জুম চাষ, করপোরেট বাণিজ্য ও পরিবেশ

আমি সরাসরি জুমচাষী পরিবারের একজন। আমার বাবা ও দাদারা সবাই জুমচাষী ছিলেন। জুম চাষ ছেড়ে লাইনচ্যুত হয়ে আমি অন্য পেশায় এসেছি। একজন জুমচাষী পরিবারের সদস্য ও পেশাজীবী হিসেবে যা দেখেছি, জুম চাষই পাহাড়ি ভূমিতে একমাত্র স্থায়িত্বশীল চাষ পদ্ধতি। খাড়া পাহাড়ে জুমের বিকল্প কোনো চাষই দীর্ঘমেয়াদে লাগসই ও পরিবেশের উপযোগী নয়। কারণ

আমি সরাসরি জুমচাষী পরিবারের একজন। আমার বাবা দাদারা সবাই জুমচাষী ছিলেন। জুম চাষ ছেড়ে লাইনচ্যুত হয়ে আমি অন্য পেশায় এসেছি। একজন জুমচাষী পরিবারের সদস্য পেশাজীবী হিসেবে যা দেখেছি, জুম চাষই পাহাড়ি ভূমিতে একমাত্র স্থায়িত্বশীল চাষ পদ্ধতি। খাড়া পাহাড়ে জুমের বিকল্প কোনো চাষই দীর্ঘমেয়াদে লাগসই পরিবেশের উপযোগী নয়। কারণ ধারাবাহিক নিবিড় চাষাবাদে পাহাড়ি ভূমি খুব সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত ফাটল সৃষ্টি হয়ে ধসে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। বিপরীতভাবে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ছাড়া জুম চাষ হয় না। স্বাভাবিকভাবে জুমচাষীদের জুম চাষের স্বার্থে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধরে রাখা সৃজন করা জরুরি হয়ে পড়ে। এজন্য কোনো জমিতে একবার জুম চাষের পর কয়েক বছরের জন্য জমি পতিত রাখা হয়। পতিত রাখা জমিতে প্রকৃতির নিয়মে প্রাকৃতিক বন সৃষ্টি হয় এবং জুম চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে। পতিত রাখার সময়ে বন সৃষ্টি হলে খাড়া ভূমির ক্ষয়শীলতা, ফাটল ধসের সম্ভাবনা থাকে না। মাটিও তার জৈব গুণাবলি ফিরে পায়। অর্থাৎ বৈশিষ্ট্যগত কারণে জুম চাষ পার্বত্য ভূমিতে অত্যন্ত পরিবেশ সহায়ক। কারণে বন বিভাগ পরিবেশবাদীদের নেতিবাচক অবস্থান এবং করপোরেট বাণিজ্যের আগ্রাসন সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামে শত শত বছর ধরে জুম চাষ টিকে রয়েছে। অন্যদিকে একই জমিতে বছরের পর বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন ফসল চাষের পরিবেশের নেতিবাচক প্রভাবে পাহাড়ের মাটির গঠন কাঠামো নড়বড়ে হয়ে ধসে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। সাম্প্রতিক সময়ে তিন পার্বত্য জেলায় পাহাড়ধসে প্রাণহানি তারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ভূমির ওপর জনসংখ্যার চাপ, করপোরেট কোম্পানি বহিরাগত প্রভাবশালীদের অবৈধ ভূমি দখলসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত জুম চাষের জমি কমে যাচ্ছে। এতে জুম চাষ সীমিত হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি প্রাকৃতিক বনায়নেরও সংকট দেখা দিয়েছে। অর্থাৎ জুম চাষ নেই তো নবায়নযোগ্য প্রাকৃতিক বনাঞ্চলও নেই। আর প্রাকৃতিক বনাঞ্চল না থাকলে পরিবেশ প্রতিবেশগত বাস্তুতন্ত্রিক ভারসাম্যও থাকার অবকাশ নেই। এভাবে পাহাড়ে একদিকে সনাতনী জুম চাষ পদ্ধতি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশগত বিপর্যয়ের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। নিচে জুম চাষে পরিবেশ সহায়ক কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার পর করপোরেট বাণিজ্যের আগ্রাসন নিয়ে আলোচনা করা হবে।

