স্টার্টআপ: সম্ভাবনার দ্বার কি খুলতে পারবে বাংলাদেশ?

‘৬৪০ কোটি টাকার বিদেশী বিনিয়োগ পেল শপআপ’। ‘চালডাল সিরিজ সি রাউন্ডে ১০ মিলিয়ন (বা এক কোটি ডলার তুলেছে’। এ রকম খবর কয়েক বছর আগেও কোনো পত্রিকায় চোখে পড়ত না। আর এখন দুটি শীর্ষ দৈনিকের শীর্ষ সংবাদ। প্রথমটি প্রথম আলোর ৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ আর দ্বিতীয়টি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১-এর। পরপর দুই সপ্তাহে দুটি স্টার্টআপ শীর্ষ দৈনিকের

‘৬৪০ কোটি টাকার বিদেশী বিনিয়োগ পেল শপআপ’। ‘চালডাল সিরিজ সি রাউন্ডে ১০ মিলিয়ন (বা এক কোটি ডলার তুলেছে’। এ রকম খবর কয়েক বছর আগেও কোনো পত্রিকায় চোখে পড়ত না। আর এখন দুটি শীর্ষ দৈনিকের শীর্ষ সংবাদ। প্রথমটি প্রথম আলোর ৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ আর দ্বিতীয়টি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১-এর। পরপর দুই সপ্তাহে দুটি স্টার্টআপ শীর্ষ দৈনিকের হেডলাইন দখল করে নিয়েছে। শপআপে বিনিয়োগ করেছে পেপ্যালের সহপ্রতিষ্ঠাতা পিটার থিয়েলসহ তিনজনের প্রতিষ্ঠিত ফান্ড ভালার ভেঞ্চারসের নেতৃত্বে প্রসুস ভেঞ্চারস, ফ্লারিস ভেঞ্চার, ভারতের সিকুইয়া ভেঞ্চার ও ভিওন ভেঞ্চার। টাভিট হ্যানরিকুইসের নেতৃত্বে চালডালে বিনিয়োগ করেছে স্টেম টামকিভি, এক্সপ্লোরেশন ক্যাপিটাল ও বাংলাদেশের মীর গ্রুপ।

বাংলাদেশে ইতিহাস: বাংলাদেশে স্টার্টআপের ইতিহাস বেশি পুরনো নয়। বড়জোর এক দশক। বিকাশকে প্রথম সফল স্টার্টআপ বিবেচনা করা যায়, যার জন্ম ২০১০ সালে (এর আগে একই উদ্যোক্তা সেল বাজার শুরু করেছিলেন। সফলও হয়েছিলেন। পরে গ্রামীণফোনের কাছে বিক্রি করে দেন)। বিশ্বব্যাংকের বাণিজ্যিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইএফসি ২০১৩ সালে এবং বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন বিকাশে ২০১৪ সালে বিনিয়োগ করে। ২০১৮ সালে বিশ্বখ্যাত ই-কমার্স আলীবাবার সহযোগী প্রতিষ্ঠান এন্ট ফাইন্যান্সিয়াল বিকাশে বিনিয়োগ করে। বিকাশের ভ্যালুয়েশন তখন দাঁড়ায় প্রায় এক বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, স্টার্টআপ জগতে ‘এক বিলিয়ন’ ভ্যালুয়েশন একটি মাইলফলক, যাকে স্টার্টআপ ভাষায় বলা হয় উইনিকর্ন। বিকাশ বাংলাদেশের স্টার্টআপ জগতে প্রথম উইনিকর্ন।

