বিশ্বমানের এভিয়েশন চাই, বদলাতে হবে পুরো ইকোসিস্টেম

কেএম মুজিবুল হক
চেয়ারম্যান
এয়ার এশিয়া ও কুয়েত এয়ারলাইনসের জেনারেল সেলস এজেন্ট প্রতিষ্ঠান টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড (টাস গ্রুপ)

এভিয়েশন শিল্পে আমরা সবচেয়ে বড় সুবিধা নিতে পারি, কারণ আমাদের ১২ মিলিয়ন মানুষ বিদেশে থাকে।

পৃথিবীতে যখনই কোনো মন্দা বা অর্থনৈতিক সমস্যা আসে, তখন তাকে দুইভাবে মোকাবেলা করা যায়। এক হচ্ছে সময় বাঁচানো ও দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। এভিয়েশনে যদি একটি সাশ্রয়ী ভ্রমণের সুযোগ দেয়া যায়, তাহলে ব্যবসায়ীরা সময় ও অর্থ বাঁচাতে পারেন। যাওয়া, বসা, কথা বলা এবং দরদাম বা নেগোসিয়েশন করার যে সুবিধা, তা এভিয়েশন শিল্পই দিয়ে থাকে। তাই সংকটের সময়েও এভিয়েশন শিল্পের বড় অবদান রয়েছে। মানুষের সময় বাঁচানো এবং যাতায়াতের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে পৌঁছতে এটি অত্যন্ত সাহায্য করে।

বাংলাদেশের এভিয়েশন শিল্প বলতে যা বোঝায়, সে অবকাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি। আমাদের এয়ারলাইনস আছে, কিন্তু এভিয়েশন শিল্প হিসেবে যেসব উপাদান প্রয়োজন, তা এখনো হয়ে ওঠেনি। সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে আমাদের কোনো শক্তিশালী লোকাল ক্যারিয়ার নেই। আমাদের যে বিমানসেবা চুক্তি অনুযায়ী স্লট বা ফ্রিকোয়েন্সি আছে, কিন্তু সক্ষমতার অভাবে আমরা সে স্লটগুলো ব্যবহার করতে পারছি না। আমাদের দুর্বলতা হচ্ছে একটি বা দুটি শক্তিশালী লোকাল ক্যারিয়ারের অভাব এবং পর্যাপ্ত বিমান না থাকা। আমাদের যে যাত্রীসংখ্যা, সে বাজার ধরতে হলে কমপক্ষে ১৫০-২০০টি বিমান লাগবে। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জিং বিষয় হচ্ছে আমাদের বিমানবন্দর ও বিমানবন্দরের পরিবেশ, যা নিয়ে আমাদের কাজ করতে হবে।

এটি করা সম্ভব। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দিল্লি বা করাচির মতো পুরোপুরি না হলেও আমরা অন্তত ৬০-৭০ শতাংশ লক্ষ্য অর্জন করতে পারব। তার জন্য আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলো দূর করতে হবে। তৃতীয় টার্মিনালটি চালু হওয়ার পর আমরা একটি মাঝারি মানের হাব গড়ে তোলার কথা চিন্তা করতে পারি। তবে আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রানওয়ে। কলকাতায় প্রতি ২ মিনিটে একটি বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ করে এবং তারা প্রতিদিন ৭০০টি বিমান পরিচালনা করে। আমাদের এখানে এ সংখ্যা ৩০০। রানওয়ের দক্ষতা বাড়াতে পারলে প্রতিদিন অন্তত ৫০০টির বেশি বিমান পরিচালনা করা সম্ভব। সক্ষমতা অবশ্যই আছে। তার জন্য প্রয়োজন ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতার উন্নয়ন এবং একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা।

এভিয়েশন শিল্পে আমরা সবচেয়ে বড় সুবিধা নিতে পারি, কারণ আমাদের ১২ মিলিয়ন মানুষ বিদেশে থাকে। এছাড়া আমরা যদি ট্রানজিট হাব গড়তে পারি, তবে আরো সুবিধা হবে। বর্তমানে আমরা অভ্যন্তরীণসহ বছরে ছয়-সাত মিলিয়ন যাত্রী পরিচালনা করি, কিন্তু এ টার্মিনালের সক্ষমতা ২০ মিলিয়ন। আগামী পাঁচ বছরে যদি আমরা ২০ মিলিয়ন যাত্রী নিশ্চিত করতে চাই, তবে বিমানবন্দরে একটি অনুকূল পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন আনতে হবে।

