অনেক বছর ধরেই দেশের ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে আমরা এএএ রেটিং পেয়ে আসছি। একই সঙ্গে দেশের একমাত্র ব্যাংক হিসেবে ব্র্যাক ব্যাংক বিশ্বখ্যাত এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল ও মুডি’স রেটিংস থেকেও দেশের সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিং অর্জন করেছে। ক্রেডিট রেটিং একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, দায় পরিশোধের সামর্থ্য এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকার ক্ষমতার স্বাধীন মূল্যায়ন। এ মূল্যায়নে করপোরেট সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সম্পদের গুণগত মান, মূলধন পর্যাপ্ততা, তারল্য এবং পরিচালন দক্ষতার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক রেটিং প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে এ রেটিং প্রদান করে বলেই এগুলো গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য।
ভালো রেটিং অর্জনের পূর্বশর্ত হলো শক্তিশালী করপোরেট সুশাসন, কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিচক্ষণ সম্পদ বণ্টন এবং দৃঢ় মূলধন ভিত্তি। এসব সূচকে ধারাবাহিকভাবে ভালো করায় আমরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—উভয় পর্যায়েই সর্বোচ্চ রেটিং ধরে রাখতে পেরেছি। এ অর্জনের মূল ভিত্তি আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ব্র্যাক ব্যাংক সুশাসন, স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং সম্পদের গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে কোনো আপস করেনি। পরিবর্তিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও আমরা সেই নীতিতে অটল থেকেছি। আন্তর্জাতিক শীর্ষ রেটিং সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন সেই ধারাবাহিকতারই স্বীকৃতি।
এ রেটিং ধরে রাখার জন্য বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
যেকোনো ব্যাংকের জন্য ট্রিপল এ রেটিং অর্জনের চেয়ে তা ধরে রাখা বেশি কঠিন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সম্পদের গুণগত মান বজায় রাখা। অর্থাৎ আমানতকারীদের অর্থ নিরাপদ ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা। কারণ বিনিয়োগের মান ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার প্রভাব সরাসরি ব্যাংকের মূলধন, মুনাফা ও আমানতকারীদের আস্থার ওপর পড়ে। এ কারণে কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বৈচিত্র্যময় ঋণ পোর্টফোলিও এবং শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্র্যাক ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে এসব বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমাদের টিয়ার-১ মূলধন অন্যতম শক্তিশালী, যা সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় বাড়তি সক্ষমতা দেয়। বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে আমাদের নিজস্ব মূলধন (টিয়ার-১ ক্যাপিটাল) সবচেয়ে বেশি এবং শক্তিশালী।
তবে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের বাইরেও কিছু বিষয় রয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি বা ব্যবসায়িক মন্দা ভালো গ্রাহকদেরও আর্থিক চাপে ফেলতে পারে, যার প্রভাব ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতে পড়ে। তাই ব্যাংকের নিজস্ব সক্ষমতার পাশাপাশি একটি স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশও উচ্চ ক্রেডিট রেটিং ধরে রাখার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রিপল এ রেটিং কি তহবিল সংগ্রহের খরচ কমাতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে বা ব্যবসা সম্প্রসারণে বাস্তব কোনো সুবিধা দিচ্ছে?
ক্রেডিট রেটিং যদি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে দেয়া হয়, তাহলে তা অবশ্যই বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ায়, তহবিল সংগ্রহ সহজ করে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। উন্নত অর্থনীতিতে উন্নত ক্রেডিট রেটিংয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো কম খরচে অর্থায়নের সুযোগ পায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও বেশি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেশীয় রেটিং ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। কারণ আমরা অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, এ স্থানীয় রেটিংয়ে সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা অনেক ব্যাংকও গ্রাহকের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে দেশীয় রেটিংয়ের প্রতি বাজারের আস্থা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক বিনিয়োগকারী আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর মূল্যায়নকে বেশি গুরুত্ব দেন।
আরেকটি বিষয় হলো আমাদের দেশে ক্রেডিট রেটিং সম্পর্কে সাধারণ গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের সচেতনতা এখনো সীমিত। রেটিংয়ের প্রকৃত গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং রেটিং প্রক্রিয়াকে আরো বিশ্বাসযোগ্য ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করা গেলে এটি তহবিল সংগ্রহ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বাজার শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তাই সবচেয়ে জরুরি হলো এমন একটি রেটিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যার প্রতি বাজারের সবার আস্থা থাকবে।
আপনার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের বর্তমান অবস্থা কী? ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে কী ধরনের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করছেন?
