নব্বইয়ের দশকে ব্যক্তি খাতের বিকাশ ও রাষ্ট্রের সক্রিয়তা

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। পাশাপাশি শিল্প ও শ্রমের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সাধিত হয়। কারণ এ সময় আন্তর্জাতিক পুঁজির সঙ্গে বাংলাদেশের পুঁজির এক ধরনের সংশ্লিষ্টতা দেখা দেয়। অনেকেই বিষয়টিকে বিশ্বায়নের শুরুর সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। এ সময়ে বাংলাদেশে পুঁজির গঠন, পুঁজির বিকাশ, শ্রমের বিকাশ ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটেছে।

নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের কৃষিতে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে। পাশাপাশি শিল্প ও শ্রমের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সাধিত হয়। কারণ এ সময় আন্তর্জাতিক পুঁজির সঙ্গে বাংলাদেশের পুঁজির এক ধরনের সংশ্লিষ্টতা দেখা দেয়। অনেকেই বিষয়টিকে বিশ্বায়নের শুরুর সঙ্গে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি হিসেবে উল্লেখ করে থাকেন। এ সময়ে বাংলাদেশে পুঁজির গঠন, পুঁজির বিকাশ, শ্রমের বিকাশ ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটেছে।

কৃষি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষণীয়। বীজ, পানি ও সার ব্যবহারে পরিবর্তনের মাধ্যমে তথাকথিত সবুজ বিপ্লব সাধিত হয়। এ সবুজ বিপ্লবের মাধ্যমে উৎপাদিকা শক্তির বিকাশ ঘটে। কৃষিক্ষেত্রে শুধু দানাদার শস্যকেন্দ্রিক পরিবর্তন হয়েছে। প্রধানত ধানের ক্ষেত্রে উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার করা হয়েছে। এর সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভূগর্ভস্থ পানি এবং রাসায়নিক সার। এ সময়ে বাংলাদেশের জন্য উপযোগী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় পরবর্তী সময় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে উৎপাদন বেড়েছে। সেই সঙ্গে উৎপাদন খরচ যেমন বেড়েছে, তেমনি মাটির উর্বরাশক্তি হ্রাস পেয়েছে। তাছাড়া চাষাবাদে এককেন্দ্রিকতা হওয়ার কারণে কৃষির বহুমুখীকরণ সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন থেকে গেছে এবং পরবর্তী সময় প্রশ্নটি আরো বড় আকার ধারণ করেছে যে পরিবর্তনটি আসলে কতটা টেকসই?

দ্বিতীয় পরিবর্তনটি আজ পর্যন্ত বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। জমি ফ্রাগমেন্টেশন বা খণ্ড খণ্ড হয়েছে। এক জমি ভাগ হয়ে টুকরো টুকরো হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভূমি বণ্টন হওয়ায় ভূমিগুলো ক্রমে খণ্ডিত হয়েছে। এমন খণ্ড খণ্ড ভাগে কৃষিজমি বিভক্ত হয়ে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকের উৎপাদনশীলতা বেশি। কিন্তু উৎপাদনশীলতা বেশি থাকলেও তারা এমন পর্যায়ের উদ্বৃত্ত তৈরি করতে পারছে না, যার মাধ্যমে নতুন জমি কিনতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের খামার বড় হচ্ছে না। এ অবস্থায় জমিগুলো ক্ষুদ্র কৃষকের হাতে নয়, বরং কৃষির সঙ্গে সংযুক্ত নয় এমন লোকদের কাছে চলে যাচ্ছে। প্রকৃত কৃষক যদি কৃষিজমির মালিক হতেন, তাহলে কৃষিকাজে উৎপাদনশীলতার বড় রকমের পরিবর্তন ঘটত।

