ভূমিকা
এ লেখার বিষয়বস্তু এত বিষয় থাকতে এখন কেন প্রাসঙ্গিক মনে হলো সেই প্রশ্নটি পাঠক রচনাটি পড়ার আগেই করতে পারেন। এক্ষেত্রে আমার কৈফিয়ত হচ্ছে—এখন আগস্ট মাস এবং ইতিহাসের এই বিষয়টি এ মাসে রাজনৈতিক মহলে একটি প্রাসঙ্গিক আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। যখন স্থির করলাম এ বিষয়ে কিছু লিখব, তখন মনে হলো অতীতের একটি বিষয় কেন এবং কীভাবে পরবর্তী ইতিহাসের জন্য প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে সেটিই সর্বাগ্রে লেখা দরকার। ভাবতে ভাবতে মার্ক্সের একটি উদ্ধৃতির কথা মনে পড়ে গেল। সব প্রগতিশীল ইতিহাস পাঠকের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
মার্ক্সের একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি ইতিহাসের ছাত্ররা মার্ক্সের একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতি প্রায়ই উদ্ধৃত করে থাকেন। মার্ক্স তার সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘The Eighteenth Burmmaire of Louise Bonaparte’ শুরু করেছিলেন সেই উদ্ধৃতিটি দিয়ে। মার্ক্সের ওই গ্রন্থের বহুল উদ্ধৃত প্রথম বাক্যটি ছিল:
Hegel remarks somewhere that all facts and personages of great importance in world history occur, as it were, twice. He forgot to add: the first time as tragedy, the second as farce. [ Marx, Engels, Selected Works, vol.-one, progress publishers, fifth printing, 1983, p-398]
বাংলায় এর অর্থ:
হেগেল কোনো এক জায়গায় বলেছিলেন যে যাবতীয় সত্য ঘটনা ও ব্যক্তি যা কিছু ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্বে যেন দুবার অনুষ্ঠিত হয়। হেগেল বলতে ভুলে গিয়েছিলেন যে প্রথমবার তা ঘটে ট্র্যাজেডি বা বিয়োগান্তক হিসেবে আর দ্বিতীয়বার তা ফিরে আসে প্রহসন হিসেবে। (নিজস্ব বঙ্গানুবাদ)
‘বাকশাল’কে আমার মনে হয় অনুরূপ একটি ঐতিহাসিক ঘটনার মতো। প্রথমেই বলে নেয়া দরকার ‘বাকশাল’ জিনিসটা আসলে কী? আক্ষরিকভাবে দেখলে বলা যায়, ‘বাকশাল’ একটি ‘সংক্ষিপ্ত নাম’—এর পূর্ণ শব্দটি হচ্ছে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’। আসলে ১৯৭৫ সালে আওয়ামী লীগ ও স্বাধীন বাংলাদেশের তদানীন্তন একচ্ছত্র নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের Brain child ছিল ‘বাকশাল’ নামক ‘একটি একদলীয় শাসন ব্যবস্থা’। ‘গণতান্ত্রিক বহুদলীয় পথে সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়ে বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন। [দেখুন দৈনিক সমকালে প্রকাশিত বিনায়ক সেন লিখিত ‘বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ৭টি বৈশিষ্ট্য’ ধারাবাহিক রচনা অথবা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ লিখিত, ‘উন্নয়নশীল দেশের গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র: একটি রূপরেখা’ নামক গ্রন্থটি। অতিসম্প্রতি বিআইডিএস, বাংলাদেশ উন্নয়ন সমীক্ষা, বার্ষিক সংখ্যা, ২০২৩ জার্নালে এ লেখাগুলো প্রকাশিত হয়েছে।]
