দুধ পরিভোগে দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে বাংলাদেশ

মানুষের আয় বাড়ার কারণে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে। পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। নিরাপদ খাদ্য হিসেবে তরল দুধসহ দুগ্ধ শিল্পের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হচ্ছে। তাই ব্যক্তি থেকে সরকার সর্বত্রই চেষ্টা চলছে দুধ উৎপাদন বাড়াতে। কিন্তু গতি পাচ্ছে না সে কাজে। উৎপাদন ও চাহিদায় ঘাটতি মেটানো সম্ভবই হচ্ছে না। এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা চলমান রয়েছে। সেজন্যই

মানুষের আয় বাড়ার কারণে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হচ্ছে। পুষ্টিকর খাবারের দিকে ঝুঁকছে সাধারণ মানুষ। নিরাপদ খাদ্য হিসেবে তরল দুধসহ দুগ্ধ শিল্পের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হচ্ছে। তাই ব্যক্তি থেকে সরকার সর্বত্রই চেষ্টা চলছে দুধ উৎপাদন বাড়াতে। কিন্তু গতি পাচ্ছে না সে কাজে। উৎপাদন চাহিদায় ঘাটতি মেটানো সম্ভবই হচ্ছে না। এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতা চলমান রয়েছে। সেজন্যই দেশের মানুষের খাদ্যের পাশাপাশি পুষ্টিচাহিদা পূরণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন দুধ গ্রহণের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিম্নে বাংলাদেশ। তালিকায় পাকিস্তানের অবস্থান সবার ওপরে। দেশটির একজনের গড়ে দুধ গ্রহণের পরিমাণ ৫২০ মিলিলিটার। এর পরই ভারত ২২৭, মালদ্বীপ ১৮৮, শ্রীলংকা ১৪২, নেপাল ১৪০ বাংলাদেশে ১২৫ মিলিলিটার। অন্যদিকে দেশের গাভী মহিষের দুধ উৎপাদনের ক্ষমতাও বিশ্বের অনান্য দেশের তুলনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার একটি গাভীর দুধ উৎপাদন (ল্যাকটোজেন) ক্ষমতা হাজার ৯২৬ কেজি হলেও বাংলাদেশের গাভীর ক্ষমতা মাত্র ২০৭ কেজি। পার্শ্ববর্তী দেশ নেপালের গাভীগুলোর ক্ষমতা ৪১৫ কেজি, ভারতের ৯৮৭ কেজি, পাকিস্তানে হাজার ১৯৫ কেজি।

ভারতের একজন খামারি প্রতিটি গাভী থেকে ২০ কেজির বেশি দুধ পাচ্ছে। আর আমরা পাচ্ছি মাত্র - কেজি। আবার ওরা উৎপাদনে কম খরচ করলেও আমাদের দ্বিগুণের বেশি খরচ করতে হচ্ছে। ফলে খামারিরা কোনোভাবেই দুগ্ধ শিল্পে লাভবান হতে পারছে না। এর পেছনে সরকারের নীতিসহায়তার ভীষণ দুর্বলতা রয়েছে। দেশে দুধ উৎপাদন বাড়তির দিকে থাকলেও আমদানিকে অবারিত করে রাখা হয়েছে। ফলে খামারিরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। আবার উন্নত গাভীর জন্য সিমেন আমদানি বা অ্যামব্রয়ো পদ্ধতিকে জনপ্রিয় করা হচ্ছে না। অন্যদিকে খামারিদের এখনো বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল জমির খাজনা দিতে হচ্ছে বাণিজ্যিক রেটে। ফলে তারা উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়াতে পারছে না তেমনি খরচও কমাতে পারছে না। উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণনসহ প্রক্রিয়াকরণের প্রত্যেকটি পর্যায়ে এখনো পদক্ষেপ না নিলে দেশের দুগ্ধ খাত আমদানিনির্ভর হয়ে পড়বে।

