বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা
বর্তমানে
এ দেশে
মিশ্র অর্থনীতি
বিদ্যমান। রাষ্ট্রীয়
খাত, সমবায়
খাত ও
ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের
ক্রমবর্ধমান দক্ষ
ও ভারসাম্যপূর্ণ
উদ্যোগ এবং
সেখানে নাগরিকদের
সামাজিক ও
গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের
সুযোগ এবং
সেজন্য মালিকানা
ও ব্যবস্থাপনা
সম্পর্কের সংস্কার
ছাড়া উন্নয়ন
এদেশে দক্ষ,
সুষম ও
টেকসই হবে
না। বাংলাদেশের
প্রাথমিক পর্বে
ধীরলয়ে (৪
থেকে ৫
শতাংশ হারে)
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
হয়েছে। ২০০০
সালের পর
তা বাড়তে
বাড়তে প্রথমে
৫, পরে
৬ এবং
অবশেষে ৭
শতাংশে উপনীত
হয়েছে। সামাজিক
নির্ণায়কের ক্ষেত্রে
যেমন নারীর
অগ্রগতি, মাতৃমৃত্যুর
হার হ্রাস,
শিশুমৃত্যুর হার
হ্রাস, গড়
আয়ু বৃদ্ধি—এ
ধরনের মানব
উন্নয়ন, কৃষি
উন্নয়ন, রেমিট্যান্স
ও পোশাকশিল্পে
লক্ষণীয় অগ্রগতি
হয়েছে। এসব
কেউ অস্বীকার
করতে পারবে
না। তবে
এখানে দুটো
স্থায়ী ঘাটতি
থাকছে—১.
এ পুঁজিবাদী
বা বাজারনির্ভর
উন্নয়নের ফল
সব মানুষ
সুষমভাবে পাচ্ছে
না। ২.
ধনী-গরিবের
আয়-সম্পদ-শিক্ষা-চিকিৎসা
বৈষম্য দৃষ্টিকটুভাবে
বাড়ছে। তাছাড়া
দারিদ্র্যের আপেক্ষিক
হার হ্রাস
পেলেও মোট
দরিদ্র লোকের
সংখ্যা এখনো
প্রায় ৩-৪
কোটির সমান।
এ সংখ্যা
বিশ্বের অনেক
ছোট দেশের
মোট জনসংখ্যার
চেয়ে বেশি।
শুধু তা-ই
নয়, ৫০
বছর ধরে
সব সরকারের
আমলেই দেখছি
ধনী ও
গরিবের মধ্যে
অর্থনৈতিক ও
সামাজিক বৈষম্য
সাধারণভাবে বেড়েছে
এবং বাজারের
ও সিদ্ধান্ত
গ্রহণের ক্ষমতা
ধনীদের হাতে
কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
রাষ্ট্র তাদেরই
সেবা করছে।
তাই ভবিষ্যতে
সুশাসন ও
গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক
সংস্কার ছাড়া
অর্থনৈতিক উন্নতির
ধারা টেকসই
না-ও
হতে পারে।
বর্তমান উন্নয়ন
ধারায় গরিবের
একদম কিছু
হচ্ছে না
তা আমি
বলছি না।
গরিবও এগোচ্ছে,
ধনীও এগোচ্ছে।
কিন্তু ধনী
এগোচ্ছে খরগোশের
গতিতে আর
গরিব এগোচ্ছে
শামুকের গতিতে।
বাংলাদেশে অতি
ধনীদের সম্পদ
বৃদ্ধির হার
বিশ্বের মধ্যে
সবচেয়ে বেশি
(১৭.৪%)।
গড় আয়ও
অনেক বেড়েছে!
যদি বলি
আমার অর্ধেক
শরীর ফ্রিজে,
অর্ধেক শরীর
চুল্লির মধ্যে
আছে আর
সব মিলিয়ে
আমি গড়ে
নাতিশীতোষ্ণ আছি,
ব্যাপারটা অনেকটাই
সে রকম।
সেজন্য মানুষ
এসব উন্নতির
পরও সমতা
ও সুশাসনের
অভাবে অসন্তুষ্ট।
মানুষ বাস্তবে
দেখছে, সে
পরিশ্রম অনুযায়ী
ফল পাচ্ছে
না। কিন্তু
আরেকজন পরিশ্রমের
তুলনায় অনেক
বেশি পাচ্ছে।
আসলে উন্নয়ন
হচ্ছে সবারই।
তবে নিচের
দিকে উন্নয়ন
হচ্ছে তুলনামূলক
অনেক কমমাত্রায়।
ওপরের দিকে
বেশিমাত্রায় হচ্ছে।
তার ফলে
আয়বৈষম্য বেড়ে
যাচ্ছে। সব
জায়গাতেই বৈষম্য
লক্ষণীয়। আমরা
যে গড়
আয়ু বৃদ্ধির
কথা বলছি,
সেখানেও গরিবের
গড় আয়ু
অতটা বাড়েনি।
শিক্ষার হারের
কথা যদি
বলি, গরিবের
ঘরে শিক্ষার
মান যতটা
বেড়েছে, ধনী
ও মধ্যবিত্তের
ঘরে তা
বেড়েছে অনেক
বেশি। আগে
অনেকেই প্রাইমারি
স্কুলে পড়তে
পারত না,
এখন পারছে।
কিন্তু গ্রামের
প্রাইমারি স্কুলের
মান আর
শহরের প্রাইমারি
স্কুলের মানে
অনেক তফাত।
শহরের সরকারি
প্রাইমারি স্কুলের
মান আর
বেসরকারি ইংলিশ
মিডিয়াম স্কুলের
মানেও অনেক
বৈষম্য।
স্বাস্থ্য খাতেও
বৈষম্য আছে।
কোনো কোনো
ক্ষেত্রে বৈষম্যটা
হয়তো পরিমাণগতভাবে
দেখা যাবে
না। কিন্তু
গুণগতভাবে দেখতে
পাব। যেমন
স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে
হয়তো অনেকেই
বলবেন, কমিউনিটি
ক্লিনিক অনেক
হয়েছে। সবাই
স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে।
কিন্তু অল্পসংখ্যক
ধনী স্কয়ার
হাসপাতাল বা
সিঙ্গাপুরে গিয়ে
যে মানের
সেবা পাচ্ছে,
ঢাকা মেডিকেল
কলেজের বারান্দায়
যে রোগীটি
আছে, সে
তো তা
পাচ্ছে না।
তার মানে
প্রতিটি স্তরে
আমরা একটা
বৈষম্য সৃষ্টি
করে ফেলেছি।
সমাজটা আর
ঐক্যবদ্ধ থাকছে
না। সমাজে
হিংসা বা
ঈর্ষার প্রতিযোগিতা
চলছে। তাই
উন্নয়ন বলা
যাবে গড়ে
অথবা ধনী
সংখ্যালঘুর দৃষ্টিতে
কিন্তু বণ্টনের
দিক থেকে,
অর্থনৈতিক ও
রাজনৈতিক স্বাধীনতার
দিক থেকে
এটাকে আদর্শ
উন্নয়ন বলা
যাবে না।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক
উন্নতির জন্য
বর্তমানে তার
শিল্পের উৎপাদনশীলতা
বাড়াতে হবে।
উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর
জন্য শ্রমিকের
উৎপাদনশীলতা বাড়াতে
হবে। শ্রমিকের
উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর
জন্য পুঁজি
বিনিয়োগ ও
শ্রমিকের দক্ষতা
বাড়াতে হবে।
আর নতুন
প্রযুক্তি আনতে
হবে। রফতানি
বহুমুখীকরণ করতে
হবে। এভাবে
চললে ১০
বছর পরের
বাংলাদেশ আরেকটু
উন্নত হবে,
হয়তো মধ্যম
আয়ের কাছাকাছি
চলে যাবে
এবং গণতন্ত্রের
ইস্যুটা আরেকটু
গুরুত্বপূর্ণ হবে।
কারণ অর্থনৈতিক
উন্নয়ন যখন
অগ্রসর হয়ে
যায়, তখন
রাজনৈতিক উন্নয়নটা
বেশিদিন পিছিয়ে
থাকতে পারে
না। কিন্তু
এ ১০
বছরে যদি
রাজনৈতিক কোনো
বড় অস্থিতিশীলতা
হয়, গণতন্ত্রের
সঙ্গে শাসকের
দ্বন্দ্বটা যদি
শান্তিপূর্ণভাবে সংস্কারের
মাধ্যমে সমাধান
না হয়
এবং উল্টো
নৈরাজ্য ও
বিস্ফোরণ ঘটে,
তবে অর্থনৈতিক
ও রাজনৈতিক
স্থিতিশীলতা নষ্ট
হয়ে যাবে।
অর্থাৎ যদি
পিসফুল রিফরমেশন
না হয়,
যদি সময়মতো
পদক্ষেপ নেয়া
না হয়
অর্থাৎ সেলফ
রিভিশন ও
রিমিশন না
হয়, তাহলে
বাংলাদেশ হয়তো
যথাসময়ে উচ্চ
আয়ের দেশ
হওয়ার স্বপ্ন
বাস্তবায়ন করতে
ব্যর্থ হবে।
কোনটা যে
হবে তা
এ মুহূর্তে
বলা মুশকিল।
অধিকসংখ্যক মানুষ
যদি দেখে
তারা যে
রকম কাজ
বা কষ্ট
করছে কিন্তু
সে রকম
কিছু পাচ্ছে
না, আর
অল্পসংখ্যক মানুষ
যদি দেখে
কোনো কাজ
ছাড়াই অনেক
কিছু পাওয়া
যাচ্ছে, যেমন
চাইলেই ব্যাংক
থেকে টাকা
পাচ্ছে, তা
আবার দেশে
বিনিয়োগ না
করে বিদেশেও
পাঠিয়ে দিতে
পারছে। কর
ফাঁকি দিতে
পারছে, ঋণ
শোধ না
করেও পার
পেয়ে যাচ্ছে।
সেই সমাজটা
তো মসৃণভাবে
চলার কথা
নয়।
বিদ্যমান রাজনীতি ও ক্রমসংকোচনশীল গণতন্ত্র
অংশগ্রহণমূলক
গণতন্ত্র থাকলে
অধিকাংশ মানুষ
ভোট দিয়ে
এমন সরকার
আনত, যে
সরকার লুটেরা
পুঁজিবাদের প্রশ্রয়
না দিয়ে
জনগণের সেবাকে
অধিকতর গুরুত্ব
দিত। কিন্তু
আমাদের দেশে
যে ভোটের
গণতন্ত্র ১৯৯০
সালের পর
জন্ম নিয়েছে,
তার অনেক
নেতিবাচক দিক
রয়েছে। এর
আগে ১৯৭১-৭৫
কালপর্বেও ন্যূনতম
উদারনৈতিক এক
ধরনের গণতন্ত্র
ছিল। ১৯৭৫-৯০
কালপর্বে ছিল
লেবাসি গণতন্ত্র।
নব্বইয়ের পর
কিছুদিন চালু
ছিল তত্ত্বাবধায়ক
সরকারের অধীনে
দ্বিদলীয় গণতন্ত্র।
সব শেষে
চালু হয়েছে
অনুদার (Illiberal
and Authoritarian) গণতন্ত্র।
সব মিলিয়ে
আমাদের ভোটের
গণতন্ত্র ফলপ্রসূ
বা সাধারণভাবে
গ্রহণযোগ্য হয়নি।
এ ধরনের
সংকুচিত ও
‘মানি’,
‘মাসল’
ও ‘ম্যানিপুলেশন’নির্ভর
ভোটের গণতন্ত্র
এমনকি প্রচলিত
বুর্জোয়া গণতন্ত্রের
মানও অর্জনে
সক্ষম নয়।
কোনো কোনো
উন্নত পুঁজিবাদী
দেশে বিদ্যমান
এ ধরনের
আরো সীমিত
ভোটের গণতন্ত্রকে
Illiberal Democracy বলে।
অর্থাৎ এমন
তথাকথিত বুর্জোয়া
‘গণতন্ত্র’
আছে যাকে
‘অনুদার
গণতন্ত্র’ বলা
হয়।
বাংলাদেশে সম্প্রতি
এ ধরনের
গণতন্ত্রের সবচেয়ে
বড় অসুবিধা
হয়ে গেছে
এ কারণে
যে, এখানে
প্রধান বিরোধী
দল বা
সরকারি দল
উভয়ই এ
দেশে কর্তৃত্বপরায়ণ
দুটি দল।
উভয়েই দেশে
অনুদার গণতন্ত্র
চালাতে ইচ্ছুক।
তাই মানুষের
কাছে ‘চয়েস’
হচ্ছে দু
পক্ষের একজনকে
বেছে নেয়া।
তাই এখানে
অনুদার গণতন্ত্র
স্থায়ী হয়ে
গেছে। কে
এমপি পদে
মনোনীত হবে,
কাকে উচ্চ