বাকশালকে বঙ্গবন্ধু ‘দ্বিতীয় বিপ্লব’ হিসেবে অভিহিত করেন। বাকশালের উল্লেখযোগ্য ও অভিনব প্রধান তিনটি কর্মসূচি ছিল:
১. দেশে একটি মাত্র রাজনৈতিক দল থাকবে, যার নাম হবে কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। মনে হয় ধারণা করা হয়েছিল যে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক-শ্রমিকরাই হবেন এ দলের মালিক। ওই একদলীয় শাসনকে বঙ্গবন্ধু নামকরণ করেছিলেন ‘শোষিতের গণতন্ত্র’। প্রকৃতপক্ষে ছিল প্রধানত অকৃষক ও অশ্রমিক, শোষক-শোষিতদের মিশ্রিত একটি মাল্টিক্লাস দল। বিপুলসংখ্যক কৃষক-শ্রমিক তখনো সেই দলে হয়তো ছিল—কিন্তু ছিল নীরব ও অসচেতন সমর্থক হিসেবে। স্বাধীনতার ঊষালগ্নে কিছু সংশয়-কিছুটা হতাশা-কিছু প্রত্যাশা নিয়ে তারা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব মেনে নিয়েছিলেন। এ ধরনের মিশ্র শোষক-শোষিতের বিশাল দলের চরিত্র নির্ভর করে কারা এ দলের নেতৃত্বে বা শীর্ষে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন তার ওপর। তাই বঙ্গবন্ধুর কাঙ্ক্ষিত ‘বাকশাল’ জন্মলগ্নে একটি কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নদল হিসেবেই যাত্রা শুরু করে এবং স্বপ্নজন্মের অল্পদিন পরেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নদলটি আঁতুড়ঘরেই মৃত্যুবরণ করে। যদিও এর পরও আওয়ামী লীগের ক্ষুদ্র একটি অংশ আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে ‘বাকশাল’ টিকিয়ে রাখার শেষ একটি চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শেষাবধি বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা স্বয়ং যখন বাকশাল বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে বহুদলীয় রাজনৈতিক পন্থায় পুনরায় ফিরে গেলেন তখন বাকশাল সমর্থকরাও আবদুর রাজ্জাকসহ পুনরায় আওয়ামী লীগেই ফিরে যান বা যেতে বাধ্য হন। এভাবেই বাকশাল ট্র্যাজেডির করুণ পরিসমাপ্তি হয়।
২. বাকশালের ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের আরেকটি উল্লেখযোগ্য মৌলিক পরিবর্তনের কর্মসূচি ছিল, প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ ও নির্বাচিত জেলা প্রশাসকের অধীনে বিকেন্দ্রীভূত গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এক কথায় আমলাতন্ত্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ভেঙে দিয়ে তৃণমূলে বিকেন্দ্রীভূত নির্বাচিত প্রশাসনিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। শত বছরের ঔপনিবেশিক ঘুণে ধরা আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে এটি ছিল একটি সত্যিকার মৌলিক যুদ্ধ ঘোষণা। যদিও এ ঘোষণাও ছিল স্বপ্নের মতো। জেলায় জেলায় প্রথমবারের মতো মনোনীত কিছু গভর্নরের তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল মাত্র। সে সময় সেটুকুতেই অবশ্য কেন্দ্রীয় আমলাতন্ত্রের ঘুম হয়তো প্রথমবারের মতো হারাম হয়ে গিয়েছিল!
