দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মেরুদণ্ড এসএমই খাত

বৈশ্বিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) দখলে। মোট কর্মসংস্থানের অর্ধেকের বেশি হয় এ খাতের মাধ্যমে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রাধান্য বেশি। ফলে এক্ষেত্রে এসএমই খাতের গুরুত্ব ও অবদান আরো বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত চার দশকে দেশের এসএমই খাতের উৎপাদন ক্রমে বাড়ছে। আর গত দুই দশক দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে

বৈশ্বিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) দখলে। মোট কর্মসংস্থানের অর্ধেকের বেশি হয় এ খাতের মাধ্যমে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রাধান্য বেশি। ফলে এক্ষেত্রে এসএমই খাতের গুরুত্ব ও অবদান আরো বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত চার দশকে দেশের এসএমই খাতের উৎপাদন ক্রমে বাড়ছে। আর গত দুই দশক দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাতের অবদান বাড়ছে ধারাবাহিকভাবে।

দেশের এসএমই খাতের আকার ও জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে এ খাতের অবদান নিয়ে গত বছরের নভেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় টেকসই উন্নয়ন অর্জনের অন্যতম একটি মূল উপাদান হয়ে উঠেছে এসএমই খাত। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জাতীয় আয়ে আনুষ্ঠানিক এসএমই খাতের অবদান ৪০ শতাংশ। এশিয়ার অনেক দেশেই শিল্প খাতে এসএমইর অবদান ৯০ শতাংশ এবং মোট জনশক্তির ৬০ শতাংশের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে থাকে এ খাত। 

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এসএমই খাতের অবদান আরো অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। কারণ এ খাতের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় আকারের শিল্পের তুলনায় অনেক কম বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়। অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব, উদ্ভাবন ও বাণিজ্যসহ বিভিন্নভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে এসএমই খাত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণা প্রতিবেদনে ১৯৭৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশের এসএমই খাতের উৎপাদনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে দেশের এসএমই খাতের উৎপাদন ছিল ৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এরপর থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এ খাতের উৎপাদন ৫ হাজার  থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যেই স্থিতিশীল ছিল। ১৯৯২ সালের পরে এ খাতের উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। ১৯৯৪ সালে এসএমই খাতের উৎপাদন দাঁড়ায় ৬ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। ২০০০ সালে এটি আরো বেড়ে ৯ হাজার ৪৩৩ কোটি হয়। পরবর্তী পাঁচ বছরে এটি ১০০ শতাংশের বেশি বেড়ে ২০০৫ সালে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকায়। এর ১০ বছর পর ২০১৫ সালে এসএমই খাতের উৎপাদন দাঁড়ায় ২০ হাজার ৪০ কোটি টাকায়। ২০২০ সাল নাগাদ এটি বেড়ে ৪৩ হাজার ৭৮০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। একইভাবে গত দুই দশকে দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদানও বেড়েছে। ১৯৯৪ সালে যেখানে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ছিল ২ দশমিক ৫৫ শতাংশ, সেটি বেড়ে ২০২০ সাল শেষে ৩ দশমিক ৭৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুসারে, দেশের শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৭৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৫। এর ৯৯ শতাংশই হচ্ছে সিএমএসএমই (কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ) খাতের। এর মধ্যে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ কুটির, ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ ক্ষুদ্র, ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ ছোট ও দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ মাঝারি প্রতিষ্ঠান। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি। সব মিলিয়ে এ খাতে ২ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ সম্পৃক্ত। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ২৪ লাখেরও বেশি। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ সালে। এরপর আর এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ফলে এ বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া না গেলেও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে বর্তমানে এ খাতের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা আরো অনেক বেড়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের জিডিপি উল্লেখযোগ্য হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এক্ষেত্রে দেশের শিল্প খাতের অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুসারে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ছিল ৩৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এটি বেড়ে ৩৪ দশমিক ৯৪ শতাংশে দাঁড়ায়। শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে উৎপাদন খাত। আর উৎপাদন খাতের মধ্যে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের শিল্প খাতে এসএমইর অংশীদারত্ব ছিল ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে সাময়িক হিসাবে জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এতে এসএমই খাতের অবদানও বেড়েছে। এ সময়ে জিডিপিতে উৎপাদন খাতের অবদান ছিল ২৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এর মধ্যে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের অবদান ছিল ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ আর কুটির উদ্যোগের অবদান ছিল ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। কভিড-১৯ অতিমারীর প্রভাব থাকার পরও জিডিপিতে কুটির খাতের অবদান ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে ৩ দশমিক ৯৪ শতাংশে অপরিবর্তিত ছিল। তবে এ সময়ে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের অবদান কমে ৭ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেশের কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পের মোট আকার ছিল ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা, যা ২০১৯-২০ অর্থবছর শেষে বেড়ে ৮ লাখ ৯০ হাজার ২৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে এসএমই খাতের আউটপুট ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে সংযোগের বিষয়টি মূল্যায়ন করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, সরকারের ব্যয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এসএমই আউটপুটের মধ্যে ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক কর্তৃক বেসরকারি খাতে অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন ও মুক্ত বাণিজ্যের সঙ্গে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক সম্পর্ক থাকলে সেটি তুলনামূলক কম উল্লেখযোগ্য। অর্থনীতিতে গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এখনো দেশের এসএমই খাত এর পুরো সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। এক্ষেত্রে খাতটির উন্নয়নে বেশকিছু সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনে। এর মধ্যে রয়েছে পর্যাপ্ত অর্থায়ন সুবিধা নিশ্চিত, রফতানির সুযোগ বৃদ্ধি ও তরুণ জনগোষ্ঠীকে এসএমই উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে নীতি সহায়তা প্রদান অন্যতম।

পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ছোট ও মাঝারি উদ্যোগের (এসএমই) অনেকেরই ব্যাংকের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংযোগ রয়েছে। অন্যদিকে কুটির ও ক্ষুদ্র যারা তাদের ব্যাংকের সঙ্গে সংযোগ নেই বললেই চলে। বাংলাদেশে এসএমইর সংখ্যা খুব বেশি হবে না এবং এর অধিকাংশই শহরে। অন্যদিকে কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের সংখ্যা এক কোটির মতো হবে এবং এগুলোর বিস্তৃতি গ্রামেগঞ্জে বেশি। এর সঙ্গে আড়াই কোটি মানুষ সম্পৃক্ত। তাই নীতি প্রণয়নে এসএমই এবং কুটির ও ক্ষুদ্রদের জন্য ভিন্নতা থাকা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ও কুটির উদ্যোক্তার মধ্যে প্রশিক্ষণ, পণ্য বাজারজাত এবং প্রযুক্তির ক্ষেত্রে জানার ঘাটতি প্রবল। তাছাড়া তারা অর্থায়ন সুবিধাও সেভাবে পায় না। ফলে তাদের এসব ক্ষেত্রে সহায়তা করা অনেক বেশি প্রয়োজন। এসএসই খাতেও সমস্যা রয়েছে তবে তা ক্ষুদ্র ও কুটিরের তুলনায় বেশ কম।

আরও