আগে বলা হয়েছে, জুম চাষে পাহাড়ি ভূমি প্রাকৃতিক বনাঞ্চল হওয়া আবশ্যক। মানুষের সৃষ্ট তথাকথিত বন বা বৃক্ষ খামারে ন্যাড়া বা বিরান ভূমিতে জুম চাষ হবে না। প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে ছাড়া জুম হয় না বলেই জুম চাষ প্রাকৃতিক পরিবেশের একটি স্বাভাবিক আবর্তন চক্রের শৃঙ্খলা রয়েছে। যেমন

ওপরে বর্ণিত প্রাকৃতিক বনাঞ্চল জুম চাষের আবর্তন চক্রে স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, জুম চাষ প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিপূরক একটি প্রতিবেশগত বাস্তুতান্ত্রিক সম্পর্ক হিসেবে কাজ করে। জুমচাষীরাও নিজেদের জীবিকা রক্ষার তাগিদে চেতনে-অবচেতনে বনাঞ্চল রক্ষা করেন। আর বনাঞ্চল সংরক্ষণ হলে পরিবেশ, প্রাণ-প্রকৃতিও রক্ষা পায়।

পাহাড়ের ভূপ্রকৃতিতে পরিবেশ রক্ষায় জুম চাষ আরো অনেক সহায়ক ভূমিকা পালন করে। যেমন () জুম চাষের জন্য মাতৃগাছ সংরক্ষণ করেই প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কেটে পরিষ্কার করা হয়। এতে জুম চাষ শেষে পতিত ভূমিতে মাতৃগাছগুলো বীজ ছড়িয়ে দিয়ে দ্রুত প্রাকৃতিক বনায়নে উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। () জুম চাষে পানির উৎস বা ঝিরি-ঝরনার তীরবর্তী বনাঞ্চল কাটা হয় না। বনাঞ্চল থাকায় উৎসগুলো শুকিয়ে যায় না। পানির উৎসগুলো জুমের ফসল উৎপাদনে বনাঞ্চল সৃজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী আবাস্থল খাদ্যচক্রের আধারে পরিণত হয়। () পার্বত্য চট্টগ্রামে ৩০-৩৫ শতাংশ ভূমি অত্যধিক খাড়া। সেখানে জুম চাষসহ কোনো ফসল চাষ করা যায় না। ওই খাড়া ভূমিতে সবসময় প্রাকৃতিক বনাঞ্চল থাকে। খাড়া ভূমির বনাঞ্চল পরিবেশ রক্ষায় বন সৃজনের বীজের উৎস সহায়ক ভূমিকা পালন করে। () জুমে একসঙ্গে ধান, তিল-তিসি, মরিচ, ভুট্টা, তুলা, মারফা, কাউনসহ বহু ফসল চাষ হয়। এজন্য জুম চাষকে অনেক কৃষিবিদ শুধু চাষ না বলে মাল্টি-ক্রপ ফরেস্ট্রি বলেন। কারণ প্রাকৃতিক বনেও অসংখ্য প্রজাতির গাছ, লতাগুল্ম থাকে। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ক্ষয়রোধ করে। একসঙ্গে বহু ফসল চাষে এক ধরনের ভারসাম্যমূলক প্রতিরোধী আবহ থাকায় কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হয় না। এক ফসলি চাষে (মনোকালচারে) রকম ভারসাম্য রক্ষা করে না। () একমাত্র জুম চাষই মাটির গঠন কাঠামো অক্ষত রেখে করা হয়। বীজ বপনে কোনো মাটি কাটার প্রয়োজন নেই। এজন্য জুমচাষের পাহাড়ে সহজে ভূমিধস হয় না। () প্রাকৃতিক বনাঞ্চল কেটে আগুনে পোড়ানোর কারণে একশ্রেণীর পরিবেশবিদ বন বিভাগ আপত্তি করে। কিন্তু ক্ষতিকর আগাছা থেকে রক্ষা, ভস্মীভূত ছাই সার কীটনাশক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া জুমে আগুনে আশপাশের বনাঞ্চলের বেশকিছু অংশ পুড়ে যায়। আগুনে পোড়ার পর নতুন করে গাছের পাতা লতাগুল্ম গজালে তৃণভোজী বন্যপ্রাণীর জন্য সহজলভ্য খাবারের জোগান হয়। এজন্য অনেক বন্যপ্রাণী জুম চাষের কাছাকাছি বনাঞ্চলে থাকে। জুমচাষীরা শিকার করে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতি পূরণ করেন।

