এভিয়েশন খাতে সমন্বিত অর্থায়ন বাড়াতে হবে

মো. শাহীন ইকবাল
অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড হেড অব হোলসেল ব্যাংকিং
ব্র্যাক ব্যাংক

কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ও কার্গো ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও দ্রুত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশী এয়ারলাইনসের রেভেনিউ ট্রান্সফারের নিয়ম সহজ করার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধি ও সক্ষমতা বাড়াতে, পাশাপাশি ট্যুরিজম শিল্পের বিকাশে ব্যাংক খাত কীভাবে কৌশলগত অর্থায়ন ও বিনিয়োগে ভূমিকা রাখতে পারে?

এভিয়েশন ও পর্যটনকে শুধু আলাদা দুটি খাত হিসেবে দেখলে আমরা এদের আসল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কখনই পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারব না। এভিয়েশন মূলত একটি দেশের বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। তাই এ খাতের উন্নয়নে ব্যাংক খাতের ভূমিকা শুধু ঋণ দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি সমন্বিত সলিউশন তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশের আকাশপথে যাত্রী পরিবহন খাত দ্রুত সম্প্রসারণ হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আইএটিএ) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ঢাকার প্রধান বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রী চলাচল করেছে।

এভিয়েশন খাতের উন্নয়নে ব্যাংকগুলো শুধু প্রচলিত ঋণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উড়োজাহাজ ক্রয় ও ইজারা, ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র, পণ্য পরিবহন অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর যাত্রীসেবা, হোটেল ও পর্যটন অবকাঠামোয় অর্থায়ন বাড়াতে পারে।

বড় প্রকল্পে একাধিক ব্যাংকের যৌথ অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ব্র্যাক ব্যাংকেরও বিমান পরিবহন খাতে অর্থায়নের পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে এ খাতে আরো বড় পরিসরে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করে।

যেহেতু এ ব্যবসা আন্তর্জাতিক প্রকৃতির, তাই ব্যাংকগুলোকে ফরেন এক্সচেঞ্জ, ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আরো শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে হবে।

তাই ব্যাংক খাতের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত পুরো এভিয়েশন ইকোসিস্টেম ফাইন্যান্সিং ও ব্যাংকিং সলিউশনে মনোযোগ দেয়া, যাতে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত পুরো ভ্যালু চেইন আমাদের অর্থায়ন ও সেবার আওতায় আসে।

এভিয়েশন ও ট্যুরিজম খাত মূলধননির্ভর ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট। এ খাতে টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?

এ খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগের আকার ও অর্থায়নের মেয়াদ। হোটেলের মতো বড় প্রজেক্ট, উড়োজাহাজ, ইঞ্জিন, রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র কিংবা বিমানবন্দর অবকাঠামোর জন্য বড় অংকের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন, যেখানে বিনিয়োগের টাকা ফেরত আসতে বহু বছর সময় লাগে। উদাহরণ হিসেবে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণে প্রায় ২১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এ ধরনের প্রকল্প একটি ব্যাংকের পক্ষে এককভাবে অর্থায়ন করা কঠিন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি। উড়োজাহাজ ক্রয়, ইজারা, যন্ত্রাংশ, বীমা ও রক্ষণাবেক্ষণের বড় অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময়হার ওঠানামা করে। সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য, ইন্টারেস্ট রেট এবং যাত্রী চাহিদার পরিবর্তনও আর্থিক ঝুঁকি সৃষ্টি করে। তাই এ খাতে যৌথ অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রায় অর্থায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ইজারাভিত্তিক অর্থায়ন এবং ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহভিত্তিক ঋণ কাঠামো আরো বেশি ব্যবহার করা প্রয়োজন।

