শেখ হাসিনা সরকারের দ্বিতীয় পর্ব

পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সোনালি যুগ

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লম্ফনের কার্যকারণ সম্পর্কিত রয়েছে ‘নয়া জাতীয় পরিকল্পনার’ সঙ্গে। পরিকল্পনা দর্শন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর বিধ্বস্ত অর্থনীতি কিংবা যখন সমুদয় উৎপাদন

একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লম্ফনের কার্যকারণ সম্পর্কিত রয়েছে নয়া জাতীয় পরিকল্পনার সঙ্গে। পরিকল্পনা দর্শন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ের প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর বিধ্বস্ত অর্থনীতি কিংবা যখন সমুদয় উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, তা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে দেশের সে সময়ের রাজনৈতিক সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ সেরা চার অধ্যাপক অর্থনীতিবিদের সমন্বয়ে এক শক্তিশালী পরিকল্পনা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সশস্ত্র সংগ্রামে সৃষ্ট নতুন দেশ, তথ্য-উপাত্ত নেই, প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান নেই, জনবল নেই, তবু অদম্য মনের বল আর বঙ্গবন্ধুর উৎসাহ প্রেরণায় দ্রুত এক বছরের মধ্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৭৩-৭৮) প্রণীত হয়ে বাস্তবায়নের প্রায় দুই বছরের মাথায় এক রক্তাক্ত প্রতিবিপ্লবে পঁচাত্তরের মাঝামাঝি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঊষালগ্নে এক চরম বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটে। সেনাশাসনে সে সময়ে পরিসমাপ্তি ঘটে স্বাধীনতার সর্বজনীন শোষণহীন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তোলার যে স্বপ্ন পরিকল্পনায় বিধৃত হয়েছিল তার। ১৯৭৮-৮০ দ্বিবার্ষিক একটি পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে বিরাষ্ট্রীয়করণ পুঁজিতন্ত্র বিকাশের অভিপ্রায় ধারণ করে। পরবর্তী সময়ে যদিও দ্বিতীয়-তৃতীয় (১৯৮০-এর দশক) চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (১৯৯০ দশকের প্রথমার্ধ) প্রণীত হয়েছে দূরলক্ষ্য কোনো অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা বর্জিত হয়ে পুঁজিতন্ত্রের অবাধ বিকাশের প্রকাশ্য আদর্শ সামনে রেখে। আশির দশকের দুটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে তত্কালীন সেনাশাসকরা ক্ষমতা সংহতকরণে যতটা ব্যস্ত ছিলেন, ততটাই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছিলেন উদাসীন লক্ষ্যভ্রষ্ট। দাতাগোষ্ঠী প্রধান ঋণদান সংস্থাগুলোর উৎসাহ ছিল সে সময়ে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়নে, যাতে বিশ্ব পুঁজিতন্ত্রের অবাধ বিকাশ নিশ্চিত হয়। শাসকরাও কাঠামোগত সংস্কারে সাড়া দিতে সচেষ্ট ছিলেন। পরিকল্পনাগুলোরও তেমন কোনো আদর্শিক ভিত্তি ছিল না। ১৯৮০-এর দশকে প্রবৃদ্ধির হারও সাড়ে শতাংশ ছাড়িয়ে যায়নি।