সাফল্য ও বাংলাদেশ: বিকাশ ছাড়াও আরো অনেক স্টার্টআপ ভালো করছে। যেমন চালডাল, পাঠাও, সেবা। চালডাল গত ১২ মাসে ২৩ লাখ অর্ডারের সেবা দিয়েছে, যার মূল্য ৪ কোটি ডলার বা প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা। প্রতি বছর ব্যবসা প্রায় ১২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত চাল-ডাল কয়েক মাস আগে লাভের মুখ দেখেছে (টেক ক্রাঞ্চ)। প্রচলিত ব্যবসার কাছে আরো দ্রুত লাভের মুখ দেখার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু ই-কমার্স অনেক দ্রুত তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করে, তাই লাভ আসে ধীরে ধীরে। বাংলাদেশে স্টার্টআপদের মধ্যে বিকাশ, বিডিজবস, চালডাল, ফুড পান্ডা, পাঠাও, রকমারি, সেবা, শপআপ পোস্টার বয় হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। এছাড়া ই-কমার্সে আজকের ডিল, সিন্দবাদ, খাস ফুড, সাজগোজ, ক্লিক বিডি, হাংরি নাকি, স্টাইলাইন, প্রিয় শপ অথবা লজিস্টিক ও পরিবহনে লুপ, পেপার ফ্লাই, ট্রাক লাগবে, ই-কুরিয়ার; মার্কেট প্লেসে হ্যালো টাস্ক, হ্যান্ডি মামা; ফিনটেকে পেওয়েল, আমারপে; এডুটেকে এসো শিখি, রেপ্টো; কন্টেন্টে মায়া, জিএন্ডআর, বঙ্গ; হেলথ টেকে অলোয়েল, প্রভা, ডিমস, সিমেড; এগ্রিটেকে ড্রিঙ্ক ওয়েল, ফার্মারহাব, আই-ফার্মার; ডিপ টেকে ইথার, বন্টন, গেজ; সফটওয়্যারে ব্রেনস্টেশন-২৩, রাইটব্রেন, কাজ, বাড়ি কই, নেসেনিয়া, ফিল্ডবাজ, জুমসেপার উল্লেখ্য। এদের মধ্যে থেকে হয়তো উঠে আসবে পরবর্তী ইউনিকর্ন বা বিলিয়ন ডলার স্টার্টআপ।

এক্সেলেটর: অনেক উদ্যোক্তা কোনো একটা আইডিয়া নিয়ে উদ্যোগ শুরু করেন, কিন্তু তার আইডিয়াকে কীভাবে ব্যবসায়ে রূপান্তর করতে হবে এক্সেলেটরে বুদ্ধি পরামর্শ দেয়া হয়। এক্সেলেটর হয় দুই-তিন মাস মেয়াদি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফুল টাইম। ক্ষেত্রবিশেষে আবাসিক। বাংলাদেশে টেলকো কোম্পানি যেমন গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও রবি এক্সেলেটর প্রোগ্রাম চালু করেছে। এছাড়া সিঞ্জেন্টা ফাউন্ডেশন, অক্সফাম কৃষি বা গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য এক্সেলেটর চালু করেছে। জিপি এক্সেলেটরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে ৬ ব্যাচে ৪৪টি স্টার্টআপকে লালন-পালন করেছে। তারা কো-ওয়ার্কিং স্পেস, মেন্টরসিপ, ডেমো ডে (বিনিয়োগকারীর সামনে পিচ ক্রার সুযোগ) ছাড়াও সিড ক্যাপিটাল দিয়ে থাকে। সেবা, রেপ্টো, অল্টার ইয়ুথ, ক্র্যামস্ট্যাক জিপি এক্সেলেটরের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান। ওয়াইওয়াইগোষ্ঠী, ওয়াই গ্যাপ, বেটার স্টোরিজ, তরু, বিআ, ফাউন্ডার ইনস্টিটিউট, চাকুরি খুঁজব না চাকুরি দেব, লাইট ক্যাসল পার্টনার্স, টিন্ডার ক্যাপিটাল এক্সেলেটর আয়োজন করেছে বা করছে।

হ্যাকাথন: সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময় হ্যাকাথনের আয়োজন করেছে। হ্যাকাথনে কিছু সমস্যা দেয়া হয়, যা অবিরাম ৪৮ বা ৭২ ঘণ্টায় সমাধান করতে বলা হয়। ২০১২ সালে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টার্টআপ উইকেন্ড, ২০১৩ সালে স্টার্টআপ কাপ, ২০১৭ সালে স্টার্টআপ ওয়ার্ল্ড কাপ আয়োজনসহ বিভিন্ন হ্যাকাথন তরুণদের মাঝে সাড়া ফেলে।

