যা দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কর্ণফুলী ইপিজেডে বর্তমানে ১৪টি দেশের ৩৯টি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। ২৭টি শতভাগ বিদেশী মালিকানাধীন যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দেশগুলো হলো হংকং, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস ও তাইওয়ান। আগামী এক বছরে আরো তিনটি রফতানিমুখী কারখানা চালু হবে, ফলে শ্রমিক সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যাবে।
কর্ণফুলী ইপিজেডের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো শিল্পের বৈচিত্র্য। গার্মেন্টস ছাড়াও এখানে সাইকেল, ব্যাগ, ফার্নিচার ও তাঁবু উৎপাদন হয়। দেশের মধ্যে এটিই একমাত্র ইপিজেড যেখানে ফার্নিচার শিল্প গড়ে উঠেছে। এর পাশাপাশি তাঁবুর অ্যাকসেসরিজ, সেফটি স্যু, ফ্যাশন স্যু উৎপাদন করে কর্ণফুলী ইপিজেড বাংলাদেশের উদ্ভাবনী শিল্পায়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস কারখানায় সাধারণত নারীর উপস্থিতি বেশি হলেও ভিন্নধর্মী শিল্পে তা তুলনামূলক কম। কিন্তু কর্ণফুলী ইপিজেড এ ধারা বদলে দিয়েছে। এখানে কর্মরত মোট শ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশই নারী।
বৈচিত্র্যময় পণ্যে কর্ণফুলী ইপিজেড
কর্ণফুলী ইপিজেডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য পণ্যের বৈচিত্র্য। পোশাকনির্ভর রফতানি শিল্পের বাইরে এখানে রয়েছে ফার্নিচার, ব্যাগ, আন্ডারগার্মেন্টস, ফ্যাশন ও সেফটি স্যু, সাইকেল প্রভৃতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যা বাংলাদেশের রফতানি খাতে নতুন সম্ভাবনা যোগ করেছে।
ট্রেনডেক্স ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ দেশের ইপিজেডগুলোর মধ্যে একমাত্র রফতানিমুখী ফার্নিচার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান; যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ব্র্যান্ডের জন্য কোটি ডলারের পণ্য রফতানি করে। পার্ক আউটডোর লিমিটেড পুমা, ইস্টপ্যাক, কিপলিং-এর মতো ব্র্যান্ডের জন্য ব্যাগ ও লাগেজ তৈরি করছে। এমএএস ইন্টিমেটস বাংলাদেশ (প্রা.) লিমিটেড বিশ্বসেরা ব্র্যান্ডের জন্য আন্ডারগার্মেন্টস উৎপাদন করছে, যেখানে আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও শ্রমিক কল্যাণ অগ্রাধিকার পায়। করভো সাইকেলস লিমিটেড ইউরোপে বিএমএক্স, মাউন্টেন ও হাইব্রিড বাইক রফতানি করছে—যা বাংলাদেশের জন্য নতুন হলেও সম্ভাবনাময় খাত।
শিল্প বৈচিত্র্যের ফলে পোশাকের ওপর নির্ভরতা কমছে এবং বৈশ্বিক বাজারে ওঠানামা সত্ত্বেও রফতানি স্থিতিশীল থাকছে। বন্দরের নৈকট্য, আধুনিক অবকাঠামো ও দক্ষ শ্রমশক্তি মিলিয়ে কর্ণফুলী ইপিজেড আজ দেশের রফতানি সম্ভাবনার অন্যতম চালিকাশক্তি।