স্বাধীনতা সংগ্রামে রমনা রেসকোর্স ময়দান

মোগল আমলে ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা লাভ করলে রমনা একটি বিশেষ এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে। এর নামকরণও করে মোগলরাই। রমনা ফরাসি শব্দ, যার ইংরেজি প্রতিশব্দ লন। রমনা এলাকার আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানটি মোগলরাই বাগান হিসেবে গড়ে তুলেছিল। মোগলদের পর ইংরেজরা ক্ষমতায় এসে রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে ঢাকার অনেক অঞ্চলের মতো রমনাও তার গুরুত্ব

মোগল আমলে ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা লাভ করলে রমনা একটি বিশেষ এলাকা হিসেবে গড়ে ওঠে। এর নামকরণও করে মোগলরাই। রমনা ফরাসি শব্দ, যার ইংরেজি প্রতিশব্দ লন। রমনা এলাকার আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানটি মোগলরাই বাগান হিসেবে গড়ে তুলেছিল। মোগলদের পর ইংরেজরা ক্ষমতায় এসে রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করলে ঢাকার অনেক অঞ্চলের মতো রমনাও তার গুরুত্ব হারায় এবং জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। ১৮২৫ সালে ব্রিটিশ কালেক্টর ডয়েসের উদ্যোগে রমনার জঙ্গল কেটে তৈরি করা হয় রেসকোর্স। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর রমনা অঞ্চল পুনর্গঠিত হয়। এ সময় রমনা মোটামুটি তিন ভাগে বিভক্ত ছিল—রমনা সিভিল স্টেশন, রমনা পার্ক আর রেসকোর্স। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় রমনা সিভিল স্টেশনে। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তার বিভিন্ন পর্যায়ের সাক্ষী হিসেবে রয়েছে রমনার রেসকোর্স ময়দান। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এ অঞ্চলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা করলে তাৎক্ষণিক ছাত্রদের প্রতিবাদের সম্মুখীন হন। এরপর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে এলাকাটি মুখরিত ছিল।

প্রথম নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন ও ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান

১৯৬৯ সালে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পেলে ২৩ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রমনা রেসকোর্সে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়া হয় এবং তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১০ লক্ষাধিক লোকের এই নাগরিক সংবর্ধনায় শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, মধ্যবিত্ত, অফিস কর্মচারী, ব্যবসায়ী, সাধারণ নাগরিকসহ সব শ্রেণীর নাগরিক উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ের কয়েক শ ছাত্রী ও বিশিষ্ট নারীরা উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন সংবর্ধনা মঞ্চে ওঠেন তখন রেসকোর্স ময়দানে বেশ ক’বার তোপধ্বনি করা হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে রেসকোর্সে জনসভায় বক্তব্য রাখার পর পাকিস্তানের একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু ছিলেন দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি এখানে জনসভায় বক্তব্য রাখেন। অর্থাৎ পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু প্রথম রেসকোর্সে জনসভায় ভাষণ দেন। তারা দুজনই দুটি জাতির পিতা। 

বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতার প্রাক্কালে ২১ বার তোপধ্বনি করা হয়। জনসভায় স্লোগান দেয়া হয় ‘শেখ মুজিব জিন্দাবাদ’, ‘এগারো দফা মানতে হবে’, ‘সংগ্রাম চলবে, ‘শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দিব না’ ইত্যাদি। অনুষ্ঠানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বঙ্গবন্ধু জনসভায় তার বক্তৃতায় বলেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থের প্রশ্নে কোনো দিন বিশ্বাসঘাতকতা করিতে পারব না। আপনারা বুকের রক্ত দান করিয়া আমাকে মুক্ত করিয়াছেন। এই রক্ত সঞ্চিত মমতার জন্য আমি আপনাদের নিকট চির কৃতজ্ঞ থাকিব। ... বাংলার মাটিকে আমি ভালোবাসি, বাংলার মানুষকে আমি ভালোবাসি—বিশ্বাস করি এদেশের মানুষের সংগ্রাম জয়যুক্ত হবেই।’ এ সভায় চলমান আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রস্তাবগুলো পাঠ করা হয়। উপস্থিত জনতা হাত তুলে প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানায়। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর শাসন-শোষণের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ব বাংলার মানুষ যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল সেখানে ১৯৬৯ সালের রেসকোর্সের এ জনসভা নতুন মাত্রা যোগ করে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনী জনসভা

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের প্রথম নির্বাচন একটি মাইলফলক। বঙ্গবন্ধু এই নির্বাচনকে ছয় দফার প্রশ্নে গণভোট হিসেবে ঘোষণা করেন এবং বাঙালির মানস জগতে ছয় দফা স্থাপন করতে নির্বাচনী মাঠকে কাজে লাগান। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধু গোটা দেশ সফর করেন। নির্বাচনী জনসভার অংশ হিসেবে ১৯৭০ সালের ৭ জুন রমনার রেসকোর্সে জনসভার আয়োজন করা হয়। আবার ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুন একটি স্মরণীয় দিন ছিল। ৭ জুন আয়োজিত জনসভাটি ছিল আর দশটা জনসভা থেকে ভিন্ন। এদিন প্রবল বৃষ্টি ও মাঠের কাদা উপেক্ষা করে জনগণ ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রমনার রেসকোর্সে আওয়ামী লীগের যে জনসভাটি হয়েছিল সেটিও ছিল স্মরণকালের একটি বড় জনসভা। ১৯৭০ সালের ৭ জুনের সমাবেশ আগের বছরের সমাবেশকেও ছাড়িয়ে যায়। তাছাড়া এ সমাবেশে যেমন এসেছেন খেতের চাষী, নায়ের মাঝি, ঘাটের শ্রমিক, অফিসের কর্মচারী, ছাত্র-শিক্ষক-শ্রমিক তেমনি এসেছেন নারী, কুলবধূ, বর্ষীয়ান মহিলা এবং অগণিত ছাত্রী। আগের বছর সবাই সমাবেশে উপস্থিত হয়েছিলেন কারামুক্ত নেতাকে এক নজর দেখতে, আর ১৯৭০ সালের ৭ জুন বৃষ্টি ভেঙে কাদা উপেক্ষা করে সবাই রেসকোর্সে এসেছেন আগামী নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনা শুনতে। 

৭ জুন দুপুরের মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, আদমজী, ডেমরা, তেজগাঁও, টঙ্গীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে লোক রেসকোর্সে এসে জমায়েত হয়। প্রদেশের দূরদূরান্ত হতেও বহু লোক সমাবেশে যোগদান করে। লোকজন সমাবেশে এসেছে দলে দলে, হাজারে হাজারে, ট্রেনে-ট্রাকে-লঞ্চে-বাসে চড়ে, আবার কেউবা পায়ে হেঁটে শোভাযাত্রা করে ব্যান্ড বাজিয়ে। টিপটিপ বৃষ্টিমুখর দুপুরে সমগ্র ঢাকা নগরীকে মনে হয়েছে একটি মিছিলের শহর। সভা শুরু হওয়ার বহু আগেই রেসকোর্স ময়দান একটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। সভা শুরু হলে দেখা যায়, কর্দমাক্ত ও বর্ষণমুখর প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও এ সমাবেশ বিশালত্ব, নতুনত্ব এবং একাগ্রতার দিক দিয়ে ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারির গণসংবর্ধনা সমাবেশকে ম্লান করে দিয়েছে। প্রকৃত অর্থে ওইদিন যে বৈরী আবহাওয়া ছিল তাতে কোনোরূপ সমাবেশ হওয়ারই কথা নয় সেখানে বৃষ্টির বেগ যতই বেড়েছে স্লোগানের সুরও ততই উচ্চে উঠেছে। বৃষ্টির মধ্যে ভাষণদানকালে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘যদি আপনারা নিরংকুশ গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক অধিকার এবং ৬-দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন চান, যদি বাংলার মীরজাফরদের রাজনীতির দিগন্ত হইতে উৎখাত করিতে চান, যদি আমার উপর আপনাদের আস্থা থাকে তবে আমি নারায়ে তকবির বলার সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলুন।’ জনগণ তার বক্তব্য অনুসারে লক্ষ লক্ষ হাত তোলেন। সেই সঙ্গে স্লোগান তোলেন ‘জেগেছে জেগেছে বাঙালি জেগেছে’, ‘বাঙালিরা আছে শেখ মুজিবের পিছে’, ‘ছয় দফা ১১ দফা মানতে হবে।’ 

