ঈশ্বরদী ইপিজেড থেকে সবুজ শিল্পায়নের যাত্রা শুরু
২০০১ সালে রেলওয়ের অব্যবহৃত জমিতে ঈশ্বরদী ইপিজেডের যাত্রা শুরু হয়। সবুজ শিল্পায়নে পথ দেখিয়েছে এই ইপিজেড। ঈশ্বরদী ইপিজেডের ‘ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও’ ২০১২ সালে দেশের প্রথম লিড প্লাটিনাম কারখানা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে, যা টেকসই শিল্পায়নের ভিত্তি স্থাপন করে। এই কারখানাকে ঘিরেই দেশে পরিবেশবান্ধব শিল্প স্থাপনার নতুন ধারা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর শিল্পে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সচেতনতা নাটকীয়ভাবে বাড়ে। তখন থেকেই উদ্যোক্তারা নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়ে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করেন। ফলে বিশ্বে তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক পরিবেশবান্ধব কারখানার মুকুট এখন বাংলাদেশের, যার পথ দেখিয়েছিল ঈশ্বরদী ইপিজেডের ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও। এই সাফল্য বাংলাদেশের শিল্প খাতের এক নতুন পরিচয় গড়ে তুলেছে এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এ কারখানা নিজস্ব ইটিপির মাধ্যমে বর্জ্য শোধন করে, ডব্লিউটিপির মাধ্যমে পানি পরিশোধন করে এবং সেই পানি বাগানে ব্যবহার করে। কারখানার অভ্যন্তরে রয়েছে সবুজের সমারোহ, যা শ্রমিকদের জন্য একটি সুন্দর কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করে।
পানি, বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সংকট নেই
এবিএম সহিদুল ইসলাম
নির্বাহী পরিচালক, ঈশ্বরদী ইপিজেড
বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের সূচনা হয়েছিল ঈশ্বরদী ইপিজেড থেকেই। এখানে গড়ে ওঠা ‘ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও লিমিটেড’ ২০১২ সালে দেশের প্রথম লিড প্লাটিনাম সার্টিফিকেশনপ্রাপ্ত গ্রিন ফ্যাক্টরি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এ ইপিজেডে আরো গ্রিন ফ্যাক্টরি রয়েছে। অন্যান্য ইপিজেডের তুলনায় ঈশ্বরদী ইপিজেডের জমির ভাড়া কম। পানি, বিদ্যুৎ বা গ্যাসেরও কোনো সংকট নেই। তাই এখানে বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। এখানে একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো নতুন প্লট তৈরির সুযোগ নেই। তবে যেসব সুযোগ-সুবিধা বিদ্যমান আছে তা যথেষ্ট সম্ভাবনাময়।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের কর্মসংস্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে ঈশ্বরদী ইপিজেড। এ ইপিজেড শুধু পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের মডেল নয়, এটি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কর্মসংস্থানের একটি প্রাণকেন্দ্র। বর্তমানে এখানে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক নিয়োজিত, যার ৭০ শতাংশই নারী। কর্মরত শ্রমিকদের বেশির ভাগই স্থানীয় এলাকার বাসিন্দা। বাড়ির পাশে হওয়ায় এলাকার নারীরা মানসম্পন্ন বেতনে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন। যেটি এ এলাকার মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ঈশ্বরদী ইপিজেডের ‘ভিনটেজ ডেনিম স্টুডিও লিমিটেড’ কারখানায় ১০ বছর ধরে কাজ করেন জান্নাতুল ফেরদাউস। নিজের এক দশকের কাজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে কাজের পরিবেশ, বেতন-ভাতা, নারী হিসেবে নিজের সুরক্ষা, নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয় না। অনেকের পরিবার ঢাকায় গিয়ে কাজ করতে অনুমতি দিতে চায় না। তাদের জন্য এটি অনেক বড় সুযোগ তৈরি করেছে। আমি এখানে কাজ করে নিজেই সংসার চালাই, ছেলেমেয়ের পড়াশোনা এবং বাবা-মায়ের চিকিৎসা খরচ সবই বহন করতে পারছি।’
