চলতি বাজেটে (২০২৪-২৫ অর্থবছর) রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার জোগান দেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ অর্থের ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা আসবে প্রত্যক্ষ কর (আয়কর ও ভ্রমণ কর) থেকে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৩৭ শতাংশ। বাকি দুই-তৃতীয়াংশ বরাবরের মতোই আহরণ হবে পরোক্ষ কর (মূসক ও শুল্ক) থেকে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, রাজস্ব বাড়াতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বাড়াতে হবে প্রত্যক্ষ কর।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের কর রাজস্বের পরিমাণ জিডিপির দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সে অনুসারে সেপ্টেম্বর শেষে ৯৫ হাজার ৬১০ কোটি, ডিসেম্বর শেষে ২ লাখ ১৫ হাজার ১২০ কোটি, মার্চ শেষে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৬৩০ কোটি ও জুন শেষে আহরণ করতে হবে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ৫০ কোটি টাকার কর রাজস্ব।
এদিকে পরোক্ষ কর খাতে আমদানি-রফতানি পর্যায়ে শুল্ক করের লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ২৬ শতাংশ। জাতীয় পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর ও অন্যান্য খাতে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ৩৭ শতাংশ। সব মিলিয়ে পরোক্ষ কর থেকে আহরণের লক্ষ্য ৬৩ শতাংশ রাজস্ব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতার প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি। বছরে চারবার জ্বালানির মূল্য বাড়বে। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি শুল্কে যে ছাড় দেয়া হয়েছে, তা আমদানিকারকদের পকেটে ঢুকে যাবে। এটা থেকে খুব বেশি সুফল আসবে না।
এ প্রসঙ্গে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এনবিআরের আয় বাড়ানোর পথ হচ্ছে প্রত্যক্ষ কর আহরণ বৃদ্ধি। পরোক্ষ করে কখনো অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা আসে না। পরোক্ষ করমুখী হওয়া মানেই দ্রব্যমূল্য বা মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়া। এবারের বাজেটটা পরোক্ষ করমুখী হয়ে গেছে।’
রাজস্ব বাড়াতে বেশকিছু পরামর্শ দিয়ে এনবিআরের এ সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, ‘এনবিআরের ভূমিকা বা সক্ষমতার প্রশ্ন উঠলেই পরোক্ষ করের ঘরে-বাইরের ব্যবস্থাপনার বিষয়টি এসে যায়। শুল্ক বা ভ্যাট হচ্ছে পরোক্ষ কর। আর আয়কর প্রত্যক্ষ কর, যা করদাতার কাছ থেকে সরাসরি নেয়া হয়। বিক্রেতার কাছে ভ্যাট বা শুল্ক পরিশোধের পর ক্রেতা জানে না যে টাকা সরকার পাবে বা পাচ্ছে কিনা। পণ্যদ্রব্য বিক্রির ওপর যে শুল্ককর, সেটা পরোক্ষভাবে নেয়া হয় বলেই খুচরা ক্রেতা বা ভোক্তার ওপর তা আরোপের ক্ষেত্রে তাদের ওপর এর অভিঘাত ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুল্ক বা ভ্যাট আরোপ কিংবা মওকুফের ক্ষেত্রে সমসাময়িক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ আবশ্যক। এ বিষয়ে কাজ করার আইনগত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ট্যারিফ কমিশন। তারাই এ দায়িত্ব পালন করবে। তারা জনগণের একটা শুনানি নেবে এবং পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার পরিমাপ-পরিকাঠামো বিশ্লেষণ করবে।’
ট্যারিফ কমিশনের মতো কমিশনগুলোর নিয়মই হলো তারা যেসব আইনগত সিদ্ধান্ত নেবে সেগুলোর একটা পাবলিক শুনানি নিতে হয়। এ বিষয়টি উল্লেখ করে ড. আবদুল মজিদ বলেন, ‘বছর শেষে বা মাঝখানে শুল্কারোপ কিংবা প্রত্যাহারের বিষয়টি এনবিআরের দায়িত্ব ও কর্তব্য বা প্রথা হিসেবে চলে আসছে। ফলে ট্যারিফ কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় না করে শুল্ক আরোপ বা মওকুফের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে এ ব্যাপারে এনবিআরের ভূমিকা বা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।’
