স্বাধীনতার
সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে বাংলাদেশ। কিন্তু ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চ বা ১৬ ডিসেম্বর ছিল ভিন্ন রকমের। পাকিস্তানের জবরদস্ত সেনাবাহিনীর ৯০ হাজার সৈন্য আত্মসমর্পণ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। মহা আনন্দের দিন, মুক্তির দিন, নিঃশ্বাস ফেলানোর দিন। আরেক দিকে ছিল দুঃখ-কান্না-কষ্ট। ঘরে ঘরে স্বজন হারানোর কান্না বেদনা। দেয়ালে মাটিতে রক্তের দাগ। পাশাপাশি চলছে অস্ত্রের ঝনঝনানি। হাতে হাতে অস্ত্র। যত না মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তার চেয়ে বেশি ‘ষোড়শ’ বাহিনীর হাতে। ‘ষোড়শ’ বাহিনী মানে যারা মুক্তিযোদ্ধা নয়, মেকি মুক্তিযোদ্ধা। এদের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নড়বড়ে। মুক্তিযুদ্ধের সরকার তখনো মুজিবনগর থেকে ঢাকায় ফেরেনি। সর্বময় নেতা বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিস্তানের কারাগারে। অথচ দেশে এক প্রায় জরুরি অবস্থা। নয় মাস কৃষিকাজ চলেনি। কৃষকরা স্ত্রী-পুত্র-কন্যা ও নিজের মান সম্মান বাঁচানোর চেষ্টায় ছিল। মিল কারখানা অচল, শ্রমিক আছে, পাকিস্তানি মালিকরা সব দেশ ত্যাগ করেছে। ব্যাংকে টাকা নেই, অথচ আমানতকারীদের টাকা দরকার। দোকানপাটে পণ্য নেই, কারণ নয় মাস দেশে আমদানি-রফতানি হয়নি। কর্মচারীদের-কর্মকর্তাদের বেতন নেই। রাস্তাঘাট-পুল-ব্রিজ ভাঙা। যাতায়াত ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। রেললাইন তোলা। বিমানবন্দর, নৌবন্দর, সমুদ্রবন্দর সব অকেজো। এক কথায় এক অচলাবস্থা, জরুরি অবস্থা। টাকার অভাব, ভীষণ অভাব।
আইনশৃঙ্খলা,
যাতায়াত ব্যবস্থা,
আর্থিক ব্যবস্থা,
ব্যবসা-বাণিজ্য,
মিল-ফ্যাক্টরি,
কৃষিকাজ ইত্যাদিতে
স্বাভাবিক অবস্থা
ফিরিয়ে আনতে
হলে দরকার
টাকা, ’ক্যাশ’।
মুক্তিযুদ্ধের নয়
মাসে সবকিছু
স্তব্ধ হয়ে
আছে। এখন
টাকা কোত্থেকে
আসবে? পাকিস্তানিরা
শেষ মুহূর্তে
তাদের মুদ্রা
‘ডিমানিটাইজ’
করে গেছে।
টাকা পেতে
হলে, টাকার
ব্যবস্থা করতে
হলে ব্যাংক
দরকার, বিশেষ
করে কেন্দ্রীয়
ব্যাংক দরকার।
টাকা মানুষের
হাতে পৌঁছাতে
হলে অন্যসব
ব্যাংক চালু
করতে হবে।
অথচ ব্যাংকের
পাকিস্তানি মালিকরা
সব দেশ
ছেড়ে নিজের
দেশে চলে
গেছে। অর্থনীতি
তখন ছোট
এক অর্থনীতি।
মতিঝিলই অর্থনীতির
প্রাণকেন্দ্র। ব্যাংক
ব্যবসা-বাণিজ্যের
কেন্দ্র মতিঝিলই।
ঢাকা শহরও
গুলিস্তান সিনেমা