এ সময় বাংলাদেশে নতুন শিল্প হিসেবে পোশাক শিল্পের আবির্ভাব ঘটে, যা বড় ধরনের আলোচনার দাবিদার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিল্পটি নতুন হলেও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ দেশে শিল্প বিপ্লবের সূচনায় ছিল পোশাক শিল্প।

বাংলাদেশে পোশাক শিল্পের আবির্ভাবের পেছনে কতগুলো বিষয় কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি যেমন কাজ করেছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও বড় ভূমিকা রেখেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তত্কালে মাল্টিফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট ব্যবস্থা ছিল। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে কোটা চালু ছিল। প্রত্যেকটি দেশের জন্য নির্দিষ্টকরণ করা ছিল যে কোন কোন দেশ থেকে তারা কতটুকু আমদানি করবে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও শ্রম ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষণীয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বেশ পরে জাপান থেকে শ্রমঘন শিল্প দক্ষিণ কোরিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। দক্ষিণ কোরিয়া যখন তাদের কোটার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন শিল্পটা বাংলাদেশে আসে। এ পরিবর্তনে রাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। পরে ওষুধ শিল্পে বড় ধরনের বিকাশ ঘটে। রাষ্ট্র এখানেও তার সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে।

প্রকৃত খাতের উদ্বৃত্ত থেকে যেমন নতুন শিল্প কিংবা নতুন কর্মসংস্থানের বিকাশ ঘটে, তেমনি আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে আরো একটি বিকাশ প্রক্রিয়া ঘটমান থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটনাটা তেমন সুখবর হয় না। তখন বাংলাদেশে পুঁজির জোগানের জন্য শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হয়। কিন্তু লক্ষ করা যায়, ওই ব্যাংক ও শিল্প সংস্থাগুলো বড় রকমের ঋণ ঘাটতিতে পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ এখানকার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলো (ডিএফআই) নতুন শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখেনি। বরং ঋণ ফেরত না দেয়ার ফলে ব্যাংকঋণের পরিমাণ বৃদ্ধির মাধ্যমে শিল্পগুলো রুগ্ণ বলে ঘোষিত হয়।

একটি সহজ কায়দার প্রযুক্তি এসে কৃষিতে এক ধরনের বিকাশ ঘটাল, অন্যদিকে শ্রমিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে শ্রমঘন শিল্প তৈরি হলো। কৃষি, পোশাক শিল্পের সঙ্গে তখন ওষুধ শিল্পের বিকাশও হতে থাকল। ওষুধ শিল্প বহুজাতিক কোম্পানির ব্যবস্থাপনাগত কায়দার মাধ্যমে দেশীয় পুঁজিপতিদের কাছে স্থানান্তরিত হয় এবং কোম্পানির ম্যানেজাররা ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তায় পরিণত হয়।

কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমিক নিজের টিকে থাকার সংগ্রামে শহরমুখী হতে বাধ্য হলো। আন্তর্জাতিক শ্রমবিভাজন তথা কম খরচের শ্রমের দিকে শ্রমঘন শিল্পের প্রতিস্থাপন রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় পোশাক শিল্পে ব্যাপক আকারে নারীর কর্মসংস্থান তৈরি করল। অন্যদিকে তেল রফতানিকারক দেশগুলো বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শ্রমিক নিয়োজনে কৃষিখাতের উদ্বৃত্ত শ্রমিক বিদেশমুখী হলো। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের যাত্রা হলো। অভিবাসী আয়ের মাধ্যমে ভোগ ব্যয় বাড়ল। গ্রামীণ দারিদ্র্য কমতে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদনও বাড়তে থাকল।

এদিকে শ্রমদক্ষতার ঘাটতি কিন্তু রয়েই গেল। অভ্যন্তরীণ সম্পদ ছিল সীমিত। সীমিত অভ্যন্তরীণ সম্পদের গুণগত ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ করা হলো না। ফলে উচ্চ উৎপাদনশীলতাসম্পন্ন শ্রমশক্তিও তৈরি করা সম্ভব হলো না। উৎপাদিকা শক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশোপযোগী প্রযুক্তির বিকাশের সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির চেষ্টা অনুপস্থিত থেকে গেল।