বিমানবন্দরের মধ্যে ট্রানজিট যাত্রীরা যে ২-৪ ঘণ্টা থাকবেন, তাদের জন্য একটি উপযুক্ত ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বিমানবন্দরেও যদি আমরা একটি সুন্দর ইকোসিস্টেম ও কানেক্টিভিটি তৈরি করতে পারি, তবে আমরাও সফল হব। আমাদেরও আন্তর্জাতিক মানের বড় লাউঞ্জ ও কেনাকাটার জন্য আউটলেট রাখতে হবে। লং ট্রানজিট যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দর সংলগ্ন সিভিল এভিয়েশনের খালি জায়গায় আমরা একটি ‘অ্যারোসিটি’ গড়ে তুলতে পারি।

হাব হতে গেলে বিমান এত সময় বসিয়ে রাখার সুযোগ থাকবে না। ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে বিমান উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। এ দক্ষতা বিমান উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে শুরু করে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, ব্যাগেজ ডেলিভারি ও ইমিগ্রেশন, সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি সেক্টরে কেপিআই নির্ধারণ করে দিতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ আছে। প্রচুর ঘাটতি রয়েছে।

সামগ্রিকভাবে দক্ষ জনবলের অভাব আছে। একটি এয়ারলাইনস মানেই সম্পূর্ণ এভিয়েশন শিল্প নয়; এজন্য ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিঙ্কেজ প্রয়োজন। এ শিল্পকে বড় করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। দেশে যদি ২০০টি বিমান আসে আর আপনি এভিয়েশন হাব করতে চান, তবে তাদের প্রশিক্ষণের জন্য দেশেই সিমুলেটর ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দেশে ফ্লাইট সিমুলেটর একেবারেই শূন্য।

বিমানের সি-চেক আমরা ঢাকায় করতে পারি। কিন্তু বিমানের বোয়িংগুলো এখন ১২ বছরের বেশি পুরনো হয়ে যাওয়ায় এগুলোর রেট্রোফিট করতে বিদেশে পাঠাতে হচ্ছে। তাই এভিয়েশন হাব করার দুটি মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, দেশীয় বিমান পরিবহনকে টেকসই করা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা। এজন্য সঠিক এমআরও বা মেইনটেন্যান্স সুবিধা গড়ে তুলতে হবে।

প্রধান বাধা হচ্ছে আমাদের নীতি বা পলিসি। বাংলাদেশে একটি বাজেট ক্যারিয়ার প্রয়োজন, যা মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চাহিদা মেটাবে। একই সঙ্গে বাজেট টার্মিনালও খুব প্রয়োজন। নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে চট্টগ্রামকে এমআরও হাব হিসেবে ঘোষণা করা যেতে পারে। সেখানে বন্ডেড ও শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। ক্যাটারিং ও লন্ড্রি সার্ভিসের মাধ্যমে বড় ধরনের বাণিজ্য সম্ভব।

সরকার যদি নীতিগত সহায়তা দেয় এবং বেসরকারি খাতকে আমন্ত্রণ জানায়, তবে দেশে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসবে। সরকারি-বেসরকারি যৌথ প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আমাদের নীতিগুলোকে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। সরকার যদি করের হার যৌক্তিক করে, তবে প্রবাসী শ্রমিকরা বছরে একাধিকবার দেশে আসতে পারবেন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। বিদেশী বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে ট্যাক্স ও ডিউটি কমিয়ে দিলে এভিয়েশন খাত থেকে বছরে ১০-১৫ বিলিয়ন ডলার আয় করা সম্ভব।

এছাড়া ২০৩০-৩৫ সালের মধ্যে আমাদের একটি নতুন বিমানবন্দর নিশ্চিত করতে হবে, কারণ বর্তমান বিমানবন্দর দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে হাব পরিচালনা করা সম্ভব নয়। নতুন বিমানবন্দর লাগবেই, এটার কোনো বিকল্প নেই। সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত নীতিগত সংস্কার ও একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা। এ মহাপরিকল্পনা মনিটরিং ও বাস্তবায়নে একটি উচ্চ পর্যায়ের স্ট্র্যাটেজিক কমিটি গঠন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোকে এগিয়ে নিতে সরকারি বিমানের মতো সমান সুযোগ বা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি খাতকে সুযোগ দিলে এভিয়েশন শিল্প দেশের তৈরি পোশাক খাতের মতোই একটি বড় চালিকাশক্তিতে পরিণত হবে।

আরও