ইউরোপ-আমেরিকার প্রতিটি গাভী যেখানে গড়ে ১২ হাজার লিটার দুধ দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের গাভীর উৎপাদন সক্ষমতা মাত্র আড়াই হাজার লিটার। অর্থাৎ বৈশ্বিক গড়ের এক-দশমাংশ দুধও উৎপাদন করতে পারছে না দেশের গাভী। আবার প্রতিটি গরুর গড় মাংস উৎপাদন সক্ষমতা ২২০ কেজি হলেও বাংলাদেশে এখনো তা ৭২ কেজির নিচে। অর্থাৎ বৈশ্বিক গড়ের এক-তৃতীংশ পরিমাণ মাংস উৎপাদন করতে সক্ষম নয় দেশের পশু। দুধ বা গরুর মাংস উৎপাদন নয়, প্রাণিসম্পদ খাতের প্রায় সব ক্ষেত্রেই উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। হাঁস-মুরগির মাংস উৎপাদন সক্ষমতা বা ডিম উৎপাদন সক্ষমতা সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রমোটিং এগ্রিফুড সেক্টর ট্রান্সফর্মিং ইন বাংলাদেশ শীর্ষক প্রতিবেদেন এসব তথ্য উঠে এসেছে।

কয়েক দশকের ব্যবধানে দেশে দুধ উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে দেশে দুধের চাহিদা উৎপাদনে এখনো বেশ ঘাটতি রয়েছে। চাহিদা জোগানের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ঘাটতি কীভাবে মেটানো সম্ভব হবে, তার কোনো রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়নি। দুধ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে প্রচুর সম্ভাবনা থাকলেও দুগ্ধ শিল্পে মানসম্পন্ন দুগ্ধবতী গাভীর সংকট, দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের অভাব, দক্ষ প্রাণী চিকিৎসক ভেটেরিনারি চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। এছাড়া স্বল্প সুদে ঋণ না পাওয়া, উৎপাদিত দুধের সঠিক মূল্য না পাওয়া, দুধ সংরক্ষণ বাজারজাতে সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে দুধ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই গুঁড়ো দুধ আমদানিতে যেমন কঠোরতা নিতে হবে তেমনি দুগ্ধ খামারিদের বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্য বলছে, ২০০৯-১০ অর্থ ছরে দুধ উৎপাদন ছিল ২৩ লাখ ৭০ হাজার টন, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল কোটি লাখ ৮০ হাজার টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুধের চাহিদা ছিল কোটি ৫২ লাখ হাজার টন। জনপ্রতি ২৫০ মিলিলিটার হিসেবে চাহিদা পরিমাপ করা হয়েছে। জনসংখ্যা হিসাবে নেয়া হয়েছে ১৬ কোটি ৬৬ লাখ। সে হিসেবে জনপ্রতি দৈনিক দুগ্ধ গ্রহণ করছে ১৭৫ দশমিক ৬৩ মিলিলিটার, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ১৬৫ মিলিগ্রাম। ফলে এখনো ঘাটতি প্রায় ৪৫ লাখ ২২ হাজার টন। জনপ্রতি প্রতিদিন ঘাটতি ৭৫ মিলিলিটার। দেশে এখন দুধ উৎপাদন ছাড়িয়েছে হাজার কোটি লিটার। সে হিসেবে সারা দেশে প্রায় প্রতিদিন আড়াই-তিন কোটি লিটার দুধ উৎপাদন হচ্ছে। এর মাত্র - শতাংশ বা ১৫-২০ লাখ লিটার প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো সংগ্রহ করে।

কীভাবে দেশের প্রতিটি খামারি বা কৃষককে দুধ উৎপাদনে আরো বেশি সম্পৃক্ত করে লাভবান হতে পারে সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে। যে জেলায় সবচেয়ে বেশি দুধ উৎপাদন সেখানে মাঝে মধ্যেই দুধ বিক্রি না করে খামারিরা রাস্তায় ঢেলে দিচ্ছে। আবার ঠিক তার পাশের জেলার মানুষ দুধ পাচ্ছে না। দুগ্ধ খাতে বিপণনের বেদনাদায়ক চরিত্রের মধ্যে উৎপাদন বাড়ছে। প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতির কারণে উৎপাদনকারী খামারিরা দুধ উৎপাদন খরচ কমাতে পারছে না। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নানা ব্যয় এখনো উচ্চমূল্যে পরিশোধ করতে হচ্ছে। আবার দুধ সংরক্ষণ বিপণন প্রক্রিয়ায় ভালো প্রযুক্তি নেই। কৃষি খাতের একটি উপখাত হলেও বিদ্যুৎ বিল গোখাদ্যে উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে খামারিদের। ফলাফল বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি। তবে আমরা চাই বৈশ্বিক প্রতিযোগী দামেই ভোক্তাদের কাছে দুধ সরবরাহ করতে। সেখানে দুধ উৎপাদনকারী দেশে যে সুবিধাগুলো দেয়া হয় সেটি প্রদান করলেই স্বল্প সময়ের মধ্যে সেটি করা সম্ভব। দাম সহনীয় বিপণন দুর্বলতা কাটাতে পারলেও জনপ্রতি দুধের ভোগ অবশ্যই বাড়বে।