হল বা
বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ
পর্যন্ত সীমিত।
এ অবস্থায়
সর্বাগ্রে চিন্তা
করতে হয়
টাকার জন্য।
টাকার জন্য
প্রথমেই দরকার
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের।
অথচ বাংলাদেশে
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের কোনো
পূর্ণ অফিস
ছিল না,
ছিল পোস্ট
অফিসের মতো
একটা প্রাদেশিক
অফিস, যার
ঢালও ছিল
না, তলোয়ারও
ছিল না।
শুরু হয়
সেই অফিসকে
সামনে রেখে
কাজ। তৈরি
করতে হবে
আইন। কেন্দ্রীয়
ব্যাংক তৈরি
করতে আইন
লাগবে। অথচ
সংসদ নেই।
অতএব দরকার
রাষ্ট্রপতির অনুমোদন।
এসব কাজে
পটু ছিলেন
মুশফেক উস
সালেহীন। তিনিই
বাংলাদেশ ব্যাংকের
প্রথম প্রশাসক
। তিনি
‘ড্রাফটিং’
এ ছিলেন
অনন্য। ভদ্র-শিক্ষিত-মার্জিত
ও শান্ত
একজন কর্মী।
এদিকে ছিলেন
কেন্দ্রীয় ব্যাংকার
নন, বাণিজ্যিক
ব্যাংকার এএন
হামিদুল্লাহ, যিনি
‘ইস্টার্ন
ব্যাংকিং করপোরেশন’
(ইবিএল) বর্তমানের
উত্তরা ব্যাংকের
ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
সালেহীন সাহেব
প্রাথমিক ও
জরুরি কাজ
সামলিয়ে দায়িত্ব
বুঝিয়ে দেন
হামিদুল্লাহ সাহেবকে,
যিনি বাংলাদেশ
ব্যাংকের প্রথম
গভর্নর (১৮-০১-১৯৭২
থেকে ১৮-১১-১৯৭৪)।
এ সময়টা
খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক পুনর্গঠনের
সময়। ১৯৭২
সালের ৩১
অক্টোবরে ‘বাংলাদেশ
ব্যাংক অর্ডার’
বলে পুরোপুরিভাবে
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
প্রতিষ্ঠা হয়।
তার আগে
চলে অস্থায়ী
অর্ডারে। এরই
মধ্যে দুটো
গুরুত্বপূর্ণ কাজ
করতে হয়
একটি নোট
ছাপানোর কাজ
এবং অন্যটি
পাকিস্তানিদের দ্বারা
পরিত্যক্ত ব্যাংকগুলো
চালুর ব্যবস্থা
করা। কথা
ওঠে এগুলো
বেসরকারি খাতে
দেয়ার জন্য।
বঙ্গবন্ধুর ৬
দফা ও
ছাত্রদের ১১
দফা মোতাবেক
তা করা
যায় না।
শেষ পর্যন্ত
পাকিস্তানি পরিত্যক্ত
সব ব্যাংক
‘জাতীয়করণ’
(ন্যাশনালাইজ) করা
হয়। সঙ্গে
সঙ্গে বাঙালি
মালিকানাধীন দুটো
ব্যাংকও জাতীয়করণ
করা হয়।
এর জন্য
লাগে ‘ব্যাংক
ন্যাশনালাইজেশন অর্ডার-১৯৭২’।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
এতদিনে মোটামুটি
কিছুটা গুছিয়ে
উঠেছে। কিন্তু
অভ্যন্তরীণ কাজ
গোছানোর সঙ্গে
সঙ্গেই জরুরি
অবস্থার দাম
হয় বৈদেশিক
মুদ্রা ক্ষেত্রে।
আমদানির জন্য
ঋণপত্র খুলতে
হলে লাগে
বৈদেশিক মুদ্রা।
পাকিস্তানিরা বৈদেশিক
মুদ্রাভাণ্ডার নয়
শুধু দেশীয়
মুদ্রাভাণ্ডার পর্যন্ত
শূন্য করে