আশার কথা হলো, সাম্প্রতিক আইনি পরিবর্তনগুলো নতুন সুযোগ তৈরি করছে। যেমন বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের বৈদেশিক মুদ্রা নীতিমালায় বিদেশী এয়ারলাইনস ও শিপিং কোম্পানিগুলোর আয় এবং অর্থ স্থানান্তরের নিয়ম অনেক সহজ করা হয়েছে। এ ইতিবাচক পরিবর্তন আমাদের মতো ব্যাংকগুলোর জন্য গ্রাহকদের আরো দ্রুত ও কার্যকর সেবা দেয়ার পথ খুলে দিয়েছে।

এয়ার কার্গো, লজিস্টিকস, এমআরও, হসপিটালিটি ও এভিয়েশন-ট্যুরিজম সংশ্লিষ্ট ব্যবসার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে কী ধরনের আধুনিক আর্থিক পণ্য ও অর্থায়ন কাঠামো প্রয়োজন?

আকাশ পথে পণ্য পরিবহন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিমান বাংলাদেশ প্রায় ৪৩ হাজার ৯১৮ টন পণ্য পরিবহন করেছে এবং এ খাত থেকে প্রায় ৯২৫ কোটি টাকা রাজস্ব অর্জন করেছে। এ আয়ের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪৫ শতাংশ। এটি প্রমাণ করে যে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট সেবায়ও উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক সম্ভাবনা রয়েছে।

এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদভিত্তিক অর্থায়ন, ইজারাভিত্তিক অর্থায়ন, চলতি মূলধন, পাওনা অর্থের বিপরীতে অর্থায়ন, সরবরাহ শৃঙ্খল অর্থায়ন এবং গুদামভিত্তিক অর্থায়ন প্রয়োজন।

এয়ার কার্গো ও লজিস্টিকস ব্যবসার জন্য দরকার ট্রেড ফাইন্যান্স, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ও ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট। উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ খাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রজেক্ট ফাইন্যান্স ও লিজ ফাইন্যান্সিং। ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর জন্য দ্রুত ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল খুবই জরুরি।

একই সঙ্গে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় অর্থ সংগ্রহ, দ্রুত অর্থ পরিশোধ, বৈদেশিক লেনদেন এবং নগদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে বিমান সংস্থা, পণ্য পরিবহনকারী, হোটেল ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরো দক্ষ হবে।

এছাড়া এভিয়েশন ব্যবসার জন্য ডিজিটাল পেমেন্ট ও মার্চেন্ট অ্যাকোয়ারিং সলিউশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে টিকিট বিক্রি, রিফান্ড ও ইনস্ট্যান্ট ফান্ড ম্যানেজমেন্ট ব্যবসার দক্ষতা অনেক বাড়িয়ে দেয়।

ব্যাংকগুলো একটি সমন্বিত এভিয়েশন ব্যাংকিং প্রপোজিশন চালু করতে পারে, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব ব্যাংকিং সার্ভিস থাকবে এক ছাতার নিচে। এক্ষেত্রে ব্র্যাক ব্যাংক এগিয়ে আছে।

আমাদের ডেডিকেটেড করপোরেট ব্যাংকিং টিম এবং নির্দিষ্ট ইন্ডাস্ট্রি উপযোগী কাস্টমাইজড সলিউশন ব্যবহার করে আমরা বড় করপোরেট ক্লায়েন্ট থেকে শুরু করে তাদের সাপ্লাই চেইনের ছোট এসএমই ব্যবসা পর্যন্ত এ খাতসংশ্লিষ্ট সবাইকে একটি সমন্বিত ব্যাংকিং সেবা দিতে পারছি।

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, পর্যটন ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দেশকে একটি কার্যকর আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে সরকার, বেসরকারি খাত ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ কী হওয়া উচিত?

বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান আঞ্চলিক আকাশ পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২৫ সালে ঢাকার প্রধান বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ যাত্রী চলাচল করেছে, যার প্রায় ৮১ শতাংশ আন্তর্জাতিক যাত্রী। পাশাপাশি দেশের আধুনিক টার্মিনাল ও নতুন বিমানবন্দর অবকাঠামো দেশের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

এখন প্রয়োজন দ্রুত শুল্ক কার্যক্রম, সার্বক্ষণিক পণ্য খালাস, আধুনিক শীতল সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সহজ ভিসা প্রক্রিয়া, দ্রুত অভিবাসন সেবা এবং উন্নত বিমানবন্দর-নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা। বেসরকারি খাতকে বিমান সংস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ, পণ্য পরিবহন, হোটেল ও পর্যটনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বাড়াতে হবে।

কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ও কার্গো ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়াকে পুরোপুরি ডিজিটাল ও দ্রুত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশী এয়ারলাইনসের রেভেনিউ ট্রান্সফারের নিয়ম সহজ করার লক্ষ্যে সাম্প্রতিক যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

বাংলাদেশী যাত্রীরা বিদেশী এয়ারলাইনসের টিকিট কেনার ক্ষেত্রে এখনো মূলত ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর ওপর নির্ভরশীল। অথচ এয়ারলাইনসের নিজস্ব ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি টিকিট কিনলে অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা তুলনামূলক কম দামে টিকিট পাওয়ার সুযোগ পান। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রাবিষয়ক নীতিমালা সহজ করতে পারে।

ব্যক্তিগত ভ্রমণ কোটা এবং বৈদেশিক মুদ্রায় ই-কমার্স লেনদেনের সীমার কারণে অনেক যাত্রী এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি টিকিট কিনতে পারেন না। এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইটে সরাসরি বাংলাদেশী টাকা দিয়ে টিকিট কেনার সুযোগ চালু করা গেলে যাত্রীরা উপকৃত হবেন।

এ বিষয়ে একটি কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর যৌথভাবে কাজ করা প্রয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু যাত্রীদের জন্যই নয়, বাংলাদেশের পর্যটন খাতের জন্যও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়ন, যৌথ অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় আরো সক্রিয় হতে হবে। এ তিন পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে বিমান পরিবহন খাত বাংলাদেশের বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।

আমি মনে করি, এভিয়েশন খাত শুধু যাত্রী পরিবহনের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের ব্যবসা, পর্যটন ও লজিস্টিকসের একটি কৌশলগত প্লাটফর্ম। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ব্যাংক খাত শুধু ঋণের জোগানদাতা নয়, বরং এ খাতের দীর্ঘমেয়াদি গ্রোথ পার্টনার হিসেবে কাজ করতে পারে।

ব্র্যাক ব্যাংক এরই মধ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় এয়ারলাইনস, শিপিং কোম্পানি ও করপোরেট ক্লায়েন্টদের বিশেষায়িত ব্যাংকিং সেবা, লিকুইডিটি সাপোর্ট এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং সুবিধা দিয়ে আসছে।

বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর জন্য আমাদের বিজনেস ও অপারেশন টিমের সমন্বয়ে একটি ডেডিকেটেড ডেস্ক রয়েছে। এ ডেস্ক সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসগুলোর বৈদেশিক লেনদেন ও রিপোর্টিং-সংক্রান্ত কার্যক্রমে সহায়তা দেয়ার পাশাপাশি পরামর্শমূলক ভূমিকা পালন করে এবং শিল্প খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে। বাংলাদেশে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন সেবা পরিচালনাকারী ২৪টি বিদেশী এয়ারলাইনসের সঙ্গে কাজ করছে ব্র্যাক ব্যাংক। এ খাত সম্পর্কে আমাদের বিশেষায়িত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সুশাসনের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারই বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর কাছে আমাদের একটি বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

আমাদের লক্ষ্য, এ সক্ষমতাকে আরো বাড়িয়ে এ খাতের উন্নয়ন ও পথচলায় একজন আর্থিক অংশীদার হিসেবে পাশে থাকা, যাতে দেশের এভিয়েশন, বাণিজ্য ও পর্যটন খাত এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে।

আরও