সর্বশেষ সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সংশোধিত কর রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয় ৪ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। যদিও সংস্থাটির হিসাবে ওই সময়ে আয় করা সম্ভব হয় ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫৬২ কোটি টাকার রাজস্ব। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের (সিজিএ) হিসাবে অবশ্য গত অর্থবছরে ২ লাখ ৮৫ হাজার ২৮২ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ হয় বলে উল্লেখ করা হয়। এক্ষেত্রে এনবিআর ও সিজিএর হিসাবে রাজস্ব আহরণের তথ্যে পার্থক্য ৯৭ হাজার ২০০ কোটি টাকার বেশি।
এনবিআরের সাবেক এক সদস্য (আয়কর) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অটোমেশনের বিকল্প নেই। গবেষণা নিয়মিত চালিয়ে যেতে হবে। গবেষণা সেলকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। গবেষণা এনবিআর থেকেও হতে পারে, বাইরে থেকেও হতে পারে। করফাঁকি খুঁজে বের করতে হবে। এনবিআরের জনবল ও পলিসি কাঠামো যুগোপযোগী করতে হবে। তবে যত কিছুই করা হোক; অটোমেশনের বিকল্প নেই। অনেকেই টিন নিলেও করযোগ্য না হওয়ায় কর দিচ্ছিলেন না। এখন বিভিন্ন সেবা নিতে গেলে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। এতে করযোগ্য ব্যক্তিদের শনাক্ত সহজ হবে। প্রত্যক্ষ করও বাড়বে।’
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এনবিআর মূল্য সংযোজন কর (মূসক) থেকে সর্বোচ্চ ৩৭ শতাংশ কর আহরণ করেছে। আয়কর থেকে ৩৪ এবং কাস্টমস (শুল্ক) থেকে ২৯ শতাংশ কর আহরণ করেছে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বেশি ছিল।
করদাতাদের হয়রানি বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করেন এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘করদাতারা যত বেশি কর অফিসে আসা থেকে রেহাই পাবেন, তত বেশি কর আয় বাড়বে, হয়রানি বন্ধ হবে।’
বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। ২০২১-২২ অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এটি আরো কমে ৭ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়ায়। অবশ্য তথ্য বিভ্রান্তি দূর করার জন্য আইবাসের হিসাবে রাজস্ব আহরণ গণনা হলে কর-জিডিপি অনুপাত আরো কমে যাবে।
গত মে মাসে আইএমএফের রিভিউ মিশন শেষে বাংলাদেশের রাজস্ব পরিস্থিতি নিয়ে সংস্থাটির বিবৃতিতে বলা হয়, নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত বিবেচনায় সামাজিক কল্যাণ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ বাড়াতে টেকসই রাজস্ব আহরণ অপরিহার্য। এজন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে কর রাজস্ব জিডিপির দশমিক ৫ শতাংশ বাড়াতে দৃশ্যমান কর নীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ বছরের অক্টোবরে সংস্থাটির একটি মিশন ঋণের চতুর্থ কিস্তির অর্থ ছাড়ের আগে বাংলাদেশ সফরের কথা রয়েছে।
এদিকে রাজস্বের নীতি প্রণয়ন ও আহরণকারী ভিন্ন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এনবিআর একটি রাজস্ব আহরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত বাস্তবায়ন সংস্থা, নীতিনির্ধারণী সংস্থা নয়। এনবিআর নীতিনির্ধারণ করবে না। আইন করবে আইন মন্ত্রণালয় আর ভেটিং নিয়ে কাজ করবে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়। যেমন বাণিজ্য করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এনবিআরের কাজ হচ্ছে সেসব আইনের আলোকে রাজস্ব আহরণ করা।’
তিনি বলেন, ‘যিনি নীতি প্রণয়ন করবেন তাকেই যদি আবার সে নীতি প্রয়োগের দায়িত্ব পালন করতে হয় তাহলে তো জটিলতা আরো বাড়বে। হাকিম নড়বে কিন্তু হুকুম নড়বে না! এখানে এনবিআর নিজেই নীতি তৈরি করে, নিজেরাই তা বাস্তবায়ন করলে অন্যের ভূমিকা পালনের ওপর দোষারোপ চলে না। এনবিআরকে যদি বলা হতো, রাষ্ট্রের সব নাগরিককে করের আওতায় আনার জন্য এ আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, আপনারা এর প্রতিপালন অনুসরণ করুন। তাহলে এ ব্যাপারে তারা দায়বদ্ধ থাকত। আমাদের এখানে প্রচলিত প্রথা হচ্ছে, এনবিআরই আইন তৈরি করে সংসদের অনুমোদন নেয়।’