দিয়ে যায়।
এ দুটো
সমাধানে অচিরেই
সমাধান পাওয়া
যায়। বাংলাদেশ
ব্যাংকের রেকর্ডে
দেখা যায়
১৯৭২ সালের
৪ মার্চ
আমাদের ১
টাকা ও
১০০ টাকার
নোট চালু
হয়। ভারত
সরকার বাংলাদেশকে
৫০ হাজার
পাউন্ড স্টার্লিং
দেয়। এ
দিয়ে বিদেশী
ব্যাংকে আমাদের
বাংলাদেশ ব্যাংক
হিসাব খোলে।
এছাড়া ভারত
সরকার আরো
সাহায্য দেয়
বৈদেশিক মুদ্রায়।
এ দিয়ে
আমদানির কাজ
সীমিত আকারে
শুরু হয়।
এদিকে
স্বাধীনতাপূর্বকালে চালু
১২টি বাণিজ্যিক
ব্যাংকে জাতীয়করণের
কাঠামোতে এনে
ছয়টি বাণিজ্যিক
ব্যাংকের সূত্রপাত
করা হয়।
অবাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর
আলাদা ব্যবস্থা
করা হয়।
এসব ব্যাংকের
নামকরণেরও একটি
ইতিহাস আছে।
আমি তখন
দৈনিক সংবাদের
‘অর্থনীতি
সম্পাদক’ ও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষক। ‘সংবাদ’
সূত্রে যাতায়াত
সর্বত্র। নানা
খবর শুনি,
লেখালেখি করি।
ব্যাংকের নামকরণে
নানা লোক
নানা মতামত
দেয়। এমনকি
‘বাংলাদেশ
ব্যাংকের’ নামকরণেও
তাই। কেউ
বলে ‘স্টেট
ব্যাংক অব
বাংলাদেশ’ কেউ
বলে ‘ব্যাংক
অব বাংলাদেশ’।
বাণিজিক ব্যাংকের
নামকরণেও নানা
সুপারিশ আসে।
বঙ্গবন্ধুর এক
সমাধান। ‘বাংলায়
নাম করো,
সহজ নাম
করো, আমার
লোক যাতে
বুঝতে পারে।
দিকের নাম
আছে, সোনালি
আঁশ আছে,
আমার জনগণ
আছে।’ এসব
আমরা বাইরে
থেকে শুনি।
কী সুন্দর
সমাধান। চিন্তাভাবনার
দরকার কম।
মানুষের কাছাকাছি
হলেই তা
সম্ভব। নাম
হলো ‘বাংলাদেশ
ব্যাংক’।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর
নাম হলো:
সোনালী ব্যাংক,
জনতা ব্যাংক,
অগ্রণী ব্যাংক,
রূপালী ব্যাংক,
পূবালী ব্যাংক
ও উত্তরা
ব্যাংক। এসব
ব্যাংকের প্রদান
নির্বাহী নিয়োজিত
হলো। যাদের
নাম আজ
আমার মনে
আছে তারা
হলেন জিএম
চৌধুরী, খায়রুল
কবীর, এম
ফজলুর রহমান,
মুসফেক-উস
সালেহীন, এম
খালেদ, রুহুল
আমীন। এরা
সোনালী, জনতা,
অগ্রণী, রূপালী,
পূবালী ও
উত্তরা ব্যাংকের
প্রধান নির্বাহী
হন। এরাই
স্বাধীনতার পরবর্তী
সময়ে বাণিজ্যিক
ব্যাংক ব্যবস্থার
হাল ধরেন।
এদের প্রত্যেকেই
ছিলেন অত্যন্ত
দক্ষ, সৎ
ও নিষ্ঠাবান
ব্যাংকার। আরো
ছিলেন সুলেমান
চৌধুরী। এদিকে
ঘটে আরেকটা
ঘটনা। পাকিস্তানে
আটকা পড়া
আমাদের কেন্দ্রীয়
ব্যাংকারদের অনেকেই
দেশে ফিরতে
শুরু করেন।
এদের
মধ্যে আছেন
একেএন আহমেদ,
এ কে
গঙ্গোপাধ্যায়, আমিনুল
হক চৌধুরী
প্রমুখ। একেএন
আহমেদ এসেই
সোনালী বাংকের
প্রধান নির্বাহী
হন ১৯৭৪
সালে। এ
বছরের শেষে
