খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্রি

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে ৫০ বছর ধরে অসামান্য অবদান রেখে চলছে ব্রি। ১৯৭০-৭১ সালে দেশের ৭ কোটি ১২ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে চালের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন মাত্র। খাদ্যের জন্য আমরা ঐতিহাসিকভাবে পরনির্ভরশীল ছিলাম। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ‘দিন বদলের সরকার’ সার এবং জ্বালানি

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে ৫০ বছর ধরে অসামান্য অবদান রেখে চলছে ব্রি। ১৯৭০-৭১ সালে দেশের ৭ কোটি ১২ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে চালের উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন মাত্র। খাদ্যের জন্য আমরা ঐতিহাসিকভাবে পরনির্ভরশীল ছিলাম। ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ‘দিন বদলের সরকার’ সার এবং জ্বালানি তেলের দাম কমানো, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, দেশে হাইব্রিড ধানের প্রবর্তন, ব্রি ধান ২৮, ২৯-এর ব্যাপক সম্প্রসারণ, ধানের উন্নত মানের বীজ সরবরাহ, সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থাসহ ইত্যাদি নানামুখী কৃষকবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ফলে ১৯৯৯ সালে দেশ প্রথমবারের মতো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে। প্রধানমন্ত্রীকে প্রদান করা হয় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কর্তৃক মর্যাদাপূর্ণ সেরেস পদক। ২০০১ সালের পর দেশ আবার খাদ্য ঘাটতিতে পড়ে।

২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবার যখন দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেন তখন খাদ্য ঘাটতি ছিল ২৬ লাখ টন। তাই সরকার গঠন করেই তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে। প্রথম ক্যাবিনেট সভায় সারের দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। যেখানে ৮০ টাকার টিএসপির মূল্য ২২ টাকা ও ৭০ টাকার এমওপির মূল্য ১৫ টাকায় নামিয়ে এনে সুষম সার ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পদক্ষেপ নেন। এছাড়া কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ভর্তুকি প্রদান, ১০ টাকায় কৃষকের জন্য ব্যাংক হিসাব চালুকরণ, সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষিতে প্রণোদনা প্রদান, সার বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনাসহ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। ফলে ২০১৩ সালে এসে দেশ শুধু খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই অর্জন করেনি, খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়।

