শেখ নাদির হোসেন লিপু
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্ক ভিটা)
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাইদ শাহীন
এবারের বিশ্ব দুগ্ধ দিবসে মিল্ক ভিটার কী অঙ্গীকার থাকবে?
অল্প কয়েকটি জেলায় চার-পাঁচ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহের মাধ্যমে মিল্ক ভিটার যাত্রা হয়েছিল। এখন সারা দেশে যে দুধ উৎপাদন হয় তার সিংহভাগই সংগ্রহ করছে এ প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রতিদিন মিল্ক ভিটা সমবায়ীদের কাছ থেকে প্রায় তিন-চার লাখ লিটার দুধ সংগ্রহ করে। দুগ্ধ দিবসে মিল্ক ভিটার অঙ্গীকার—আমরা প্রতিটি মানুষকে দুধ খাওয়াতে চাই। সবার জন্য পুষ্টির নিশ্চয়তা করা। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাতে মেধাবী একটি প্রজন্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। পর্যায়ক্রমে গাভীর জাত উন্নত করতে হবে। খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও মিল্ক ভিটার অন্যতম অঙ্গীকার। মিল্ক ভিটা হবে ভারতের আমুলের মতো প্রতিষ্ঠান।
দুধ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছি না কেন?
আমদানি করা গুঁড়ো দুধ আমাদের সাংঘাতিকভাবে ক্ষতি করছে। এসব দুধের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বাজারে ২৬০ টাকা দরে আমদানি করা এক কেজি গুঁড়ো দুধ পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে মিল্ক ভিটাসহ ব্যক্তি খাতে যারা দুধ উৎপাদন করছেন, তারা গুঁড়ো দুধ ওইভাবে বাজারজাত করতে পারছেন না। গুঁড়ো দুধ আমদানির মাধ্যমে দেশের দুগ্ধ শিল্প এক ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। পাশাপাশি গুঁড়ো দুধ আমদানিকারকরা এক ধরনের প্রতারণা করছেন। গুঁড়ো দুধ আমদানিতে কঠোরতা আরোপ করে সঠিক ও কার্যকর উদ্যোগ নিলে দুই বছরের মধ্যে দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারবে বাংলাদেশ। আমদানিতে অধিক হারে শুল্কারোপ করে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে প্রতিযোগিতা সক্ষম করে তুলতে হবে। ভারতে দুগ্ধ বা দুগ্ধজাতীয় যেকোনো পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে সরকার আমুলকে ডাকে। আমুলের উৎপাদন সক্ষমতাসহ তাদের পরামর্শ জানতে চায়। তারপর আমদানির অনুমতি দেয় দেশটির সরকার। বাংলাদেশে সেটা হয় না। আমরা বারবার এনবিআরকে বলেছি। আমি মনে করি, আমাদের দুগ্ধ উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতায় সহযোগিতা করছে না এনবিআর।
বাজারে মিল্ক ভিটার গুঁড়ো দুধের দাম বেশি কেন?
আমরাদের গুঁড়ো দুধের দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ৮ থেকে ৩০ টনে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছি। এক্ষেত্রে আমাদের বাধা হলো আমদানীকৃত গুঁড়ো দুধ। এর ওপর আরোপিত কর খুবই কম। মিল্ক ভিটার এক কেজি পাউডার মিল্ক বাজারে ৫৫০ টাকার নিচে পাবেন না। আমাদের এক কেজি পাউডার দুধ উৎপাদন করতে ৮-১০ লিটার দুধ লাগে। প্রতি কেজি ৫০-৫৫ টাকা দরে শুধু তরল দুধের দামই ৪৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। আবার ৫০ টাকার নিচে দাম দিলে গাভী লালন-পালন করার জন্য যে খরচ হয়, তাতে চাষীদের লাভ হয় না। লাভ না হলে কেউ দুধ উৎপাদন করতে চান না। তরল দুধ কেনার পর তার সঙ্গে উৎপাদন খরচ, এস্টাবলিশমেন্ট ব্যয়, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফা—সব মিলিয়ে ৫০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এখন প্রশ্ন হলো আমদানীকৃত এক কেজি গুঁড়ো দুধ যদি ২৬০ টাকায় পাওয়া যায়, তাহলে ভোক্তা কেন আমাদের দুধ কিনবে। ফলে প্রতিনিয়ত একটা বড় ধাক্কার মধ্যে আছি আমরা। এর কারণে সাধারণ খামারিরা দুধ উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন।
মিল্ক ভিটা খামারিদের কী কী সুবিধা দেয়?