তিনি গভর্নর
হিসেবে যোগ
দেন কেন্দ্রীয়
ব্যাংকে। কেন্দ্রীয়
ব্যাংক তখন
একগুচ্ছ মেধাবী
ব্যাংকাদের দ্বারা
পরিবেষ্টিত। গভর্নর,
ডেপুটি গভর্নর,
নির্বাহী পরিচালক,
বিভাগীয় প্রধানদের
প্রত্যেকেই ছিলেন
সৎ, মেধাবী
ও একনিষ্ট
কর্মী। এদের
মধ্যে ছিলেন
একেএন আহমেদ,
এ কে
গঙ্গোপাধ্যায়, আমিনুল
হক, বিবি
দেবনাথ, সৈয়দ
আলী কবীর,
সৈয়দ আলী
আশরাফ, এসআর
কর্মকার মজিদ
মোল্লা, ফখরুল
আহসান, এটিএম
আমিন। কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের প্রাথমিক
আরম্ভের পর
এরাই এ
ব্যাংকের পরিপূর্ণ
কাঠামো তৈরিতে
নেতৃত্ব দেন।
বিস্তারিত নিয়মকানুন,
বিধি তৈরি,
বাণিজ্যিক ব্যাংকের
সঙ্গে সম্পর্ক,
সরকার-কেন্দ্রীয়
ব্যাংক সম্পর্ক
ইত্যাদি তৈরিতে
তারাই নেতৃত্ব
দেন। দৈনন্দিন
ভিত্তিতে বাণিজ্যিক
ব্যংকগুলোর নেতৃত্ব
দেন এবং
অবদান রাখেন
পূর্বোক্ত ব্যাংকাররা।
এদের নেতৃত্বে
নানা ধরনের
ঋণ কর্মসূচির
সূত্রপাত হয়।
প্রথম দিকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যে গুরুদায়িত্ব পালন করতে হয়, তা হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের জন্য, পুনর্বাসনের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা। ১৯৭২ সালেই ১ টাকা ও ১০০ টাকার নোট প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংকগুলো জাতীয়করণ করে পুরোপুরি চালু করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুটি পুরনো তথ্যমতে যে পদক্ষেপগুলো তখন গৃহীত হয়, সেগুলো হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক, শিল্প ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকে প্রশাসক বসানো হয় (মনে রাখা দরকার অন্যান্য শিল্প-ব্যবসা-বড় বড় দোকান ইত্যাদিতেও প্রশাসক বসানো হয়)। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক বন্ধ করার জন্য ১৯৭১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত টাকা তোলা বন্ধ রাখা হয়। ১৯৭২ সালের প্রথম দিক থেকে ব্যাংকিং কার্যক্রম চলে বিধিনিষেধের মধ্যে। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে ইস্যু করা টিটি/ডিডি পরিশোধ স্থগিত করা হয়। অবশ্য ‘পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূলে’ ইস্যুকৃত ডিডি/টিটি পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয় ১৯৭২ সালের জুনের পর। ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়, যাতে তারা আমানতকারীদের টাকা তুলতে দিতে পারে। পাটকলের জন্য ঋণের ব্যবস্থা করা হয়। সব ব্যাংকের জন্য সুদের হার নির্ধারণ করে দেয়া হয়, যাতে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ব্যাংকগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। বাড়ি-জমির বিপরীতে ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের ঋণের ব্যবস্থা করা হয় এবং কোনো জামানত ছাড়াই ব্যক্তিগত ঋণ হিসাবে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দেয়ার ব্যবস্থা হয়।
বলা
বাহুল্য আমাদের
কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
চালানোর কোনো
অভিজ্ঞতা ছিল
না। আবার
ভারত-পাকিস্তানের
উদাহরণ মতো
স্টেট ব্যাংক
অব পাকিস্তানকেও
(এসবিপি) অস্থায়ীভাবে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
দায়িত্ব পালনের
সুযোগ দেয়া
সম্ভব ছিল
না। কারণ
বাংলাদেশ পাকিস্তানের
কোনো ‘উত্তরসূরি’
দেশ নয়।
রক্তাক্ত যুদ্ধ
করে আমাদের
স্বাধীনতা। এখানে
ক্ষমতা প্রত্যর্পণ
এবং ক্ষমতা
গ্রহণের বিষয়
নেই। অতএব
আমাদের অফিসারদের
ধীরে ধীরে
ঠেকে ঠেকে
শিখতে হয়েছে।
শুধু ব্যাংক
ব্যবস্থা নয়,
সাজাতে হয়েছে
বীমা খাত,
পাট ব্যবসা
খাত, শিল্প
খাত ইত্যাদিকে।
সব
পাকিস্তানি বীমা
কোম্পানিগুলোকে চারটি
বীমা কোম্পানিতে
রূপান্তরিত করা
হয়। এখানে
নামকরণে বঙ্গবন্ধু।
কী সুন্দর
সুন্দর নাম।
সাধারণ বীমা
ব্যবসার জন্য
দুটো: কর্ণফুলী
বীমা করপোরেশন,
তিস্তা বীমা
করপোরেশন। জীবন
বীমার জন্য
দুটো কোম্পানি
যথা: সুরমা
জীবন বীমা
করপোরেশন ও
রূপসা জীবন
বীমা করপোরেশন
(এসব নামে
এখন আর
কোনো সরকারি
বীমা কোম্পানি
নেই)।
ব্যাংকের মতো
বীমা কোম্পানিগুলোকেও
জাতীয়করণ করা
হয়। ব্যাংক-বীমা-ব্যবসা-শিল্পকে
পুনর্গঠন করার
তাগিদে পাট
শিল্পের দু-তিনটি
করপোরেশন করা
হয় যথা:
বাংলাদেশ জুট
মিলস করপোরেশন,
বাংলাদেশ জুট
ট্রেডিং করপোরেশন
এবং বাংলাদেশ
জুট এক্সপোর্ট
করপোরেশন। এছাড়া
প্রতিষ্ঠা করা
হয় শিল্পভিত্তিক
করপোরেশন। প্রথম
দিকে সর্বমোট
১০টি শিল্প
করপোরেশন ছিল।
চিনি, ইস্পাত,
বস্ত্র, পাট
ইত্যাদি খাতের
জন্য আলাদা
আলাদা করপোরেশন
প্রতিষ্ঠা করা
হয়। টাকা-পয়সার
টানাটানির জন্য
কর্মচারী-কর্মকর্তাদের
বেতন কিছু
‘ক্যাশে’
কিছু ‘সঞ্চয়পত্রে’
দেয়া হয়।
বেতন-ভাতা
ঠিক করার
জন্য আমলা
আব্দুর রবকে
দিয়ে ‘পে
কমিশন’ করা
হয়। খুবই
শক্তিশালী একটা
পরিকল্পনা কমিশন
গঠন করা
হয়। ওই
কমিশনের প্রধান
হন ড.