বিনিয়োগের নিরাপদ গন্তব্য
ঈশ্বরদী ইপিজেডে আধুনিক অবকাঠামো ও সেবার পরিসর ক্রমাগত বাড়ছে। নিরাপদ বিনিয়োগের লক্ষ্যে এখানে রয়েছে কাস্টমস অফিস, নিরাপত্তা অফিস, পুলিশ ক্যাম্প, ফায়ার স্টেশন, মেডিকেল সেন্টার, জোন সার্ভিসেস কমপ্লেক্স, নিজস্ব টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, গ্যাস বিতরণ অফিস, ব্যাংকিং সেবা ও রেস্ট হাউজ। ফলে দেশীয় বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
কার্গো বিমান চালু হলে অনেক সুবিধা হবে
শুহেই উশিদা
ব্যবস্থাপনা পরিচালক
ঈশ্বরদী মাৎসুকা বাংলাদেশ লিমিটেড
আমরা ঈশ্বরদী ইপিজেডে কারখানা গড়েছি কিছু বিষয় বিবেচনায় নিয়ে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্থানীয় শ্রমিক। এখানে তরুণ শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি এবং তারা দ্রুত শিখতে পারে এবং তাদের কাজের মান অনেক ভালো। আরেকটি সুবিধা হলো এখানকার শ্রমিকরা প্রায় সবাই স্থানীয় বাসিন্দা।
বাংলাদেশে বিশেষ করে ইপিজেডগুলোয় ব্যবসার পরিবেশ অনেক ভালো। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার ব্যবসায়ী বন্ধুদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উৎসাহ দিয়েছি। তবে ঈশ্বরদী অনেক দূরবর্তী এলাকা হওয়ায় যাতায়াতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এখানে একটি বিমানবন্দর রয়েছে, যেটি বন্ধ। এটি যদি চালু করা হয়, বিশেষ করে কার্গো বিমান চলাচল করে তাহলে আমাদের জন্য অনেক সুবিধা হবে।
শ্রমিকবান্ধব অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ
শ্রমিক কল্যাণে ঈশ্বরদী ইপিজেডের প্রতিষ্ঠানগুলো বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এ ইপিজেডের নিজস্ব মেডিকেল সেন্টার রয়েছে, যেখান থেকে শ্রমিকরা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ এমনকি রোগ নির্ণয়ের লক্ষ্যে নামমাত্র মূল্যে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে পারেন। এছাড়া রয়েছে বেপজা পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ, যেখানে বর্তমানে ১ হাজার ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে। শ্রমিকদের সন্তানরা এখানে ৫০ শতাংশ ছাড়ে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
ইপিজেডের কারখানাগুলো স্থানীয় শ্রমিকদের দক্ষতা বাড়াতে বিদেশী দক্ষ টেকনিক্যাল লোকজনের মাধ্যমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে। ঈশ্বরদী ইপিজেডের জাপানি একটি প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, যেখানে প্রশিক্ষণ নিয়ে শ্রমিকরা দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন।
উৎপাদিত পণ্য
দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় ঈশ্বরদী ইপিজেডে শুধু গার্মেন্টস পণ্যই নয়, উৎপাদিত হচ্ছে বহুমুখী পণ্যও। গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলের বাইরেও রহিমআফরোজ গ্লোবেট লিমিটেড কারখানার উৎপাদিত গ্লোবেট ব্যাটারি, তোয়া পারসোনাল প্রটেকটিভ ডিভাইস বাংলাদেশ লিমিটেড কারখানার উন্নতমানের ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লাভস বহুমুখী রফতানির চিত্রই তুলে ধরে। এছাড়া এখানে উৎপাদিত হচ্ছে তাঁবু ও ক্যাম্পিং আইটেম, উইগ, ক্যাপ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্লাভস, ব্যাটারি, সোয়েটার, প্লাস্টিক পণ্য, সিগার ও সিগারেট, ডেনিম গার্মেন্টস, গার্মেন্টস ও গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ প্রভৃতি