আদিকাল থেকেই ‘বাংলা’ প্রাকৃতিক সম্পদে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ ছিল। বৈচিত্র্যময় ফল-ফসলের উৎপাদন ও প্রাণিকুলের বংশবিস্তারে এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও জলবায়ু ছিল বেশ সহায়ক। কৃষিপ্রধান হলেও জনজীবনে বাণিজ্যের গুরুত্ব মোটেই কম ছিল না। তাছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্যের ট্রানজিট রুট হিসেবেও বাংলার বিশেষ খ্যাতি ছিল।
ফলে পৃথিবীর নানা প্রান্তের বণিক গোষ্ঠীর বেঙ্গলে আগমন ও ব্যবসায়িক কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা ছিল লক্ষণীয়। তদুপরি, সহস্রাধিক নদ-নদী, ভূমির উর্বরতা ও মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন পদ্ধতি—সব মিলিয়ে বহু গোষ্ঠীর আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল প্রাচীন বাংলা।
ইবনে বতুতা, হিউয়েন সাঙ, মা-হুয়ান, ফাহিয়ানসহ অসংখ্য পর্যটক তাদের বর্ণনায় তত্কালীন বাংলাকে সমৃদ্ধ এক জনপদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাছাড়া মার্কোপোলোর ভ্রমণবৃত্তান্তে এ অঞ্চলের সঙ্গে রোম, চীন, মালাবার, সিংহল ও সুমাত্রার ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা উল্লেখ রয়েছে।
এ অঞ্চলের চিকন চাল, মসলিন কাপড় ও মসলাজাতীয় (বিশেষত তেজপাতা ও সুগন্ধি তেল) দুর্লভ বস্তুর আকর্ষণে আরব, আফগান, মিসরীয় ও চীনা বণিকদের আগমন ঘটে। বাংলার ঐতিহাসিক উত্থান-পতনের সঙ্গেও এতদঞ্চলে প্রাপ্ত সম্পদসমূহের বিশেষ সম্পর্ক লক্ষ করা যায়। গ্রিক, শক-পার্থিয়ান ও কুষাণদের আগমন, অবস্থান ও শাসনকাল তারই সাক্ষ্য বহন করে।
পরবর্তীকালে পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজদের এতদঞ্চলে আগমন ঘটে। এখানে প্রাপ্ত কৃষি ও হস্তশিল্পজাত দ্রব্যাদির (বিশেষ করে সুগন্ধি, রেশম ও কার্পাস বস্ত্রের) সুনাম এবং সমগ্র ইউরোপে সেগুলোর চাহিদা তাদের ভারতবর্ষ আগমনে প্রেরণা জোগায়। মূলত ব্যবসায়িক সমৃদ্ধির আশায় তারা জীবন বাজি রেখে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে প্রথমদিকের দুঃসাহসিক অভিযানগুলো পরিচালনা করে।
একপর্যায়ে অতি সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোর ওপর পূর্ণ অধিকার লাভের প্রশ্নে তারা পরস্পর সংঘাতেও লিপ্ত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় একপর্যায়ে তারা বেনিয়া থেকে সমগ্র ভারতবর্ষের শাসকে পরিণত হয়। ১৯০ বছরের (১৭৫৭-১৯৪৭) ঔপনিবেশিক আমল তারই সাক্ষ্য বহন করছে।
ব্রিটিশ আমলে নৌ ও সমুদ্রপথের পাশাপাশি রেল যোগাযোগে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সম্প্রসারণ ঘটে। সহজলভ্য কাঁচামালের সদ্ব্যবহারে ইংরেজরা বিভিন্ন স্থানে পাট, চিনি ও কাগজ কল প্রতিষ্ঠা করে। আদমজী জুট মিলের মতো বিশাল স্থাপনাও প্রতিষ্ঠা করেছিল নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য।
এখানে প্রাপ্ত কাঠ আরব দেশগুলোতে এবং পান, সুপারি, লবণ ও নারকেল অন্যান্য দেশে রফতানি করত। এখানকার স্বর্ণ, তামা, পিতলের মতো সম্পদগুলো নানা কৌশলে করায়ত্ত করে তারা নিজেদের ভূখণ্ডকে সমৃদ্ধ করে। স্থানীয় অধিবাসীদের কল্যাণের বিষয়টি তাদের কাছে চিরদিনই গৌণ ছিল। স্থানীয়দের শ্রম ব্যবহার করলেও ব্যবস্থাপনা থেকে সচেতনভাবে সব সময় তাদের দূরে রাখে।
অন্যদিকে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সদস্যদের নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে বড় কিছু করার মতো সামর্থ্য, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা ছিল না। ফলে নিজেদের সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তা থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা খুব একটা উপকৃত হয়নি।
১৯৪৭ সালের দেশভাগ এক্ষেত্রে নতুন এক সম্ভাবনার সৃষ্টি করে। বহিঃশত্রুর বিদায়ে নিজেদের প্রতি মনোযোগী হওয়া বা নিজেরা একটা কিছু করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির স্বল্প সময়ের মধ্যে সেটাও দুরাশায় পরিণত হয়। শাসন ও শোষণের নতুন শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে বাংলার জনগণ উপলব্ধি করে যে ইংরেজদের বদলে পাকিস্তানি শাসকরা আরো কঠিনভাবে তাদের ওপর চেপে বসেছে।
