দেশে স্মার্ট লিভিং আইটেমের আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে যেসব প্রতিষ্ঠানের অবদান রয়েছে, তাদের মধ্যে আকিজ বশির গ্রুপ অন্যতম। প্রতিষ্ঠানটির স্মার্ট লিভিং আইটেমের যাত্রা শুরু হয় প্রায় ২১ বছর আগে; পার্টিকেল বোর্ডের মাধ্যমে। এরপর টাইলস ও সিরামিকসের নানা পণ্য নিয়ে স্মার্ট লিভিং আইটেম ব্যবসার পরিধি বাড়াতে থাকে তারা।
আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজ উদ্দিনের মৃত্যুর পর এর ব্যবসায়িক উত্তরাধিকার হন তার ১০ ছেলে। তাদের হাত ধরে সেই ব্যবসার একটি বড় অংশ নিয়ে ২০২৩ সালে যাত্রা শুরু করে ‘আকিজ বশির গ্রুপ’। বাবার নাম ও নিজের নাম যুক্ত করে নতুন এ গ্রুপের নামকরণ করেন আকিজ উদ্দিনের ছেলে শেখ বশির উদ্দিন।
গ্রুপের বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস অপারেশনের ডিরেক্টর মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মনে করেন, ‘আকিজ-বশির গ্রুপ সম্পর্কে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, আকিজ বশির গ্রুপের ডিএনএ হচ্ছে “এভার এক্সপ্যানশন” বা “সর্বদা বিস্তৃতকরণ”। আরেকটি বিষয় হলো, আকিজ বশির গ্রুপের কোনো আয় কোম্পানির বাইরে যায় না। এখানে আয়কে আবার প্রতিষ্ঠানে পুনর্বিনিয়োগ করা হয়। নিজেদের আয় আবার নিজেদের জন্যই বিনিয়োগ করে ব্যবসার ক্রমাগত সম্প্রসারণের এই ডিএনএ অনুসরণ করার ফলেই আজ দেশের শিল্প-অর্থনীতির বড় অংশজুড়ে রয়েছে আকিজ বশির গ্রুপের নাম।’
আকিজ বশির গ্রুপের স্মার্ট লিভিং পণ্যের যাত্রার শুরু ২০০১ সালে। ওই বছর তারা বাজারে আনে পার্টিকেল বোর্ড। এজন্য গড়ে তোলা হয় আকিজ পার্টিকেল বোর্ড মিলস লিমিটেড (এপিবিএমএল)। বাংলাদেশে প্রথম মেলামাইন বোর্ডের বাজারজাত শুরু হয় এপিবিএমএলের হাত ধরেই। এছাড়া এ খাতের আরো অনেক পণ্য যেমন—কিচেনে ব্যবহারোপযোগী ইউভি বোর্ড, সিনক্রোনাইজ বোর্ড ও ম্যাট বোর্ডও দেশে প্রথমবারের মতো তারাই তৈরি করে।
আকিজ বশির গ্রুপের পার্টিকেল বোর্ডের পুরনো কারখানাটির অবস্থান মানিকগঞ্জে। বাজারে ক্রমাগত চাহিদা বাড়ার কারণে ২০১৭ সালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে চালু করা হয় দ্বিতীয় ইউনিট, যা বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম পার্টিকেল বোর্ড কারখানা। বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে এ কারখানায় পার্টিকেল বোর্ড ছাড়াও অন্যান্য পণ্য যেমন—দরজা, প্লাইউড, এইচপিএল বোর্ড, ইউভি বোর্ড, অ্যাক্রেলিক বোর্ড, এমডিএফ বোর্ড ইত্যাদি উৎপাদন করা হচ্ছে।
সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে আকিজ বশির গ্রুপ প্রবেশ করে টাইলসের বাজারে। ‘আকিজ সিরামিকস’-এর মাধ্যমে এ ব্যবসা শুরু করে তারা, যা বর্তমানে আকিজ বশির গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত।
দেশে একসময় ভবনের অভ্যন্তরীণ সজ্জার জন্য মোজাইক ব্যবহার হতো সবচেয়ে বেশি। কিন্তু অধিকতর নান্দনিকতা ও ব্যবহার উপযোগিতার কারণে সবখানে এখন টাইলসের ব্যবহার অনেক বেড়ে গেছে। শুরুর দিকে টাইলস আসত বিদেশ থেকে। কিন্তু বর্তমানে দেশেই আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন টাইলস উৎপাদন হচ্ছে। আর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আকিজ বশির গ্রুপ অন্যতম।
টাইলসে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সময়ে বাথওয়্যার ব্যবসায় প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠানটি। বাজারে তাদের সিরামিকস পণ্য মূলত ROSA ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত। রোসা ব্র্যান্ডের বেসিন, কমোড, ফসেট, বাথওয়্যার আইটেম ইত্যাদি ইউরোপেও রফতানি হচ্ছে। জনপ্রিয়তার কারণে গত দুই বছর রোসা ব্র্যান্ডের বিভিন্ন পণ্য যেমন—ফসেট, সিংক, গিজার ইত্যাদি বাজার অংশীদারত্বের হিসাবে শীর্ষস্থান দখল করে রয়েছে।
ব্যবসায়িক সাফল্য ও ক্রমাগত প্রবৃদ্ধির এক পর্যায়ে টেবিলওয়্যার ব্যবসায় প্রবেশ করে আকিজ সিরামিকস। গৃহস্থালি বা বাণিজ্যিক যেকোনো ডাইনিং স্পেসে সুলভমূল্যে দেশীয় পণ্য সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করে টেবিলওয়্যার শাখা। টেবিলওয়্যার নির্মাণে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কারখানা বর্তমানে আকিজ সিরামিকসের। ইউরোপের বাজারে এ কারখানায় উৎপাদিত দেশী ও ইউরোপিয়ান ব্র্যান্ডের নানা পণ্য রফতানি করছে আকিজ বশির গ্রুপ।
স্মার্ট লিভিং আইটেমের ব্যবসায় সাফল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে ছোট-বড় বেশকিছু প্রতিবন্ধকতাও মোকাবেলা করতে হয়। যেমন কারখানা করার ক্ষেত্রে বড় জায়গা নিশ্চিত করা, ট্রেড লাইসেন্স পাওয়া, পরিবেশ রক্ষা, এনার্জি (গ্যাস, কারেন্ট) রিসোর্স ও দক্ষ লোকবলের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আবার নান্দনিক ডিজাইনের বোর্ড, বাথওয়্যার কিংবা টেবিলওয়্যার তৈরিতে দক্ষ লোকবলের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ এ ধরনের পণ্যের গুণগত মান ও নান্দনিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আকিজ বশির গ্রুপের স্মার্ট লিভিং আইটেমের বেশির ভাগ কারখানা পরিচালিত হয় অটোমেশন প্রযুক্তিতে। প্রায় সব পণ্যই তৈরি করা হয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করে। যেমন— পার্টিকেল বোর্ডের কারখানায় ‘প্রেসিং’ পদ্ধতির বদলে ব্যবহার করা হয় ‘কন্টিনিউয়াস রোল’ পদ্ধতি। টাইলস ও স্যানিটারি পণ্য উৎপাদনেও অটোমেশনকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে হাই প্রেসার কাস্টিং সিস্টেম, রোবটিক গ্লেজিং সিস্টেম, এলপিডিসি ও সম্পূর্ণ অটোমেটেড ইলেক্ট্রোপ্লেটিংয়ের মতো প্রযুক্তি।
প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দেয়ার একটি উদাহরণ হতে পারে কারখানার যন্ত্রপাতির জন্য আকিজ বশিরের বিনিয়োগ। এপিবিএমএল কারখানায় ইউভি বোর্ড তৈরির যে মেশিনটি রয়েছে, সেটির মূল্যই প্রায় ২০ কোটি টাকা।
আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিদেশী পণ্যের চেয়ে ৩০-৪০ শতাংশ কম দামে নান্দনিক ও মানসম্পন্ন দেশী পণ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে আকিজ বশির গ্রুপ।
মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মনে করেন, ‘প্রযুক্তিগত আধুনিকতা রক্ষা করতে গিয়ে অনেক বেশি বিনিয়োগ করতে হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে মানসম্পন্ন পণ্য দেশেই পাওয়া যাচ্ছে। এতে করে আকিজ বশির গ্রুপ গ্রাহকের ভরসার জায়গা তৈরির পাশাপাশি দেশ-বিদেশে ব্যবসার প্রবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে।’