৩. সর্বশেষ কর্মসূচিটি ছিল কৃষি ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের কর্মসূচি। কৃষিজমির ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা বাতিল না করে যৌথ চাষের নিয়ম চালু করা হয়। জমির আইল উঠিয়ে দিয়ে জমি একত্র করার প্রস্তাব দেয়া হয়। সেই যৌথ চাষের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ বাজারের পরিবর্তে রাষ্ট্র থেকে বিকেন্দ্রীভূত নির্বাচিত প্রশাসন বা সমবায় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সংগ্রহ, বিতরণ ও বণ্টনের নিয়ম ঘোষণা করা হয়। উৎপাদন শেষে ফসল বণ্টনের ক্ষেত্রে তেভাগা পদ্ধতি প্রবর্তনের কথা বলা হয়। তাতে এক ভাগ জমির মালিকদের মালিকানাধীন জমির অনুপাতে বণ্টিত হবে, এক ভাগ শ্রমদাতাদের মধ্যে শ্রমের পরিমাণ ও গুণ অনুযায়ী বণ্টন হবে এবং সর্বশেষ ভাগটি উপকরণ সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষের হাতে প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। এ পরিকল্পিত, কৃষি উৎপাদন ও বণ্টন ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক রূপের বিষয়টি নিয়ে তখন নানা এক্সপেরিমেন্ট জল্পনাকল্পনা চলছিল। কুমিল্লার বার্ডে বা ময়মনসিংহের ফুলপুরে কমিউনিস্ট কৃষি অর্থনীতিবিদরা ড. মোয়াজ্জেম হোসেনের নেতৃত্বে এসব গবেষণা নিবিড়ভাবে পরিচালনা করছিলেন। কিন্তু এগুলোও কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নীলনকশা রূপে বা বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে থাকতে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে বঙ্গবন্ধুর শত্রুরা মেরে ফেলে। ফলে বাকশাল কৃষি কর্মসূচিটি টেকঅফ করার আগেই মুখ থুবড়ে রানওয়েতে পড়ে যায়। এটাকেও আমরা বলছি ইতিহাসের ট্র্যাজেডি।
তাই এখন পর্যন্ত বাকশাল টিকে থাকলে কী হতো, এ নিয়ে আমরা যত তর্কই করি না কেন, তা আজ বৃথা। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে একে আমাদের একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ বিয়োগান্তক ট্র্যাজেডি হিসেবেই দেখতে হবে এবং তা থেকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা নিতে হবে। বস্তুত প্রথমে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিকভাবেই সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন। তখন চরম বামপন্থী, চরম ডানপন্থী ও বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সশস্ত্রভাবে তাকে সন্ত্রাসী প্রতিআক্রমণ শুরু করেছিল। বাকশাল গঠনের আগেই জাসদ, সর্বহারা পার্টি, মাওবাদী আন্ডারগ্রাউন্ড দলগুলো ও স্বাধীনতার পরাজিত শত্রুরা সরকারকে অগণতান্ত্রিক সশস্ত্র পন্থায় উৎখাতের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। ঈদের জামাতেও তখন গুলিবর্ষণে দ্বিধা করা হয়নি। বাকশাল গঠনের আগে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর সংসদীয় বক্তৃতায় তিনি এসব ঘটনার কিছু বিবরণ উল্লেখ করেছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র থেকে অগণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষায় কি অন্য কোনো অশুভ উদ্দেশ্য ছিল? তখন আমাদের তা মনে হয়নি, যদিও একদলীয় ব্যবস্থা বাংলাদেশে আমরা তখনো সঠিক মনে করিনি। বঙ্গবন্ধু ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার জন্য নয় বরং তা বিকেন্দ্রীভূত করার জন্যই বাকশালের কর্মসূচিগুলোর কথা ভেবেছিলেন। দ্বিতীয়ত তিনি বুর্জোয়া শিল্পপতিদের ক্ষমতা আগেই শিল্প খাতে খর্ব করেছিলেন, যদিও জাতীয়করণ শিল্পের পরিচালনায় ঈপ্সিত সফলতা আসেনি। একই সঙ্গে লক্ষণীয় যে মধ্যবিত্ত ও উদ্বৃত্ত কৃষকের দল আওয়ামী লীগের পক্ষে [এ ধরনের দলকে কালেস্কির তত্ত্বানুসারে বলা হয় Intermediate Regime, রেহমান সোবহান ও মোজাফ্ফর আহমদ, PE in an Intermediate Regime, BIDS, দ্র.] ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত কৃষিতে কিছু করা সম্ভব হয়নি। তদানীন্তন পরিকল্পনা কমিশনের ৫ একর সিলিং ও পুনর্বণ্টনমূলক ভূমি সংস্কার প্রস্তাব বা এমনকি শুধু ১০০ বিঘা সিলিং প্রস্তাবও তখন আওয়ামী লীগ সরাসরি গ্রহণ করেনি। বঙ্গবন্ধু সংসদে এ ধরনের প্রস্তাব নেয়ার পর উত্তরবঙ্গের জোতদার এমপিদের চাপের কাছে নিজেই নতি স্বীকার করেছিলেন। এর এক বছর পর ১৯৭৫ সালে শেষ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু কৃষি খাতেও একটি অভিনব উপায়ে শ্রমজীবী কৃষকদের ক্ষমতা বাড়াতে চেয়েছিলেন, যার বর্ণনা আগেই উল্লিখিত হয়েছে। তিনি কেন্দ্রে একটি দল বানালেও তাতে সব দলকেই [এমনকি স্বাধীনতাবিরোধীরা ছাড়া অন্য সব দলকেই!] স্থান দিয়েছিলেন এবং গণতন্ত্রকে তৃণমূলে বেশি সক্রিয় ও বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন। আকাঙ্ক্ষা হিসেবে এগুলো সবই ছিল গণমুখী এবং নির্বাচনী গণতন্ত্রের পরিসীমা ছাড়িয়ে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রাভিমুখী।
কিন্তু বাকশাল ব্যর্থ হলো কেন?
