আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর

আকাশপথে বহির্বিশ্বের সঙ্গে দেশের তিন প্রবেশদ্বার

রাজধানীর কুর্মিটোলায় অবস্থিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের প্রধান ও সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ঢাকার কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বিমানবন্দরটির আয়তন ৮০২ হেক্টর।

ঢাকার শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী—বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের প্রধান তিন কেন্দ্র। এর সঙ্গে কক্সবাজার বিমানবন্দরও আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতিতে রয়েছে। দেশের অর্থনীতি, প্রবাসী যোগাযোগ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এ বিমানবন্দরগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

শাহজালাল: দেশের প্রধান আকাশপথের কেন্দ্র

রাজধানীর কুর্মিটোলায় অবস্থিত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বাংলাদেশের প্রধান ও সর্ববৃহৎ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ঢাকার কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত বিমানবন্দরটির আয়তন ৮০২ হেক্টর। এটি পরিচালনা করে বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)।

১৯৮০ সালে তেজগাঁও থেকে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের কার্যক্রম স্থানান্তরের পর শাহজালাল দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে যাত্রা শুরু করে। শুরুতে এর নাম ছিল ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। পরে প্রখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহজালালের নামে এর নামকরণ হয়। বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক কোড ডিএসি।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, এয়ার অ্যাস্ট্রা, নভোএয়ার ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের প্রধান পরিচালনা কেন্দ্র হিসেবে বিমানবন্দরটি ব্যবহৃত হয়। আন্তর্জাতিক যাত্রী ও ফ্লাইট চলাচলের দিক থেকেও এটি দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত বিমানবন্দর।

শাহজালাল বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ যাত্রীদের জন্য পৃথক টার্মিনাল রয়েছে। আন্তর্জাতিক টার্মিনাল-১ ও ২ ছাড়াও রয়েছে অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল, ভিভিআইপি টার্মিনাল ও পণ্য পরিবহন টার্মিনাল। সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে নির্মিত তৃতীয় টার্মিনাল চালু হলে যাত্রীসেবা ও উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। বিমানবন্দরে লাউঞ্জ, ব্যাংকিং, তারহীন ইন্টারনেট, উড়োজাহাজ চলাচলের তথ্য প্রদর্শন, খাবার ও অন্যান্য সেবাও রয়েছে।

শাহ আমানত: বন্দরনগরীর আন্তর্জাতিক সংযোগ

চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত শাহ আমানত দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গন্তব্যের যোগাযোগে এ বিমানবন্দর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সরকার বিমানবন্দরটি নির্মাণ করে। ১৯৯০ সালে এটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রূপ নেয়। ২০০৫ সালে এর নাম পরিবর্তন করে ‘শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’ রাখা হয়। বিমানবন্দরটির আন্তর্জাতিক কোড সিজিপি (CGP)।

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কাছাকাছি হওয়ায় আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচলের পাশাপাশি ব্যবসায়িক যোগাযোগেও এর গুরুত্ব রয়েছে। যাত্রীদের জন্য এখানে চলন সহায়ক চেয়ার, বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা, মুদ্রা বিনিময়, হোটেল বুকিং, বিশুদ্ধ পানি, নামাজের স্থান, নিরাপত্তা, তারহীন ইন্টারনেট, উড়োজাহাজ চলাচলের তথ্য প্রদর্শন ও লাগেজ মোড়ানোর সুবিধা রয়েছে। এছাড়া শুল্কমুক্ত পণ্যের দোকানও রয়েছে।

ওসমানী: সিলেটের প্রবাসী যোগাযোগের সেতু

সিলেটের ওসমানী দেশের তৃতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সিলেটের প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের মানুষের আন্তর্জাতিক যাতায়াতে এ বিমানবন্দরের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সিলেটের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এটি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৪-৪৫ সালে বিমানবন্দরটি নির্মাণ করা হয়। প্রথমে এটি ‘সিলেট বেসামরিক বিমানবন্দর’ নামে পরিচিত ছিল। পরে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএজি ওসমানীর সম্মানে এর নামকরণ হয়। ২০০২ সালে বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক মর্যাদা পায়। এর আন্তর্জাতিক কোড জেডওয়াইএল (ZYL)।

ওসমানী বিমানবন্দরে চলন সহায়ক চেয়ার, প্রাথমিক চিকিৎসা, মুদ্রা বিনিময়, হোটেল বুকিং, বিশুদ্ধ পানি, নামাজের স্থান, নিরাপত্তা, তারহীন ইন্টারনেট, উড়োজাহাজ চলাচলের তথ্য প্রদর্শন ও লাগেজ মোড়ানোর সুবিধা রয়েছে।

কক্সবাজার: আন্তর্জাতিক আকাশপথের নতুন সম্ভাবনা

দেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের পরিধি বাড়ানোর প্রস্তুতিতে রয়েছে কক্সবাজার বিমানবন্দর। পর্যটন নগরী কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর লক্ষ্যে রানওয়ে সম্প্রসারণ, নতুন আন্তর্জাতিক যাত্রী টার্মিনাল নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ এগিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি থাকলেও নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এখনো চালু হয়নি। তবে বিমানবন্দরটি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। বেবিচক সূত্রে জানা গেছে, নতুন টার্মিনাল ও সম্প্রসারিত রানওয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ পরিচালনার সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।

বর্তমানে এখান থেকে অভ্যন্তরীণ যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালিত হয়। আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু হলে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্রটির সঙ্গে বিদেশী পর্যটক ও প্রবাসীদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বাড়বে। এতে পর্যটন, হোটেল, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো শুধু যাত্রী ওঠানামার স্থান নয়; এগুলো অর্থনীতি, প্রবাসী যোগাযোগ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ঢাকার শাহজালাল যেখানে দেশের প্রধান আকাশপথের কেন্দ্র, চট্টগ্রামের শাহ আমানত সেখানে বন্দরনগরীর আন্তর্জাতিক যোগাযোগের দ্বার। সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দর প্রবাসী জনগোষ্ঠীর সঙ্গে দেশের সম্পর্ককে আরো সহজ করেছে। আর কক্সবাজার আন্তর্জাতিক কার্যক্রম শুরু করলে দেশের পর্যটননির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক আকাশপথের সংযোগ আরো বিস্তৃত হবে।

আরও