বাংলাদেশে হৃদরোগের সর্বোচ্চ চিকিৎসা ও হৃদরোগের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসক তৈরির সূতিকাগার বলা হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালকে (এনআইসিভিডি)। ১৯৭৮ সালে দেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগের চিকিৎসাসেবার প্রসার ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে এ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়। হৃদরোগের চিকিৎসায় সরকারের একমাত্র বিশেষায়িত এ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বছরে কয়েক লাখ রোগীকে সেবা দিচ্ছে। রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল। দেশে হৃদরোগের চিকিৎসা, সেবার বিস্তৃতি, সম্ভাবনা ও সংকট সমাধানের বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন এনআইসিভিডির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ
বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার অগ্রগতি থাকার পরও হৃদরোগের প্রাদুর্ভাব কমছে না। এর পেছনে কী কারণ রয়েছে?
বিশ্বে একসময় সংক্রামক রোগের ধারা ছিল। এখন তা অসংক্রামক রোগের দিকে ধাবিত হয়েছে। সারা বিশ্বেই অসংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়। অসংক্রামক রোগের মধ্যে আবার হৃদরোগ বেশি দেখা যাচ্ছে। তার কারণ হিসেবে অনিয়ন্ত্রিত জীবনাচার দেখতে পাচ্ছি। কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়া একটি বড় কারণ। হৃদরোগের যে অসুখ ৬০ বছর বয়সে হওয়ার কথা তা ৪০ বছর বয়সে হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া হৃৎপিণ্ডের অনেকগুলো ঝুঁকি রয়েছে। সেগুলো পরিহার করে চলতে হবে।
অনিয়ন্ত্রিত জীবনাচার, অসম খাদ্যাভ্যাস ও নিষ্ক্রিয় জীবনযাপন হৃদরোগকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে কতটুকু দায়ী?
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব বিষয় দায়ী বলা যায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ যত হবে, ততই মানুষের জীবনযাপন অনিয়ন্ত্রিত হবে। মানুষের হাঁটার জায়গা কমে যাবে। ব্যায়াম করার জায়গা কম থাকবে। তার পরও যদি সেটা সঠিকভাবে হয়, পরিকল্পনা করে হয় তবে রোগের বোঝা কমানো যায়। বৈজ্ঞানিকভাবে নগরায়ণ হচ্ছে না। ফলে চিকিৎসার উন্নতি যতই হোক না কেন রোগ বেড়েই যাচ্ছে।
অসংক্রামক রোগে মৃতদের সিংহভাগই হৃদরোগে মারা যাচ্ছেন। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়ার কারণেই কি এত বেশি মৃত্যু হচ্ছে?
সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়া একটি কারণ। তার চেয়েও বড় বিষয় হলো আমরা এসব রোগকে প্রতিরোধ করতে পারি। চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম হলেও প্রতিরোধের বিষয়ে আমাদের সবার কার্যক্রম ও সচেতনতা কম। রোগ প্রতিরোধের জন্য যে পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করতে হবে সেগুলো অনুপস্থিত। প্রতিরোধের সঙ্গে সঙ্গে আমরা চিকিৎসা ব্যবস্থারও যদি উন্নয়ন করি তাহলে রোগীরা ভালো থাকবে এবং মৃত্যুর সংখ্যা কমে যাবে। এছাড়া পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়ার হারও কমবে।
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগ ছাড়াও অন্যান্য অসংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগকে প্রভাবিত করে। ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আপনার পরামর্শ কী?
