এয়ারলাইনস থেকে এভিয়েশন গ্রুপ—ইউএস-বাংলা

বাংলাদেশের এভিয়েশনের নতুন অধ্যায়

বাংলাদেশে এভিয়েশন ও পর্যটনের বড় সংযোগ তৈরি হতে পারে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সিলেট, সুন্দরবন, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গন্তব্য ঘিরে।

এয়ারক্রাফট শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মানুষ পৌঁছে দেয়ার বাহন নয়। আধুনিক এভিয়েশন পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম—যেখানে যাত্রী পরিবহন, কার্গো, পর্যটন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, গ্রাউন্ড সার্ভিস, ক্যাটারিং, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস, হসপিটালিটি ও বিমানবন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। এ বাস্তবতায় ইউএস-বাংলার সামনে প্রশ্ন—প্রতিষ্ঠানটি কি শুধু এয়ারলাইনস হিসেবেই থাকবে, নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন গ্রুপে রূপ নেবে? উত্তর খোঁজার ক্ষেত্রে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বর্তমান সম্প্রসারণ পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইউএস-বাংলা ২০২৭ সালের মধ্যে ১৫টি বোয়িং ৭৩৭-৮ ও ছয়টি ৭৩৭-৮০০ এনজিসহ ২১টি নতুন উড়োজাহাজ বহরে যুক্ত করতে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে সমন্বিত এভিয়েশন গ্রুপে রূপান্তরের লক্ষ্যও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমান ২৫টির সঙ্গে আরো ২১টি উড়োজাহাজ যোগ করা মূলত বহর সম্প্রসারণ। কিন্তু এয়ারলাইনসের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসাকে একই কাঠামোর আওতায় এনে পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন গ্রুপ গড়ে তোলা অনেক বড় ব্যবসায়িক রূপান্তর।

এয়ারলাইনস থেকে এভিয়েশন গ্রুপ

এয়ারলাইনসের মূল ব্যবসা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। আর এভিয়েশন গ্রুপের ধারণা হলো এ খাতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন মূল্যসংযোজনকারী ব্যবসাকে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেমে আনা। এর কেন্দ্রে থাকতে পারে ফুল সার্ভিস ক্যারিয়ার; পাশাপাশি ভিন্ন শ্রেণীর যাত্রীর জন্য লো-কস্ট ক্যারিয়ার বা দ্বিতীয় এয়ারলাইনসও থাকতে পারে। ইউএস-বাংলা এরই মধ্যে এমন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এ মডেলের লক্ষ্য শুধু প্রতিযোগী এয়ারলাইনসকে টেক্কা দেয়া নয়; বরং যাত্রীর পুরো ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে একই ইকোসিস্টেমে আনা। টিকিট বুকিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস, ফ্লাইট, ক্যাটারিং, হোটেল, যাতায়াত, হলিডে প্যাকেজ, কার্গো ও ফ্রেইটার—সব সেবা একই গ্রুপের আওতায় থাকতে পারে। পাশাপাশি মেইনটেন্যান্স, ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনিক্যাল জনবল তৈরির ব্যবস্থাও যুক্ত হতে পারে।

ফুল সার্ভিস ও লো-কস্ট ক্যারিয়ার—দুই বাজার, দুই কৌশল

বাংলাদেশের আকাশ পরিবহনে ফুল সার্ভিসের পাশাপাশি শক্তিশালী লো-কস্ট ক্যারিয়ারের শূন্যতা রয়েছে। এক শ্রেণীর যাত্রী ব্যাগেজ, খাবার, সংযোগ, লাউঞ্জ ও প্রিমিয়াম সেবা চান; আবার অনেকের প্রধান চাহিদা সাশ্রয়ী ভাড়া, সময়মতো ফ্লাইট ও প্রয়োজনমাফিক অতিরিক্ত সেবা কেনার সুযোগ। একই গ্রুপের অধীনে দুটি আলাদা ব্যবসায়িক মডেল থাকলে বাজারের ভিন্ন দুই শ্রেণীকে লক্ষ্য করা সম্ভব।