শাসকগোষ্ঠী ন্যায্য, সুষম ও যৌক্তিক নয় বরং শুধু পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে আগ্রহী। বাংলার সম্পদ ও শ্রম পুরোমাত্রায় ব্যবহূত হয় তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে। ষাটের দশকে অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে।
ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের স্বল্পতম সময়ে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে স্বতন্ত্র এক রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত কারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো রকমে চলতে থাকে। সেগুলোর সম্প্রসারণ বা নতুন শিল্প-কারখানা প্রতিষ্ঠায় তেমন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না।
২৩ বছরে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবসায় উদ্যোগ বা উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়নি। পাকিস্তানি কিছু ব্যবসায়ী অনুকূল পরিবেশ কাজে লাগিয়ে বড় উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে সেগুলোর সুফল খুব সংগত কারণেই পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যায়।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রেক্ষাপটে এবং নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলাকালে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের অনেকেই দেশ ত্যাগ করেন। বিশেষত মাড়োয়ারি ও বিহারিদের চলমান ব্যবসায় উদ্যোগগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে অনেক সম্পদ লুটপাট হয়ে যায়।
সেগুলোর চলমান ধারাবাহিকতা স্তব্ধ হওয়ায় সার্বিক অর্থ ব্যবস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয়ভাবে বড় উদ্যোগ নেয়ার মতো লোকের সংখ্যা একেবারে হ্রাস পায়। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থ ব্যবস্থার পুনর্গঠন ছিল বঙ্গবন্ধু সরকারের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় নিজেদের অর্থ ব্যবস্থা গোছাতে সচেষ্ট হয়। তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি বিরোধিতা করায় তাদের ‘পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থা’র প্রতি নীতিনির্ধারকদের নেতিবাচক মনোভাব ছিল স্পষ্ট। ফলে স্তব্ধ ও বিপর্যস্ত কলকারখানাগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় সচল করার উদ্যোগ নেয়া হয়। স্বল্প সময়ের মধ্যে বহু প্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ করা হয়।
তত্কালীন বিশ্বের প্রভাবশালী সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু সরকারের সম্পর্ক বৃদ্ধি পেতে থাকে। সে কারণেই আমাদের শিল্প-কলকারখানা স্থাপন ও তার প্রসারে সমাজতান্ত্রিক মডেলের প্রভাব বেশি থাকে। ব্যক্তি উদ্যোগের ব্যবসা-বাণিজ্যগুলো মূলত আমদানি-রফতানি বা মধ্যস্থ কারবারি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। ব্যক্তি উদ্যোগে বড় কোনো শিল্প-কারখানা স্থাপন বা উৎপাদনে যাওয়ার কথা তখন খুব একটা ভাবা সম্ভব হয়নি।
আশির দশক প্রায় পুরোটা এভাবেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে অতিক্রান্ত হয়। তখন পর্যন্ত ব্যক্তিপর্যায়ে ব্যবসায়গুলো ছিল মূলত খাদ্য ও বস্ত্রসংক্রান্ত। ছোট উদ্যোগে প্রাপ্ত সফলতা ও অভিজ্ঞতা এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের ক্রমেই বড় উদ্যোগ গ্রহণে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে।
সরকারি খাতের বাইরে ব্যাংক-বীমা ও শিল্প-কলকারখানা স্থাপনের বড় উদ্যোগ শুরু হয় মূলত নব্বইয়ের দশকে। বিপুল জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়ায় বিশেষত ভোগ্যপণ্যের উৎপাদন ও বণ্টনসংক্রান্ত উদ্যোগ বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়।