নুরুল ইসলাম,
তার মর্যাদা
মন্ত্রীর মর্যাদা।
ড. মোশারফ
হোসেন, রেহমান
সোবহান ও
আমলা একেএম
আহসান ছিলেন
পরিকল্পনা কমিশনের
সদস্য। তাদের
মর্যাদা ছিল
প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা।
বিভিন্ন জায়গায়
যথাযোগ্য মর্যাদার
লোক বসানোর
কাজটি বঙ্গবন্ধু
করেছিলেন। বাংলাদেশ
ব্যাংকের গভর্নর
হিসেবে তিনি
দুজন ব্যাংকারকেই
নির্বাচিত করেন।
পরবর্তীকালে তা
আমলানির্ভর হয়।
ব্যবসায় অভিজ্ঞতার
জন্য তিনি
ইউনিয়নে ইউনিয়নে
আমদানি লাইসেন্সের
ব্যবস্থা করেছিলেন।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের
অভাবের প্রেক্ষাপটে
বহুদিন বাংলাদেশ-ভারত
সীমান্ত খোলা
ছিল। অবাধে
পণ্য আনা-নেয়া
করা যেত।
এ দ্বারা
এক শ্রেণীর
লোকের হাতে
টাকা আসে।
করপোরেশনের মাল
বিক্রির ‘পারমিট’
জোগার করেও
অনেকে পয়সার
মুখ দেখে।
বাঙালির হাতে
টাকার আসার
শুরু এভাবেই।
বলা বাহুল্য
স্বাধীনতার পর
পুনর্বাসনের যে
কাজ শুরু
হয় তার
মধ্যে সর্বপ্রথম
কাজ ছিল
কেন্দ্রীয় ব্যাংক
প্রতিষ্ঠা, নোট
ছাপানো, ব্যাংকগুলো
চাুল করা,
আমানতের টাকা
ফেরত দেয়া,
ব্যবসায়িক ও
শিল্প ঋণের
ব্যবস্থা করা,
ব্যক্তিগত পুনর্বাসন
ঋণের সরবরাহ
করা ইত্যাদি।
আইনি কাঠামো
তৈরি করা,
সাংগঠনিক কাঠামো
তৈরি ছিল
জটিল কাজ।
তার চেয়ে
কঠিন কাজ
ছিল অভিজ্ঞ
জনশক্তি জোগাড়
করা। একটি
‘প্রদেশ’
(পূর্ব পাকিস্তান)
নয় মাসের
যুদ্ধে একটি
স্বাধীন রাষ্ট্র।
প্রদেশ চালানো
আর স্বাধীন
রাষ্ট্র চালানো
ভিন্ন জিনিস।
সেই সমস্যাতেই
পড়েছিলাম আমরা।
এ বিশাল
কর্মযজ্ঞে বঙ্গবন্ধুর
ছত্রছায়ায় থেকে
যারা রাজনৈতিক
নেতৃত্ব দিয়েছেন
তাদের কথা
আলাদা। অর্থনীতি,
ব্যবসা-বাণিজ্য,
ব্যাংক-বীমা,
শিল্প ইত্যাদি
পুনর্বাসন, পুনর্গঠন
ও নতুনভাবে
নির্মাণে যারা
১৯৭২ থেকে
১৯৭৫ পর্যন্ত
অবদান রেখেছেন,
তাদের কয়েক
জনের নাম
আমি ইতোপূর্বেই উল্লেখ
করেছি। এর
মধ্যে রয়েছেন
বিশিষ্ট ব্যাংকার,
কেন্দ্রীয় ব্যাংকার,
আমলা, অর্থনীতিবিদ
প্রমুখ। বীমা
ক্ষেত্রে তখন
যে দুজন
বিশেষ অবদান
রেখেছেন, তারা
হলেন মঈদুল
ইসলাম ও
এমএ সামাদ।
পরিশেষে বলতে
হয় রাজনৈতিক
দিকনির্দেশনা বঙ্গবন্ধুর।
এর মধ্যে
থেকে যিনি
একনিষ্ঠভাবে অবদান
রেখেছেন, তিনি
হচ্ছেন তত্কালীন
অর্থ ও
পাটমন্ত্রী তাজউদ্দীন
আহমদ। এ
কথাও উল্লেখ
করতে হয়
যে অগণিত
মধ্যবর্তী পর্যায়ের
লোকজন-অফিসার
বাংলাদেশের প্রথম
দিকে পুনর্গঠনে
অবদান রেখেছেন।
তাদের সবার
নাম আমার
জানা নেই।
তবে বলতেই
হয় সবাই
তখন মুখ
বুজে কাজ
করেছেন। চাওয়া-পাওয়ার
চেয়ে গড়ার
সংকটটাই ছিল
প্রধান। বঙ্গবন্ধুর
সোনার বাংলাই
সবার লক্ষ্য
ছিল।
ড. আরএম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক