ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হূতগৌরব পুনরুদ্ধার হবে কীভাবে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। আজ ২০২১—প্রতিষ্ঠানটির বয়স ১০০ বছর। এ ১০০ বছর পরিক্রমণের দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই—গৌরব আছে, অবনতিও আছে। মানবজীবনে যৌবন আসে অগ্রগতি হয় আবার বার্ধক্য আসে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তো এমনটা হওয়ার কথা নয়, কারণ এটি একটি বিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য প্রতিষ্ঠান। প্রত্যেক বছর এখানে নতুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯২১ সালে। আজ ২০২১—প্রতিষ্ঠানটির বয়স ১০০ বছর। এ ১০০ বছর পরিক্রমণের দিকে ফিরে তাকালে আমরা দেখতে পাই—গৌরব আছে, অবনতিও আছে। মানবজীবনে যৌবন আসে অগ্রগতি হয় আবার বার্ধক্য আসে, কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তো এমনটা হওয়ার কথা নয়, কারণ এটি একটি বিবর্তনশীল নবায়নযোগ্য প্রতিষ্ঠান। প্রত্যেক বছর এখানে নতুন নতুন শিক্ষার্থী এসে ভর্তি হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাই চিরনবীন একটি চরিত্র থাকা উচিত ছিল। তবু কেন মাঝেমধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভাটা হচ্ছে? কেনইবা সবার মনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে একধরনের হাহাকার ও অতৃপ্তি. এটা কি প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে না সেজন্য নাকি আসলে ক্রমাগত অবনতিই হচ্ছে সেজন্য—এ প্রশ্নটা মানুষের মনে জাগা স্বাভাবিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের পাতা উল্টালে কোনো কোনো পৃষ্ঠায় আপনার চোখ আটকে যাবে, আপনি মুগ্ধ নয়নে তা দেখতে থাকবেন। কোনো কোনো পৃষ্ঠায় গিয়ে দেখবেন আপনার একধরনের অস্বস্তি হচ্ছে। আবার কোনো কোনো পৃষ্ঠায় এসে দেখবেন কোনো কিছুই তো হচ্ছে না। সবকিছু একদম মন্থর, মন্দ, স্থবির। কখনোবা মনে হবে একি দলাদলি, একি সংকীর্ণ একাডেমিক ও রাজনৈতিক বিচ্যুতি এ ঐতিহাসিক বৈচিত্র্যগুলোকে আমরা যদি বুঝতে চাই, তাহলে পর্বগুলোকে আমাদের সুচিহ্নিত করতে হবে।

আমার মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল পর্বটি হচ্ছে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১। এ পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঞ্চারপথ ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী ও উন্নত হয়েছে। উন্নত হয়েছে দুদিক থেকে। পরিমাণ ও গুণের দিক থেকে। এ সময় ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ক্রমাগত। নতুন নতুন মেধাবী শিক্ষকরা যোগ দিয়েছেন। নানা হল তৈরি হয়েছে। নান্দনিক অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বড় হচ্ছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ যা ভেবেছে, কাল তা সমগ্র জাতির ভাবনায় পরিণত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতির বিবেক ও বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছে।

আবার আমরা যদি ১৯৭১ থেকে ২০২১ পর্যন্ত দেখি, তাহলে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর ইতিহাসকে যতটা উজ্জ্বল মনে হবে, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়টাকে মোটেও অতটা উজ্জ্বল মনে হবে না। মাঝেমধ্যে পুরনো দীপ্তির কিছু স্ফুরণ চোখে পড়বে মাত্র। যেমন, ১৯৮০ থেকে ১৯৯০—স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর্বে এসে মনে হবে পুরনো সে ঔজ্জ্বল্য আবার যেন কিছুটা ফিরে এসেছে। কিন্তু নব্বইয়ের পর আবার স্থবিরতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবাদী রাজনৈতিক ভূমিকাও আগের মতো থাকতে পারেনি এবং শিক্ষাগত উত্কর্ষের ধারাবাহিকতাও থাকেনি। অবস্থান ধরে রাখতে সমর্থ হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে। অথচ ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্রমেই বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল বলেই মনে হয়—যদি তা না-ও হয়ে থাকে, তার পরও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে এমন উজ্জ্বল ভূমিকা পৃথিবীতে আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয় রাখতে পারেনি। এজন্যই হয়তো তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকেই প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে অভিহিত করেছিলেন। অথচ এটা এখন আর কেউ করবেন না। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা আমাদের মতো অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং আজ অনেক নিচে। মাপকাঠি ভুল বলে নিজেকে প্রবোধ দিলেও, এর থেকে সবটা মাফ পাওয়া যাবে না।

