দুর্নীতি চিহ্নিতের পাশাপাশি পানির দাম কমানোর দাবি

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় আসে, তখন ঢাকাবাসীকে প্রতি হাজার লিটার পানির জন্য গুনতে হয় ৫ টাকা ৭৫ পয়সা। আর ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের যখন পতন ঘটে, তখন

আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে যখন ক্ষমতায় আসে, তখন ঢাকাবাসীকে প্রতি হাজার লিটার পানির জন্য গুনতে হয় ৫ টাকা ৭৫ পয়সা। আর ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের যখন পতন ঘটে, তখন একই পরিমাণ পানির জন্য গুনতে হয় প্রায় ১৭ টাকা। ১৬ বছরে পানির মূল্য প্রায় ১৯০ শতাংশ বৃদ্ধির বিষয়টিকে ওয়াসার সীমাহীন দুর্নীতির ফল হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি নির্মিত অবকাঠামো সঠিক ব্যবহার করা গেলে পানির মূল্য দ্রুত সময়ের মধ্যে কমিয়ে আনা সম্ভব। 

ওয়াসার পানির মান ও দুর্নীতির বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘দ্রুতই ওয়াসার পানির দাম কমাতে হবে। আর এজন্য দেশপ্রেমিক এমডি (ব্যবস্থাপনা পরিচালক) প্রয়োজন। এ দায়িত্বে নতুন যিনি এসেছেন, তিনি সদ্য সাবেক এমডির (তাকসিম এ খান) অনুগত বলে সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। নতুন এমডি বলেছেন, ওয়াসায় নাকি কোনো দুর্নীতি হয়নি। তাহলে তিনি থাকলে ওয়াসার কোনো উপকার হবে না, নগরবাসীও সাশ্রয়ী মূল্যে পানযোগ্য পানি পাবেন না।’ 

পরিসংখ্যান বলছেন, ২০০৯ সালের পর প্রতি বছর ঢাকা ওয়াসা ৫ শতাংশ হারে পানির মূল্য বাড়িয়েছে। ২০১৬ সালে দুবার পানির মূল্য বাড়ে। ২০১৭ সালে আবাসিক গ্রাহকদের পানির মূল্য প্রতি হাজার লিটারে ৫০ পয়সা বাড়িয়ে সাড়ে ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয় ৩৩ টাকা ৬০ পয়সা। ২০১৮ সালে আবাসিকে হয় ১১ টাকা এবং বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৩৫ টাকা ২৮ পয়সা। ২০১৯ সালে আবাসিকে হয় ১১ টাকা ৫৭ পয়সা এবং বাণিজ্যিকে হয় ৩৭ টাকা। ২০২০ সালে এক লাফে মূল্য বাড়ে ২৫ শতাংশ। আবাসিকে প্রতি হাজার লিটার পানির মূল্য দাঁড়ায় ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা। বাণিজ্যিকে মূল্য দাঁড়ায় ৪০ টাকা। এরপর ২০২১ সালে আবার ৫ শতাংশ পানির মূল্য বাড়ায় ওয়াসা। 

২০২২ সালেও পানির মূল্য বাড়াতে চেয়েছিল ঢাকা ওয়াসা। কিন্তু তখন ওয়াসা কর্তৃক পানির মূল্য বাড়ানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়। সর্বশেষ গত ১ জুলাই পানির মূল্য ১০ শতাংশ বাড়ায় ওয়াসা। ওই সময় ওয়াসা কর্তৃপক্ষ আবাসিক গ্রাহকদের জন্য প্রতি এক হাজার লিটার পানির মূল্য নির্ধারণ করে ১৬ টাকা ৭০ পয়সা। বাণিজ্যিক গ্রাহকদের জন্য একই পরিমাণ পানির মূল্য ধরা হয় ৪৬ টাকা ২০ পয়সা।

অভিযোগ উঠেছে, বছরে বছরে ওয়াসা পানির মূল্য বাড়াতে যথাযথ নিয়ম মানেনি। বিধি প্রণয়ন ছাড়া পানির মূল্য নির্ধারণ ১৯৯৬ সালের ওয়াসা আইনের ২১ ও ২২ ধারার পরিপন্থী বলেছেন বিশ্লেষকরা। আইনে বলা আছে, ‘বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে পানির মূল্য বাড়াতে হবে।’ কিন্তু ১৯৯৬ সালে আইন হওয়ার পর দীর্ঘ ২৮ বছরেও কোনো ধরনের বিধি তৈরি হয়নি। ফলে কীভাবে পানির মূল্য নির্ধারণ করা হবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো বিধিবিধান নেই। এমন প্রেক্ষাপটে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০২৩ সালের ১৬ মার্চ বিধি তৈরি ছাড়া পানির মূল্য নির্ধারণ অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। এর বিরুদ্ধে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ আপিল করে। আপিল বিভাগ একই বছরের ২৩ মার্চ হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন। তবে পানির মূল্য বাড়ানোর ওপর নিষেধাজ্ঞার আদেশ বহাল রাখেন। 

বারবার পানির মূল্য বৃদ্ধির পেছনে ওয়াসার যুক্তি ছিল, পানির উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে খরচ বেড়েছে। আর এ খরচ তুলতে গ্রাহকদের বিল বাড়াতে হয়েছে। 

বর্তমানে ঢাকাবাসীর পানির চাহিদা দৈনিক ২৪৫-২৫২ কোটি লিটার। ওয়াসার দাবি অনুযায়ী, তাদের উৎপাদন সক্ষমতা ২৫৫ কোটি লিটার। তবে ওয়াসা যে পদ্ধতিতে পানির উৎপাদন বাড়ানোর দাবি করেছে, সেটা পুরোপুরি অবৈজ্ঞানিক বলে দাবি করেছেন নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মুহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, ঢাকার আশপাশের নদ-নদী ও খাল পানির ভালো উৎস। কিন্তু ওয়াসা বছরের পর বছর এসব খাল ব্যবহার করেনি। দূষিত করেছে নদ-নদীর পানিও। অন্যদিকে নিঃশেষ করেছে ভূগর্ভস্থ পানি। ফলে ভূ-পৃষ্ঠের পানির দিকে যখন নজর দিল, তখন দেখল ঢাকা থেকে বেশ দূরের মেঘনা ও পদ্মা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এত দূর থেকে পানি আনার জন্য যে অবকাঠামো নির্মাণ প্রয়োজন, সেটা করতে গিয়েই পানির মূল্য বাড়ানো হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে। ওয়াসার পানির মূল্য বাড়ানোর পেছনে সীমাহীন দুর্নীতির বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন তিনি। 

ওয়াসার পানির মূল্য কমানোর প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসা বিদেশী ঋণে যেসব উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়েছে, সেগুলো থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। এর কারণ হলো বাস্তবতা বিবেচনায় প্রকল্পগুলো নেয়া হয়নি। পানি বিক্রি করে ওয়াসা মুনাফা করলেও বিপুল বৈদেশিক ঋণের অপচয়ে লোকসানের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন প্রকল্পে ঢাকা ওয়াসার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া ঢাকা ওয়াসায় সিস্টেম লস ২০ শতাংশ। সিস্টেম লস ও দুর্নীতি কমাতে পারলে ওয়াসাকে পানির মূল্য এভাবে বাড়াতে হতো না।’ 

আরও