প্যাসেঞ্জার এয়ারলাইনসের পাশাপাশি কার্গো এয়ারলাইনস

দেশের এভিয়েশন অর্থনীতিতে এয়ার কার্গোর বড় সম্ভাবনা রয়েছে। গার্মেন্টস, ওষুধ, সামুদ্রিক খাদ্য, পচনশীল পণ্য, উচ্চ মূল্যের ইলেকট্রনিকস ও ই-কমার্স পণ্যের জন্য দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য আকাশপথে পরিবহনের চাহিদা বাড়ছে। তাই এভিয়েশন গ্রুপের আওতায় কার্গো এয়ারলাইনস বা ফ্রেইটার অপারেশন গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। ইউএস-বাংলার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কার্গো বা ফ্রেইটার অপারেশনের পাশাপাশি এয়ারক্রাফট মেইনটেন্যান্স, প্রশিক্ষণ ও ফ্লাইট ক্যাটারিং ব্যবসার কথাও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বেলি কার্গো, ফ্রেইটার ও লজিস্টিকস—এ তিন স্তরকে সমন্বিতভাবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।

কোল্ড চেইন: বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুযোগ

বাংলাদেশে কোল্ড চেইন এভিয়েশনের সম্ভাবনা রয়েছে। খাদ্য, মাছ, সামুদ্রিক পণ্য, ওষুধ, টিকা ও তাপমাত্রা-সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত গুদাম, হিমায়িত ট্রাক, শীতল কক্ষ ও বিশেষ হ্যান্ডলিং। বিমানবন্দরে কার্গো ও কোল্ড চেইন হাব বাংলাদেশকে আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে রূপ দিতে পারে। ইউএস-বাংলার পরিকল্পনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে রিজিওনাল হাব করার লক্ষ্য রয়েছে।

এভিয়েশন একাডেমি: বিমান কেনার পাশাপাশি প্রফেশনাল কর্মী তৈরি: বিমান কেনা গেলেও দক্ষ এভিয়েশন পেশাজীবী দ্রুত তৈরি করা যায় না। তাই এভিয়েশন গ্রুপের গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হতে পারে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন একাডেমি। এখানে পাইলট, কেবিন ক্রু, গ্রাউন্ড সার্ভিস, সিকিউরিটি, রেভিনিউ ও রিজার্ভেশন ব্যবস্থাপনা, প্রকিউরমেন্ট, অপারেশনস, রিস্ক ও সেফটি ম্যানেজমেন্ট, এয়ারপোর্ট, কার্গো এবং ট্রাভেল-ট্যুরিজম প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ এখনো বিদেশী প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক মানের একাডেমি নিজস্ব জনবল তৈরির পাশাপাশি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিক্ষার্থী আকর্ষণ করে এভিয়েশন শিক্ষা রফতানির নতুন খাতও তৈরি করতে পারে।

ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমি, সিমুলেটর ও এমআরও

এয়ারক্রাফট পরিচালনায় মেইনটেন্যান্স ব্যয়বহুল ও গুরুত্বপূর্ণ। নিজস্ব এমআরও সক্ষমতা তৈরি হলে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিমান গ্রাউন্ডেড থাকার সময় ও বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ কমতে পারে। এর সঙ্গে ইঞ্জিনিয়ারিং একাডেমি, সিমুলেটর ও টেকনিক্যাল ট্রেনিং যুক্ত হলে প্রশিক্ষণ থেকে কর্মসংস্থান এবং পরে আন্তর্জাতিক এয়ারক্রাফট রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ টেকনিক্যাল ভ্যালু চেইন তৈরি হবে।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও ইনফ্লাইট ক্যাটারিং

বিমান পরিচালনায় গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে যাত্রী ব্যবস্থাপনা, ব্যাগেজ, র‍্যাম্প কার্যক্রম, উড়োজাহাজ পরিষ্কার, পুশব্যাক, লোডিং-আনলোডিং ও টার্নঅ্যারাউন্ড সমন্বয় রয়েছে। একইভাবে নিজস্ব ইনফ্লাইট ক্যাটারিং ব্যবস্থা এয়ারলাইনসের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি দেশী-বিদেশী অন্যান্য এয়ারলাইনসকে সেবা দিয়ে খরচের কেন্দ্রকে আয়ের উৎসে রূপ দিতে পারে।