আগেই বলেছি, স্বাধীনতার পর আশির দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল রোলটা খুব উজ্জ্বল ছিল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন হয়েছে। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে যখন হত্যা করা হলো—তার আগে-পরে পর্বগুলোকে যদি ভাগ করা হয়, তাহলে আমরা দেখি ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে তীব্র মেরুকরণ হয়েছে এবং বিপরীত ধারাটি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে জয়ী হয়েছে কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন কোনো তীব্র প্রতিবাদ করেনি। কেন মাত্র পাঁচ বছরে মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরাজয়কে বিজয় মনে করে আত্মপ্রতারিত হলো, তা নিয়ে গভীর ও নিরপেক্ষ মনস্তাত্ত্বিক গবেষণা হওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকরা সর্বদা অতীতে জাতিকে পথনির্দেশ করেছেন। কিন্তু ১৯৭৫-এর পর সবাই কেমন যেন হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলেন। এরপর থেকে শিক্ষকরা নীল-সাদা-গোলাপি দলে ভাগ হয়ে গেলেন—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐক্যবদ্ধ শক্তিও ক্রমেই কমতে থাকল। পরবর্তী সময়ে একমাত্র স্বৈরাচারের সময় বা নাইন-ইলেভেনের সময় সেই ঐক্য পুনঃস্থাপিত হয়েছিল।

এ পর্বে যারা পালাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্ণধার হয়েছেন কিংবা যারা দেশকে পরিচালনা করেছেন তারা আর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে ব্যস্ত থাকেননি। তারা বরং নিজেদের ক্যারিয়ার ক্ষমতা, উন্নয়ন, ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য বিদেশে যাওয়া অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ পদগুলো দলীয় সংকীর্ণ রাজনীতির মাধ্যমে দখলের জন্য মনোযোগী হয়েছেন। অন্যদিকে যারা সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি করতে অপারগ, তারা অনেকেই এরপর বিদেশে গিয়ে বিদেশ থেকে আর ফিরে আসেননি। প্রত্যেক বিভাগের শ্রেষ্ঠ শিক্ষার্থীরা যারা পঁচাত্তরের পর বিদেশে গেছেন, তারা পরবর্তী সময়ে আর ফিরে আসার তাগিদ অনুভব করেননি। পক্ষান্তরে ষাটের দশকে যারা বিদেশে গিয়েছিলেন, তারা স্বাধীনতার আগেই ফিরে আসেন বিরাট আশা নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ তাদের সেই আশাকে আরো উদ্দীপ্ত করেছিল। কিন্তু স্বাধীনতার বিজয়ের আগমুহূর্তে সুচতুর হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় সহচর ‘বদর বাহিনী’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের হত্যা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নেতৃত্বশূন্য করে দেয়। সেই সঙ্গে জাতিও এক তীব্র নেতৃত্ব সংকটে পড়ে।

যদিও স্বাধীনতার পরও পঁচাত্তর পর্যন্ত ভগ্নস্তূপ থেকে উঠে দাঁড়ানোর একটা চেষ্টা ছিল; আগের একাডেমিক এক্সিলেন্স, শিক্ষক রাজনীতি ও ছাত্র রাজনীতির আদর্শগত ভিত্তিকে ধরে রাখার চেষ্টা। আমার প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক আনিসুর রহমান ও শ্রী অজয় রায়ের মতো প্রগতিশীলরাই ছিলেন শিক্ষক রাজনীতির অগ্রদূত। ছাত্র রাজনীতির অগ্রদূতও ছিল প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো। কিন্তু তারা কেন স্থায়ী হতে পারলেন না, সেটাও একটা গভীর পর্যালোচনার বিষয়।