জুম চাষে করপোরেট আগ্রাসন: পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একশ্রেণীর কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গির সংকট রয়েছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের কাছে যেমন ভারতীয় উপমহাদেশ পাকিস্তানিদের কাছে বাংলাদেশ (তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তান) মানে একটি লোভনীয় ব্যবসা অথবা পেশা, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামকেও ওই স্বার্থগোষ্ঠী সেই একই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে। পার্বত্য চট্টগ্রাম বলতেই প্রভাবশালীদের কাছে আভিজাত্যের প্রতীকবাগানবাড়ি, রাবার বাগান, হর্টিকালচারের ইজারাদারি, বনাঞ্চল পাচার, ভূমি নদী-খালের প্রাকৃতিক পাথরের খনি দখল। আর প্রান্তিক মানুষের জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই, চাকরিবাকরি, কর্মসংস্থান ভাগ্যবদলের অবাধ সুযোগ। এজন্য বানের পানির মতো পার্বত্য চট্টগ্রামে জনসংখ্যার ঢেউ ছুটে আসছে। ক্ষমতা কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষীরা ঢুকছে জুমচাষীদের জুমের জমি দখল করে আভিজাত্য অর্জনের জন্য। প্রান্তিকরা আসছে ভাগ্যবদলের জন্য। সমতল থেকে এসে যারা অঞ্চলের বন, প্রকৃতি জাতিগত বৈচিত্র্যকে ভালবেসে বসবাস করে, তাদের তিরস্কার করে বলা হয়, এত বছর পার্বত্য চট্টগ্রামে থেকে কিছুই করতে পারলেন না! বলতে দ্বিধা নেই, আভিজাত্য অর্জন ভাগ্যবদলের সারিতে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও রয়েছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেন।

বান্দরবানের এক হিসাবে দেখা যায়, লামা, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি বান্দরবান সদর উপজেলায় ২৮টি করপোরেট কোম্পানিসহ হাজার ৮৬৯ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানকে ৪৬ হাজার ৭২৫ একর পাহাড়ি জমি ইজারা দেয়া হয়েছে। রাবার হর্টিকালচার বাগানের নামে ৪০ বছরের জন্য ইজারা দেয়া এসব জমিতে শত শত বছর ধরে আদিবাসীরা বংশপরম্পরায় জুম চাষ করত। আদিবাসী প্রথাগত আইনে জুমের জমি সামাজিক মালিকানায় থাকে। প্রশাসন ওই সামাজিক মালিকানার জমি সরকারি খাস দেখিয়ে ইজারা প্রদান করে। যুগ যুগ ধরে ভূমির মালিক আদিবাসী জুমচাষীরা মুহূর্তের মধ্যে অবৈধ বসবাসকারী হয়ে যান, আর বহিরাগতরা ইজারা দলিল নিয়ে ভূমির মালিক হয়ে ওঠেন।

সেনা শাসক জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম রাবার উন্নয়ন বোর্ড গঠন করেন। তখন থেকে ১৯৯৫-৯৬ সাল পর্যন্ত ইজারা দেয়া জমি অনেক ইজারাদার পার্বত্য শান্তিচুক্তির আগে দখল করতে পারেনি। পার্বত্য চুক্তির পর শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে ইজারা চুক্তির দলিল নিয়ে হাজার হাজার একর জুমের জমি দখল করে নিয়েছে। অথচ জমি ইজারা দেয়ার সময় সহজ-সরল আদিবাসীদের কিছু জানানো হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলন নামে একটি সংগঠনের হিসাবে শান্তিচুক্তির পর জুম চাষের জমি হারিয়ে লামা, আলীকদম নাইক্ষ্যংছড়িতে ১৩টি পাড়া উচ্ছেদ হয়েছে।

