এভিয়েশন খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা শুধু যাত্রী পরিবহন কিংবা নতুন রুটে সীমাবদ্ধ নয়। বড় সুযোগ রয়েছে কার্গো পরিবহন, উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত বা এমআরও এবং এভিয়েশন ঘিরে বিভিন্ন সহায়ক সেবায়। এসব খাত একসঙ্গে বিকশিত হলে বিমানবন্দরকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের বড় একটি অংশ দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি অবদান রাখবে। নতুন অবকাঠামোর সঙ্গে তাই যাত্রীসেবার পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ এভিয়েশন অর্থনীতি গড়ে তোলার সুযোগও সামনে এসেছে।
এর প্রথম বড় ক্ষেত্র এয়ার কার্গো। শাহজালাল বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের বার্ষিক কার্গো বাছাই ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা ধরা হয়েছে ৫ লাখ টন। তৈরি পোশাক, ওষুধ, পচনশীল পণ্য, সামুদ্রিক খাদ্য ও ই-কমার্স পণ্যকে এয়ার কার্গোর অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে কার্গোকে শুধু বিমানবন্দরে পণ্য ওঠানামার কার্যক্রম না দেখে রফতানিমুখী একটি এয়ার-লজিস্টিকস ব্যবস্থায় রূপ দেয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে শুধু কার্গো টার্মিনালের ধারণক্ষমতা বাড়লেই এ বাজার বড় হবে না। এজন্য ডিজিটাল কার্গো কমিউনিটি, আগাম স্লট বুকিং এবং কাস্টমস প্রি-ক্লিয়ারেন্সের মতো ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি কোল্ড চেইন, বন্ডেড লজিস্টিকস, এক্সপ্রেস জোন ও নিরাপদ ট্রাক প্রবেশের অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের কার্গো ধারণক্ষমতার পাশাপাশি কার্গো ফ্লাইট এবং আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্টের সুযোগ তৈরির কথাও রয়েছে। অর্থাৎ কাস্টমস, সংরক্ষণ, স্থল যোগাযোগ ও এয়ারলাইনসের সক্ষমতা—সবগুলোকে একই ব্যবস্থায় আনতে পারলেই কার্গো খাত বড় অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হতে পারে।
দ্বিতীয় বড় সম্ভাবনা রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও ওভারহল বা এমআরও খাতে। শুরুতে স্থানীয় বহর ও বাংলাদেশে আসা বিদেশী উড়োজাহাজের জন্য লাইন ও বেস মেইনটেন্যান্স সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় সনদ ও দক্ষতা অর্জনের পর পরবর্তী পর্যায়ে চাকা, ব্রেক, এভিওনিকস, ইন্টেরিয়র, কম্পোজিটস এবং যন্ত্রাংশের যৌথ মজুদের মতো সেবা যুক্ত করা যেতে পারে। এরপর চাহিদা ও সক্ষমতা তৈরি হলে আঞ্চলিক হেভি মেইনটেন্যান্সের দিকে যাওয়া সম্ভব। এজন্য হ্যাঙ্গার, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি এবং নির্বাচিত ন্যারো-বডি উড়োজাহাজের সি-চেক সক্ষমতা তৈরির কথা বলা হয়েছে।
এমআরও খাতের বড় অর্থনৈতিক গুরুত্ব বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে। বিদেশে রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট সেবায় যে অর্থ ব্যয় হয়, তার একটি অংশ দেশে ধরে রাখা সম্ভব হলে স্থানীয় বহরের পরিচালন দক্ষতাও বাড়বে। এরপর আন্তর্জাতিক মান ও সনদ নিশ্চিত করা গেলে আঞ্চলিক এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে সেবা রফতানির সুযোগও তৈরি হতে পারে। লক্ষ্য তাই এক ধাপে বড় শিল্প গড়ে তোলা নয়; স্থানীয় চাহিদা দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ করা।
কার্গো ও এমআরওর বাইরে এভিয়েশনকে ঘিরে রয়েছে বিস্তৃত সহায়ক সেবার বাজার। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাটারিং ও সরবরাহ, জ্বালানি ও হাইড্র্যান্ট ব্যবস্থা, গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট রক্ষণাবেক্ষণ, ক্রু ও অপারেশনস সেবা, এভিয়েশন তথ্যপ্রযুক্তি ও ডেটা, অর্থায়ন ও বীমা, নিরাপত্তা ও স্ক্রিনিং এবং লজিস্টিকস ও গুদামজাতকরণ। এসব খাত আলাদাভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
একটি এভিয়েশন সার্ভিস ক্লাস্টার গড়ে তুলতে অবশ্য শুধু বাজারের ওপর নির্ভর করলে হবে না। প্রয়োজন আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সনদ, কাস্টমস সুবিধা, বিনিয়োগ সহায়তা, স্থানীয় সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য এবং বড় প্রাথমিক ক্রেতা বা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি। কোন সেবা দেশেই তৈরি করা যাবে, কোথায় আন্তর্জাতিক অংশীদার প্রয়োজন এবং কোন খাতে বিনিয়োগ আগে দরকার—এগুলোও ধাপে ধাপে নির্ধারণ করতে হবে।
এ তিন খাত আবার পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। কার্গো কার্যক্রম বাড়লে লজিস্টিকস, নিরাপত্তা, গুদামজাতকরণ ও গ্রাউন্ড সার্ভিসের চাহিদা বাড়বে। উড়োজাহাজ চলাচল বাড়লে এমআরও, যন্ত্রাংশ ও গ্রাউন্ড সাপোর্ট সেবার বাজারও বড় হবে। এর সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি, বীমা, জ্বালানি ও ক্যাটারিং যোগ হলে বিমানবন্দর ঘিরে একটি বড় শিল্পগুচ্ছ তৈরি হতে পারে।
বাস্তবায়নেও ধাপে ধাপে এগোনোর পরিকল্পনা রয়েছে। ১৮-৩৬ মাসের পর্যায়ে কার্গো কমিউনিটি প্লাটফর্ম চালু, লাইন ও বেস এমআরও সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এভিয়েশন সার্ভিস ক্লাস্টার সক্রিয় করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এরপর তিন-সাত বছরে আঞ্চলিক হেভি এমআরও ও কার্গো ট্রান্সশিপমেন্ট সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
এ অর্থনীতির সাফল্য তাই শুধু কত যাত্রী বা কত উড়োজাহাজ চলাচল করছে তা দিয়ে মাপা যাবে না। কত এমআরও ব্যয় দেশে রাখা যাচ্ছে, কার্গোর পরিমাণ ও মূল্য কত বাড়ছে এবং কত বেসরকারি মূলধন এ খাতে আসছে—এসবও গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কার্গো, এমআরও ও সহায়ক সেবাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলে এভিয়েশন খাতের অর্থনৈতিক পরিধি বিমানবন্দরের সীমানার অনেক বাইরে যেতে পারে। তখন বিমান চলাচল শুধু মানুষ ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যম থাকবে না; এর চারপাশে তৈরি হবে নতুন ব্যবসা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও সেবা রফতানির বাজার।