মহামারীর
পর যুদ্ধের
অভিঘাতে চরম
অনিশ্চয়তায় বৈশ্বিক
অর্থনীতি। এ
অনিশ্চয়তার বাইরে
নেই বাংলাদেশও।
এর মধ্যেই
আজ ২০২২-২৩
অর্থবছরের বাজেট
জাতীয় সংসদে
উপস্থাপন করতে
যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী
আ হ
ম মুস্তফা
কামাল। বৈশ্বিক
এ সংকট
মোকাবেলায় বাজেটে
বিনিয়োগকে প্রাধান্য
দিয়ে কর,
শুল্ক ও
ভ্যাটে বড়
ধরনের পরিবর্তন
আসছে। স্থানীয়
শিল্পের উৎপাদকদের
জন্য থাকছে
করপোরেট করে
ছাড়, আমদানি
পর্যায়ে আগাম
কর থেকে
অব্যাহতির মতো
সুখবর। বাজেটে
এবার বৈদেশিক
মুদ্রা ব্যয়ে
সাশ্রয়ী হতে
বিলাসপণ্যের আমদানি
নিরুৎসাহিত করা
হবে।
ব্যক্তিশ্রেণীর
করদাতাদের থেকে
বেশি রাজস্ব
সংগ্রহের কৌশল
নেয়া হচ্ছে
এবারের বাজেটে।
এছাড়া রফতানি
খাতের কর
বৈষম্য দূর
করে একই
হারে করারোপ
করা হচ্ছে।
পাশাপাশি এক
ব্যক্তির কোম্পানিতে
করছাড়, স্টার্ট-আপ
কোম্পানির কর
হ্রাসের উদ্যোগ
থাকছে। অর্থ
মন্ত্রণালয় ও
জাতীয় রাজস্ব
বোর্ড (এনবিআর)
সূত্রে এসব
তথ্য জানা
গেছে।
সূত্রগুলো
জানায়, বর্তমানে
তৈরি পোশাক
খাতে করপোরেট
কর সাধারণ
গার্মেন্টসের জন্য
১২ শতাংশ
এবং সবুজ
কারখানার জন্য
১০ শতাংশ।
অথচ পশ্চাত্পদ
শিল্প হিসেবে
অ্যাকসেসরিজ শিল্প
বৈদেশিক মুদ্রা
সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ
অবদান রাখলেও
তাদের নিয়মিত
হারে (৩০
শতাংশ) আয়কর
দিতে হয়।
পাট, হিমায়িত
মাছ, প্লাস্টিক,
চামড়া খাতে
বৈষম্য আছে।
আগামী বাজেটে
রফতানি পণ্যের
বৈচিত্র্যকরণকে উৎসাহ
দিতে সব
ধরনের রফতানিমুখী
শিল্পের করপোরেট
কর তৈরি
পোশাক শিল্পের
মতো ধার্য
করা হচ্ছে।
এতে বাণিজ্য
ঘাটতি নিম্নমুখী
হবে। ফলে
বৈদেশিক লেনদেনের
চলতি হিসাবের
ভারসাম্যের পার্থক্য
কমবে।
একজন
উদ্যোক্তা দেশী
হোন বা
বিদেশী, বিনিয়োগের
আগে সবাই
ওই খাতের
করপোরেট কর
কত সেটি
খোঁজখবর নেন।
প্লাস্টিক খাতে
উচ্চ করহার
থাকায় এ
খাতে অনেক
সম্ভাবনা থাকা
সত্ত্বেও অনেকে
বিনিয়োগে আগ্রহ
দেখাননি। বাজেটে
কর কমানো
হলে এ
খাতে নতুন
বিনিয়োগ আসবে।
পাশাপাশি রফতানি
পণ্য বহুমুখীকরণে
সরকারের সদিচ্ছার
প্রতিফলন ঘটবে
বলে মনে
করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমান
সরকার আইসিটি
খাতকে সর্বোচ্চ
গুরুত্ব দিচ্ছে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে
ডিজিটাল বাংলাদেশ
বিনির্মাণে স্টার্ট-আপ
উদ্যোগকে বাজেটে
বিশেষ প্রণোদনা
দেয়া হবে।
বাজেটে স্টার্ট-আপ
উদ্যোক্তাদের আয়কর