মিডিয়া: স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরিতে মিডিয়াও যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে যেমন উদ্যোক্তা সম্মাননায় স্টার্টআপদের বিবেচনায় নিয়ে সহজকে পুরস্কৃত করেছে। ডেইলি স্টার আইসিটি অ্যাওয়ার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন স্টার্টআপকে অনুপ্রাণিত করেছে। ২০১৯ সালে এনটিভি রবির আর-ভেঞ্চার প্রতিযোগিতা প্রচার করেছে। এ বছর ডিবিসি টিভি বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্রান্ট (বিগ) প্রচার করছে।

ইঙ্কুবেশন: আইডিয়াকে উদ্যোগে রূপান্তরের জন্য ইঙ্কুবেশন সেন্টার খোলা হয়। সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইঙ্কুবেশন সেন্টার স্থাপন করা হয়, যাতে ছাত্ররা তাদের নতুন উদ্ভাবন নিয়ে শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে কাজ করতে পারে। আইসিটি মন্ত্রণালয় আইসিটি বিল্ডিং ও কারওয়ানবাজারে জনতা টাওয়ারে ইঙ্কুবেশন সেন্টার খুলেছে, যেখানে স্টার্টআপরা ১২-১৮ মাস ফ্রি স্পেস ও মেন্টরশিপের সুবিধা পায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ ব্যাপারে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে, যাতে ছাত্রদের উদ্ভাবনী আইডিয়াগুলো বাস্তবে রূপ নিতে পারে। তাদের প্রজেক্টগুলো নিছক ছক কাটা অনুশীলনে পরিণত না হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়: অনেক বিশ্ববিদ্যালয় স্টার্টআপের ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপের ওপর কোর্স খুলেছে। স্টার্টআপগুলোর পণ্য বিক্রি ও প্রদর্শনের জন্য ব্যবস্থা আছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৩ সালে সেন্টার ফর অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট বা সিএডি চালু করেছে, যেখানে বিজনেস প্ল্যান প্রতিযোগিতা হয়। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ইউ ল্যাব, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিও উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইনোভেশন ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ বা আইস নামে উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য কেন্দ্র খুলেছে। অনেক কিছু হচ্ছে, তবে আরো অনেকদূর যেতে হবে। সম্প্রতি বুয়েট শ্বাসকষ্টে অক্সিজেন দেয়ার জন্য হাই ফ্লো ক্যানুলার বিকল্প অক্সিজেট নামে একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। এতে বুয়েটের শিক্ষক ও কিছু ছাত্র অংশগ্রহণ করেছে। যন্ত্রটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি বা আইপি নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। বুয়েট তার ল্যাব ও মানবসম্পদ ব্যবহার করে আবিষ্কৃত পণ্যের আইপি কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তি খাতের প্রতিষ্ঠানকে দেবে কিনা, তা লালফিতায় ঝুলে আছে। স্টার্টআপদের প্রয়োজন দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনসম্পদ। বিশ্ববিদ্যালয় সে ব্যাপারে বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।

অ্যানজেল ইনভেস্টর: ব্যক্তি পর্যায়ে যারা স্টার্টআপে বিনিয়োগ করেন তাদের অ্যানজেল ইনভেস্টর বলে। সাধারণত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়গের আগে অ্যানজেল ইনভেস্টর বিনিয়োগ করেন। তারা নীরবে-নিভৃতে ঝুঁকি নিয়ে, ভালোবাসা থেকে গাঁটের পয়সা ঢালেন। বাংলাদেশে অনেকেই এ কাজ করেন। সম্প্রতি তাদের নিয়ে নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে যেমন, বাংলাদেশ অ্যানজেল নেটওয়ার্ক বা বান, দি অ্যানজেল নেটওয়ার্ক বা টান। অ্যানজেল নেটওয়ার্ক উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীর একটি সম্মিলনের প্লাটফর্ম। বান গত দুই বছরে ২১টি প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১৭ কোটি টাকা বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

আইপি: প্রত্যেক ব্যবসায় একটা গোমর থাকে। স্টার্টআপের আসল গোমর ইনোভেশন বা উদ্ভাবন। সেই উদ্ভাবন অন্যে যেন কপি না করতে পারে তার জন্য প্রয়োজন আইনি সুরক্ষা, যা পাওয়া যেতে পারে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি বা আইপি নিবন্ধনের মাধ্যমে। বাংলাদেশে আইপি নিবন্ধন খুব সময়সাপেক্ষ। অনেক উদ্যোক্তার অভিযোগ, ওই দপ্তর থেকেই উদ্ভাবনের কলাকৌশল ফাঁস হয়ে যায়। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা তাই আইপি নিবন্ধনের জন্য বিদেশী কোনো দপ্তর যেমন সিঙ্গাপুর বা আমেরিকাকে পছন্দ করে। আমাদের এ দুর্বলতা না কাটালে আমরা বিদেশী ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টকে আকৃষ্ট করতে পারব না।