গণআন্দোলনের সফলতা শেষে নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় গণতন্ত্রের বাতাবরণে যে সরকার এল, তারা ওয়াশিংটন কনসেনসাস অনুযায়ী মুক্তবাজার দর্শন প্রতিপালনে উৎসাহী ছিল। পাঁচসালা একটা পরিকল্পনা করল বটে, (১৯৯১-৯৫), সেটি প্রকাশিত হলো ১৯৯৫ সালে, সরকারের বিদায়ী বছরে। বাস্তবায়নে কতটুকু আন্তরিকতা ছিল থেকেই স্পষ্ট। দীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হন ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাঁচসালা পরিকল্পনা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয় জিইডিকে। ১৯৯৭-০২ পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা খুব দ্রুত প্রণীত হয়। পরিকল্পনাটি অর্থনীতিবিদ সমিতি প্রেস ক্লাব সাংবাদিকদের সমালোচনাবিদ্ধ হয়। ২০০২ থেকে ২০০৯-১০ বাংলাদেশে কোনো পাঁচসালা পরিকল্পনাই ছিল না। প্রায় ১০ বছর বাংলাদেশ পরিকল্পনাবিহীন কাটিয়েছে বিশ্বব্যাংক প্রণোদিত দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র নিয়ে। তখন পরিকল্পনা শব্দটি সরকারি উন্নয়ন ডিসকোর্স থেকে পরিত্যাজ্য হয়ে যায়। পিআরএসপির সঙ্গে সংযোজন হয় আইএমএফ বিশ্বব্যাংকের তাত্ত্বিক প্রণোদনায় মিডিয়াম টার্ম বাজেটারি ফ্রেমওয়ার্ক, তিন বছরের আগাম বরাদ্দ সূচি। এতে পরিকল্পনা পরিহারের ঝোঁক ছিল আর বাজেটকে উন্নয়নের মুখ্য অস্ত্র হিসেবে দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৫ নং ধারার উপধারায় পরিকল্পনার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে উল্লিখিত আছে, রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন মৌলিক চাহিদার (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা স্বাস্থ্য) নিশ্চিতকরণ। সংবিধানের ব্যত্যয় ঘটিয়েই রাষ্ট্র থাকে ১০ বছর পরিকল্পনাবিহীন। ২০০৭-০৮ সালে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকট ওয়াশিংটন সমঝোতা কোনো কাজে আসেনি, সেটা প্রমাণিত হয়। দেশে দেশে অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ২০০৮-এর ডিসেম্বরের অংশগ্রহণমূলক অবাধ সাধারণ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালের জানুয়ারি ক্ষমতাসীন হয় এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন। পশ্চিমের অর্থনৈতিক সংরক্ষণবাদের প্রেক্ষাপটে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা আবির্ভূত হন নয়া জাতীয় পরিকল্পনা নিয়ে, আশাজাগানিয়া উদ্দীপনাময় সুনির্দিষ্ট অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে নতুন এক স্বপ্নযাত্রায়। তারই প্রতিফলন পাওয়া যায় দিনবদলের প্রত্যয়ে রূপকল্প ২০২১-এর শেষে স্বপ্ন দেখান দেশের ৫০তম জন্মজয়ন্তীতে দেশ কোথায় পৌঁছবে। দেশ মধ্যম আয়ের হবে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে, প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হার ১০০ শতাংশে পৌঁছবে, জেন্ডার সমতা অর্জিত হবে ইত্যাদি। জাতীয় পরিকল্পনায় আসে নতুন ব্যাপ্তি, নতুনভাবে গুরুত্ব পায় দীর্ঘমেয়াদি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। সংবিধানে বর্ণিত (১৫ অনুচ্ছেদ) পাঁচটি মৌলিক অধিকার অর্জন স্তম্ভ হয়ে দাঁড়ায় পরিকল্পনা প্রণয়নে। সে কারণেই দারিদ্র্য বিমোচন, প্রত্যাশিত গড় আয়ু বৃদ্ধি, দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির বিষয় চলে আসে পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় আলোচনায়। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের দরকার হয়ে পড়ে। পরিকল্পনা প্রণয়নের বিস্তারিত প্রেক্ষাপটকেই আমরা বলেছি নিউ ন্যাশনাল প্ল্যানিং প্রবর্তন। অতীতের পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, যা দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কোনো অভীষ্ট ধারণ করেনি। সেগুলোর সঙ্গে নয়া জাতীয় পরিকল্পনার ভিন্নতা এবং অর্জন আমরা নিম্নে আলোচনায় আনব। অর্থনীতিবিদদের সব নিরাশাবাদকে হটিয়ে বাংলাদেশ কেমন করে উন্নয়ন বিস্ময় হলো, নয়া জাতীয় পরিকল্পনাকালে সামষ্টিক স্থিতিশীলতার রহস্যের মূলে কী, তা ব্যাখ্যা করতে চাইব।

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় রূপকল্প-২০২১-এর আলোকে প্রথমবারের মতো প্রণীত হলো বাংলাদেশের প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২১): রূপকল্প বাস্তবে রূপায়ণ। দলিলের উপক্রমণিকায় প্রধানমন্ত্রী লিখলেন, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা জাতির জন্য একটি রূপকল্প, যা আমাদের সামনে ত্বরান্বিত প্রবৃদ্ধির পথচিত্র তুলে ধরে এবং দারিদ্র্য, অসাম্য মানবিক বঞ্চনার মূলোৎপাটনের জন্য সাধারণ উপায়গুলো বর্ণনা করে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১১-১৫) এবং সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১৬-২০) মাধ্যমে বাস্তবায়নের নির্দিষ্ট কৌশল করণীয় যথাযথভাবে বর্ণনা করা হবে। সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রত্যাশার মূল সুরটি এখানে প্রতিফলিত যথা দারিদ্র্য, অসাম্য মানবিক বঞ্চনার মূলোৎপাটন।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা তৈরি হলো সম্পূর্ণ পৃথক ধারায় আঙ্গিকে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক থেকে পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো প্রণীত হয়েছিল সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা হিসেবে। অর্থনৈতিক বিবেচনা ছিল অনুন্নত দেশে প্রবৃদ্ধি প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য রাষ্ট্রের তরফে ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলে প্রবৃদ্ধি এককভাবে এগিয়ে নেয়া, যেখানে ব্যক্তি খাত ছিল অবিকশিত। সরকারই উন্নয়নের চালক। বাস্তবতাও ছিল। সত্তরের দশকে সরকারি বিনিয়োগ ছিল দেশজ মোট বিনিয়োগের ৮৭ শতাংশ আর বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল ১৩ শতাংশ। প্রতিষ্ঠান যতই অবিকশিত হোক, রাষ্ট্রের তরফে সজোরে ধাক্কা দেয়ার জন্যই তখন পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল, যদিও মধ্য পঁচাত্তর থেকে নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেয়ে লক্ষ্য ছিল ব্যক্তি খাত যেভাবেই পারে বিকশিত হোক। তখন ব্যক্তি খাতের বিকাশ অবারিত হয়ে যায়। পরে এদের অনেকেই আবির্ভূত হন ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা একটি পরিবর্তনযোগ্য কৌশলগত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী পরিকল্পনা দলিল হিসেবে প্রণীত হয়। পরিস্থিতি গিয়েছিল পাল্টে, অর্জনযোগ্য সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবতার আলোকে ব্যক্তি খাতের প্রাধান্যকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। পরিকল্পনাকালে মোট দেশজ বিনিয়োগের ৭৭ শতাংশ ছিল বেসরকারি খাতের আর ২৩ শতাংশ বিনিয়োগের অংশীদার ছিল সরকারি খাত। বিনিয়োগে বেসরকারি খাতের প্রাধান্য থাকায় আর সরকারের সর্বমুখী বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজন ছিল না। সরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বেসরকারি খাতের তুলনায় এক-চতুর্থাংশের কম হলেও কৌশলগতভাবে ছিল গুরুত্বপূর্ণ এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের পরিপূরক। গুরুত্বপূর্ণ ভৌত অবকাঠামো, সড়ক-জনপথ, বন্দর, বিদ্যুৎ অবকাঠামো সৃষ্টি সরবরাহ, মানবসম্পদ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়। প্রথম প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২১) প্রণীত হয় অত্যন্ত অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পাঁচ বছরের জন্য প্রতিটি মন্ত্রণালয়/বিভাগ থেকে বছরভিত্তিক কর্মসূচি এমটিবিএফ বরাদ্দ জানতে চাওয়া হয়। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় পাঁচ বছরের জন্য মন্ত্রণালয় খাতভিত্তিক বরাদ্দ দেখানো হয়। সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় পাঁচ বছরের প্রতিটি বছরের জন্য প্রবৃদ্ধির হার, বিনিয়োগ, সঞ্চয়ের পরিমাণ, আমদানি-রফতানির পরিমাণ, বিদেশে শ্রমিক প্রেরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ এবং সেই সঙ্গে এসব ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হারের প্রাক্কলন দেয়া হয়। পরিকল্পনার খাতভিত্তিক অংশে প্রতিটি খাতে বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধির হার, অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভীষ্ট, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কৌশল বিভাগভিত্তিক/খাতভিত্তিক সংস্কারের পরামর্শ রাখা হয়। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হয়ে থাকে প্রত্যাশামূলক, ভবিষ্যত্মুখী স্বপ্নতাড়িত। বাজেট হচ্ছে আয়-ব্যয় বরাদ্দকেন্দ্রিক। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কর্মসূচি অভীষ্ট কিংবা লক্ষ্যমাত্রা কিংবা সংস্কারের পরামর্শ বর্ণিত থাকে না। পরিকল্পনাকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে বার্ষিক বাজেট হচ্ছে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অস্ত্র। সীমাবব্ধ সম্পদের দেশে অপূর্ণ বাজার ব্যবস্থায় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বিকল্প নেই। কারণেই পরিকল্পনার বিকল্প বাজেট নয়। জাতীয় স্বপ্নপূরণের অস্ত্র হচ্ছে পরিকল্পনা, বাজেট সহায়ক অস্ত্র। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কর্ম সম্পাদনভিত্তিক পরিবীক্ষণ মূল্যায়ন কাঠামো পরিমাপকৃত সূচকসহ প্রথমবারের মতো সংযুক্ত করা হয় এবং মধ্যবর্তী মূল্যায়নের ব্যবস্থা রাখা হয়, যাতে বাস্তবায়নের সফলতা/ব্যর্থতা নিরিখে পরিকল্পনার প্রক্ষেপণ কর্মকৌশল সংশোধন করা সম্ভব হয়।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০১৬-২০) ছিল ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা এবং প্রেক্ষিত পরিকল্পনার (২০১০-২১) অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জনের শেষ পাঁচসালা পরিকল্পনা। অত্যন্ত অংশগ্রহণমূলকভাবে পরিকল্পনাও গৃহীত হয়। ষষ্ঠ, সপ্তম অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলো এমডিজি এসডিজি অর্জনের কর্মপত্র হিসেবেও তৈরি করা হয়েছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাজেটে বর্ণিত খাত বিন্যাস অনুসারে প্রথমবারের মতো খাত বিন্যাস করা হয়। ষষ্ঠ সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দুটোর মধ্যবর্তী মূল্যায়ন যথাসময়ে সম্পন্ন হয় এবং প্রাপ্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (জুলাই ২০২০-জুন ২০২৫) একই ধারাবাহিকতায় কৌশলগত পরিকল্পনা হিসেবেই প্রণীত হয়েছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হচ্ছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১: রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবে রূপায়ণ-এর প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা।