বাংলাদেশে পঁচাত্তর থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত নামে-বেনামে সামরিক আইন চলে—আদর্শ বা মূল্যবোধ নয়, প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তবাজার দর্শন—Carrot and Stick-এর অদৃশ্য জাল। ঠিক এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরও অবনতি শুরু হলো। আবার নব্বই সালে যখন তা কিছুটা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করা হয় তখন কিছু উদ্দীপনা দেখা দিলেও তা স্থায়ী বিজয় অর্জন করতে পারেনি।

এরশাদ পতনের পর বলা হলো আমরা স্বৈরাচার ও রাজাকার উভয়কে তাড়ালাম। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিন্তু স্বৈরাচার-রাজাকারমুক্ত থাকতে পারেনি। রাষ্ট্রও থাকতে পারেনি। সুতরাং পঁচাত্তর পর্যন্ত অতীত গৌরব পুনরুদ্ধারের তীব্র দ্বন্দ্বসংকুল চেষ্টা, এরপর ব্যর্থতা, তারপর আবার ছোট ছোট চেষ্টা কিন্তু কোনো অবিমিশ্র সাফল্য নেই। আনেক চাকচিক্য, অনেক উন্নতি কিন্তু কোনোকিছুই সুষম নয়, স্থায়ী নয়, গভীর নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ, কেন্দ্রসংখ্যা, ছাত্র ও শিক্ষকসংখ্যা সবই অনেক বেড়েছে কিন্তু দেশের জনগণের সঙ্গে সংযোগ এবং প্রতিষ্ঠানটির বৌদ্ধিক প্রভাবের ব্যাপ্তিটা সংকুচিত হয়ে গেছে। মাঝখানে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় কিছু জনসংযোগ শুরু হলেও পরবর্তী সময়ে এর ধারাবাহিকতা থাকেনি। একাত্তরের আগে যেমন দেখা যেত, ইকবাল হলে বিচার সভা হচ্ছে। এমনকি কোনো শ্রমজীবী দম্পতি তাদের দাম্পত্য কলহ মীমাংসার জন্য ইকবাল হলের ছাত্রনেতাদের কাছে এসে বিচার দিচ্ছেন। সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতাদের এমন ধরনের ঘনিষ্ঠতা তো ১৯৬৯ সালে অনেকেই দেখেছেন!

১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গ্রামের যোগাযোগ ছিল বেশ নিবিড় ও অটুট। উদ্বৃত্ত কৃষকের সন্তানরা এখানে পড়ত। তারা ছুটিতে গ্রামে ফিরে যেত। যে কারণে একাত্তর থেকে পঁচাত্তর সালেও আমরা দেখেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ছুটিতে গ্রামগঞ্জে যাচ্ছেন, মিশছেন, কৃষক পিতার সঙ্গে মাঠে শ্রম দিচ্ছেন। এ ধারায় সৃষ্ট তদানীন্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান দুটো বৈশিষ্ট্য—একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং জনগণকে রাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেয়। অন্যটা হচ্ছে তার পাণ্ডিত্য, অর্থনৈতিক ও সামাজিক আদর্শ নির্মাণ। ১৯৪৭-৭১ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রেহমান সোবহানের মতো মানুষেরা দুই অর্থনীতির তত্ত্ব নির্মাণ করেছেন, নুরুল ইসলামের মতো লোকেরা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মিশে ছয় দফা তৈরি করেছেন, তোফায়েল আহমদ, আ স ম রব, শাজাহান সিরাজরা মিলে ছয় দফার জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম গড়ে তুলেছেন, সাইফুদ্দীন মানিক, রাশেদ খান মেনন এবং অন্যান্য বামপন্থী ছাত্রনেতা মিলে ১১ দফার সংগ্রাম তৈরি করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদ নিজের প্রাণ দিয়েছেন।

সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল গোটা দেশের উদ্দীপনা। সে সময় ২১ ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশ থেকে কত ছাত্র-ছাত্রী এখানে আসছে। মেয়েরা টিপ পরছে, শাড়ি পরছে। তাদের পোশাক এখনকার মতো নয়, একেবারেই সাধারণ বাঙালি পোশাক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একদিকে গ্রামের সঙ্গে যুক্ত, আবার উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদীয়মান বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিনিধি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের প্রতিনিধিও বটে।

বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে একটা সময় সবাই দেশে ফিরে আসত। কিন্তু পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে সে ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ল। কারণ তারা হয়তো মনে করল কাজের পরিবেশ নেই। অথবা একটা সময় এখানে যে উদারনৈতিক মুক্তবুদ্ধি ও রেনেসাঁর চর্চা হতো সে পরিবেশ অনুপস্থিত। তাই সারা দেশের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর ‘শ্রেষ্ঠদের’ আকর্ষণ করা বা ধরে রাখতে ব্যর্থ হলো।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ পেছন দিকে হাঁটার কারণটা কী? শতবর্ষে এসে যদি আমরা শুধু গৌরবগাথা আর অতীতের স্মৃতি স্মরণ করি, তাহলে এ উদযাপন সঠিক হবে না। শেকড় অনুসন্ধানে আমাদের অতীতের গৌরবগাথা তুলে ধরাটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পাশাপাশি আমাদের খুব কঠোরভাবে আত্মসমালোচনাটা করতে হবে। কেন আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে এলাম? বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গর্জে উঠল না? কেন আশি থেকে নব্বই পর্যন্ত স্বৈরাচার অব্যাহত থাকল? কেন যুদ্ধাপরাধীরা মন্ত্রিসভায় স্থান পেল? কেন আমাদের অর্থনীতি সমতা ও গণতন্ত্রের নীতি বাদ দিয়ে অসমতা এবং গড় প্রাচুর্য বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন চুপচাপ তা মেনে নিল এবং নিচ্ছে?

এ কথার উত্তর আমি খুঁজি। মনে হয় দুটো মোটা দাগের উত্তর আছে। একটা হচ্ছে, মধ্যবিত্ত যখন বঞ্চিত থাকে তখন তার সংগ্রামী একটা ভূমিকা থাকে। মধ্যবিত্ত যখন উদীয়মান থাকে ও অগ্রগতির নানা সুযোগ তার সামনে থাকে, তখন মধ্যবিত্তের একটি অংশ সেই সুযোগগুলো গ্রহণ করার জন্য ওপরে উঠে যায়। যে অংশটি নিচে থাকে, তারাও তখন ওই প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত হতেই চায়, কিন্তু সুযোগ না পেলে নিন্দায় মুখর হয়ে ওঠে, কিন্তু সুযোগ পেলেই আবার তা দ্রবীভূত হয়ে যায়। ইংরেজিতে এটাকে বলে ‘র্যাট রেস’ বা ইঁদুরের দৌড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঁদুরের দৌড় চলছে—কে কীভাবে ওপরে উঠবেন, উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হবেন তার এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা চলছে এখানে, যেখানে জ্ঞান এবং সত্য নয়, আধিপত্য করছে সেই আদিম ‘Carrot and Stick’ অর্থাৎ ‘লোভ এবং ভয়’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এটা চলছে আবার এখান থেকে যারা পাস করে বের হয়ে কর্মজীবনে ঢুকছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এটা প্রযোজ্য। আর যারা ‘পলায়নবাদী’ তারা দেশ ছাড়ছেন।

একটি চাকরির জন্য ছাত্ররা মরিয়া। তাদের মধ্যে মানবিক চিন্তা, আদর্শ অনুপস্থিত বা খুবই কমে গেছে কি? আমার একজন বন্ধু বলে, ‘তোমার সামনে যদি এমন কোনো লক্ষ্য না থাকে, যার জন্য তুমি তোমার জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত—তাহলে তুমি মানুষই না।’ এই স্ট্যান্ডার্ডে হয়তো আমিও ফেল করে যাব। সাধারণ ছাত্রদের তাই দোষ দেয়া চলে না। তবে মনে হয় বাস্তবে এখন কিন্তু জীবন বাজি না রেখেও অনেকরকম ছোটখাটো ভালো কাজ করা যায়। আগের মতো এখন ব্রিটিশ বা পাকিস্তানি বহিঃশাসনের নিষ্ঠুর বিস্তার নেই। এখন বাজার অর্থনীতির মধ্যে মধ্যবিত্তের নানা ধরনের অগ্রগতির সুযোগ আছে। কিন্তু তার পরও কখনো কখনো মনে হয় এ সুযোগটাই আমাদের সর্বনাশ করল কিনা—এটা আমার মনে একটা বড় প্রশ্ন। এ সুযোগের কারণে আমরা কী আমাদের শেকড় থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করলাম কিনা? প্রথমে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করলাম গ্রাম থেকে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, এরপর বাইরে চলে গেলাম, আর ফিরলাম না। আমি সবচেয়ে হতাশ হই এটা দেখে যে আমার শ্রেষ্ঠ ছাত্ররাও এ ধারাতেই শামিল। তারা চিন্তা করল না যে বাংলাদেশের এত দরিদ্র মানুষ, তাদের ট্যাক্সের টাকায় সাবসিডি দিয়ে আমি শিক্ষাগ্রহণ করেছি। আমি দেশের মানুষের কাছ থেকে নিলাম কিন্তু বিনিময়ে কিছু ফেরত দিলাম না। দেশের বাইরে চলে গেলাম। আমার মনে হয় এটা বিশ্বায়নের হাতছানির স্বাভাবিক একটি ফল। এখনকার গ্লোবালাইজেশনের একটা অবজেকটিভ ল হচ্ছে, যেখানে আমি বেশি পাব সেখানে যাব, যেখানে আমি কম পাব সেখানে থাকব না। পুঁজির যেমন স্থানবদল হয়, তেমনি মানবসম্পদেরও। এটাকে আমরা অতীতে বলতাম ব্রেন-ড্রেন। এর মানে আমরা মেধাটা তৈরি করলাম কিন্তু আমাদের এখানে তা কাজে লাগল না। আজকের আলোচনাটা আমি এখানে শেষ করতে পারতাম—কিন্তু এটি হবে কানাগলির মতো হতাশাজনক এক শেষ। তাই প্রশ্ন করতে ইচ্ছা হয়, এর মধ্যেও কি কোনো বিপরীতের দ্বন্দ্ব নেই?

আশার কথা হচ্ছে, নতুন একটি ধারণার সূচনা বর্তমানে হয়েছে। যারা বলছেন ব্রেন-ড্রেন নয়, ব্রেন-গেইনও হতে পারে। তাদের মতে, যারা দেশ ছেড়ে চলে গেছে, তারা এখন বিদেশে থেকেও যোগাযোগ বিপ্লবের কারণে যে কোনো খাতে অবদান রাখতে পারে। কে কোথায় আছে এখন আর তা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কে কোন জায়গায় অবদান রাখতে চায় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমেরিকায় বা সিঙ্গাপুরে থেকেও বাংলাদেশে অবদান রাখতে পারি। উল্টো দিক থেকে আবার আমি বাংলাদেশে থেকেও কানাডার বেগম পাড়ায় অংশগ্রহণ করতে পারি!