২০২৫ সালের শেষে আমাদের খেলাপি ঋণের হার ছিল মোট ঋণের মাত্র ২.২৭ শতাংশ। ব্র্যাক ব্যাংক দেশের সবচেয়ে কম খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোর একটি। করপোরেট সুশাসনের কারণে আমরা সবসময় খেলাপি ঋণের প্রকৃত তথ্য স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ করি এবং আশা করছি, চলতি বছর এ হার আরো কমবে।
ঋণের গুণগত মান নিশ্চিত করতে আমরা ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, পরিশোধক্ষমতা ও ব্যবসার ঝুঁকি গভীরভাবে মূল্যায়ন করি। একই সঙ্গে কোনো একক খাত বা বড় কয়েকজন গ্রাহকের ওপর নির্ভর না করে করপোরেট, কমার্শিয়াল, এসএমই, রিটেইল ও কৃষি খাতে বৈচিত্র্যময় ঋণ পোর্টফোলিও গড়ে তুলেছি। এ ঝুঁকি বৈচিত্র্যই আমাদের সম্পদের মান ধরে রাখতে সহায়তা করেছে।
আগামী দিনের ব্যাংকিং হবে প্রযুক্তিনির্ভর। এক্ষেত্রে আপনার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল কী?
আমাদের লক্ষ্য সব ধরনের ব্যাংকিং সেবা প্রযুক্তিনির্ভর করা, যাতে গ্রাহকরা শাখায় না গিয়েই সেবা নিতে পারেন। এরই মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহক ‘আস্থা’ অ্যাপের মাধ্যমে ব্যাংকিং করছেন। সাইবার নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি মাল্টিফ্যাক্টর অথেনটিকেশন, ডেটা এনক্রিপশন, ডেটা লস প্রিভেনশন এবং SOC, SIEM ও SOAR প্রযুক্তির মাধ্যমে রিয়েল টাইম পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সব নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অনুসরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান দিয়ে নিয়মিত নিরাপত্তা মূল্যায়নও করানো হয়।
তবে ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহারে বিদ্যমান বিধিনিষেধের কারণে আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পুরো ব্যাংক খাতের জন্য একটি ডেডিকেটেড ফাইন্যান্সিয়াল ক্লাউড গড়ে উঠলে এআই, মেশিন লার্নিং, জালিয়াতি শনাক্তকরণ ও ঋণঝুঁকি বিশ্লেষণের মতো প্রযুক্তি আরো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতকে আন্তর্জাতিক মানে আরো শক্তিশালী করতে সবচেয়ে জরুরি সংস্কার কী?
ব্যাংকগুলোর মূলধন ভিত্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সাইবার নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি পুরো খাতের জন্য একটি সমন্বিত প্রযুক্তি অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রকদেরও বাস্তবসম্মত, ধারাবাহিক ও বাজার-সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি প্রণয়ন করতে হবে। নীতি প্রণয়নে সরকার, নিয়ন্ত্রক, ব্যাংক ও গ্রাহকদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা গেলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ উভয়ই বাড়বে।
আগামী পাঁচ বছরে আপনার ব্যাংকের প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার কী?
আমাদের প্রধান লক্ষ্য ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় আনা এবং তাদের আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি করা। আমরা বিশ্বাস করি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। আগামী পাঁচ বছরে ব্র্যাক ব্যাংককে দেশের সবচেয়ে ইমপ্যাক্টফুল ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে আমাদের বাজার হিস্যা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, আমদানি-রফতানিসহ ব্যাংকিং কার্যক্রম আরো ডিজিটাল করা এবং ভবিষ্যৎ ব্যাংকিংয়ের উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও আমাদের কৌশলগত অগ্রাধিকার।