এ দশকে তৈরি পোশাক খাতে বিনিয়োগের প্রতি বিশেষ ঝোঁক বাড়তে থাকে। গার্মেন্টস খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমেই মূলত দেশে ব্যক্তি পর্যায়ে বড় উদ্যোগ গ্রহণের প্রবণতা শুরু হয়। সেগুলোর ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজে নিটওয়্যার ও হোসিয়ারির মতো অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ গৃহীত হয়।
স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের ধারায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কলকারখানা গড়ে উঠতে শুরু করে। নদী ও সমুদ্রবন্দরের সুবিধা থাকায় রাজধানীর বাইরে খুলনা শিল্পনগরী ও চট্টগ্রাম বন্দরনগরী হিসেবে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি মালিকানাধীন ব্যবসায় উদ্যোগের সংখ্যা বেশ দ্রুত বাড়তে থাকে। তাছাড়া রংপুর অঞ্চলে তামাকজাত দ্রব্যাদি, রাজশাহীতে রেশম পণ্য ও সিলেটে চা ও বেত শিল্পসংশ্লিষ্ট বিশেষ ব্যবসায় উদ্যোগ বিস্তার লাভ করে।
গত শতাব্দীর শেষ দশকে স্বল্পতম সময়ে ব্যক্তি খাতে বেশকিছু বড় উদ্যোগ গৃহীত হয়। পরিবারনির্ভর ব্যবসায়ের বাইরে কোম্পানি গঠন ও সেগুলো শক্তিশালীকরণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের প্রবণতা দেখা যায়। এই সময়ে বিদেশী ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এখানে ব্যবসায় বিস্তারে মনোযোগী হয়। ফলে প্রতিযোগিতার আওতা ও তীব্রতা বেশ দ্রুত বাড়তে থাকে। এ দশকে প্রথম জেনারেশনের ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের অনেকেই সাফল্যের স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করেন।
দেশের বিভিন্ন সেক্টরে বেশকিছু সফল উদ্যোক্তার আবির্ভাব ঘটে। তাদের মধ্যে আর পি সাহা (ভারতেশ্বরী হোমস, কুমুদিনী কলেজ ও দেবেন্দ্র কলেজ), জহুরুল ইসলাম (ইসলাম গ্রুপ), স্যামসন এইচ চৌধুরী (স্কয়ার গ্রুপ), লতিফুর রহমান চৌধুরী (ট্রান্সকম গ্রুপ), সালমান এফ রহমান (বেক্সিমকো গ্রুপ), সেখ আকিজ উদ্দিন (আকিজ গ্রুপ), আবুল খায়ের (আবুল খায়ের গ্রুপ), আমজাদ খান চৌধুরী (প্রাণ-আরএফএল), নিতুন কুণ্ডু (অটবি), আবদুল মোনেম (আবদুল মোনেম লিমিটেড), সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী (এপেক্স গ্রুপ), আব্দুল আউয়াল মিন্টু (মাল্টিমোড গ্রুপ), আব্দুল মাতলুব আহমাদ (নিটল-নিলয় গ্রুপ), এমএ হাশেমের (পারটেক্স গ্রুপ) নাম উল্লেখ্য।
গত কয়েক দশকে আরো কিছু উল্লেখযোগ্য উদ্যোক্তার বিকাশ ঘটে। তাদের মধ্যে নুরুল ইসলাম বাবুল (যমুনা গ্রুপ), আহমেদ আকবর সোবহান (বসুন্ধরা গ্রুপ), সুফি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান (পিএইচপি গ্রুপ), জয়নুল হক সিকদার (সিকদার গ্রুপ), আব্দুল খালেক পাঠান (কেয়া গ্রুপ), আবুল কালাম আজাদ (আজাদ প্রোডাক্টস), গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী (অ্যাডকম লিমিটেড), এমএ আজাদ (হা-মীম গ্রুপ), আনিসুল হক (মোহাম্মদী গ্রুপ), এম আনিস উদ দৌলা (এসিআই গ্রুপ), ফজলুর রহমান (সিটি গ্রুপ), রহিম উদ্দিন ভরসা (ভরসা গ্রুপ), নাসির উদ্দিন বিশ্বাস (নাসির গ্রুপ), মোহাম্মদ সাইফুল আলম (এস আলম গ্রুপ), এসএম নজরুল ইসলামের (ওয়ালটন গ্রুপ) নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এনজিও খাতে বাংলাদেশ অতি সফল কিছু উদ্যোক্তা পেয়েছে। তাদের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ব্র্যাক’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্যার ফজলে হাসান আবেদ অনন্য এক নজির সৃষ্টি করেছেন। ‘গ্রামীণ ব্যাংক’ ও তার প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ড. হোসনে আরা বেগম প্রতিষ্ঠিত ‘টিএমএসএস’ লক্ষাধিক মানুষের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাছাড়া ‘আশা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সফিকুল হক চৌধুরী দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের কল্যাণে বড় অবদান রেখেছেন।
খাতওয়ারি দৃষ্টিকোণ থেকে বিগত দশকগুলোতে বেশ বৈচিত্র্যময় উদ্যোক্তার দেখা মেলে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন, আবাসন, শপিং মল, হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট, পার্ক ও বিনোদনকেন্দ্র, সুপার শপ, ইলেকট্রনিকস দ্রব্যাদি এমনকি গাড়ি নির্মাণ শিল্পে বড় বিনিয়োগ হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে আরো বৈচিত্র্যময় খাতে বিনিয়োগের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