বিপণন দুর্বলতা দেশের দুগ্ধ শিল্পের জন্য চরম বাস্তবতা। বিপণন ব্যবস্থায় দুর্বলতার পাশাপাশি দামের কারণে সাধারণ ভোক্তা দুধ সঠিক সময়ে পাচ্ছে না। দুধ উৎপাদন বাড়ানোয় যেমন পদক্ষেপ থাকতে হবে তেমনি বিপণন ব্যবস্থায় আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া দুধ উৎপাদন খরচ কমাতে উন্নত জাত দেশে আনতে হবে। গোখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি অবাধ আমদানি প্রান্তিক খামারিদের বিপর্যস্ত করছে। বিপণন ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতাও খামারিদের জন্য উদ্বেগের কারণ। খামারিদের দুধ সংগ্রহ বাজারজাতের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। পশুখাদ্যের সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য পশুখাদ্যের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করে টিসিবির মতো পশুখাদ্য প্রতিটি উপজেলায় বিতরণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

প্রতি বছর আড়াই-তিন হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন দুধ দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি হচ্ছে। মোট আমদানির মধ্যে বাল্ক ফিল্ড মিল্ক বস্তায় বা বড় প্যাকে আমদানি হচ্ছে ৭০ শতাংশের বেশি। বাল্ক ফিল্ড মিল্ক নামে ভেজিটেবল ফ্যাট মিশ্রিত যে দুধ বাংলাদেশে আমদানি হয় সেটি দেশের দুগ্ধ শিল্প ধ্বংসের জন্য মূলত দায়ী। দুঃখের বিষয় ভেজিটেবল ফ্যাট মিশ্রিত দুধের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়নি। দুধগুলোই সাধারণত দেখা গেছে বস্তা আকারে মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কিছুদিন আগে আমদানি করে নতুনভাবে পলি প্যাক করে বিক্রি করে। এসব দুধ মূলত দোকান, হোটেল, বেকারি, রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে। দুধ জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ। অতিসত্বর দুধের ওপর আমদানি শুল্ক ১০০ শতাংশ বাড়িয়ে এবং অ্যান্টি-ডাম্পিং ট্যাক্স আরোপ করে দেশীয় দুগ্ধ শিল্প রক্ষায় পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী আমাদের দেশে প্রতি বছরই দুধ উৎপাদন বাড়ছে। কিন্তু একই সাথে আমদানির পরিমাণও বাড়ছে। এটাকে যদি সমন্বয় করা যেত তাহলে দেশী শিল্প উপকৃত হতো। কিন্তু সেটা না হওয়ায় প্রতিযোগিতা থাকছে না। গত পাঁচ বছরে খামারি পর্যায়ে বেশ বিনিয়োগ হয়েছে। নতুন করে অনেক খামারও হয়েছে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে নতুন কোনো মিল্ক প্রসেসর বাজারে আসেনি। হাতে গোনা যে কয়টি বিনিয়োগকারী আছে তারাই ঘুরেফিরে বিনিয়োগ করছে এবং তাদের সামর্থ্য বাড়াচ্ছে। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে শিল্পটা স্লো রিটার্নিং শিল্প। রিটার্নটা দেয় খুবই কম এবং যেটা দেয় সেটাও লম্বা সময় ধরে। কিন্তু অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ করলে তিন-পাঁচ বছরে সেটা ফিরে পাচ্ছে। সেজন্য খাতে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। এটা আমাদের দুগ্ধ শিল্পের জন্য খুবই খারাপ দিক।

উন্নত জাত না আসায় দেশী গাভীর দুধ উৎপাদনক্ষমতা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। ভালো জাত না আসায় মাংস উৎপাদনের জন্য খামারিদের বেশি পরিমাণে খাদ্য শ্রম দিয়ে কম পরিমাণ মাংস উৎপাদন করতে হচ্ছে। বেশি পরিমাণ খাদ্য খরচ করলেও সক্ষমহীনতার কারলে গাভীগুলো বেশি দুধ দিতে পারছে না। ফলে শুধু উৎপাদনশীলতায় পিয়িছে থাকছে বিষয়টা এমন নয়। দেশের মাংস দুধ উৎপাদনকারী গরু গাভীগুলোকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি ঘাস বা খাদ্য খেতে দিতে হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে যেখানে সাড়ে তিন-চার কেজি খাদ্য দিলে এক কেজি মাংস উৎপাদন করতে সক্ষম, সেখানে বাংলাদেশের গরুকে দিতে হয় সাত থেকে সাড়ে আট কেজি। আর সেটি হচ্ছে একমাত্র উন্নত জাত প্রযুক্তির অভাবে। এতে কৃষকরা লাভবান হতে পারছে না।