২০০৯-২০ পর্যন্ত ১২ বছরে ব্রি উদ্ভাবিত জাতগুলোর প্রতিটিই বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। যেমন খরা, বন্যা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু, জিংকসমৃদ্ধ, প্রিমিয়াম কোয়ালিটি, ডায়াবেটিক রাইসসহ অধিক উচ্চফলনশীল। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রভাব মোকাবেলায় ব্রি এখন পর্যন্ত ১২টি লবণাক্ততাসহিষ্ণু, তিনটি খরা সহনশীল, তিনটি বন্যা সহনশীল, দুটি জোয়ার-ভাটা সহনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাত মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের মোট লবণাক্ত এলাকার প্রায় ৩৫ ভাগ ধান চাষের আওতায় এসেছে এবং এ থেকে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। খরাপ্রবণ এলাকায় খরাসহিষ্ণু জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১২ শতাংশ আবাদ এলাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। জলমগ্নতা সহনশীল জাতগুলো সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২৬ শতাংশ এলাকা চাষের আওতায় আসায় উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৯ শতাংশ। উপকূলীয় এলাকায় ধানের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে উদ্ভাবিত জোয়ার-ভাটা সহনশীল জাত (ব্রি ধান ৭৬, ৭৭) সম্প্রসারণের ফলে প্রায় ৫৭ হাজার হেক্টর জমি এ ধান চাষের আওতায় এসেছে। সর্বোপরি, ২০১৮-১৯ সালে উচ্চফলনশীল ধানের জাতগুলো দেশের শতকরা ৮০ ভাগ জমিতে চাষ করা হয়েছে এবং এ থেকে পাওয়া গেছে দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯১ ভাগ। ঘাত সহনশীল ও অনুকূল পরিবেশ উপযোগী জাতগুলোর আবাদ সম্প্রসারণের ফলে ২০১০-১৯ পর্যন্ত ছয় লাখ টন হারে উৎপাদন বেড়েছে এবং উৎপাদন বৃদ্ধির এ ধারা অব্যাহত রয়েছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম একটি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অসময়ে বৃষ্টি, ফ্রিকোয়েন্সির পরিবর্তে বৃষ্টির ইনটেনসিটি বেড়ে যাওয়ায় হঠাৎ বন্যা দেখা দিচ্ছে। ফলে বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ২০১৭ সালে হাওরে ২৯ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৬২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিতে বন্যা দেখা দেয়; যা ফসলের ক্ষয়ক্ষতির অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায় এবং এক সপ্তাহের মধ্যে ছয়টি জেলার শতভাগ ফসল হানি হয়। ওইসব এলাকার কৃষক সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় করণীয় কী? প্রথমত, হাওরে বাঁধ দেয়া ও নদীখননের মাধ্যমে পানি ঢুকতে না দেয়া বা অতি দ্রুত পানি বের করে দেয়া; দ্বিতীয়ত, এমন জাত বের করতে হবে যাতে পাহাড়ি ঢল আসার আগেই ফসল তোলা যায়। কিন্তু কাজ দুটি সহজ নয়। কারণ হাওরের বৈশিষ্ট্যই এমন বাঁধ বা নদীখনন করলেও ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে হাওরে দ্রুত পানি ঢুকলে তা আর বের করার অবকাশ থাকে না। অন্য একটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রজনন পর্যায়ে বা রিপ্রডাকটিভ ফেজে ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে এমন স্বল্প জীবনকালের জাত উদ্ভাবন করা। আমরা সর্বান্তকরণে চেষ্টা করছি এমন জাত উদ্ভাবনের এবং এমন কিছু লাইন আমরা পেয়েছিও। আশা করি, কিছুদিনের মধ্যে এ ধরনের জাত অবমুক্ত করা যাবে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হঠাৎ ঠাণ্ডা, হঠাৎ গরম ও গরমের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় ইনডিউসড ম্যাচুরিটির কারণে ফলন কমে যায়। তাপমাত্রা যেহেতু বেড়ে যাচ্ছে সেহেতু হিট টলারেন্ট জাত উদ্ভাবনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

বিভিন্ন ঘাত সহনশীল জাতসহ দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ব্রি এ পর্যন্ত ১০৬টি জাত উদ্ভাবন করেছে। খাদ্যনিরাপত্তাকে টেকসই করার জন্য লোকেশন স্পেসিফিক জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য বলতে আমরা ধানকেই বুঝে থাকি। আর খাদ্যনিরাপত্তা বলতে চাল বা ভাতের নিরাপত্তাকে বোঝায়। স্বাধীনতার পর আমাদের দেশের মানুষ মোটা চাল মোটা ভাতে সন্তুষ্ট থাকত। কিন্তু দেশের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ফলে এখন মানুষ সরু চাল পছন্দ করছে। আপনারা জানেন, অতীতের তীব্র খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ বর্তমানে উদীয়মান অর্থনীতির নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। এক সময়ের তলাবিহীন ঝুড়ি এখন শক্ত ভিত্তির উদ্বৃত্ত খাদ্যের বাংলাদেশ; ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ এবং গড় ফলনের হিসাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম। এমনকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে কিছু চাল বিদেশেও রফতানি করা হয়। এটি আমাদের জাতীয় জীবনে এক অসামান্য অর্জন। খাদ্য উৎপাদনে এ অসামান্য অর্জন সম্ভব হয়েছে প্রধানত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট কর্তৃক উচ্চফলনশীল ধানের জাত ও আনুষঙ্গিক লাগসই চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে এসব প্রযুক্তি প্রয়োগের ফলে।

এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দেশের বিজ্ঞানীদের প্রতি জাতির জনকের সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা, বর্তমান সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, ধানবিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং কৃষকের নিরলস পরিশ্রম। আপনারা হয়তো জানেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাকৃবিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘দুনিয়াভর চেষ্টা করেও আমি চাউল কিনতে পারছি না। চাউল পাওয়া যায় না। যদি চাউল খেতে হয় আপনাদের চাউল পয়দা করে খেতে হবে’। এটা ছিল আমাদের বর্তমান সাফল্যের অনুপ্রেরণা দিকনির্দেশনা।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) এবং বর্তমান সরকারের ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্রি এরই মধ্যে রাইস ভিশন-২০৫০ প্রণয়ন করেছে যা থেকে দেখা যায়, বর্তমান বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের জনসংখ্যা সাড়ে ২১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। রাইস ভিশনে বলা হয়েছে, উৎপাদনের গতিশীলতা অব্যাহত থাকলে ২০৩০, ২০৪১ ও ২০৫০ সালে চালের উৎপাদন হবে যথাক্রমে ৪০, ৪৪ ও ৪৭ মিলিয়ন টন। বিপরীতে ২০৩০, ২০৪১ ও ২০৫০ সালে যথাক্রমে ১৮৬, ২০৩ ও ২১৫ মিলিয়ন লোকের খাদ্য চাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে যথাক্রমে ৩৮ দশমিক ৫, ৪২ দশমিক শূন্য ও ৪৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন টন। চূড়ান্তভাবে ২৫ কোটি মানুষকে খাওয়ানোর টার্গেট নিয়ে ব্রি বিজ্ঞানীরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। রাইস ভিশন বাস্তবায়নের পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ করার লক্ষ্যে ব্রি একটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান তৈরি করেছে।

টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্য পূরণে প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, ক্রমহ্রাসমান প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন কৃষিজমি, পানি, কৃষি শ্রমিক ও মাটির উর্বরতা) এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিবর্তন। দেশে ধানের জমির পরিমাণ প্রতি বছর শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ হারে কমে যাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্রি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতি বছর ৪৪ কেজি/হেক্টর হারে জেনেটিক গেইন বাড়ানো, কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ১ শতাংশ হারে ফলন পার্থক্য ও জাতগুলোর সম্প্রসারণে দীর্ঘসূত্রতা কমানো, আউশের কভারেজ বৃদ্ধি করে ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা পূরণ করেও ২০৩০, ২০৪১ ও ২০৫০ সালে যথাক্রমে ১৯ , ২১ ও ২৬ লাখ টন উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদন করা সম্ভব।

সরকারের পরিকল্পনায় আমাদের কৃষি ক্রমে দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণে শিফট হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে হলে দক্ষিণাঞ্চলের অলবণাক্ত এলাকায় ধান চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। সেই অনুযায়ী দক্ষিণের বিভিন্ন নদী যেমন তেঁতুলিয়া, পায়রা, কীর্তনখোলার মিষ্টি পানি ব্যবহার করে ধানের আবাদ এলাকা কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায় সে ব্যাপারে আমাদের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছেন। লবণাক্ততা সহনশীল জাতের পাশাপাশি নতুন সেচ উৎস তৈরি হলে দক্ষিণাঞ্চলে ধান চাষের এলাকা সম্প্রসারণ হবে। যেমন বিআর২৩, ব্রি ধান৩০, ব্রি ধান৫২, ব্রি ধান৬৭, ব্রি ধান৭৬, ব্রি ধান৭৭ এবং ব্রি ধান৮৭ দক্ষিণের চর এলাকাসহ বিশাল অনাবাদি এলাকা ধান আবাদের আওতায় এসেছে। এছাড়া ভূগর্ভের পানি ও ভূ-উপরিস্থ পানির অপচয় রোধে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি, কম পানি ব্যবহার করে বেশি ফলন পেতে সি৪ রাইস উদ্ভাবনের গবেষণায় সম্পৃক্ত হয়েছে ব্রি।

কৃষিমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা পুষ্টিনিরাপত্তা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে কাজ করে যাচ্ছি। কেননা দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর পুষ্টির অধিকাংশ ক্যালরি, প্রোটিন ও মিনারেল আসে ভাত থেকে। ভাত তাদের কাছে সহজলভ্য। সাধারণ মানুষ দুধ-ডিম ও মাংসসহ অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার কিনতে না পারলেও ভাত নিয়মিত খেতে পারছে। তাই ভাতের মাধ্যমে কীভাবে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করা যায়, সেই লক্ষ্যে কাজ করছেন আমাদের বিজ্ঞানীরা। চাল ছেঁটে যাতে চালকে অনিরাপদ করতে না হয় সেজন্য ব্রি এরই মধ্যে প্রিমিয়াম কোয়ালিটিসম্পন্ন জাত যেমন ব্রি ধান৫০, ব্রি ধান৬৩, ব্রি ধান৭০, ব্রি ধান৭৫, ব্রি ধান৮০, ব্রি ধান৮১, ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান৮৮ এবং ব্রি ধান৯০ উদ্ভাবন করেছে। এসডিজি সামনে রেখে ব্রি বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে পাঁচটি জিংকসমৃদ্ধ জাত উদ্ভাবন করেছে, পাশাপাশি অন্যান্য পুষ্টি উপাদান যেমন প্রোটিন, আয়রন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, গাবা ও বিটা ক্যারোটিন-সমৃদ্ধ জাতসহ বিভিন্ন পুষ্টিকর ধান উদ্ভাবন করেছে। এছাড়া শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য উপাদানগুলো দেহের প্রয়োজন অনুসারে চালে সংযোজন, সরবরাহ বা পরিমাণে বৃদ্ধি করে উদ্ভাবনকৃত জাতগুলো অবমুক্তকরণের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

কৃষিকে টেকসই ও বহুমাত্রিকীকরণে জাতীয় কৃষিনীতি ২০১৮-তে কৃষি উন্নয়নে ন্যানো প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জাত উদ্ভাবন, রোগবালাই দমন, সার ব্যবস্থাপনায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। ধানের উৎপাদন ও রোগবালাই দমনে ন্যানো ফার্টিলাইজার ও ন্যানো পেস্টিসাইডের প্রভাব নিয়ে ব্রি’তে গবেষণা চলছে। এছাড়া বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধা কাজে লাগিয়ে প্রিসিশন এগ্রিকালচার নিয়েও ব্রি’তে গবেষণা চলমান রয়েছে।

কৃষিমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ব্রিতে একটি ল্যাব স্থাপনের মাধ্যমে অনিরাপদ খাদ্য যাতে মানুষের শরীরে না যায় তা নিশ্চিতে আমরা কাজ করছি। আশা করি, আমরা ভালো একটি সময়ের দিকে যাচ্ছি।

এইচআইইএসের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে মাথাপিছু চালের চাহিদা বছরে জনপ্রতি ১৩৪ কেজি, যা খাদ্যের বহুমুখিতা ও খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফল। চালকে প্রধান খাদ্যশস্য বিবেচনায় রাখতে হলে আমাদের কমপক্ষে ৬০-৬৫ শতাংশ ক্যালরি চাল থেকে নিতে হবে। তা না হলে ডায়াবেটিস, স্থূলতাসহ বিভিন্ন লাইফ স্টাইল (জীবনাচরিত) রোগ বেড়ে যাবে। সেই হিসাবে মাথাপিছু চালের ব্যবহার জনপ্রতি ১৩৩ কেজির নিচে আসা উচিত হবে না। অথচ ইদানীং দেখা যাচ্ছে, অনেকে ওজন কমানোর জন্য খাদ্যতালিকা থেকে ভাত বাদ দিয়ে দিচ্ছেন; বিশেষ করে টিনএজ বা অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা। ভাতের পরিবর্তে তারা জাংক বা ফাস্ট ফুডের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা ভাতের তুলনায় আরো বেশি ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশে মাথাপিছু চালের চাহিদা কমলেও সারা বিশ্বে বাড়ছে। অতএব উৎপাদন বাড়িয়ে আমাদের বহির্বিশ্বে চাল রফতানির সুযোগ রয়েছে। খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ সাফল্য বহির্বিশ্বের অনেক দেশের মাথাব্যথার কারণ, বিশেষ করে যারা আজীবন আমাদের পরনির্ভরশীল দেখতে চায়। চালে আর্সেনিক, হেভি মেটাল বা ভাত খেলে ডায়াবেটিস হয় এমন নেতিবাচক প্রচারণা দেশের খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দেয়ার চক্রান্ত। আমি আপনাদের মাধ্যমে যারা এমন নেতিবাচক প্রচারণা করেন তাদের কাছে অনুরোধ করতে চাই, এসব নেতিবাচক প্রচারণা পরিহার করে ধান গবেষণায় বিজ্ঞানীদের অর্জন ও সাফল্যের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেন, যাতে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।

 

ড. মো. শাহজাহান কবীর: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি)

আরও