দুই. ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ নির্মাণে এ সময়ের অভিজ্ঞতা কতগুলো প্রশ্নের যেমন উদ্রেক করে, তেমনি সমাধানও প্রদান করে। কী কারণে কৃষিতে, শিল্পে এ পরিবর্তন ঘটল? এ পরিবর্তন কি নীতি-কাঠামোর পরিবর্তন তথা বেসরকারীকরণ, উদারীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণের কারণে ঘটল, না অন্য কারণে? যদি কেউ যুক্তি দেয় বাংলাদেশে এ বিকাশমানতার ক্ষেত্রে সস্তা শ্রম একটি বড় রকমের পরিচালক হিসেবে কাজ করেছে, তাহলে প্রশ্ন আসে অন্যান্য শিল্পের বিকাশ হলো না কেন? কিংবা এ সময় থেকে কেন অভিবাসন শুরু হলো? এক্ষেত্রে কার ভূমিকা কেমন? আবার কেনইবা ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলো (ডিএফআই) যে ঋণ দিল তা দিয়ে বড় শিল্প গড়ে উঠল না, বরং রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা খুবই জরুরি।

অভিজ্ঞতার আলোকে নীতি প্রণয়ন করা সৃজনশীলতার প্রকাশ। পোশাক শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে কতগুলো প্রবণতা খুবই পরিষ্কার। প্রথমত যেকোনো শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে তিনটি শর্ত প্রয়োজন হয়—পুঁজির জোগান, প্রশিক্ষিত জনবল বা তার সঙ্গে প্রযুক্তির সংমিশ্রণ এবং বাজারের অভিগম্যতা বা উৎপাদিত পণ্যের বাজার থাকা। পোশাক শিল্পের বিকাশের ক্ষেত্রে তথাকথিত সংস্কারের একটিও কাজে লাগেনি, বরং উল্টো চিত্র লক্ষণীয়। বাজারের ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায় তত্কালীন মাল্টিফাইবার অ্যারেঞ্জমেন্ট থাকার কারণে উৎপাদিত পণ্যের মান যদি প্রতিযোগিতামূলক হয় এবং পণ্যটি যদি বাজারে টিকে থাকতে পারে, তাহলে পণ্যটির বাজার নিশ্চিত থাকে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স বা জিএসপি বা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য ব্যবস্থা। জিএসপির আওতায় উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ইউরোপে রফতানি পণ্যের শুল্ক ও কোটায় ছাড় দেয়া হয়।

দ্বিতীয়ত পোশাক শিল্পে রাষ্ট্রের বড় ধরনের ভূমিকা লক্ষণীয়। বর্তমানে বাংলাদেশে যে পোশাক শিল্পের ভিত তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে অধিকাংশ পোশাক শিল্পের ভিত যারা রচনা করেছেন, তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্র গ্যারান্টি দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়াকে। দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তারা সে প্রশিক্ষণটা নিয়ে এসেছেন। কীভাবে শ্রমকে ব্যবহার করে প্রযুক্তির মধ্যে এনে মানযুক্ত প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্পন্ন পণ্য ও উদ্বৃত্ত তৈরি করা যায়।

লক্ষ করা যায় বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পের তুলনায় পোশাক শিল্পের শ্রম ব্যবস্থাপনাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। পরবর্তী সময় দেখা গেছে, এ খাতে শ্রমিকদের শ্রম অধিকারও খুবই নগণ্য। কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থাপনার অধীনে তারা কাজ করতে বাধ্য হয়। শ্রমিকদের মজুরি কম হলেও মনিটরিংয়ের জন্য পোশাক কারখানাগুলোয় বড় অংকের অর্থ ব্যয় করা হয়। পোশাক কারখানায় প্রচলিত শ্রম ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে শ্রমিকের থেকে উদ্বৃত্ত তৈরি করতে হয়, তা কিন্তু বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্প-কারখানায় লক্ষণীয় নয়।