জুমচাষীদের জুমের জমিতে এখন রাবার-হর্টিকালচার বাগান বিদেশী প্রজাতির গাছে বাণিজ্যিক বনায়ন বা গাছের খামার করা হয়েছে। পাহাড়ি পরিবেশের অভিযোজনে সহায়ক মাল্টি-ক্রপ ফরেস্টেশনের জুম চাষের পরিবর্তে মনোকালচারের বাণিজ্যিক বৃক্ষ খামারে এখন দ্রুত পানির উৎস শুকিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক বনাঞ্চল না থাকায় বাস্তুতন্ত্রের খাদ্যচেক্রর শৃঙ্খলা বিলুপ্ত হওয়ায় জীববৈচিত্র্যও হারিয়ে গেছে। সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড) নামের একটি গবেষণা সংস্থার গবেষণায় এসব মনোকালচারের বাণিজ্যিক বনায়নকে পাহাড়ি পরিবেশে সবুজ মরুভূমি (গ্রিন ডেজার্ট) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে প্রভাবশালীদের আভিজাত্য জাহিরে, করপোরেট আগ্রাসনের ভূমি দখলে বাণিজ্যিক বৃক্ষ খামারে দিনে দিনে জুম চাষ হারিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ি প্রকৃতি পরিবেশের সঙ্গে লাগসই অভিযোজন উপযোগী জুমের বিকল্প চাষ পদ্ধতি বিকল্প উন্নয়নের পদক্ষেপ না থাকায় পরিবেশ-প্রতিবেশগত সংকট তৈরি হচ্ছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম চাষের বর্তমান অবস্থা: পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ একসময়ে শতভাগ জুমচাষী ছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে চাকমা রাজপরিবার পাহাড়ি অভিজাতশ্রেণী সমতল জমির কৃষি চাষ শুরু করেন। তারা কৃষিকাজের জন্য সমতল থেকে বাঙালি কৃষক নিয়ে আসেন। তখন থেকে জুম চাষ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। বাঙালি বসতিও শুরু হয়। ১৮৬০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা হওয়ার পর ১৮৬২ সালে ব্রিটিশরা চন্দ্রঘোনায় বন বিভাগের দপ্তর নিয়ে আসে। ১৮৭০ সাল থেকে বন বিভাগ জুম চাষ নিয়ন্ত্রণের জন্য উদ্যোগ নেয়। ১৮৭১ সালে মাইনী উপত্যকা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রূপান্তরিত হয়। ১৮৭৫ সালে কাঁচালং সীতা পাহাড় বন বিভাগের আওতায় নেয়া হয়। বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সে সময়ে ১৮৮০ সালে মাতামুহুরী লাখ হাজার ৮৫৪ ১৮৮১ সালে সাঙ্গু ৮২ হাজার ৮০ মোট লাখ ৮৪ হাজার ৯৩৪ একর ভূমির ওপর সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষিত হয়েছে। বন বিভাগ পর্যায়ক্রমে পার্বত্য অঞ্চলের এক-চতুর্থাংশ ভূমি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নামে অধিভুক্ত করে নিয়েছে। ফলে জুম চাষের জমিও সংকুচিত হতে থাকে। অন্যদিকে সমতলের লোকজনের আগমনে ভূমির ওপর প্রচণ্ড জনসংখ্যার চাপ বেড়ে যায়। এমনিতে পার্বত্যাঞ্চলের খাড়া পাহাড়ি ভূমিতে জনধারণক্ষমতা অত্যন্ত কম। করপোরেট ভূমি দখল, বৈধ-অবৈধ কাঠ পাচারে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় জুম চাষ দ্রুত কমে যেতে থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের ২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী তিন পার্বত্য জেলায় ৪২ হাজার ৯৯২ দশমিক ৫০ একর জমিতে জুম চাষ হয়। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে ১৫ হাজার ১২৫ একর, বান্দরবানে ২২ হাজার ২৩৭ দশমিক ৫০ একর খাগড়াছড়িতে হজার ৬৩০ দশমিক ৩০ একর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে জুম চাষ প্রতি বছর কমে আসছে। বোমাং রাজার দপ্তরের ২০১৩ সালের হিসাবমতে বান্দরবানের ৯৫টি মৌজায় ৯৩৬টি পাড়ায় ১৬ হাজার ২৯১টি পরিবার জুম চাষ করে। বান্দরবানের জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ এবং মৃত্তিকা সংরক্ষণ পানি বিভাজিকা কেন্দ্রের (এসআরডিআই) হিসাব অনুযায়ী জেলার মোট ভূমির পরিমাণ ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৪৬০ একর।