মাত্র ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে গাভী কেনার জন্য ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করে মিল্ক ভিটা। গাভীর দুধ বৃদ্ধিতে আমরা খামারিদের অস্ট্রেলিয়া থেকে ঘাসের বীজ সরবারাহ করে দিয়েছি। আমাদের নিজস্ব গোখাদ্য প্লান্ট আছে। সমবায় সমিতির অফিস পর্যন্ত দুধ নিয়ে আসতে খামারিদের যে লোকাল ট্রান্সপোর্ট সার্ভিস হয়, সেটাও মিল্ক ভিটা সরবরাহ করে। তবে প্রান্তিক চাষীকে আমরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে এ সেবাগুলো দিই। গবাদিপশুর নিয়মিত টিকা প্রদান, অসুস্থ গবাদিপশুর চিকিৎসাসেবা প্রদান ও ওষুধ সরবরাহ এবং উন্নত মানের ফ্রিজিয়ান ও জার্সি বুলের সিমেন দিয়ে কৃত্রিম প্রজননের মতো সেবা দিচ্ছি আমরা। আবার গাভীর উন্নত খাবারের জন্য উচ্চফলনশীল সবুজ ঘাসের কাটিং ও বীজ প্রদান, উন্নত মানের দানাদার গোখাদ্য প্রকৃত মূল্যে সরবরাহ করা হয়। খামারিদের প্রশিক্ষণ প্রদান, গবাদিপশু প্রতিপালনের জন্য খামারিদের কারিগরি জ্ঞান প্রদান করা হয়। এসব সেবা মিল্ক ইউনিয়নের সব সমবায়ী খামারিদের দেয়া হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দখলে থাকা বাথান জমি (গোচারণ ভূমি) উদ্ধার করা হচ্ছে।
মিল্ক ভিটার উন্নয়ন পরিকল্পনা কী রয়েছে?
মিল্ক ভিটার প্রধান লক্ষ্যই হলো দুধে স্বয়ম্ভরতা অর্জন। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে প্রত্যেকটি উপজেলায় মিল্ক ভিটার কার্যক্রম সম্প্রসারণের। এজন্য সব উপজেলায় একটি করে পূর্ণাঙ্গ প্লান্ট করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। ফরিদপুরের চরাঞ্চলে গবাদিপশুর জাত উন্নয়নে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। দেশের সর্বাধুনিক দুগ্ধ প্লান্ট করা হচ্ছে ফরিদপুরে। দিনাজপুরেও একটি বড় প্রকল্প আছে। বাঘাবাড়ীতে যে জায়গা মিল্ক ভিটার প্রাণকেন্দ্র, সেখানে প্লান্ট সম্প্রসারণ করছি। দেশে দুধের রাজধানী বাঘাবাড়ীর উন্নয়নে সব ধরনের উদ্যোগ থাকবে। সব ধরনের দুগ্ধপণ্য তৈরি করতে চট্টগ্রামের পটিয়ায় আমরা একটি প্লান্ট করছি। মাদারীপুরে একটি প্রকল্প হচ্ছে।
ফরিদপুর কি দেশের দ্বিতীয় দুগ্ধ রাজধানী হচ্ছে?
ফরিদপুরে দেশের সর্বাধুনিক দুগ্ধ প্লান্ট নির্মাণে ‘বৃহত্তর ফরিদপুরের চরাঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন ও দুধের বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতকরণ কারখানা স্থাপন’
শীর্ষক প্রকল্প নেয়া হয়েছে। বাস্তবায়নাধীন পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে ফরিদপুরের সঙ্গে ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগযোগ ব্যবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। ফলে ফরিদপুরের দুগ্ধ কারখানা থেকে উৎপাদিত দুধ সারা দেশে বিপণন করা সহজ হবে। সব ধরনের দুগ্ধপণ্যই এখানে উৎপাদন করা হবে। ফরিদপুরে অনেক চরাঞ্চল রয়েছে। সেখানে অনেক দুধ উৎপাদন হলেও তা শহরে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এসব চরাঞ্চল থেকে দুধ সংগ্রহে এক ধরনের বিশেষ ট্রলার তৈরি করছি। এতে অনায়াসে চরাঞ্চল থেকে দুধ নিয়ে আসতে পারব আমরা।