পদ দেয়া
হবে সব
নির্ধারিত হচ্ছে
অগণতান্ত্রিকভাবে, কখনো
কখনো টাকা-পয়সা,
স্বজনপ্রীতি ও
সচরাচর শীর্ষ
কর্তৃত্ব দ্বারা।
১৯৯০ সালের
পর থেকে
অনুদার গণতন্ত্র
থেকে রাষ্ট্র
ও সমাজ
কখনই রক্ষা
পায়নি। তবে
বর্তমান ক্ষমতাসীন
দলটির কৃতিত্ব
হচ্ছে যে
এরই মধ্যে
তারা তাদের
ক্ষমতা যথেষ্ট
সংহত করতে
সক্ষম হয়েছেন।
তারা বঙ্গবন্ধুর
হত্যাকারীদের বিচার
করেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের
বিচার করছেন
এবং বিরোধী
দলের তথাকথিত
দুই আইকন
মাতা-পুত্রের
ভাবমূর্তিও ধ্বংস
করে দিয়েছেন।
অনুদার গণতন্ত্রেও
ট্র্যাজেডির মধ্যে
থেকেই সম্প্রতি
অবাধ বাজার
অর্থনীতির হাত
ধরে বাংলাদেশের
যতটা উন্নতি
হয়েছে, তার
চেয়ে অনেক
বেশি উন্নয়ন
কিন্তু সম্ভব
ছিল। এমনকি
এ অবস্থায়
বৈষম্যহীন উন্নয়নও
সম্ভব হতে
পারে যদি
কঠোর রাষ্ট্রের
শাসন কিছুটা
আলোকিত উদ্দেশ্য
অভিমুখী হয়।
আমাদের সামনে
দক্ষিণ কোরিয়া,
চীন ও
ভিয়েতনামের উদাহরণ
আছে। একদলীয়
রাজনৈতিক কঠোর
শাসন যদি
তথাকথিত মুক্তবাজার
নীতির পরিবর্তে
রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ
এবং সুষম
বণ্টনের দিকটা
নিশ্চিত করতে
প্রয়োজনীয় কাঠামোগত
পরিবর্তনে আগ্রহী
হয়, যদি
অন্ধ দলীয়
সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে
উঠে রাজনৈতিক
শাসন কিছুটা
বিকেন্দ্রীভূত বা
বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক
পথে খাটিয়ে
সাধারণ মানুষকে
অংশগ্রহণমূলক প্রবৃদ্ধির
মধ্যে নিয়ে
আসতে ইচ্ছুক
হয় এবং
শাসক নিজে
যদি অসৎ
ও লুটেরাদের
বিরুদ্ধে অবস্থান
নিতে সক্ষম
হয়, তাহলে
তা যে
আপেক্ষিকভাবে কিছুটা
জনপ্রিয় ও
ফলপ্রসূ হয়ে
উঠতে পারে
তা এসব
দেশের উদাহরণ
দ্বারা প্রমাণিত
হয়েছে।
চীনের শি-পিং
বা সিঙ্গাপুরের
লি কুয়ান
বা মালয়েশিয়ার
মাহাথিরের সাম্প্রতিক
দৃষ্টান্তটি অনেকে
এক্ষেত্রে দেখিয়ে
থাকেন। কিন্তু
আমাদের দেশে
বর্তমানে যে
কর্তৃত্বপরায়ণ গণতন্ত্রের
ধারা বিরাজমান
তা সুশাসন
ও সমতাকে
একেবারে বাদ
দিয়ে নিছক
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
ও কিছু
পরিমাণে চরম
দারিদ্র্য কমানোর
দ্বারা ক্ষমতায়
থাকতে চাইছেন,
সেটা মুশকিল।
উন্নত অ্যান্টিবডির সন্ধানে
অধিকাংশ
পণ্ডিতই এখন
মানেন, দীর্ঘমেয়াদে
অনুদার গণতন্ত্র
সচেতন সচ্ছল
নাগরিকরা মানবে
না। কারণ
যেকোনো জায়গায়
যখন সাধারণ
জীবনমানের উন্নয়ন
একটা নির্দিষ্ট
পর্যায়ে চলে
যাবে বা
নব্য মধ্যবিত্তের
উত্থান হবে,
তখন মানুষের
সামনে গণতান্ত্রিক
অধিকার ও
Civil Rights-এর
প্রশ্নগুলো আসবে।
বৈষম্য কেন
হচ্ছে? লুটপাট
কেন হচ্ছে?
স্বজনপ্রীতি কেন
হচ্ছে? সিদ্ধান্ত
গ্রহণের প্রক্রিয়ায়
আমার কণ্ঠস্বরের
ভূমিকা কই?
এ প্রশ্নগুলো
উঠবে। এখন
হয়তো এত
চিন্তা করছে
না বা
ভাবছে এসব
তো হবেই,
আমার জীবনমান
তো বাড়ছে।
কিন্তু শিক্ষিত
মধ্যবিত্ত শ্রেণী
গড়ে উঠলে
তারা বলবে,
আমি কেন
আপেক্ষিকভাবেও বঞ্চিত
হব? তাছাড়া
বিভিন্ন দেশের
নাগরিকদের মনস্তত্ত্বে
ভোট ও
গণতন্ত্রপ্রীতির মাত্রা
বিভিন্ন হতে
পারে। শাসক
কর্তৃক ম্যানেজেবল
জনসংখ্যাও একেক
দেশে একেকরকম
হতে পারে।
তাই ভিন্ন
আন্তর্জাতিক পটভূমিতে
চীনে বা
দক্ষিণ কোরিয়ায়
যা সম্ভব
বর্তমানে বাংলাদেশে
তা সম্ভব
না-ও
হতে পারে।
কোথাও কোথাও
অনুদার গণতন্ত্র
Developmental State-এ
পরিণত না
হয়ে নিছক
স্বৈরতন্ত্রেও পরিণত
হতে পারে।
মার্কোসের ফিলিপাইন
সে রকম
একটি উদাহরণ।
কেউ কেউ
উত্তর কোরিয়া
ও কম্বোডিয়ার
তথাকথিত সমাজতান্ত্রিক
আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকেও
সে নামেই
অভিহিত করে
থাকেন। আমাদের
দেশে অতীতে
জেনারেল এরশাদের
আমলটিও সে
রকম একটি
উদাহরণ যদিও
এখন তা
অনেকে ভুলে
গেছেন। তখন
ডা. জাফরুল্লাহর
সহযোগিতায় আমাদের
জাতীয় ঔষধ
শিল্প ও
রাস্তাঘাটেরও প্রচুর
উন্নতি হয়েছিল,
কিন্তু তার
পরও স্বৈরাচার
এরশাদ ক্ষমতায়
টিকতে পারেননি।
আমার শিক্ষক
আনিসুর রহমানের
উদাহরণটা আমি
দিতে পারি।
তিনি বলেছিলেন,
‘যখন
একটা মানুষকে
গলা কামড়ে
ধরেছে একটা
নেকড়ে বাঘ,
আর আরেকটা
বাঘ খানিক
দূরে দাঁড়িয়ে
জিভ চাটছে,
মানুষটা তখন
কী করবে?
সে নিশ্চয়ই
নেকড়ে বাঘটাকে
সরাতে চেষ্টা
করবে কিন্তু
সে জানে
নেকড়েটাকে সরালে
বাঘটা তাকে
এসে ধরবে।
তাই বাঘটার
বিরুদ্ধেও তাকে
একই সঙ্গে
লড়তে হবে।
এটা খুবই
কঠিন অবস্থা
কিন্তু এটাই
সত্য বলে
বাংলাদেশের অনেকেরই
ধারণা। নির্বাচনের
মাধ্যমে এ
অবস্থার পরিবর্তন
করা খুবই
দুরূহ। নির্বাচনে
রয়েছে তিন
‘গ’-এর
আধিপত্য। Money,
Muscle and Manupulation. বলা
হয়ে থাকে
নির্বাচনে কালো
টাকার ব্যাপক
ব্যবহার হয়,
যে কালো
টাকা দিয়ে
একশ্রেণীর ভোটারকে
পর্যন্ত কিনে
ফেলা যায়।
আগামী সব
নির্বাচনেই এমন
আশঙ্কা থাকছে।
কিন্তু এ-ও
বাহ্য।
বাংলাদেশের প্রধান
রাজনৈতিক দলগুলো
তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা
ব্যবহার করে
কর্তৃত্ব বজায়
রাখার জন্য
সমাজে অসংখ্য
এজেন্ট তৈরি
করেছে। বিষয়টা
এমন যে
তুমি কালো
টাকা করবে
বা করেছ
আমি জানি,
তুমি টাকা
বিদেশে পাচার
করবে বা
করেছ তা-ও
আমি জানি।
কিন্তু আমার
নির্বাচনী খরচটা
যদি দাও,
আমার কর্তৃত্ব
যদি বহাল
রাখতে সাহায্য
করো, তাহলে
তোমাকে কিছু
বলব না
এবং ক্ষমতায়
এলে তোমাকে
সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি
দিচ্ছি। সুতরাং
কালো টাকা
একটা সিস্টেমের
অংশ এবং
ক্ষমতারও অংশ
হয়ে গেছে।
ফলে একটা
এলাকায় এমপি
ইলেকশনে বর্তমানে
নাকি ১০০
কোটি টাকাও
ব্যয় হয়!
আইনে তো
আছে, ঋণখেলাপিরা
নির্বাচনে অংশগ্রহণ
করতে পারবে
না। কিন্তু
আদালতের স্থগিতাদেশ
নিয়ে তারা
অংশগ্রহণ করছে।
জুডিশিয়ারি ব্যর্থ
হলে প্রশাসনকে
কাজে লাগাচ্ছে।
তার মানে
আমি মানুষকে
দেখাচ্ছি যে,
আমি কর্তা
এবং আমার
আইনগুলো সৎ
কিন্তু আমার
সাঙ্গোপাঙ্গরা অসৎ,
অতএব আমি
কী করতে
পারি?
কিন্তু এর
পরও আমরা
জানি যে
বিদ্যমান সিস্টেমটি
অভ্যন্তরীণ নানা
দ্বন্দ্বে দীর্ন।
রয়েছে ক্ষমতাসীন
লুটেরাদের নিজস্ব
ভাগাভাগির দ্বন্দ্ব।
রয়েছে সামরিক-বেসামরিক
প্রশাসনিক কর্মকর্তা
ও রাজনৈতিক
নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব।
রয়েছে বুর্জোয়াদের
বিভিন্ন অংশের
দ্বন্দ্ব, যদিও
আপাতদৃষ্টিতে মনে
হচ্ছে এখন
এটা অনেকখানি
স্তিমিত। সমগ্র
সামাজিক পরিমণ্ডলে
এছাড়াও রয়েছে
পশ্চাত্পদ ধ্যান-ধারণার
সঙ্গে আধুনিক
ধ্যান-ধারণার
দ্বন্দ্ব। রয়েছে
জনগণের সঙ্গে
মাঠে-ময়দানে
তৃণমূলে দুর্নীতিবাজ
গণশত্রুদের দ্বন্দ্ব।
রয়েছে আন্তর্জাতিক