গত দুই দশকে কৃষি ও পশুসম্পদের সঙ্গে জড়িত ছোট ও মাঝারি অসংখ্য উদ্যোক্তার সৃষ্টি হয়েছে। রফতানির উদ্দেশ্যে দেশের নানা প্রান্তে ফুল-ফল-সবজির বেশকিছু খামার গড়ে উঠেছে। এই সময়ে ঔষধি বৃক্ষের চাহিদা মেটাতে উত্তরাঞ্চলের (বিশেষত নাটোরের) ঔষধি গ্রামগুলো বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
দেশে আমিষের চাহিদা মেটাতে গরু-ছাগল খামারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। ফলে বেশ কয়েক বছর হলো কোরবানির সময়ও নিজেদের পশু দিয়ে মোট চাহিদা পূরণ হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য পোলট্রি ফার্ম গড়ে উঠেছে। ছোট ও মাঝারি বিপুলসংখ্যক উদ্যোক্তার কল্যাণে মত্স্য চাষেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সফলতা পেয়েছে।
খাদ্যশস্যের পাশাপাশি আম-কাঁঠাল-লিচু-পেয়ারা ও লেবু চাষে বড় পরিবর্তন এসেছে। মাল্টা, কমলা ও ড্রাগন ফলের মতো অপ্রচলিত খাতে কৃষি উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়েছে। ফলে আগে উদ্যোক্তা বলতেই যে শিল্প-কারখানায় পণ্য উৎপাদন বা বিক্রয়সংক্রান্ত কাজকর্মকে বোঝাত, সেই ভাবনায় অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। দেশে কৃষিসংশ্লিষ্ট আধুনিক যন্ত্রপাতি তৈরি ও আমদানিকারী (সিলেটের আলীম ইন্ডাস্ট্রিজের মতো) প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ছে।
এখন তরুণ উদ্যোক্তাদের ভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের সাহস ও প্রবণতা বাড়ছে। গোটা বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়ে ঝুঁকে পড়ছে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম সেদিকে মনোযোগী হলে সেখানেও আশাতীত সফলতা আসা সম্ভব। ‘পাঠাও’ কিংবা ‘টেন মিনিটস স্কুল’-এর সফলতা সেটাই ইঙ্গিত করে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাগুলো থেকে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও উৎসাহ পাওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ সরকার বরাবরই উদ্যোক্তা উন্নয়নে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোয় নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধাও অফার করছে। বিপুল জনগোষ্ঠীর দেশে উদ্যোগ গ্রহণের প্রতি ইতিবাচক প্রবণতা বাড়াতে আরো বেশি গবেষণা হওয়া দরকার। বাজারের চাহিদা মেটাতে স্থানীয় কাঁচামাল ও শ্রমশক্তির সদ্ব্যবহারের বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে যে প্রজন্ম হাল ধরে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছিল তাদের অনেকেই বার্ধক্যের কারণে কিংবা সম্প্রতি করোনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। তাদের অনুপস্থিতি দেশের ব্যবসা জগতে নিঃসন্দেহে বড় এক আঘাত হেনেছে। অনেকের সন্তানরাই দক্ষতার সঙ্গে সেই উদ্যোগগুলোতে হাল ধরেছেন। কিন্তু বেশকিছু ক্ষেত্রে যোগ্য ও দক্ষ উত্তরাধিকার সংকট বেশ ভোগাচ্ছে। এ ব্যাপারে আরো ভাবা দরকার যে কীভাবে সেগুলোকে শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো যায়।
কারণ প্রকৃতির নিয়মেই প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তারা একসময় থাকবেন না। কিন্তু তাদের উদ্যোগগুলো টিকে থাকা জরুরি। সেটা করার মাধ্যমে অসংখ্য স্টেকহোল্ডারের কল্যাণ নিশ্চিত হয়। কোনো কারণে তাদের উদ্যোগ হোঁচট খেলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অসংখ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় দেশের অর্থনীতির। তাই সামগ্রিক কল্যাণের কথা বিবেচনা করে দেশে উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও বিকাশের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।
মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক ও ‘মার্কেটিংয়ের সহজপাঠ’ বইয়ের লেখক।