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। কেননা ডায়াবেটিস এমন একটা রোগ যা মানুষের মাথা থেকে পা পর্যন্ত যত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে তাতে রোগের বিস্তার ঘটাতে ও অকেজো করতে দায়ী। যেমন কিডনি রোগ, স্ট্রোক, অন্ধত্ব হওয়ার জন্যও দায়ী। এতে হার্ট অ্যাটাক ও বিভিন্ন হৃদরোগ হতে পারে। হাত ও পায়ের যে ধমনি আছে সেখানে পেরিফেরাল ভাসকুলার ডিজিজ হয়। তখন অনেক সময় হাত ও পা কেটে ফেলতে হয়। উচ্চ রক্তচাপও মাথা থেকে পা পর্যন্ত সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সমস্যা ঘটাতে পারে। সুতরাং উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ কমে আসবে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় হৃদরোগের চিকিৎসা বিদ্যমান। সরকারি পুরনো সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যাথল্যাব পর্যন্ত আছে। সেসব হাসপাতালে সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) রয়েছে। বেসরকারি কয়েকটি হাসপাতালে এখন মোটামুটি উন্নত মানের চিকিৎসা পাওয়া যায়। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা বহুদূর এগিয়ে গেছে। পরিপূর্ণ চিকিৎসা বলতে যা বোঝায় তা বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেয়া কঠিন। আমাদের জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট গত কয়েক বছরে অনেক সমৃদ্ধ হয়েছে। এখন সাড়ে বারোশ শয্যার এ হাসপাতাল বিশেষায়িত চিকিৎসা দিচ্ছে।
হৃদরোগে আক্রান্তদের জেলা ও জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে তাদের জরুরি চিকিৎসা দিয়ে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠানোর ক্ষেত্রে কী কী সীমাবদ্ধতা এখনো রয়ে গেছে বলে মনে করছেন?
বাংলাদেশে এখন প্রায় সোয়া এক হাজার হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। আমাদের প্রায় প্রতিটি উপজেলায়ই একজন করে কার্ডিওলজিস্ট রয়েছেন। প্রতিটি জেলা হাসপাতালেও রয়েছেন। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কার্ডিওলজিস্টদের টিম আছে। সেখান থেকে তারা যদি রোগীকে যথাযথভাবে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠান তাহলে রোগীর ঝুঁকি কমে যাবে। চিকিৎসা উপকরণের যে ঘাটতি কোথাও কোথাও রয়েছে তা দ্রুত সমাধান করতে হবে।
হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগের কোনো জটিলতা দেখা দিলে রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে, এনজিওগ্রাম ও অন্যান্য পরীক্ষা করে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠাতে হবে। সব জেলা হাসপাতাল সেই পর্যায়ে এখনো আসেনি। বিষয়টি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
বয়স্ক লোক বা কারো যদি কোনো ঝুঁকি থাকে যেমন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে, কায়িক পরিশ্রম না করলে, এমন ব্যক্তির হঠাৎ বুকে ব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গে যদি তিনি স্থানীয় হাসপাতালে গিয়ে পৌঁছান; সেখানকার চিকিৎসক তার প্রাথমিক পর্যায়ে একটা ইসিজি করবেন। এরপর বুঝতে পারবেন যে তার হার্টের সমস্যা হয়েছে কিনা। তাহলে পরের ধাপের পরীক্ষাগুলো করে হার্ট অ্যাটাক বোঝা যাবে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসাটা দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব তাকে বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রেরণ করতে পারলে রোগীকে বাঁচানো যাবে। এটার জন্য প্রাথমিকভাবে দরকার হলো সচেতনতা। সমস্যার ধরন অনুযায়ী নিকটস্থ কোনো হাসপাতালে চলে যাওয়া। চিকিৎসকদেরও প্রশিক্ষিত করা। তাহলে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রোগীকে বিশেষায়িত কোনো হাসপাতালে পাঠানো সহজ হবে।
রাজধানীর বাইরে কার্ডিয়াক চিকিৎসা প্রসারের ক্ষেত্রে আপনার পরামর্শ কী?
রাজধানীর বাইরে কার্ডিয়াক চিকিৎসা প্রসারের ক্ষেত্রে সরকারের বিশাল কর্মযজ্ঞ রয়েছে। প্রায় সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্যাথল্যাব আছে। হার্ট অ্যাটাক হলে রোগীকে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা করানো ও প্রয়োজন হলে প্রাইমারি পিসিআই বা প্রাইমারি পারকিউটেনিয়াস করোনারি ইন্টারভেনশন করতে পারি। সরকারের আট বিভাগের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য কাজ করছে। এতে ক্যান্সার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের চিকিৎসা হবে। সেখানে ওপন হার্ট সার্জারি থেকে শুরু করে সব ধরনের চিকিৎসা হবে। তখন আর চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে হবে না।
দেশে হৃদরোগের চিকিৎসায় সরকারের সর্বোচ্চ হাসপাতাল জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল বা এনআইসিভিডি। আপনি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে কী কী প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে?
আমরা সব ধরনের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছি। আগে আমাদের সাতটি ওয়ার্ড ছিল, এখন ২৩টি হয়েছে। চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকার আমাদের সহযোগিতা করতে চায়, আমরা সেই সহযোগিতা নিচ্ছি। এনআইসিভিডিতে সব ধরনের প্রযুক্তি আছে। এছাড়া ২০২২ সালে সরকারি সহযোগিতায় ইন্ট্রাভাসকুলার আল্ট্রাসাউন্ড, রোটা অ্যাবলেশন, ইন্ট্রা ভাসকুলার লিথোট্রিপসির মতো পাঁচটি নতুন প্রযুক্তি শুরু করতে পেরেছি। নতুন দুটি ক্যাথল্যাব ও দুটি কোর্স চালু করেছি। এটিই বাংলাদেশের প্রথম হাসপাতাল, যেখানে ২৪ ঘণ্টা ভাসকুলার সার্জারি হয়। আমি মনে করি প্রাইভেট যতটুকু সেবা দেয়, সরকারের পক্ষে আরো বেশি সেবা দেয়া সম্ভব। তবে বর্তমানে আমাদের প্রতিবন্ধকতা হলো দক্ষ জনবলের অভাব, এনআইসিভিডিতে শয্যার তুলনায় দক্ষ জনবল অপ্রতুল। সেটাও প্রক্রিয়াধীন, আগামীতে আমরা পেয়ে যাব।
হৃদরোগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা প্রশিক্ষিত নার্সের সংকট সামধানের জন্য কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?
সেটা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো প্রশিক্ষণ। এ ইনস্টিটিউটের দক্ষ জনবল দিয়ে দেশের সব ফিজিশিয়ানদের পালাক্রমে আমরা প্রশিক্ষণ দিতে পারি। সর্বাধুনিক চিকিৎসা দিতে পারলে মৃত্যুহার কমে আস। আমাদের ৭০-৮০ শতাংশ জেনারেল ফিজিশিয়ান, তাদের যদি পালাক্রমে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়, তাহলে হৃদরোগের ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসা দেয়া সম্ভব।
হৃদরোগ চিকিৎসায় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কেমন? গত কয়েক দশকের সঙ্গে যদি আমরা তুলনা করি সেক্ষেত্রে কী দেখতে পাই?
হৃদরোগ গবেষণার ক্ষেত্রে আমরা অনেক দূর এসেছি। টারশিয়ারি হাসপাতাল ছাড়াও অন্যান্য হাসপাতালে হৃদরোগ চিকিৎসার ক্ষেত্রে যেমন উন্নতি হচ্ছে এবং গবেষণার কাজও উন্নতির দিকে।
এনআইসিভিডি কতটা সেবা দিতে পারছে? মানুষের আস্থা অর্জনে এনআইসিভিডি কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে?
১৭ বা ১৮ কোটি লোকের জন্য একটা বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট যথেষ্ট নয়। এখন বিভিন্ন ইনস্টিটিউট তৈরি হচ্ছে ও কার্ডিয়াক রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তবে ক্যাথল্যাব যদি আরো বাড়ানো যায় তবে আরো রোগীর সেবা দিতে পারব। এ সেবার মান ওয়ার্ল্ড স্ট্যান্ডার্ড। এবারো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের সাড়ে ৭ কোটি টাকা দিয়েছেন, যা দিয়ে আমরা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনেছি এবং ব্যবহার করছি। এ টাকা দিয়ে ৬০০ স্ট্যান্ট, ৩০০ পেসমেকার, ৩০০ ভালভ ইত্যাদি কিনেছি। আমরা ধারাবাহিকতা ধরে রাখছি। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট যতটা সম্ভব সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া সারা দেশের রোগীদের একমাত্র ভরসাস্থল হিসেবে আরো অনেক কিছু করার আছে। এনআইসিভিডির ওপর মানুষের আস্থা রয়েছে। কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতিনিয়তই তা সমাধান করা হয়।