রমনা রেসকোর্স ময়দানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন প্রশ্নে প্রস্তাবাবলি পাস করে। বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে রেসকোর্সের জনসভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রস্তাব পেশ এবং অন্য সহসভাপতি খোন্দকার মোশতাক আহমদ প্রস্তাবগুলো সমর্থন করেন। সে সঙ্গে জনসভায় উপস্থিত বিপুল জনতা হাত তুলে ও মুহুর্মুহু স্লোগানের মাধ্যমে প্রস্তাব অনুমোদন করে। ছয় দফা ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসন আদায়ের জন্য নবতর উদ্যোগে গণতান্ত্রিক সংগ্রাম অব্যাহত রাখার জন্য জনসমাবেশে নতুনভাবে সংকল্প গ্রহণ এবং ঘোষণা করা হয়, এই লক্ষ্য হাসিলে যেকোনো ধরনের আত্মত্যাগেই জনসাধারণ প্রস্তুত রয়েছে।

জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়। তাদের মধ্যে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রথমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দিলেও একপর্যায়ে তিনি তার মত পরিবর্তন করেন। ১৯৭০ সালের ২ অক্টোবর চতুর্থ পাকিস্তান কৃষক-শ্রমিক স্বেচ্ছাসেবক সম্মেলন উপলক্ষে রেসকোর্স ময়দানে জনসভার আয়োজন করা হয়। ওই জনসভায় ভাষণদানকালে ভাসানী বলেন, তিনি নির্বাচনবিরোধী নন এবং তার দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তিনি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন না, কৃষক-শ্রমিকদের দাবি আদায় এবং সংগ্রাম অব্যাহত রাখার জন্যই তার দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। তবে ভাসানীর বক্তৃতা চলাকালে ভাসানী সমর্থক দুটি ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীদের উপর্যুপরি অনাবশ্যক স্লোগানের ফলে সমাবেশের শৃঙ্খলা ব্যাহত হয়। এর মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ভাসানীপন্থী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক সংস্কৃতি দৃষ্টিগোচর হয় এবং তাদের এই বিশৃঙ্খলা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশেও অব্যাহত ছিল। ভাসানী জনসভায় ২৮ দফাসংবলিত ‘চরমপত্র’ পেশ করেন এবং পাকিস্তান সরকারকে তা মেনে নেয়ার আহ্বান জানান। অবশ্য অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের কারণে শেষ পর্যন্ত তার দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিল।

ঢাকার বৃহত্তম জনসভায় বঙ্গবন্ধু-‘সংগ্রাম শেষ হয় নাই, সংগ্রাম শুরু’

ঢাকার ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণসমাবেশ ছিল ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি রমনার রেসকোর্সে আয়োজিত পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। এপিপির মতে, জনসভায় ১০ লাখ এবং পিপিআইয়ের মতে ২০ লাখ লোকের বেশি মানুষ জনসভায় অংশগ্রহণ করে। সেদিন রমনায় মানুষের ঢল নেমেছিল। বস্তুত ১৯৭০ সালের নির্বাচন বাঙালিকে তার অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ব্যাপক উদ্দীপনা জোগায়, যার প্রমাণ পাওয়া যায় রেসকোর্সে মানুষের উপস্থিতি দেখে। ওই জনসভায় বঙ্গবন্ধু ভাষণদানকালে বলেন, ‘৭ জুনের পর আমি আবার আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আজ কি বক্তৃতা করব ভাবছি। আপনারা জানেন সাধারণ নির্বাচন শেষ হয়েছে। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন এতেই দাবি আদায় হয়ে গেছে, তাহলে ভুল করবেন। আসল সংগ্রাম এবার শুরু হলো মাত্র। ... স্মরণ করি সেই শহীদ ভাইদের কথা—রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করে, ছাত্র আন্দোলন করে যারা জীবন দিয়েছেন। স্মরণ করি মনু মিয়াসহ ৭ জুন এবং ৬৮-৬৯ সালের গণজাগরণে যেসব ছাত্র-কৃষক শ্রমিক বুকের রক্তে রাজপথ লাল করে দিয়েছেন। আকাশ থাকবে, যতদিন বাতাস থাকবে; ততদিন এদেশের মানুষ ওদের কথা ভুলতে পারবে না। নির্বাচনই চূড়ান্ত বিজয় নয়। এমনও হতে পারে অধিকার আদায়ের জন্যে আমাদের চূড়ান্ত সংগ্রামের পথ বেছে নিতে হবে। আশা করি সেদিন এসব রক্ত ঋণ শোধ করতে আপনারা প্রস্তুত থাকবেন।’  

বঙ্গবন্ধু জনসভায় আওয়ামী লীগ কর্মীদের উদ্দেশ করে বলেন, গ্রামে গ্রামে আওয়ামী লীগ ও ছয় দফার দুর্গ গড়ে তুলুন। সংগঠনের অভাবে আমাদের দেশে বহু আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়াও তিনি বলেন, ‘আজ সকলকে সঙ্গে লইয়া এই গণসমাবেশে শপথ লইতেছি, শহীদানের রক্ত বৃথা যাইতে দিব না। যতদিন আকাশ, বাতাস থাকিবে, বাংলাদেশ থাকিবে, বাংলার মাটি থাকিবে ততদিন রক্তের কথা ভুলিব না। প্রয়োজন হইলে নিজের রক্ত দিয়া তাহাদের রক্ত ঋণ পরিশোধ করিব। ... আমরা যাহা পাশ করিব তাহাই পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র। তাহা নস্যাৎ করার ক্ষমতা কাহারও নাই। যদি কেহ করেন, দেশব্যাপী প্রচণ্ড গণ-বিস্ফোরণে তাহার জবাব দেওয়া হইবে।’

পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সদস্যরা এ মর্মে শপথ গ্রহণ করেন, তারা শাসনতন্ত্র ও বাস্তব প্রয়োগে ছয় দফা কর্মসূচিভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন ও এগারো দফা কর্মসূচির প্রতিপালন ঘটাবার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন এবং এই দুটি কর্মসূচির প্রতি একনিষ্ঠরূপে বিশ্বস্ত থাকবেন। কোনো অবস্থাতেই পাকিস্তানি শাসকদের চাপের মুখে তারা বাংলার মানুষের স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ

পাকিস্তানের সামরিক সরকার ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পরিচালনা করে। পশ্চিম পাকিস্তানের এস্টাব্লিশমেন্ট ছয় দফাকে পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ গণ্য করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের নেতাদের হাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রদানে সংশয়ে ছিল। এ অবস্থায় ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ আসন্ন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। ৩ মার্চ পল্টনের জনসভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুন রমনার রেসকোর্সে জনসভার আয়োজন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে

 সেদিন পূর্ব পাকিস্তানের লাখ লাখ মানুষ রেসকোর্স অভিমুখে যাত্রা করেছিল, জনসভাস্থল পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ছুটে এসেছে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের দিকনির্দেশনা লাভ করতে। ৭ মার্চ বাংলার আপামর জনসাধারণের মধ্যে জনসভাকে কেন্দ্র করে যে উদ্দীপনা কাজ করেছে তা আগে আর কখনো দেখা যায়নি। স্মরণকালের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে সেদিন রমনার রেসকোর্সে লাখ লাখ মানুষ একত্র হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর ভাষণ অবলোকন করতে। অধীর আগ্রহে মানুষ সমবেত হয়েছে মুক্তির সংগ্রামের পরবর্তী কর্মসূচি সম্পর্কে অবগত হতে।

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তার দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্যসাধারণ ভাষণ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। ১৮ মিনিট ৩ সেকেন্ডের ভাষণে তিনি বাঙালি জাতিকে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চূড়ান্ত নির্দেশনা প্রদান করেন। এরপর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ কার্যত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। তিনি সেদিন বলেন, “...আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে.... প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেবো। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বান বাঙালির মনে গভীর দাগ কাটে এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে উদ্বুদ্ধ করে।

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে রমনা রেসকোর্স বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী বহন করছে। ১৯৬৯ সালে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি লাভের পর থেকে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ পর্যন্ত রেসকোর্স ময়দানে জনতা বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে একত্রিত হয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে নেতা ও জনতার যে সম্মিলন ঘটেছে তা বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত করে। রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত একেকটি জনসভা পূর্ববর্তী জনসভার রেকর্ডকে ভঙ্গ করেছে, যার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় সংগ্রামের ডাক দিয়ে বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন এবং জনগণ তার ওপর গভীর আস্থা স্থাপন করেছিল। তাই বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে পূর্ব বাংলার মানুষের মনোভাব সৃষ্টিতে রমনা রেসকোর্স স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সর্বোপরি, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এখানেই পাকিস্তান বাহিনী যৌথ বাহিনীর নেতৃত্বের কাছে আত্মসমর্পণ এবং বাঙালির বিজয়ের ক্ষণ আরম্ভ হয়।

মুর্শিদা বিন্‌তে রহমান: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

আরও