তৃতীয়ত অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশে দেখা যায়, পুঁজি উদ্যোক্তার কাছে গেলে আর ফেরত আসে না। বাংলাদেশে এ সময় পুঁজি ফেরত আনার ক্ষেত্রে একটি নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে। সৃজনশীলতার পরিচয় দেয়া হয়েছে। পুঁজির প্রবাহ যাতে চলমান ও বর্তমান থাকে, সেজন্য ব্যাক টু ব্যাক লেটার অব ক্রেডিট পদ্ধতি চালু করা হয়। অর্থাৎ কারখানায় ক্রেতার কাছ থেকে কাজের আদেশ আসছে, তার বিপরীতে ব্যাংক কাঁচামাল কেনার অর্থ দিচ্ছে, কাঁচামাল আসছে, পুরো কারখানাটিকে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ হিসেবে ঘোষণা করা হচ্ছে, উৎপাদন হচ্ছে, উৎপাদিত পণ্য আবার রফতানি করা হচ্ছে, রফতানির পর ব্যাংক তার প্রদেয় অর্থ আদায় করে নিচ্ছে, অবশিষ্টাংশ মালিকের কাছে যাচ্ছে। পুঁজি গতিময়তা পাচ্ছে। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ থাকা হয়নি, রাষ্ট্র বিভিন্ন রকমের প্রণোদনা তৈরি করেছে। নীতিকাঠামোগত প্রণোদনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে আর্থিক প্রণোদনা। রাষ্ট্র এখানে পৃষ্ঠপোষকতা বা রেন্ট বণ্টন করেছে। রাষ্ট্রের এ পৃষ্ঠপোষকতা উৎপাদন খাতে ব্যয়িত হয়েছে। যেহেতু তা বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার আলোকে সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে করা হয়েছে, তাই খেলাপিঋণ বাড়েনি। অনুৎপাদনশীল খাতে পুঁজির প্রবাহ স্থানান্তরিত হয়নি।

ওষুধ শিল্প খাতের ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্র ওষুধনীতির মাধ্যমে দেশীয় শিল্পের বিকাশের জন্য ভূমিকা রেখেছে। প্রথম জাতীয় ওষুধনীতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কর্তৃক বিপুলভাবে প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়। এ ওষুধনীতির ফলে বাংলাদেশের ওষুধের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং মান উন্নত হয়, ওষুধের দামের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। আমদানি নির্ভরতা কমে দেশ ওষুধের ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হতে শুরু করে। ওষুধ খাতে বিদেশী আধিপত্য কমে আসে। দেশীয় ওষুধ কোম্পানিগুলো আধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বৃহদাকার কারখানা স্থাপন করতে থাকে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পখাতের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় এবং এক সময়কার ওষুধ আমদানিকারী দেশটি ওষুধ রফতানিকারী দেশে পরিণত হয়। ১৯৮২ সালে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ বাজারজাত বন্ধ করে দেয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ বৃদ্ধি করা হয়। প্রতিযোগিতামূলক বাজারের মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় ওষুধের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার নাগালে রাখা সম্ভব হয়।

শিল্পের বেসরকারীকরণ কোনো আশাপ্রদ ফল দেয়নি। অনেক কম দামে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহারের মাধ্যমে ওগুলো হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। অধিকাংশ শিল্প চালু করা হয়নি বা রুগ্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। এরই আবর্তে বাংলাদেশের প্রধান শিল্প পাটখাত তলিয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচির আওতায় পাট শিল্প হারিয়ে যায়। অন্যদিকে আশির দশকে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে জোরজবরদস্তির মাধ্যমে বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়ায় সম্পদের মালিকানার মাধ্যমে গোষ্ঠীতন্ত্র প্রক্রিয়া বেগবান হয়।

বিনিয়ন্ত্রিতকরণ প্রক্রিয়াও ভোক্তা বা উদ্যোক্তাকে লাভবান না করে গোষ্ঠীতন্ত্র প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করেছে। ব্যাংকে ঋণখেলাপির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলো। যুক্তি দেয়া হলো রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলো বিনিয়ন্ত্রিত করলে এবং ব্যক্তিখাতে ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি দিলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সুদের হার কমবে। বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অধীনে ব্যাপক পরিসরে আর্থিক খাতের সংস্কার কর্মসূচি চালু হলো। বেসরকারীকরণ হলো এবং নতুন নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়া হলো। কিন্তু ক্ষমতা কীভাবে কাজ করে এবং ক্ষমতার মাধ্যমে পুঁজির আদিম সঞ্চায়ন কীভাবে ঘটে—এ ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের তাত্ত্বিক ভিত্তির দুর্বলতা ছিল। কেতাবি কায়দায় তারা মনে করেছিল যদি সরকারি ব্যাংক কমিয়ে ফেলা যায় এবং ব্যক্তিখাতে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে সুদের হার কমবে। কিন্তু সুদের হার কমেনি বরং বেড়ে যায়। এর মানে রাষ্ট্র শৃঙ্খলা আনতে পারেনি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লুটপাট আশির দশকের শেষ দিকে আরো বেড়ে যায়। শ্রমশক্তির সৃজনশীল ব্যবহারের মাধ্যমে পুঁজি গঠন—এটাই যে মূলত পুঁজি গঠনের মূলশক্তি, বিষয়টি শুরু হলেও বাধাপ্রাপ্ত হয়।

বাংলাদেশ বিনির্মাণে মানুষের ইচ্ছা ও অভিযোজন শক্তি বিশাল। কৃষিতে, পোশাক শিল্পে ও অভিবাসী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে বিষয়টি লক্ষণীয়। বিশেষ করে পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকদের আগমন। নারীরা অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাত ও শ্রমশক্তির রিপ্রডাকশন বা প্রজনন—দুই ক্ষেত্রেই বড় অবদান রাখছেন। গ্রাম থেকে নারীরা শহরে এসেছেন, পোশাক শিল্পের উত্তরণে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছেন। তবে নারী শ্রমশক্তির উচ্চতর দক্ষতা বৃদ্ধির বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে। নারীদের অধিকারহীনতা যেমন জাজ্বল্যমান, তেমনি তাদের প্রতি পুরুষতান্ত্রিক সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

তিন. শিল্পখাতের টেকসই রূপান্তরের জন্য কতগুলো বিষয়ের ওপর নজর দেয়া প্রয়োজন। পোশাক শিল্পে রফতানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একটি শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা ক্রমে বেড়ে চলছে। পরিকল্পনার ক্ষেত্রে লক্ষ করা হয়নি, কেন পোশাক শিল্পের বিকাশ ঘটল কিংবা ওষুধ শিল্পের বিকাশ ঘটল কিন্তু অন্য শিল্পের বিকাশ ঘটল না। অতীতের থেকে শিক্ষাগ্রহণ না করার ফলে বাংলাদেশের সমূহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠছে না। শিল্পখাত, রফতানি পণ্য ও রফতানি বাজারের বৈচিত্র্যকরণ সম্ভব হচ্ছে না। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা হয়নি। নীতির ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা দেখানো হয়নি। অন্যদিকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা হয়নি। পরবর্তী সময় লক্ষ করা গেছে পোশাক শিল্পের ম্যানেজার পর্যায়ে দক্ষ জনশক্তিকে অন্য দেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। অর্থাৎ সৃজনশীল ও দেশোপযোগী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্র কীভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করবে এবং পুঁজি গঠনে সহায়তা করবে, যাতে পুঁজি আবার খেলাপি ঋণে পরিণত না হয়, শৃঙ্খলা বজায় থাকে—এটা যেমন করা হয়নি; তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক রেখে দেশের উপযোগী করে প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেনি। দ্বিতীয়ত শ্রমের দক্ষতা বিকাশে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির দিকে জোর দেয়া হয়নি। শ্রমের ওপর রাষ্ট্র কখনই জোর দেয়নি। ফলে দিন দিন বৈষম্য বেড়েই চলছে। মূলধন থেকে যে প্রাপ্তি বা রিটার্ন পুঁজিপতিরা পেয়েছেন, শ্রমিকরা মজুরি হিসেবে অনেক কম পেয়েছেন। শ্রম অধিকারও সীমিত। ফলে বাংলাদেশের রূপকার শ্রমিকরা বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

শুধু পশ্চিমা দেশ নয়, রফতানির ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের বাজারে নির্দিষ্ট অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা বা জিএসপি আদায়ে জোর দিতে হবে। একইভাবে দেশী ও বিদেশী বাজারের জন্য নতুন উৎপাদন কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। মূলত পশ্চিমে ও মধ্যপ্রাচ্যে রফতানি এবং পার্শ্ববর্তী দেশদ্বয়ে আমদানি নয়, নতুন আঞ্চলিকতা এবং নতুন আন্তর্জাতিকতার সম্পর্কের জালে নিজেদের যুক্ত হতে হবে। বিমান, রেল, সড়ক, নৌ—সব ধরনের নেটওয়ার্কে জড়াতে হবে। ভারসাম্য ও বৈচিত্র্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সম্পর্ক স্থাপনে নজর দিতে হবে। সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবশ্যই ভোক্তার চাহিদাভিত্তিক বাণিজ্যের ওপর জোর দিতে হবে। যেসব দেশে ভোক্তাদের চাহিদা বেশি সেসব দেশের উৎপাদন, প্রযুক্তি ও আর্থিক নেটওয়ার্কে নিজেদের সংযুক্ত হতে হবে।

শ্রমঘন শিল্পের ওপর জোর দিতে হবে। প্রতিনিয়ত শ্রমবাজারে যোগ দেয়া বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাই মুখ্য। যেমন হালকা প্রকৌশল শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো যেতে পারে। স্বল্প সুদে ঋণ, প্রযুক্তিগত উত্কর্ষ সাধনে প্রশিক্ষণ, শিল্পপার্ক স্থাপনে কার্যকর উদ্যোগ নিলে সম্প্রসারণ হবে এবং ক্রমান্বয়ে ভারী প্রকৌশল শিল্পের দিকে যাওয়ার পথ সুগম হবে। শ্রমিকের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। সমাজে সব পেশাকে সম্মানের চোখে দেখার মূল্যবোধ তৈরি করা যায়নি বিধায় কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহ কম। সব কর্মই সম্মানের—এ মূল্যবোধের জাগৃতি জরুরি।

শুধু পুনরুদ্ধার নয়; অর্থনীতির টেকসই কাঠামোগত রূপান্তর নিশ্চিতি দরকার। প্রতিটি গ্রাম ও শহরকে স্বাবলম্বী করতে হলে গোষ্ঠী স্বার্থ চিন্তা না করে সংখ্যাগরিষ্ঠদের স্বার্থে নীতি-কৌশল গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে টেকসই ও সবুজ বিকাশের জন্য উৎপাদন ব্যবস্থা অবশ্যই সবুজ এবং পরিবেশবান্ধব হতে হবে। নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ও গুণকপ্রভাবক সৃষ্টিকারী বিনিয়োগ হলে নতুন কর্মসংস্থান হবে। এভাবে বৈষম্যহীন ও টেকসই উত্তরণ সম্ভব।

 

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক এবং ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’-এর প্রতিষ্ঠাতা-চেয়ারপারসন

আরও