করপোরেট ইনভেস্টর: পরিপক্ব বাজারে করপোরেটরা ভালো ভূমিকা রাখে। করপোরেটরা বড় হয়ে যাওয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দেখা দেয়। সেখানে উদ্ভাবনের সুযোগ কমে যায়। উদ্ভাবন আসে নিয়ম-নীতির বাইরে, খোলামেলা, বাধাবন্ধনহীন পরিবেশে। অথচ বাজারে টিকে থাকতে বা ভালো করতে হলে করপোরেটদের উদ্ভাবনী হতে হয়। আবার স্টার্টআপরা নতুনত্ব দিয়ে করপোরেটদের স্থায়ী বাজার বা ব্যবসায় ধস নামিয়ে দেয় বা দিতে পারে যেমন গুগল, ফেসবুক বা ইউটিউব বড় বড় মিডিয়া জায়ান্টের বিজ্ঞাপন বাজারে ভালোই ভাগ বসিয়েছে। করপোরেটরা তাই স্টার্টআপ কিনে তাদের উদ্ভাবন করায়ত্ত করে। এর মাধ্যমে ব্যবসায় গতি আনে বা প্রতিযোগিতা ঠেকায়। আবার অনেক করপোরেটের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল শাখা থাকে, যার মাধ্যমে তাদের ব্যবসা-সংশ্লিষ্ট উদ্ভাবনকে অর্থায়ন ও লালন-পালন করা হয়। বাংলাদেশে কিছু কিছু করপোরেট বিচ্ছিন্নভাবে স্টার্টআপে বিনিয়োগ করছে। কিন্তু তাদের (ব্যবসায়িক) কৌশলগত কারণে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ বা স্টার্টআপ অধিগ্রহণ এখনো দেখা যায় না।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল: বাংলাদেশে অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট (এআই) রুল ২০১৫-এর অধীনে ২১টি কোম্পানি নিবন্ধন পেয়েছে। যদিও তারা ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, প্রাইভেট ইকুইটি ও ইমপ্যাক্ট ফান্ড—তিন ধরনের তহবিলই ব্যবস্থাপনা করতে পারে কিন্তু ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ব্যবসা করার উদ্দেশ্য পাঁচ-ছয়টি প্রতিষ্ঠানের যেমন বিডি ভেঞ্চার, বাংলাদেশ ভেঞ্চার, আইডিএলসি এএমসি, এসবিকে ভেঞ্চার, মসলিন ক্যাপিটাল, কন্সটেলশন এএমসি ইত্যাদি। অনেক প্রতিষ্ঠান ছয়-সাত বছর আগেই নিবন্ধন নিয়েছে, কিন্তু বিনিয়োগে তাদের উপস্থিতি দেখা যায় না। অবশ্য স্টার্টআপে বিনিয়োগের আগে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড উত্তোলন করতে হয়। ফান্ড ব্যবস্থাপকরা ফান্ড তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন। বেশকিছু বিদেশী ভেঞ্চার ক্যাপিটাল (ভিসি) ফার্ম দেশে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে যেমন পেগাসাস ভেঞ্চার, ওসাইরিস, এঙ্করলেস, আবিষ্কার, রেজার ক্যাপিটাল, এসবিকে টেক ভেঞ্চার ইত্যাদি।

শেয়ার্ড স্পেস: অনেক বিখ্যাত স্টার্টআপের জন্ম গ্যারেজে। বাংলাদেশেও অনেক স্টার্টআপ গ্যারেজে জন্মেছে যেমন বাড়ি কই, গো-জায়ান; ড্রয়িং রুমে জন্মেছে বিডিজবস। বাংলাদেশে ট্রেড লাইসেন্স পেতে বাণিজ্যিক ভবনে অফিস ভাড়া নিতে হয়। স্টার্টআপের পক্ষে বাণিজ্যিক ভবনে অফিস ভাড়া নেয়া ব্যয়সাধ্য। শেয়ার্ড স্পেসের মালিক বাণিজ্যিক ভবন ভাড়া নিয়ে অফিস সাজিয়ে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের একটি দুটি ডেস্ক মাসিক চুক্তিতে ভাড়া দেয়। ঢাকায় ‘মোড়’, ‘হাব-ঢাকা’, ‘শুরু’ এ ধরনের সেবা দেয়। এখানে বাণিজ্যিক ঠিকানা ব্যবহার, অফিস স্পেস ছাড়াও কিছু কমন সেবা যেমন রিসেপশন, পিয়ন, টয়লেট, ক্যানটিন, মিটিং রুম ইত্যাদি সেবা মেলে।

গবেষণা: উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র গবেষণায় ব্যয় করেছে ৬১২ বিলিয়ন ডলার, যা তাদের জিডিপির ৩.১ শতাংশ, চীন ব্যয় করেছে ৫১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা তাদের জিডিপির ২.২ শতাংশ। আমাদের প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ভারত তার জিডিপির ০.৩ ও পাকিস্তান ০.১  শতাংশ ব্যয় করেছে। উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে আরঅ্যান্ডডি বা গবেষণায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই। সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবকাঠামোতে ব্যয়ের ব্যাপারে উদার হলেও গবেষণায় ব্যয়ের ব্যাপারে দারিদ্র্যে ভোগে। আসলে দারিদ্র্য অর্থের নয়, দূরদৃষ্টির। আমাদের অধিকাংশ স্টার্টআপের আইডিয়া উন্নত বিশ্ব থেকে কপি করে লোকায়ত করা। মৌলিক গবেষণা না থাকলে দুনিয়া কাঁপানো কোনো স্টার্টআপ আমরা আমাদের দেশ থেকে পাব না।

সরকার: স্টার্টআপের উন্নয়নের ব্যাপারে সরকার অনেক আন্তরিক। আইসিটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইনোভেশন ডিজাইন অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ একাডেমি বা আইডিয়া প্রজেক্ট স্টার্টআপদের মেন্টরশিপ, কো-ওয়ার্কিং স্পেস, নেটওয়ার্কিং, আইপি নিবন্ধন, আইনি সহায়তা ও অর্থায়ন করে থাকে। এ পর্যন্ত ১৮৬টি স্টার্টআপকে ৮.৭৫ কোটি টাকা অনুদান দেয়া হয়েছে। সরকার নীতিসহায়তা দিয়েছে। যেমন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন ২০১৫ সালে অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট রুল জারি করেছে, যার অধীনে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম তহবিল উত্তোলন করতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৫ সালে একটি পরিপত্রের মাধ্যমে ব্যাংকদের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডে ২০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আওতামুক্ত করেছে। ২০১৬ সালে অর্থ বিলের মাধ্যমে সরকার বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলের আয়কে করমুক্ত ঘোষণা করেছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে। প্রত্যেক ব্যাংককে তাদের নিট মুনাফার ১ শতাংশ স্থানান্তর করে আলাদা স্টার্টআপ তহবিল গঠন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড (এসবিএল) নামে একটি ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি গঠন করেছে, যার প্রস্তাবিত তহবিল ৫০০ কোটি টাকা। এসবিএল এরই মধ্যে সাতটি স্টার্টআপে ১৪ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে।