ওটিএ ও ডিজিটাল এভিয়েশন

আগামী দিনে বিমান ব্যবসা শুধু সেলস কাউন্টার বা ট্র্যাভেল এজেন্ট-নির্ভর থাকবে না। অনলাইন ট্র্যাভেল এজেন্সি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন, ডায়নামিক প্যাকেজিং, হোটেল বুকিং, বিমানবন্দর যাতায়াত সুবিধা (এয়ারপোর্ট ট্রান্সফার), ইন্স্যুরেন্স, ট্যুর, গাড়ি ভাড়া—সবকিছুকে একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেমের মধ্যে আনা সম্ভব।

হলিডে প্যাকেজ: বিমান থেকে পর্যটন

বাংলাদেশে এভিয়েশন ও পর্যটনের বড় সংযোগ তৈরি হতে পারে কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, সিলেট, সুন্দরবন, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গন্তব্য ঘিরে। এয়ারলাইনসের সঙ্গে হোটেল, পরিবহন, ট্যুর অপারেটর ও হলিডে প্যাকেজ যুক্ত হলে সম্পূর্ণ পর্যটন অভিজ্ঞতা বিক্রি করা সম্ভব।

এয়ারপোর্ট ইকোনমি: আসল বড় স্বপ্ন

এয়ারপোর্ট ইকোনমিতে বিমানবন্দর শুধু রানওয়ে-টার্মিনাল নয়; এর চারপাশে হোটেল, কনভেনশন সেন্টার, লজিস্টিকস পার্ক, কার্গো ভিলেজ, গুদাম, এমআরও, ক্যাটারিং, খুচরা ব্যবসা, অফিস, কেনাকাটা, বিনোদন ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠে ‘এয়ারপোর্ট সিটি’ তৈরি হতে পারে। ইউএস-বাংলার এভিয়েশন গ্রুপ পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নেও শক্তিশালী এয়ারপোর্ট ইকোনমি গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটকে এভিয়েশনভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুললে এগুলো প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে। সরকারও ২০২৬ সালে দীর্ঘমেয়াদি সিভিল এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন শুরু করেছে। তবে এভিয়েশন গ্রুপের সাফল্যে সুশাসন, নিরাপত্তা, আর্থিক শৃঙ্খলা, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট, সম্মতি ও পরিচালন দক্ষতা জরুরি। মূলধননিবিড়, নিয়ন্ত্রিত এ শিল্পে প্রতিটি সহযোগী ব্যবসার পৃথক পরিকল্পনা, জবাবদিহি, মুনাফার লক্ষ্য ও নিরাপত্তা কাঠামো থাকতে হবে; সেফটি-সিকিউরিটিতে কস্ট-কাটিংয়ের সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

ইউএস-বাংলা পরিকল্পনা অনুযায়ী এভিয়েশন গ্রুপ গড়ে তুলতে পারলে এর ইতিবাচক প্রভাব দেশের অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। একটি এয়ারক্রাফটের সঙ্গে পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, গ্রাউন্ড স্টাফ, নিরাপত্তাকর্মী, ক্যাটারার, ট্রাভেল এজেন্ট, হোটেল, ট্যুর অপারেটর, কার্গো হ্যান্ডলার, সফটওয়্যার পেশাজীবীসহ অসংখ্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান যুক্ত হয়। অর্থাৎ একটি এয়ারক্রাফট নিজেই একটি অর্থনৈতিক মাল্টিপ্লায়ার। তাই ২১টি নতুন বোয়িং যুক্ত করার পরিকল্পনাকে শুধু বহর সম্প্রসারণ হিসেবে দেখলে পুরো সম্ভাবনাটি ধরা পড়ে না। এটি এয়ারলাইনস, কার্গো, পর্যটন, প্রশিক্ষণ, এমআরও, প্রকৌশল, ক্যাটারিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস, ডিজিটাল ভ্রমণ ও বিমানবন্দর অর্থনীতিকে যুক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন ইকোসিস্টেমের ভিত্তি হতে পারে। এ সম্ভাবনা বাস্তবায়নে সরকার, সিএএবি, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, আর্থিক ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশের আসল অর্জন হবে তখনই, যখন বিমান আনার পাশাপাশি এভিয়েশনের জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি, মেইনটেন্যান্স, লজিস্টিকস ও পর্যটনসেবার বড় অংশ দেশেই তৈরি হবে।

আরও