বান্দরবান পার্বত্য জেলার সাতটি উপজেলায় বর্তমানে খাস জমি রয়েছে লাখ ৪৭ হাজার ৬৫১ একর বা মোট জমির ৩৩ শতাংশ। ১৯৬৩-৬৪ সালের ফরেস্টাল ফরেস্ট্রি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের পার্বত্য অঞ্চলের ৭৭ শতাংশ জমি অত্যধিক খাড়া। ওই খাড়া ভূমির ৩০-৩৫ শতাংশ জমি জুম চাষেরও অনুপযোগী। তাহলে বান্দরবানের খাসে থাকা লাখ ৪৭ হাজার ৬৫১ একর জমির অধিকাংশই জুম চাষের উপযুক্ত নয়। অবস্থায় কোনো জমিতে একবার জুম চাষ করার পর ওই জমি পতিত রাখার সময় (জুম চক্র) কমে গেছে। ফলে জুম চাষে উৎপাদনও কমে যাওয়ায় দিনে দিনে অলাভজনক হয়ে উঠছে।

জুম চাষ টিকে থাকা না থাকা নিয়ে কথা: কৃষি সভ্যতার গোড়পত্তন হয়েছে জুম চাষের মধ্য দিয়ে। তবে পরবর্তী সময়ে জুম চাষ কোনো সময়ে মূল স্রোতের কৃষি ব্যবস্থা ছিল না। পার্বত্য বনভূমিতে লাগসই হওয়ায় হাজার হাজার বছর ধরে পাহাড়ি অঞ্চলের প্রান্তিক জনপদে টিকে রয়েছে। আমাদের দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট ময়মনসিংহের গারো পাহাড়ে এখনো জুম চাষ করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানে অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের সামাজিক ইতিহাস বিশ্বসভ্যতা গ্রন্থে বলেছেন, Theory of vertical economy নামে একটি তত্ত্বে বিশ্বের কৃষি ব্যবস্থাকে ধানপ্রধান গমপ্রধান দুটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। জাপান, দক্ষিণ চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ভারত হচ্ছে ধানপ্রধান অঞ্চল। আর গমপ্রধান অঞ্চল ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, নিকট প্রাচ্য মধ্য এশিয়া। জুম চাষ ধানপ্রধান অঞ্চলের অন্যতম একটি কৃষি ব্যবস্থা। কৃষি ব্যবস্থা মূলত খরপোষ অর্থনীতিভিত্তিক, বাণিজ্যিক নয়। শুধু খেয়েপরে বেঁচে থাকার তাগিদে জুমিয়ারা জুম চাষ করেন। প্রান্তিক জনপদে চাষ পদ্ধতি টিকে থাকা না থাকা প্রাকৃতিক পরিবেশ বা বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে রাখতে পারার ওপর নির্ভর করছে। কারণ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল না হলে জুম হয় না। আর জুম টিকিয়ে রাখা না গেলে উৎপাদন সম্পর্কের ওপর গড়ে ওঠা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জুম সংস্কৃতির রূপান্তর কী হবে তাও অনুমান করা কঠিন। সুতরাং প্রাকৃতিক বন, জুম চাষ, জুমিয়া মানুষের জুম সংস্কৃতি পরিবেশ একে অন্যের পরিপূরক। একটাকে টিকিয়ে রাখতে হলে অন্যগুলোও টিকিয়ে না রাখলে চলবে না।

 

বুদ্ধজ্যোতি চাকমাগবেষক

আরও