রিটার্ন দাখিল
ব্যতীত অন্য
সব ধরনের
রিপোর্টিংয়ের বাধ্যবাধকতা
থেকে অব্যাহতি
দেয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি স্টার্ট-আপ
কোম্পানির লোকসান
নয় বছর
পর্যন্ত সমন্বয়ের
প্রস্তাব থাকছে।
এছাড়া স্টার্ট-আপ
উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে
ব্যয়সংক্রান্ত বিধিনিষেধ
প্রত্যাহার ও
টার্নওভার কর
দশমিক ৬০
শতাংশ থেকে
কমিয়ে দশমিক
১০ শতাংশ
করা হচ্ছে।
এছাড়া
বাজেটে মোটরগাড়ি
উৎপাদন শিল্পে
ভ্যাট অব্যাহতি
সুবিধা দেয়া
হচ্ছে। বর্তমান
ফ্রিজ, এসি,
টিভি, হোম
অ্যাপ্লায়েন্স, মোবাইল
সংযোজন, লিফট
সংযোজন শিল্পে
এ সুবিধা
দেয়া আছে।
তবে ফ্রিজ
উৎপাদনে ভ্যাট
অব্যাহতি সুবিধার
মেয়াদ ৩০
জুন শেষ
হওয়ায় বাজেটে
৫ শতাংশ
ভ্যাট আরোপ
করা হচ্ছে।
সরকার
দেশী-বিদেশী
নতুন বিনিয়োগ
আকর্ষণের লক্ষ্যে
করপোরেট করহার
কমানোর সিদ্ধান্ত
নিয়েছে। এক্ষেত্রে
শর্তসাপেক্ষে পুঁজিবাজারের
তালিকাভুক্ত ও
তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির
করহার আড়াই
শতাংশ কমিয়ে
যথাক্রমে ২০
ও ২৭
দশমিক ৫০
শতাংশ করা
হচ্ছে। এক্ষেত্রে
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত
কোম্পানিকে পরিশোধিত
মূলধনের ১০
শতাংশ শেয়ার
অফলোড করতে
হবে। তা
না হলে
করছাড়ের সুবিধা
পাওয়া যাবে
না। আর
তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির
যাবতীয় লেনদেন
ব্যাংক অথবা
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের
মাধ্যমে সম্পন্ন
করতে হবে।
অন্য সব
খাতে করপোরেট
কর অপরিবর্তিত
থাকছে। বিনিয়োগ
বেড়ে নতুন
করদাতা সৃষ্টি
হলে মোট
রাজস্বে প্রভাব
পড়বে না
বলে মনে
করছে এনবিআর।
পাশাপাশি কর্মসংস্থান
সৃষ্টিও সরকারের
লক্ষ্য।
এদিকে
উৎপাদন খরচ
কমানোর লক্ষ্যে
সরকার উৎপাদকদের
কাঁচামাল সরবরাহের
ওপর উৎসে
কর ৭
শতাংশ থেকে
কমিয়ে ৪
শতাংশ করা
হচ্ছে। এছাড়া
ব্যবসায়িক পণ্য
সরবরাহের ওপর
উৎসে করহার
৭ শতাংশ
থেকে কমিয়ে
৫ শতাংশ
এবং সরকারি
বই ছাড়া
অন্য বই
সরবরাহের ওপর
৭ শতাংশ
থেকে কমিয়ে
৩ শতাংশ
করা হবে।
এ
প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই
সভাপতি জসিম
উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন,
যেসব ছাড়
দেয়ার কথা
শোনা যাচ্ছে
তা বাস্তবায়ন
হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের
জন্য ভালো।
তবে সরকারের
মোট রাজস্ব
আহরণ বাড়ানো
হচ্ছে। অর্থাৎ
কোনো কোনো
ফি বা
কর অবশ্যই