দুধের বাজারে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এসব দুধের ৯০ শতাংশই অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিক্রি হচ্ছে। দুগ্ধ প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা গেলে শিল্পে আরো বিনিয়োগ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যদিও দেশে বেশ কয়েকটি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত কোম্পানি রয়েছে। সব প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে। বাজার থেকে দুধ সংগ্রহে শীর্ষে সমবায় অধিদপ্তরের সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেড (মিল্ক ভিটা) এর পরই রয়েছে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের আড়ং, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রাণ ডেইরি। এছাড়া আকিজ গ্রুপ, রংপুর ডেইরি ফুড অ্যান্ড প্রডাক্ট লিমিটেড, আফতাব ডেইরি, ইবনে সিনা, আমেরিকান ডেইরি আব্দুল মোনেম গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দুধ সংগ্রহ করে। এছাড়া দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন, গুঁড়ো দুধ বিপণন কৃষকের উন্নয়নে নতুন কোম্পানি হিসেবে এসিআই বাজারে প্রবেশ করেছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ না বাড়িয়ে বরং দুধ সংগ্রহে মনোযোগী হচ্ছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানকে আরো বেশি দুধ উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে উদ্যোগ নিতে হবে। এছাড়া গবাদিপশুর লালন-পালন ব্যবস্থা, টিকা, চিকিৎসাসেবা, খামার স্থাপনবিষয়ক প্রশিক্ষণ, কৃত্রিম প্রজনন প্রভৃতি সেবা দেয়ার সুযোগ রয়েছে। চুক্তিবদ্ধ খামারিদের গাভী ক্রয়, শেড স্থাপন, মিল্কিং মেশিন, চপার মেশিন, দুধ বহনের অ্যালুমিনিয়াম ক্যানসহ খামার ব্যবস্থাপনার আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করার জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা। ডেইরি হাব নির্মাণ করে দুধ বিপণন ব্যবস্থা সহজতর করা। পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ব্যক্তিপর্যায়ে গাভী উৎপাদনে জোর দিতে হবে। কীভাবে দেশের প্রতিটি খামারি বা কৃষককে গাভী উৎপাদনে আরো বেশি সম্পৃক্ততা করে লাভবান হতে পারে কিংবা পরিবারের জন্য সম্পদ সৃষ্টি করতে পারে, সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে।

দুধ উৎপাদন কম হওয়ার কারণে আমদানিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। ফলে দুগ্ধ শিল্পের অবকাঠামো উন্নয়নে সুযোগ-সুবিধা না দিয়ে বরং আমদানিকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দেশীয় শিল্পটির বিকাশ। গুঁড়ো দুধ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিনিয়ত অসম প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে হচ্ছে দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তাদের। শুল্করোপের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিনিয়ত সুবিধা পাচ্ছে। এতে দামে প্রতিযোগিতা করতে পারছে না দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো। তাছাড়া দুগ্ধ শিল্পের জন্য নেই কোনো আলাদা বোর্ড বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান। অথচ দেশের বর্তমানের আবহাওয়া প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে দুগ্ধ শিল্পকে এগিয়ে নেয়া সম্ভব।

গরুর জাত উদ্ভাবনে দেশে এখন ৩০ বছরের আগের সেই ব্রিড নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর যে চারটি জাত দেশে ছাড়া হয়েছিল, এরপর আর দেশে জাত আনা হয়নি। এসব গরুর মধ্যে শতভাগ দেশী জাতের গরুর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে। বেশির ভাগই সংকর জাতের। দেশের প্রায় ১০ শতাংশ গরু বিদেশী জাত দ্বারা সংকরায়িত। অনেক গরুই এখন ইনব্রিড শুরু হয়ে গেছে। আর কারণেই মাংস বা দুধ উৎপাদনক্ষমতা কমে গেছে। অথচ উন্নত বিশ্বে জাত উদ্ভাবনে প্রতিনিয়তই গবেষণা এবং নতুন নতুন সিমেন দিচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে রয়েছে। আর তাই তো দেশে মাংস দুধের চাহিদা পূরণে পিছিয়ে পড়তে হচ্ছে। খাতের উৎপাদন বাড়াতে গাভীর জাত কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানো হচ্ছে না। শুধু খাদ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলে বর্তমান গাভী দিয়েই এক-তৃতীয়াংশ দুধ বেশি উৎপাদন করা সম্ভব। বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে পশু পালনকে উৎসাহিত করতে হবে। এজন্য খাতের প্রণোদনা দেয়া, কৃষক পর্যায়ে ঋণসহ প্রাথমিক সব সুবিধা দেয়ার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।

প্রাথমিক আর্থিক চাহিদা পূরণেও সরকারি-বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা কৃষক পর্যায়ে ঋণ সুবিধা দেয়া না গেলে গাভী পালনে আগ্রহ হারাবেন দেশের কৃষক। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সহজ শর্তে যে কৃষিঋণ বিতরণ করার নিয়ম রয়েছে, সেখানে প্রাণিসম্পদ খাতকে একটু গুরুত্ব দিয়ে ঋণ প্রদানে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া যতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মোট ঋণের শতাংশ হারে কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়। কৃষিঋণের মধ্যে শস্য, মত্স্য, প্রাণী পোলট্রি ছাড়াও সেচ যন্ত্রপাতি, ফসল মজুদ বিপণন, দারিদ্র্য বিমোচনে ঋণ বিতরণ করে। কিন্তু কৃষি খাতের মধ্যে বৈষম্যের শিকার হয় প্রাণিসম্পদ খাত। প্রতি বছরই প্রায় গড়ে ২০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। কিন্তু প্রাণিসম্পদ খাতে তাদের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ মোট ঋণের মাত্র -১০ শতাংশ। অথচ খাতে সহজ সুবিধাজনকভাবে কৃষক খামারিদের ঋণ প্রদান করা গেলে ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে পশু পালনকে উৎসাহিত করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগে বাড়বে। এছাড়া খাতে প্রণোদনা দেয়া এবং সচেতনতার পাশাপাশি তদারকি বাড়ানোর বিকল্প নেই।

উৎপাদিত পণ্য কীভাবে বাজারজাত করা কিংবা শিল্পের সঙ্গে সংযোগ করা যায়, সে বিষয়ে বা উৎপাদিত দুধের বিপণন বা প্রক্রিয়া অবস্থা কেমন রয়েছে, সেদিকেও নজর দিতে হবে। কেননা খামারিরা দুধ উৎপাদনের পর তা যদি বিক্রি করতে না পারেন, তাহলে তা ভিন্ন মাত্রায় বিপদ বয়ে আনবে কৃষকদের। দীর্ঘ কয়েক দশক দুধের বিপণন প্রক্রিয়াকরণের কাজ করে যাচ্ছে সমবায় অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (বিএমপিসিইউএল) বা মিল্ক ভিটা। সরকারি প্রতিষ্ঠান তাদের দুধ সংগ্রহের সিংহভাগই করছে গুটি কয়েক জেলায়।

দুগ্ধ শিল্পকে এগিয়ে নিতে সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। সেখানে বিনিয়োগ নীতি, গবেষণা সম্প্রসারণ নীতি, তদরকি কাঠামো, কৃষক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা স্পষ্ট করা থাকবে। এর মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশী বিদেশী উন্নয়ন সংস্থাগুলো কাজ করতে এগিয়ে আসবে। সেটি করা গেলেই কেবল কৃষকের সম্পদ যেমন অর্জিত হবে, তেমিন দেশও অর্থনৈতিকভাবে সম্পদশালী হবে। কৃষকদের আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। গোখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি খামারিদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। দেশে গরুর জন্য ডেডিকেটেড কোনো ঘাসের জমি নেই। ফলে গাভীর খাদ্যচাহিদা মেটাতে ব্যয়টা অনেক বেড়ে যায়। এর মধ্যে আশার দিক হলো আমাদের নিজস্ব ডাটা অনুযায়ী ২০ বছর আগে দেশে প্রতিদিন দুধ উৎপাদনক্ষমতা ছিল গাভীপ্রতি মাত্র দুই লিটার। এখন দুধ উৎপাদন বেড়ে প্রায় সাড়ে চার লিটার হয়েছে। সীমাবদ্ধতা হলো আমাদের আমদানীকৃত যে জাত সেটা হলো ফ্রিজিয়ান। এটি শীতল এলাকার গরুর জাত। বাংলাদেশে অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে জাতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই বিকল্প জাত দেখতে হবে।

 

মো. শাহ এমরান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএফএ)

আরও