গ্রমীণ অর্থনীতি ও পুষ্টিনিরাপত্তায় অন্যতম বড় খাত এখন দেশের দুগ্ধ শিল্প। বেকার সমস্যা দূরীকরণ, জ্বালানি সমস্যা সমাধানে এ খাতের বড় অবদান রাখার সুযোগ আছে। বর্তমানে সব মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ দুগ্ধ খামার রয়েছে। এসব খামারে প্রত্যক্ষভাবে ৭০ লাখ ও পরোক্ষভাবে আরো প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে। দেশে দুধের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই উৎপাদন হচ্ছে এসব খামারে। তবে দুগ্ধ শিল্পে এখনো ব্যাপক উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে। বাণিজ্যিকভাবে গবাদিপশু পালনের সুযোগ সেভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে আমদানি করা দুধের ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে। এতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) তথ্যমতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন ছিল ২৩ লাখ ৭০ হাজার টন, যা গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ১ কোটি ৬ লাখ ৮০ হাজার টন। এই সময়ে দুধের চাহিদা ছিল ১ কোটি ৫২ লাখ ২ হাজার টন। জনপ্রতি ২৫০ মিলিলিটার হিসাবে এ চাহিদা পরিমাপ করা হয়েছে। জনসংখ্যা হিসাবে নেয়া হয়েছে ১৬ কোটি ৬৬ লাখ। সে হিসেবে জনপ্রতি দৈনিক দুগ্ধ গ্রহণ করছে ১৭৫ দশমিক ৬৩ মিলিলিটার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১৬৫ মিলিগ্রাম। ফলে এখনো ঘাটতি প্রায় ৪৫ লাখ ২২ হাজার টন। জনপ্রতি প্রতিদিন ঘাটতি ৭৫ মিলিলিটার। দেশে এখন দুধ উৎপাদন ছাড়িয়েছে হাজার কোটি লিটার। সে হিসেবে সারা দেশে প্রায় প্রতিদিন আড়াই-তিন কোটি লিটার দুধ উৎপাদন হচ্ছে। এর মাত্র ৬-৭ শতাংশ বা ১৫-২০ লাখ লিটার প্রক্রিয়াজাত কোম্পানিগুলো সংগ্রহ করে।
দুগ্ধ খাতে এখনো ধারাবাহিক বড় বিনিয়োগ আসেনি। প্রক্রিয়াজাতে বেজা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করেছে। বাজার থেকে দুধ সংগ্রহে শীর্ষে সমবায় অধিদপ্তরের সমবায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেড (মিল্ক ভিটা)। এর পরই রয়েছে ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজের আড়ং, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের প্রাণ ডেইরি। এছাড়া আকিজ গ্রুপ, রংপুর ডেইরি ফুড অ্যান্ড প্রডাক্ট লিমিটেড, ফার্ম ফ্রেশ, আফতাব ডেইরি, ইবনে সিনা, আমেরিকান ডেইরি, আবুল মোনেম গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পাস্তুরিত তরল দুধ সংগ্রহ করে। উৎপাদিত দুধ বিপণন ব্যবস্থার দুর্বলতায় প্রতিদিন তরল দুধ গ্রহণের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিচে বাংলাদেশ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ডেইরি শিল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আমদানীকৃত গুঁড়ো দুধের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা। এসব গুঁড়ো দুধ উৎপাদিত দেশে ভর্তুকিপ্রাপ্ত হওয়ায় এর দাম তুলনামূলক অনেক কম হয় বাংলাদেশে। ফলে বাংলাদেশের স্থানীয় উৎপাদনকারীরা প্রতিযোগিতা করতে পারেন না। তাই বাল্ক ফিল্ড মিল্ক আমদানি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বাল্ক ফিল্ড মিল্ক নামে ভেজিটেবল ফ্যাট মিশ্রিত যে দুধ বাংলাদেশে আমদানি হয়, সেটি দেশের দুগ্ধ শিল্প ধ্বংসের জন্য মূলত দায়ী। ভেজিটেবল ফ্যাট মিশ্রিত এ দুধের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়নি। আমদানীকৃত গুঁড়ো দুধের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে এবং অ্যান্টি-ডাম্পিং ট্যাক্স আরোপ করে দেশীয় দুগ্ধ শিল্প রক্ষার পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশে উৎপাদিত সব ধরনের ডেইরি পণ্যে শুল্ক ও কর শূন্য হারে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। করোনার আঘাত থেকে মুক্ত করে ডেইরি খাতকে টেকসই ও মজবুত উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, প্রাণিসম্পদ সম্প্রসারণ সেবাকে ডিজিটালাইজড ও খামারিবান্ধব করা এবং ডেইরিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে গাভি বীমা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। প্রান্তিক কৃষক যাতে সহজেই করোনা প্রণোদনার অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন, সেজন্য গ্রেস পিরিয়ডসহ জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা দেয়া যেতে পারে। এছাড়া ডেইরি পলিসি অনুমোদনসহ ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন করতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশন (বিডিএফএ) মো. শাহ এমরান বণিক বার্তাকে বলেন, এক দশকের ব্যবধানে দেশে দুধ উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। তবে দেশে দুধের চাহিদা ও উৎপাদনে এখনো বেশ ঘাটতি রয়েছে। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে এ বিপুল পরিমাণ ঘাটতি কীভাবে মেটানো সম্ভব হবে, তার কোনো রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়নি। দুধ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও দুগ্ধ শিল্পে মানসম্পন্ন দুগ্ধবতী গাভীর সংকট, দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবলের অভাব, দক্ষ প্রাণী চিকিৎসক ও ভেটেরিনারি চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। এছাড়া স্বল্প সুদে ঋণ না পাওয়া, উৎপাদিত দুধের সঠিক মূল্য না পাওয়া, দুধ সংরক্ষণ ও বাজারজাতে সহযোগিতা না পাওয়ার কারণে দুধ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গুঁড়ো দুধ আমদানিতে যেমন কঠোরতা নিতে হবে, তেমনি দুগ্ধ খামারিদের বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
কীভাবে দেশের প্রত্যেক খামারি বা কৃষককে দুধ উৎপাদনে আরো বেশি সম্পৃক্ত করে লাভবান করা যেতে পারে সেটি নিয়ে কাজ করতে হবে। যে জেলায় সবচেয়ে বেশি দুধ উৎপাদন হয়, সেখানে মাঝে মধ্যেই দুধ বিক্রি না করে খামারিরা রাস্তায় ঢেলে দিচ্ছেন। আবার ঠিক তার পাশের জেলার মানুষ দুধ পাচ্ছে না। দুগ্ধ খাতে বিপণনের এ বেদনাদায়ক চরিত্রের মধ্যে উৎপাদন বাড়ছে। বিপণন দুর্বলতা দেশের দুগ্ধ শিল্পের জন্য চরম বাস্তবতা। বিপণন ব্যবস্থায় দুর্বলতার পাশাপাশি দামের কারণে সাধারণ ভোক্তা দুধ সঠিক সময়ে পাচ্ছে না। দুধ উৎপাদন বাড়ানোয় যেমন পদক্ষেপ থাকতে হবে তেমিন বিপণন ব্যবস্থায় আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া দুধের উৎপাদন খরচ কমাতে উন্নত জাত দেশে আনতে হবে। গোখাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও অবাধ আমদানি প্রান্তিক খামারিদের বিপর্যস্ত করছে।