ঝুঁকি ও প্রতারণা: ব্যাংকার হওয়ার সুবাদে জানি, ঢাকা শহরে চকবাজারে খেলাপি ঋণের হার অনেক বেশি। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র দিয়ে ঋণ নেয়ায় ব্যাংক কিছু করতে পারে না। অনেকেই বলতেন বা বলেন, চকবাজার জায়গাটা বা ওখানকার মানুষগুলো খারাপ। ব্যাংকার হিসেবে আমার অভিমত, চকবাজারে টাকাপয়সার লেনদেন বেশি, তাই সেখানে প্রতারকের সমাগমও বেশি। প্রতারক তো আর মনপুরাদ্বীপ—যেখানে টঙ্কার টুংটাং নাই সেখানে যাবে না! ই-কমার্সে অনেক নতুন নতুন কিছু ঘটছে। ই-কমার্স থেকে কেনাকাটা একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। তাই প্রচুর প্রতারকও এ সেক্টরে আসবে বা এসেছে। গ্রাহকের আস্থা বজায় রাখার জন্য প্রতারকের হাত থেকে স্টার্টআপদের মুক্ত রাখতে হবে। শুধু গ্রাহক নয়, ই-ভ্যালি বা ই-অরেঞ্জ বা ধামাকা সরবরাহকারীকেও প্রতারণা করেছে বা করছে। অনেক স্টার্টআপ মিথ্যা কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে টাকা তুলতে পারে। বিশেষত বিদেশী অনেক বিনিয়োগকারী, যারা বিলিয়ন ডলার ফান্ড ব্যবস্থাপনা করে, তাদের কাছে ১০ বা ২০ মিলিয়ন ডলার হাতের ময়লা। তারা বাংলাদেশে না এসেই উদ্যোক্তার সুন্দর প্রেজেন্টেশন দেখে ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। ভবিষ্যতে ওই স্টার্টআপের তথ্যে গরমিল পাওয়া গেলে বাংলাদেশের ইমেজে আঘাত করবে।

অর্থায়ন: লাইটক্যাসল পার্টনার্সের তথ্যমতে, ২০১০ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশে স্টার্টআপে ৪১৮ মিলিয়ন বা ৪১.৮ কোটি ডলার বিনিয়োগ হয়েছে। তার মধ্যে ৩৯৪ মিলিয়ন বিদেশী ও ২৪ মিলিয়ন দেশী বিনিয়োগ। বিদেশী বিনিয়োগের হার ৯৪ শতাংশ ও দেশী বিনিয়োগ ৬ শতাংশ। প্রথম বিনিয়োগ ২০১০ সালে ফিনটেক খাতে ৫ মিলিয়ন ডলার। ২০১০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ১১ বছরে বিনিয়োগ হয়েছে ২৯৩ মিলিয়ন অথচ ২০২১ সালের সাড়ে আট মাসে বিনিয়োগ হয়েছে ১২৫ মিলিয়ন ডলার, যা মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ। বাংলাদেশী স্টার্টআপ সম্পর্কে বিদেশী ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের আগ্রহ জন্মানো বা বাড়ার এটি বড় লক্ষণ। বিনিয়গের ৫২ শতাংশ এসেছে ফিনটেক, ১৯ শতাংশ লজিস্টিক ও পরিবহন, ১১ শতাংশ ই-কমার্স, ৫ শতাংশ হেলথকেয়ার ও ৪ শতাংশ সফটওয়্যার খাতে।

এক্সিট: স্টার্টআপের সাফল্য ফান্ড উত্তোলনে নয়, আসল সাফল্য এক্সিট বা প্রস্থানে। স্টার্টআপে বিনিয়োগ অন্য উদ্যোগে বিনিয়োগ থেকে আলাদা। এখানে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বা অ্যানজেল ইনভেস্টররা অনেক ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করেন, অতি উচ্চ মুনাফার আশায়। ডিভিডেন্ড এখানে উদ্দেশ্য নয়। অতি উচ্চ মুনাফা আসে, মার্জার, অ্যাকুইজিশন বা আইপিওতে শেয়ার বিক্রি করে, ক্যাপিটাল গেইন বা মূলধনি মুনাফা থেকে। যে উদ্যোক্তা তার উদ্যোগে বিনিয়োগকারীদের ভালো মুনাফার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন, পরবর্তী সময়ে তিনি কোনো উদ্যোগ হাতে নিলে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবেন। সেটাই ভালো এক্সিটের জন্য উদ্যোক্তার প্রেষণা। ভালো এক্সিট এমনি এমনি বা মুখের মিষ্টি কথায় হয় না। স্টার্টআপকে ভালো ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হয়। বাংলাদেশে কিছু এক্সিট ঘটেছে। যদিও এসব তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়, তবুও বাজার তথ্য অনুসারে, বিকাশ, পাঠাও ও ব্রেনস্টেশন ২৩-এর বিনিয়োগকারীরা ভালোই মুনাফা ঘরে তুলেছেন।

 

শওকত হোসেন: ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিশেষজ্ঞ

আরও