সুতরাং এখন আমি যদি বলি এখানে যারা থেকে গেল তারাই ভালো, আর ওখানে যারা চলে গেছে তারাই খারাপ—এ বক্তব্যটা এখন আর খাটবে না। চিন্তা করে দেখুন রেমিট্যান্স প্রেরনকারী প্রবাসী শ্রমিকদের কথা। দেশের বাইরে অবস্থান করেও কেউ কেউ এখানে অবদান রাখছেন। আমাদের শুধু ভালো একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে। যাতে তারা আবার দ্রুত দেশে ফিরে আসার কথা বিবেচনা করেন—চীনারা যেমন নিজের দেশে তা করেছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো লোক যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন এর মানে সেখানে অবক্ষয় শুরু হয়েছে। আজ তাই নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে আমাদের সামনে। অবকাঠামো তৈরির পাশাপাশি আমাদের দেশে যদি সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো শিক্ষকরা ও ছাত্ররা যদি ফিরে আসেন এবং এখানে ইঁদুরের দৌড়টা যদি আমরা বন্ধ করে Meritocracy চালু করতে পারি, তাহলে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ব গৌরবে পুনঃঅধিষ্ঠিত হবে। তবে এটা করার জন্য যে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রয়োজন হবে তা হয়তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই অগ্রদূত কতিপয় সচেতন শিক্ষক এবং ছাত্রকেই করতে হবে। সেই ভোরের জন্য আমরা অপেক্ষা করে আছি।

রাজনৈতিক দিকটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানগত দিকটি যদি প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, তাহলে বিভিন্ন ফলিত গবেষণার সঙ্গে একে যুক্ত করতে হবে। এর মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে হবে। কভিডবিষয়ক গবেষণার জন্য হাসপাতাল, বায়োমেডিকেলের জন্য বারডেম, টেক্সটাইল নিয়ে গবেষণার জন্য তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এ যোগাযোগগুলো এখনো আমরা তৈরি করতে পারিনি। যদি এ যোগাযোগটা হয়ে যায়, তাহলে চাহিদামাফিক গবেষণা হবে। এছাড়া কিছু মৌলিক গবেষণা রয়েছে। যেগুলো হলো দার্শনিক, তাত্ত্বিক ও সামাজিক গবেষণা। যেগুলোর হয়তো সরাসরি কোনো বস্তুগত ফলাফল নেই। কিন্তু এগুলো আদর্শ, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি তৈরি করে। এগুলো আর কিছুই না, গভীর চিন্তা করে মানুষের মনস্তত্ব কীভাবে বদলানো যায়, তা খুঁজে বের করা। এটা করতে হবে দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্য বিভাগকে। তবে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে এ গবেষণা কাজগুলো করতে গিয়ে তারা যেন অর্থ সংকটে না পড়ে। অন্যদেরটা যেহেতু ফলিত গবেষণা, সুতরাং তাদের অর্থের অভাব হয় না। তাদের শুধু ইচ্ছার অভাব অথবা প্রযুক্তির অভাব। ইচ্ছা ও প্রযুক্তির সমস্যা দূর করলেই তারা গবেষণাটা করতে পারে।

বিপরীতে দর্শন, সমাজবিজ্ঞান, সাহিত্যের ওপর গবেষণার জন্য মানুষের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ দরকার। বিপর্যয়ের সময় মানুষের আচরণের ওপর গবেষণা করতে চাইলে ঘটনাস্থলে যেতে হবে। এছাড়া প্রয়োজন দেশ-বিদেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুবাদ। একই বিষয় বারবার গবেষণার দরকার নেই, শুধু তা অনুবাদ করে নিয়ে আসতে হবে। বিদেশে গিয়ে আমরা সেখানে থাকব না, সেখানকার জ্ঞানটা আহরণ করে দেশে ফিরে এসে ছাত্রদের মধ্যে বিতরণ করব। উন্মুক্ত জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে দেশ-বিদেশ থেকে জ্ঞান আহরণ, ফলিত গবেষণা আর এ-বিষয়ক জ্ঞান ব্যবহারকারীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং যারা গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক গবেষণা করবেন, তাদের সঙ্গে সমাজের সজীব মিথস্ক্রিয়া—এ শর্তগুলো পূরণের পাশাপাশি যদি দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন করা যায়, তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অচিরেই তার হূতগৌরব ফিরে পাবে।

 

এমএম আকাশ

অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও