রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে ক্যান্সারের অস্ত্রোপচার, প্রশমনসেবা পর্যন্ত রয়েছে ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের। উন্নত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রমও রয়েছে এ হাসপাতালের। দেশে ক্যান্সারের বিশেষায়িত হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ শামীম
আপনার এ ক্যান্সার সুপার হাসপাতালে বিশেষ কী সুবিধা রয়েছে?
আমাদের হাসপাতালটি ক্যান্সার রোগীদের জন্য বিশেষায়িত। সেদিক থেকে এটা ১৫০ বেডের স্পেশালাইজড ক্যান্সার হসপিটাল। যেখানে ক্যান্সারের জন্য ডেডিকেটেড ১০০ বেড আছে। আমরা বোনম্যারো ট্রান্সপ্লানটেশনের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। রেডিওথেরাপির জন্য রয়েছে দুটি অত্যাধুনিক লিনিয়ার এক্সিলারেটর এবং ইন্টারনাল রেডিয়েশন থেরাপির জন্য ব্রাকিথেরাপি। এখানে সুসজ্জিত ও কমপ্রিহেনসিভ কেমো ডে কেয়ার রয়েছে ৩০ বেডের। ডেডিকেটেড ইমিউনিথেরাপি, হরমোনথেরাপি ও কেমোথেরাপির সুবিধাও দিচ্ছি আমরা। এর বাইরে আমাদের এখানে আছে অ্যাডমিশন ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার। ডেডিকেটেড আরেকটা বিল্ডিং আছে, সেখানে আমরা এন্ড অব লাইফ কেয়ার রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। পাশাপাশি এখানে ছয়টি অ্যাধুনিক মডিউলার হাইব্রিড গ্রিন ওটি আছে। ক্যান্সারের বড় ওটির পাশাপাশি জেনারেল সার্জারি, গাইনি অনকোলজি সার্জারির মতো ২০-২৫ ধরনের সার্জারি সুবিধা দিচ্ছি আমরা।
বিশ্বের কোন হাসপাতালের আদলে এ প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে?
আমাদের হাসপাতালটা আসলে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ক্যান্সার সেন্টারের আদলে প্রতিষ্ঠিত। পাশাপাশি ভারতের রাজীব গান্ধী ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের কনসেপ্টেও এ হসপিটাল পরিচালনা করা হয়।
ক্যান্সারের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় আগামীতে কী পরিকল্পনা রেখেছেন?
আমরা আসলে আগামী পাঁচ বছরের বড় পরিকল্পনা ধরেই কাজ করছি। আমাদের এ হাসপাতালে বার্ষিক এক-দেড় লাখের বেশি রোগীর সংস্থান করতে পারব না। সে অবকাঠামোটা আমাদের নেই। ফলে পরিকল্পনা হলো দেশের ৩০টি জেলায় আগামী পাঁচ বছরে আমরা স্যাটেলাইট ক্যান্সার সেন্টার খুলব এটার অধীনে। এখন অনেক দূর দূরান্ত থেকে রোগী আসে। উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রাম থেকেও রোগী আসছে। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা হলো বিভাগীয়ভাবে ছোট ছোট সেন্টার খোলা, যেখানে স্পেশালাইজড কেমো, রেডিওথেরাপি ও মৌলিক কিছু সাপোর্ট থাকবে। এতে খরচ অনেকটাই কমে যাবে। দূর থেকে আমরা মনিটর করতে পারব প্রতিটা ক্যান্সার সেন্টারে। তাছাড়া আমাদের তো জনবল কম। ফলে টেকনোলজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০-৩৫ জন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। আমাদের হাসপাতালে ২০ জন ভালো সার্জন আছেন। ৭০ ডাক্তারের মধ্যে ২৫ জন ফুল টাইম। এখানে রয়েছে ভালো রেডিওলজিস্ট, ল্যাবরেটরি স্পেশালিস্ট ও ল্যাব ডিরেক্টর। সেটা দিয়েই বাস্তবায়ন করব পরিকল্পনা। জেলাভিত্তিক ক্যান্সার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কোনো পরিকল্পনা আপাতত নেই। কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা হলো রেডিওথেরাপি ও মেডিকেল অনকোলজি শুরু করার, আমাদের ডাক্তাররা এখানে বসে সরাসরি মনিটরিং করবেন।
হাসপাতাল চালু করার পর রোগীদের কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
মোটা দাগে বলতে গেলে ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। প্রথম দিক থেকে আমাদের লক্ষ্য ছিল ইথিক্যাল জায়গা থেকে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। রোগীর সেবার মান ও পেশেন্ট ফার্স্ট নীতিকে আমরা অগ্রাধিকার দিই। প্রথম থেকেই জোর দিয়েছিলাম বিভিন্ন ধরনের কোয়ালিটিতে। তার একটা দিক হচ্ছে মাল্টিডিসিপ্লিনারি বোর্ড। প্রতিটা নতুন ক্যান্সার রোগীর জন্যই একটা বোর্ড হচ্ছে। সেখানে একজন ক্যান্সার স্পেশালিস্ট, সার্জন, ডায়েটিশিয়ান, রেডিওলজিস্ট ও ল্যাবের প্রতিনিধি আছেন। সবাই বসে তার চিকিৎসা কীভাবে হওয়া উচিত, সে বিষয়ে সীদ্ধান্ত দেন; সার্জারিই করতে হবে, নাকি রেডিওথেরাপি দিতে হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের প্যারামিটারগুলো আমরা সিঙ্গাপুরের মতো দাঁড় করাতে চেয়েছি। বোর্ডের সদস্য ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, এখন সাড়া খুবই ভালো। আমার অনেক ভালো রেফারেলও পাচ্ছি। টাটা ক্যান্সার হসপিটাল ও রাজীব গান্ধী হসপিটালে যারা যাচ্ছেন, তাদের কেমো রেডিয়েশনও আমরাই করছি। তারাই বলছে তোমরা ল্যাবএইড ক্যান্সারে চলে যাও, সেখানে ভালো চিকিৎসা হচ্ছে।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী বলে আপনি মনে করেন?
হসপিটাল ব্যবস্থাপনা আসলে দুটি বিষয়ের দিকে তাকানো দরকার। প্রথমটি পেশেন্ট ম্যানেজমেন্ট আর দ্বিতীয়টি ডক্টর ম্যানেজমেন্ট। দুটি বিষয়ের ভেতরেই বিস্তৃত বহু ক্ষেত্রে রয়েছে। বিশেষ করে প্যাশেন্ট ম্যানেজমেন্টের ক্ষেত্রে আমি মনে করি সবচেয়ে জরুরি হলো ডেডিকেটেড হেলথকেয়ার এক্সপার্টিজ। আর হেলথকেয়ার এক্সপার্টিজস হলো প্রসেস। এ হসপিটালে প্রায় ১ হাজার ৪০০ প্রসেস আছে আর প্রতিটা প্রসেসে যদি আপনি একটা বা দুটা ভুল করেন, রোগী মারা যেতে পারে। আমাদের এখানে আমরা এ প্যারামিটারগুলো সবসময় মেজার করি। পুঁথিগত বিদ্যাও যেভাবে জরুরি, পাশাপাশি জরুরি অভিজ্ঞতা। ভালো হসপিটালে এ স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস হয়। ওইখানে যারা কাজ করেছে, তারা আমাদের এখানেও জড়িত।
আপনার এ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে অন্য যে লোকবল থাকে, এদের বিশেষায়িত চিকিৎসায় ভালোভাবে যুক্ত করতে আপনার পদক্ষেপ কী?
সবচেয়ে জরুরি হলো প্রতিনিয়ত আউটসাইড ট্রেনিং। যারা একটু সিনিয়র ও অভিজ্ঞ, তাদের আমরা বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারা বিভিন্ন হসপিটালে যাচ্ছে, এছাড়া আমরা বিভিন্ন কনফারেন্স করছি। সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামও এখানে হচ্ছে প্রচুর। এভাবেই আসলে নলেজ গ্যাদারিং হচ্ছে। আমরাই বাংলাদেশের প্রথম হাসপাতাল, যেটা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি রেগুলেটরি বোর্ডের প্রথম মেম্বার। আমরা এর মধ্যেই কয়েকটি গ্লোবাল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালও করেছি। আমাদের কাজের কোয়ালিটি ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামে আমরা খুব বেশি জড়িত, এজন্য তারাও চাচ্ছে আমাদের এখানে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হোক। দু-তিনটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হচ্ছেও। ট্রেনিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। ট্রেনিং এডুকেশন বা কন্টিনিউইং মেডিকেল এডুকেশন, যাকে আমরা সিএমই বলি, সেই সিএমইর কোনো বিকল্প নেই আসলে।
বিশেষায়িত ক্যান্সার হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা আসলে কী?
এখানে প্রথম সীমাবদ্ধতা হিউম্যান রিসোর্স। আমাদের হেলথকেয়ারে ডক্টর, নার্স ও বেডের হার অনেক কম। নার্সের হার প্রতি ১০ হাজার রোগীতে পয়েন্ট ফাইভ। আমরা যে নার্সগুলোকে ট্রেনিং দিচ্ছি, তারা এক বা দুই বছর পর ভালো একটা সুযোগ পেলেই চলে যাচ্ছে। সরকারি সার্কুলার হলেও সবাই সরকারি চাকরির জন্য চলে যায়। নতুন এমপ্লয়ি আমরা অবশ্যই নিই। কিন্তু তাকে ট্রেনিং করিয়ে আগের জায়গায় আনতে অনেক সময় লাগে। অনেক সময় আনা সম্ভব হয় না। দ্বিতীয় ক্রাইসিসটা মূলত অর্থনৈতিক। হেলথকেয়ার আসলে পুঁজিচালিত শিল্প। এখানে প্রচুর বিনিয়োগ করতে হয়। আর রিটার্ন আসার গতিও অনেক ধীর। সেক্ষেত্রে আমাদের অনেকাংশে ব্যাংকের ওপর নির্ভর করতে হয়। অনেক সময় ক্যাশ ফ্লো জেনারেট না হলে আমাদের স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করাটা একটু চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। আমরা এ দুটি ইস্যুতে অনেক বেশি সাফারার। এর বাইরে এক্সচেঞ্জ রেটও একটা বড় ইস্যু। ডলারের দাম বেড়ে গেছে। আর আমাদের পণ্য তো অনেকটাই আমদানিনির্ভর।
চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রশমনসেবা গুরুত্বপূর্ণ। আপনাদের এ বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি কেমন?
যদিও আমাদের হাসপাতালের বয়স তিন বছর। কিন্তু এ তিন বছরের মধ্যে আমরা বেশ এগিয়েছি। আমি টাটা মেডিকেল সেন্টারে ভিজিট করেছিলাম। কলকাতায় তারা সুন্দর বিল্ডিং করেছে। দেখলাম এক লোক ভায়োলিন বাজাচ্ছে, বই পড়াচ্ছে, পূজা পাঠ হচ্ছে ও যোগ-ব্যায়াম করছে। এ জিনিসগুলোর সবটা আমরা করতে পারিনি। কিন্তু আমাদের একটা ডেডিকেটেড বিল্ডিং আছে। আমরা এর নাম দিয়েছি অপরাজয়ী। ওইখানে প্যালিয়েটিভ পেশেন্ট ও দূর থেকে আসা রোগীরা থাকতে পারেন। সেখানে ভর্তুকি দেয়া হয় ও সাশ্রয়ী। প্রতিদিন ১ হাজার টাকা ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০০ টাকায় থাকা যায়। সেখানে এ কাজকর্মগুলো থাকে। আর্ট ক্যাম্প ও তাদের মন ভালো রাখা, ফিজিওথেরাপি ও অসুস্থ হয়ে গেলে ওখানেই কিছু ট্রিটমেন্ট করি। বেশি খারাপ হয়ে গেলে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সীমাবদ্ধতা এখনো আমাদের আছে। এক্ষেত্রে আমরা গুরুত্বসহকারে বিষয়টি দেখছি। প্যালেটিভ ও এন্ড অব লাইফ কেয়ার নিয়ে আমরা আরো সামনে যেতে চাই। আইসিইউতে মানুষ মারা যাওয়ার সময় রোগীর রিলেটিভরা রোগীর সঙ্গে দেখা করতে চায় ও কথা বলতে চায়। ধর্মীয়ভাবেও তওবা পড়াতে চায়। আমাদের দেশে কিন্তু এখানে মিসিং। কিন্তু এগুলোয় আমরা এখন অনেকটা ওপেন হয়ে গেছি। চাই রোগীরা যেন শেষ মুহূর্তে পাশে ভালো কিছুই পায়। আর যে রোগী বাঁচবে না, তাদেরও আমরা বলে দিচ্ছি। এতদিন বাঁচবে, নিয়ে যান।
চিকিৎসার ব্যয় নিয়ে কথা বলতে চাই। ক্যান্সার চিকিৎসার খরচও অনেক বেশি। একে মানুষের সক্ষমতার মধ্যে আনতে গেলে আমাদের কী করণীয়?
যেকোনো ক্যান্সারেই বাংলাদেশে খরচ প্রায় ৪০-৫০ লাখ টাকা। কখনো আরো বেশি হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে এটা অনেক বড় বোঝা। বোঝাই বলব, কারণ যার আয় ৪০-৫০ হাজার টাকা কিংবা পরিবারে উপার্জনক্ষম মানুষই একজন, তাদের জন্য এটা অনেক বড় একটা অ্যামাউন্ট। তখন গোটা ফ্যামিলিটাই পথে বসে যায়। সেক্ষেত্রে দুভাবে ব্যয় কমানো সম্ভব। প্রথমত, আমাদের এখানে ইনকাম ট্যাক্সের মতো কিছু জায়গায় যদি অর্ধেক কিংবা ছাড় দেয়া যায়, তাহলে চিকিৎসা খরচ কমানো সম্ভব। পেট সিটি স্থাপনে খরচও কমানো সম্ভব। যেমন আমরা কমাতে পারি। সরকার একটা ভালো কাজ করেছে সাইক্লোট্রন নিয়ে এসে। সাইক্লোট্রন আরো দু-তিনটা হলে প্রতিদিন যদি আমরা এফডিজি পাই, তাহলে আমরা আরো ব্যয় কমাতে পারব। দ্বিতীয়ত, হেলথ ইন্স্যুরেন্স একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। অনেক উদ্যোক্তা এটা নিয়ে কথা বলছেন। তবে বিষয়টা একটু ক্রিটিক্যাল। জনগণ যেভাবেই হোক, এখন আসছে ও চিকিৎসা করাচ্ছে। এখন হেলথ ইন্স্যুরেন্সের শুরু করার জন্য কিন্তু অবকাঠামো লাগবে। না হলে দেখা যাবে রোগী মারা যাচ্ছে, আমাদের লোক বসে থাকবে, কিন্তু ইন্স্যুরেন্স এখনো প্রস্তুত হয়নি। শুধু সরকারের উদ্যোগ হলে হবে না। স্বাস্থ্যসেবা দাতা ও ইন্স্যুরেন্স দাতা প্রতিষ্ঠানেরও এগিয়ে আসা জরুরি। রোগী হার্ট অ্যাটাক নিয়ে এসেছে, বিদ্যমান অবকাঠামোয় তার ইন্স্যুরেন্স তৈরি করতে করতে রোগী মারা যাবে। যথাযথ পরিবেশ তৈরি করতে না পারলে হাসপাতালগুলো ঠিকমতো রোগীও ম্যানেজ করতে পারবে না। কারণ প্রতিদিন অপারেট করার জন্য যে ক্যাশ লাগবে, তখন তারা তা পাবে না। ইন্স্যুরেন্স হলে রোগী বাড়বে; কিন্তু হসপিটালের ডে টু ডে ম্যানেজ করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।