সবচেয়ে বেশি অর্জনের পরিকল্পনা হচ্ছে ষষ্ঠ সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে। এটা বাস্তব বিবেচনায় সফল পরিকল্পনা প্রণয়নের ফল। পরিকল্পনা প্রেক্ষাপট আলোচনায় সর্বশেষ যে বিষয়টি উল্লেখ প্রাসঙ্গিক হবে, তা তুলে ধরছি। সংসদে বাজেট পেশের পর বাজেট নিয়ে নাগরিক সমাজ অর্থনীতিবিদদের ব্যাপক আলোচনায় অংশ নিতে দেখা যায়, তা অবশ্যই ইতিবাচক। বাজেট হচ্ছে পরিকল্পনার পল্লবিত অংশ, অথচ আলোচনায় পরিকল্পনা থাকে অনুল্লেখিত। যদিও বরাদ্দের পূর্বাভাসগুলো পরিকল্পনায় আগেই দেয়া থাকে। বাজেট এক বছরের আয়-ব্যয় বরাদ্দকেন্দ্রিক বিন্যাসিত তালিকা। প্রারম্ভিকে কিছু রাজনৈতিক ঘোষণা। এতে অনেকে কর্মসূচি বা কর্মপরিকল্পনা খুঁজে পাননি এবং বাজেটের সমালোচনা করেছেন—‘কভিড বরাদ্দের কর্মসূচি নেই। বাস্তবে মন্ত্রণালয় বরাদ্দের ভিত্তিতে পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কর্মসূচি প্রণয়ন কিংবা গ্রহণ করে। বরাদ্দভিত্তিক কর্মসূচি দিতে গেলে বাজেট হবে মহা গদ্যকাব্য। পরিকল্পনাভিত্তিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় বাজেট পরিকল্পনার ব্যাখ্যায় ডি-লিংক বা চ্যুতি কাম্য নয়। এতে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা তৈরি হয় না। বাজেট আলোচনা থাকে প্রাসঙ্গিক-বর্জিত। গত এক যুগ ছিল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সফলতার সোনালি যুগ।

 

. শামসুল আলম: প্রতিমন্ত্রী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়

অর্থনীতিতে একুশে পদকপ্রাপ্ত সামষ্টিক অর্থনীতিবিদ

আরও