ডলার সংকট ও মূল্যস্ফীতির অব্যাহত চাপের মুখে সম্প্রতি কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় আসে। সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সর্বশেষ বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ কিছুটা বাড়ানোও হয়। তবে এ বরাদ্দকে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলছেন অর্থনীতিবিদরা। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বরাদ্দ কিছুটা বাড়লেও তা সামগ্রিক বাজেটের আকারের তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। আবার এ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ কমানো হয়েছে। এ অবস্থায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে কৃষি খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির আহ্বান জানিয়েছেন তারা; মনোযোগ দিতে বলেছেন সার উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়েও।
চলতি অর্থবছরে (২০২৪-২৫) কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৭ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। এ টাকা মোট বরাদ্দের ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এ হার ছিল ১১ শতাংশের ঘরে। সে হিসাবে এক যুগে কৃষি খাতে বরাদ্দ নেমেছে প্রায় অর্ধেকে। এবার শস্য ও কৃষি খাতের জন্য রাখা হয়েছে ২৭ হাজার ২১৪ কোটি টাকা। বাকিটা ব্যয় হবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন ও পরিবেশ এবং ভূমি ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে।
গত অর্থবছরে (২০২৩-২৪) শস্য খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ৮ হাজার ১১১ কোটি টাকা যোগ করে সংশোধিত বাজেটে তা নির্ধারণ করা হয় ২৫ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ২৬১ কোটি টাকা, যা গত বছরের মূল বাজেটের চেয়ে ২৭২ কোটি টাকা কম। আর সংশোধিত বাজেটের চেয়ে কমেছে ৮ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা।
ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ও কৃষিযন্ত্রের দাম বাড়ার কারণে উৎপাদন খরচ বাড়বে। সেক্ষেত্রে ভর্তুকি হ্রাস অনাকাঙ্ক্ষিত। কৃষির উৎপাদন বিঘ্নিত হবে। ব্যাহত হবে খাদ্যনিরাপত্তা।’
নতুন সরকারের কাছে কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ ও বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গড়ে সাড়ে ৪ শতাংশ হারে প্রতি বছর কৃষি উৎপাদন না বাড়াতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। সেজন্য এ খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। আর ইউরিয়া সার আমদানির পরিবর্তে নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এখন আমরা মাত্র ১০ লাখ টনের মতো উৎপাদন করে থাকি। তিনটি সার কারখানার মধ্যে একটি চালু আছে। বাকি দুটি কারখানা চালু রাখতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এসব কারখানা চালুর মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা উন্নীত করতে হবে ২০-২৫ লাখ টনে।’
দেশের কৃষি উৎপাদনের সঠিক পরিসংখ্যান প্রকাশের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত উৎপাদন দেখানোটা ক্ষতিকর। বিগত সময়ে কৃষি উৎপাদনের তথ্য বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা ছিল। আর মূল্যস্ফীতি দেখানো হতো কম। এটা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। আগের উৎপাদনের সব তথ্য পর্যালোচনা করা দরকার।’
খাদ্যসহ অন্যান্য পণ্যের সরবরাহে নজর দিতে বলছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। কৃষিবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে সব অংশীজনের সঙ্গে বসার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ এম আসাদুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার রাজনৈতিক ও আইনি কাঠামোয় প্রথম নজর দিচ্ছে। তবে খাদ্য সরবরাহ ঠিকমতো না পেলে মানুষ ১০ দিন পরই ঘুরে দাঁড়াবে। তখন শুধু তারুণ্য দিয়ে হবে না। তাই আসন্ন আমন ও বোরো উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে। এজন্য কৃষিবিজ্ঞানী এবং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও এনজিওর সঙ্গেও বসতে হবে। শুধু হুকুম দিয়ে চলবে না। আগেও দেখা গেছে, দেশে আমন উৎপাদন ব্যাহত হলে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এবার বৃষ্টিও কম হয়েছে। তাই লোকজনের খাবার নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’