বাড়বে। তাই
পুরো বাজেট
দেখেই বোঝা
যাবে প্রকৃত
অবস্থা।
এছাড়া
বাজেটে উৎপাদনশীল
প্রতিষ্ঠানের আমদানি
পর্যায়ে আগাম
কর দেয়ার
বিধান প্রত্যাহার
করা হতে
পারে। পরিশোধিত
আগাম কর
সমন্বয়ের জটিলতা
দূর করার
লক্ষ্যে এ
উদ্যোগ নেয়া
হচ্ছে। এনবিআর
সূত্রে জানা
গেছে, অধিকাংশ
ক্ষেত্রেই আগাম
করের অর্থ
রিফান্ড বা
ফেরত দিতে
হচ্ছে। সেজন্য
আমদানিনির্ভর কাঁচামাল
ব্যবহারকারী ম্যানুফ্যাকচারিং
প্রতিষ্ঠানের আগাম
করের বিধান
প্রত্যাহার করা
হতে পারে।
বিশেষ করে
সিমেন্ট, সিরামিক,
বেভারেজ, ভোজ্যতেল,
গ্যাস, পেট্রোলিয়াম
খাতসহ বিভিন্ন
খাতের জন্য
এ সুবিধা
দেয়া হতে
পারে।
নতুন
বাজেটে ডিজিটাল
বাংলাদেশের প্রসারের
জন্য অনাবাসী
ব্যান্ডউইডথ পেমেন্টের
ওপর উৎসে
করহার ২০
শতাংশ থেকে
কমিয়ে ১০
শতাংশ করার
প্রস্তাব করা
হতে পারে।
এছাড়া অবৈধ
চ্যানেলের মাধ্যমে
বিল পরিশোধকে
নিরুৎসাহিত করার
লক্ষ্যে বিদেশী
সংস্থাগুলোয় অন্যান্য
পরিষেবা প্রদান
থেকে উৎসে
কর আদায়ের
হার ৩০
শতাংশ থেকে
কমিয়ে ২০
শতাংশ করা
হবে।
এদিকে
ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের
জন্য আগামী
অর্থবছরের বাজেটে
বিশেষ কোনো
সুখবর থাকছে
না। করমুক্ত
আয়সীমা ৩
লাখ টাকা
অপরিবর্তিত থাকছে।
আবার ব্যাংক
হিসাবে জমার
বিপরীতে আবগারি
শুল্ক বাড়ানো
হচ্ছে। ১০
লাখ টাকার
বেশি যাদের
আমানত বা
ঋণ আছে,
তাদের বেশি
পরিমাণে আবগারি
শুল্ক দিতে
হবে। অন্যদিকে
সব করদাতা
শনাক্তকরণ নম্বরধারীর
(টিআইএন) রিটার্ন
দাখিল নিশ্চিত
করতে বিশেষ
ছাড় দেবে
এনবিআর। যেসব
টিআইএনধারী গত
করবর্ষে বা
তার আগেও
আয়কর রিটার্ন
জমা দেননি,
তারা কোনো
ধরনের জরিমানা
ছাড়াই আগামী
করবর্ষে রিটার্ন
দিতে পারবেন।
তবে পরবর্তী
বছর থেকে
আয়কর রিটার্ন
জমা না
দিলে জরিমানা
বা অন্য
কোনো ধরনের
শাস্তির মুখে
পড়তে হবে।
একই সঙ্গে
বেশকিছু ক্ষেত্রে
সেবা নিতে
রিটার্ন জমার
প্রমাণপত্র জমা
দেয়ারও বিধান
আসছে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বণিক বার্তাকে বলেন, বর্তমানের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকার এবার বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা ছাড় দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে সেটা ঠিক হচ্ছে না। করমুক্ত আয়সীমার একটু ওপরে থাকা করদাতাদের প্রতিটি টাকা গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চমূল্যস্ফীতির এ সময়ে তাদের কষ্ট লাঘব করা জরুরি।