বাকশাল আঁতুড়ঘরেই মৃত্যুবরণ করেছিল, কারণ বাকশালের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বাকশালের হত্যাকারীরা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তারাই বাকশালের কোটর থেকে বের হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন।
বাকশালের সমর্থক সেজে তার ভেতরেই ঘাপটি মেরে ছিলেন খন্দকার মোশতাক, শাহ মোয়াজ্জেম, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর প্রমুখ বাকশালবিরোধী শক্তি। ছিলেন জিয়াউর রহমান, কর্নেল তাহের, মাহবুব আলম চাষী প্রমুখ সামরিক-বেসামরিক আমলারা। ছিলেন ছদ্মবেশী আমলা ড. আব্দুস সাত্তার, যিনি ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান থেকে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধুর সেক্রেটারিয়েটে সদস্য হয়েছিলেন এবং বাকশালের পক্ষে অন্যতম স্তাবক ছিলেন [দেখুন রেহমান সোবহানের স্মৃতিকথা Untranquil recollections, Sage, 2021, p-303]। অথচ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর মোশতাকের সেক্রেটারি হিসেবে তিনিই প্রকাশ করেন বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের দুরবস্থার ওপর তথাকথিত শ্বেতপত্র (white paper).
অন্যদিকে সেই সময় বাকশালের বিপ্লবী সংস্কার কর্মসূচিগুলোকে যারা সত্যিই কার্যকর করতে চাচ্ছিলেন সেই গঠনমূলক বাম শক্তি তখন দ্বিধায় পড়ে যায়। তখন যে প্রস্তাব নিজেদের মধ্যে গোপনে তারা গ্রহণ করেছিলেন, তাতে তারা বলেছিলেন যে ‘বাকশাল’-এর ভেতরে গোপনে থেকে একটি স্বাধীন গ্রুপ হিসেবে তারা চেষ্টা করবেন To make
bes t out of the wors t. অর্থাৎ তারা অগত্যা বাকশালে যোগ দিয়েই বাকশালকে যথাসম্ভব শুদ্ধ ও ঠিক করার চেষ্টা চালাতে চেয়েছিলেন। পাঁড় দক্ষিণপন্থী ও উগ্র বামপন্থীরাও সে ধরনের নিজ নিজ পরিপ্রেক্ষিত থেকেই তখন বাকশালে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন।
পরিকল্পনা কমিশনের মূল পরিকল্পকরা, কোনো কোনো একাডেমিশিয়ান [প্রফেসর রাজ্জাক, প্রফেসর আনিসুজ্জামান, প্রফেসর রওনক জাহান প্রমুখ উল্লেখযোগ্য] ও অন্যান্য অনেক স্বাধীনচেতা লোকই তখন বঙ্গবন্ধুর প্রতি ব্যক্তিগত আস্থা থাকলেও বাকশালে যোগ না দিয়ে বিদেশে বা অন্যত্র অবস্থান নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাই তখন একদিকে শত্রু পরিবেষ্টিত, অন্যদিকে বন্ধুহীন হয়ে পড়েছিলেন। তখন তার একটি প্রিয় সংগীত ছিল, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে।’ [দেখুন ইউপিএল এমএম আকাশ, বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন, ২০২২, পৃ. ৭১]
বন্তুত মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধু তার বাম বন্ধুদের সম্পর্কে অভিযোগ এনেছিলেন যে তারা চলেন আকাশে বা বিমানে আর তিনি চলেন মাটিতে—বাকশাল গঠনের পর তার সেই কমিউনিস্ট বাম বন্ধুরাই তার বিরুদ্ধে বলতে শুরু করলেন যে ‘বঙ্গবন্ধু চলেন আকাশে ও বিমানে—কমিউনিস্টরা চলতে চান মাটিতে’। তবে এর পরও কমিউনিস্টরা বিশেষ করে মস্কোপন্থীরা অনেকেই সেই দুঃসময়ে তাকে একলা ফেলে চলে যাননি। প্রতিকূল হলেও তদানীন্তন কমিউনিস্ট পার্টি তার ওপরই শেষ বাজিটা রেখেছিল।
এর পরও বলতে দ্বিধা নেই যে বাকশালের প্রগতিশীল আর্থসামাজিক কর্মসূচিগুলো নিয়ে আসলে খুব বেশি বিতর্ক নেই। আজও বাংলাদেশে বিকেন্দ্রীভূত প্রশাসন এবং শ্রমজীবীদের জন্য ইতিবাচক সুযোগ বৃদ্ধি করার লক্ষে কৃষিতে ভূমি সংস্কার বা ভূমিস্বত্বের সংস্কার দরকার। এমনকি সিঙ্গাপুর-তাইওয়ান-দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রাক্তন ঔপনিবেশিক বা
Pos t Colonial দেশগুলোতে পুঁজিবাদী পথে কিছুটা যে সাফল্য সাধিত হয়েছে তাতেও সেখানে যেসব সংস্কারের কাজ তাদের কোনো না কোনো সময়ে করতেই হয়েছে সেগুলোও একই রকম কর্মসূচি বটে! আজ তাই বাংলাদেশের সব দেশপ্রেমিক গণমুখী রাজনৈতিক শক্তি মাত্রেই স্বীকার করেন কৃষি সংস্কার ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনের কথা।
বর্তমানে অবশ্য সেই রামও নেই সেই অযোধ্যাও নেই। এখন বঙ্গবন্ধুও নেই, বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগও নেই। বিদ্যমান আওয়ামী লীগে শুধু যে কৃষক-শ্রমিকের আধিপত্য নেই তা নয়, দলটি তার Intermediate Regime চরিত্রও বজায় রাখতে পারেনি, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আজ মধ্যবিত্তদের দিকে না ঝুঁকে দলটি বর্তমানে শোষক উচ্চবিত্ত তথা ধনী শিল্পপতি এবং ধনী আমলাদের সঙ্গে আপস করেছে এবং তাদের আধিপত্যে পরিচালিত হতে শুরু করেছে। এমনকি ‘জাতীয় নির্বাচনে’ থ্রি-এমের [3M=Money+Muscle+ Manipulation] ব্যবহার করে নিজের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার চেষ্টা করছে। জনগণের থেকে দলটি তাই ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন হতে হতে এখন Fair নির্বাচনে তার জয়লাভ সম্ভব বলে এখন অনেকেই বিশ্বাস করেন না।
এ অবস্থায় বামপন্থীদের মধ্যে কেউ কেউ আবারো যদি দাবি করেন আগের মতোই বর্তমান আওয়ামী লীগকে দিয়েই তারা বাকশালের কর্মসূচিগুলোকে পুনরায় কার্যকর করতে পারবেন, তাহলে সেই চেষ্টার পরিণতি আজ শুধু ট্র্যাজেডি হবে না, হবে একটি হাস্যকর প্রহসন বা Farce.
এম এম আকাশ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়