শক্তির দড়ি
টানাটানির দ্বন্দ্ব।
রয়েছে মৌলবাদী
জঙ্গি শক্তি,
লুটেরা বুর্জোয়া
শক্তি, লিবারেল
বুর্জোয়া শক্তি,
বাম-প্রগতিশীল
শক্তি, ধর্মীয়
নানা ধরনের
সুবিধাবাদী সামাজিক
শক্তি এবং
নানা পেটি
বুর্জোয়া সুবিধাবাদী
শক্তির প্রতিনিয়ত
ক্ষমতাকে ঘিরে
নিরন্তর এক
রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক
প্রতিযোগিতা। এ
দ্বন্দ্বগুলো সব
যদি কখনো
একটি বিন্দুতে
আকস্মিকভাবে ঘনীভূত
হয়, তাহলে
সেই দুর্বল
গ্রন্থিতে তখন
সৃষ্টি হতে
পারে চরম
পরিবর্তনের কোনো
সুযোগ। তীব্র
কোনো অর্থনৈতিক
শক থেকেও
এ রকম
ঘনীভূত সংকটের
উদ্ভব হতে
পারে। কিন্তু
সে রকম
সুযোগও কুশলী
রাজনৈতিক নেতৃত্বের
অভাবে জনগণের
হাতছাড়া হয়ে
যেতে পারে।
আবার হিসাবের
ভুল হলে
‘অ্যাডভেঞ্চারে’
পা হড়কে
বাম গণতান্ত্রিক
বিকল্পের অপমৃত্যুও
হতে পারে
বা সে
অন্য কোনো
শক্তির দ্বারা
ব্যবহূতও হতে
পারে। সেক্ষেত্রে
বাম প্রগতিশীলদের
বা জনগণের
ঘাড়ে পা
রেখে ওপরে
উঠে আসতে
পারে শাসক
শ্রেণীর ভেতর
থেকেই কোনো
লৌহমানবের স্ট্রং
স্টেট, কোনো
ধর্মীয় ছদ্মবেশী
একনায়ক বা
নতুন কোনো
সদ্য গঠিত
গণতান্ত্রিক উদারনৈতিক
বুর্জোয়া দলের
প্রতিনিধি। এদের
ফলাফলে তারতম্য
থাকলেও আখেরে
এর কোনোটির
ফলাফলই জনগণের
জন্য মৌলিকভাবে
শুভ হবে
না।
কখনো কখনো
সিস্টেমের মধ্যে
বা বাইরে
বৃহত্তর সমাজে
কোনো একক
ব্যক্তি একটা
ব্যতিক্রমী ইতিবাচক
ভূমিকা রেখে
থাকেন। ধরা
যাক দুর্নীতি
দমন কমিশনের
(দুদক) প্রধান
ব্যক্তিটি যদি
ঝুঁকি নেন।
যেমন তিনি
যদি স্থির
করেন, ‘আমি
আমার পরিবেষ্টনের
ইচ্ছার বিরুদ্ধে
হলেও ন্যায়
এবং সত্যের
পক্ষে লড়াই
করব। ওই
যে ম্যাজিস্ট্রেট
রোকনুজ্জামান খান
ঝুঁকি নিয়ে
সব ভেজাল
ধরলেন। ওই
রকম কোনো
শক্তিশালী একরোখা
লোক কোথাও
থাকলে ভূমিকা
রাখতে পারে।
তখন কোন
কোন খাতে
রাষ্ট্রের ভেতরে
বা রাষ্ট্রের
বাইরে আংশিক
ও স্থানীয়
পরিবর্তনের একটি
ধারাও সৃষ্টি
হতে পারে।
বডির মধ্যে
এসব অ্যান্টিবডির
সঙ্গে বাইরের
আম জনগণের
আন্দোলনকে যুক্ত
করার মাধ্যমে
হয়তো কোনো
একদিন মৌলিক
পরিবর্তনের জন্য
সচেতন একটি
পরিকল্পিত উদ্যোগ
গ্রহণও সম্ভব
হতে পারে।
তবে তার
জন্য দেশজুড়ে
নিবেদিতপ্রাণ অসংখ্য
কাণ্ডারির পূর্ব-উপস্থিতি
প্রয়োজন হবে।
এম এম আকাশ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়