জানা
গেছে, অপ্রদর্শিত
আয় প্রদর্শনের
সুযোগও আগামী
বাজেটে সীমিত
করা হচ্ছে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ
করে কালো
টাকা সাদা
করার যে
সুযোগ আছে,
আগামী অর্থবছরে
তা নাও
থাকতে পারে।
ফ্ল্যাট কেনার
ক্ষেত্রেও অপ্রদর্শিত
অর্থ বিনিয়োগের
সুযোগ তুলে
নেয়া হতে
পারে। তবে
বিদেশে কারো
অপ্রদর্শিত সম্পদ
থাকলে তা
আয়কর রিটার্নে
প্রদর্শন বা
দেশে নিয়ে
আসার সুযোগ
রাখা হচ্ছে
বলে জানা
গেছে। অন্যদিকে
ব্যক্তি খাতে
উপহার পাওয়া
সম্পদ করমুক্ত
হিসেবে ঘোষণা
করা হতে
পারে। বর্তমানে
বাবা-মা
যদি সন্তানকে
উপহার দেন,
তাহলে সে
সম্পদ আয়করমুক্ত।
কিন্তু সন্তান
বাবা-মাকে
উপহার দিলে
তার বিপরীতে
আয়কর দিতে
হয়। এ
বিধান তুলে
নেয়া হবে।
এছাড়া
বিলাসপণ্য ও
জরুরি নয়
এমন পণ্য
আমদানি নিরুৎসাহিত
করা হচ্ছে
আগামী বাজেটে।
এরই মধ্যে
এনবিআর ফল,
ফুল, প্রসাধনী
ও আসবাব
খাতের ১৩৫টি
এইচএস কোডের
পণ্য আমদানি
নিরুৎসাহিত করতে
সম্পূরক শুল্ক
৩ শতাংশ
থেকে বাড়িয়ে
২০ শতাংশ
করেছে। বাজেটে
আরো কিছু
পণ্যে এ
ধরনের পদক্ষেপ
নেয়া হবে।
বিশেষ করে
ইলেকট্রনিক ও
ইলেকট্রনিকস পণ্য,
গাড়ি, প্রসাধনী,
পোশাক-পরিচ্ছদ
আমদানি নিরুৎসাহিত
করা হবে।
আবার দেশে
এ ধরনের
পণ্যের উৎপাদন
পর্যায়ে ৫
শতাংশ ভ্যাট
আরোপেরও চিন্তাভাবনা
রয়েছে সরকারের।
এদিকে
কর আইনের
আওতায় কোম্পানি
হিসেবে সংজ্ঞায়িত
সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের
নিরীক্ষিত আর্থিক
প্রতিবেদন জমা
দেয়া বাধ্যতামূলক
করা হবে
২০২২-২৩
অর্থবছরের বাজেটে।
আয়কর অধ্যাদেশ
অনুসারে, যেকোনো
জাতীয়করণকৃত ব্যাংকিং
বা অন্যান্য
আর্থিক প্রতিষ্ঠান,
বীমা সংস্থা
ও শিল্প
বা ব্যবসায়িক
উদ্যোগকে কোম্পানি
হিসেবে বিবেচনা
করা হয়।
আগামী অর্থবছর থেকে ব্যবসা নিয়ন্ত্রক, কর্তৃপক্ষ ও করপোরেশনকেও নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। বর্তমানে যেসব ব্যবসা জয়েন্ট স্টক কোম্পানি অ্যান্ড ফার্মের রেজিস্ট্রারের কাছে নিবন্ধিত তাদের কোম্পানি হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাদের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবৃতি জমা দিতে হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, কোম্পানি ও নিরীক্ষক—উভয়কেই ট্যাক্স কমপ্লায়েন্সের আওতায় আনতে এবং জাল আর্থিক বিবৃতি জমা দেয়া বন্ধ করতে এ পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।