ভাষা আন্দোলনে ‘সৈনিক’

সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর। পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে এবং এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থার মুখপত্ররূপেই সাপ্তাহিক সৈনিক প্রকাশিত হয়।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালের ১৪ নভেম্বর। পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে এবং এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থার মুখপত্ররূপেই সাপ্তাহিক সৈনিক প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক আবুল কাসেম ও অন্যান্য কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর উদ্যোগে ১৯৪৭ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর ঢাকায় ‘পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস’ নামে এ সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটি গঠিত হয় (দ্রষ্টব্য: ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস/অধ্যক্ষ আবুল কাসেম)। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া লিখেছেন, ‘...মূল ও প্রধান উদ্যোক্তা অধ্যাপক আবুল কাসেম সাহেব “তমদ্দুন মজলিস” নামে একটি সংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করেন।’ (দ্রষ্টব্য: ভাষা আন্দোলনের গোড়ার কথা)

তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সৈনিকের সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন শাহেদ আলী ও এনামুল হক। পরে সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন শাহেদ আলী। দ্বিতীয় বার্ষিকী সংখ্যার প্রিন্টার্স লাইনে মুদ্রিত রয়েছে : ‘মো. আবদুল গফুর কর্তৃক আমাদের প্রেস, ১৯ নং আজিমপুর হইতে মুদ্রিত এবং ৭ নং ফুলার রোড, ঢাকা হইতে প্রকাশিত।’ ‘সৈনিক’ প্রকাশের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং পত্রিকার নীতি ও আদর্শ সম্পর্কে প্রথম সম্পাদকীয় নিবন্ধে সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়:

সাধারণ মানুষের সামনে পাকিস্তান সম্বন্ধে একদিন এক রঙিন স্বপ্ন তুলিয়া ধরা হইয়াছিল—কিন্তু কোনো মজবুত আদর্শের বুনিয়াদ তাদের মনে খাড়া করা হয় নাই—কারণ, নেতাদের মনেই আদর্শ সম্বন্ধে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না, এবং আজো নাই...ক্ষমতা হাতে পাইয়া নেতারা নিজ নিজ স্বার্থ আদায় করিতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছেন আর দরিদ্র জনসাধারণ ছাত্র শিক্ষক, কিষাণ, শ্রমিক, যাদের ঐতিহাসিক কোরবানীর ফলে পাকিস্তান হাসিল হইয়াছে, নিজেদের ভবিষ্যত ভাবিয়া আজ তারা শঙ্কিত ও সন্ত্রস্ত। তাদের ভাত-কাপড়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের দাবী এতোটুকু মিটে নাই।...ক্ষমতার গদীতে বসিয়া যারা শুধু ক্ষমতার অপব্যবহারই করিতেছেন এবং জনগণের প্রত্যেকটি দাবী-দাওয়াকে পায়ের তলায় মাড়াইয়া তাদের মনোবল ভাঙিয়া দিতেছেন, তাদের ভুল শোধরাইবার দায়িত্ব নিয়াছে ‘সৈনিক’।....পাকিস্তানকে জনকয়েকের ভোগের শরাবখানা করিয়া তুলিবার জন্য যে আয়োজন চলিতেছে সৈনিক তাহা বরদাশত করিবে না, বরং জনগণের হুকুমত কায়েম করিবার জন্য অবিরাম লড়াই করিয়া যাইবে। ....চারিদিকে আজ অসহায় জনগণের অসন্তোষের আভাস পাওয়া যাইতেছে, আমাদের অভাব-অভিযোগ, দুঃখ-দুর্দশার কোনো সীমা নাই, শেষ নাই....জীবনের কানায় কানায় আমাদের জমা হইয়াছে অনেক চোখের পানি।

সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র হলেও সাপ্তাহিক সৈনিক এ অবস্থার অবসানের লক্ষ্যে লড়াই করার অঙ্গীকার নিয়েই আত্মপ্রকাশ করে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে মুসলিম বাংলার প্রাচীনতম পত্রিকা দৈনিক আজাদ এবং দৈনিক ইত্তেহাদ তখনো কলকাতা থেকেই প্রকাশিত হচ্ছে এবং পাকিস্তানের বিশেষ করে পূর্ব বাংলার জনগণের অভাব-অভিযোগ, সমস্যা-সংকট ও সুখ-দুঃখের কথা তুলে ধরার মতো কোনো নির্ভীক ও বলিষ্ঠ পত্রপত্রিকা তখনো ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়নি বললেই চলে। বাস্তব কারণেই সাপ্তাহিক সৈনিককে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে জনগণের পক্ষে এবং ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারের অগণতান্ত্রিক, অনৈসলামিক ও জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্রতী হতে হয়েছে। প্রথম সম্পাদকীয় নিবন্ধেই সৈনিক ঘোষণা করে:

তার কাজ হইবে: সাধারণ মানুষের মনোবল অটুট রাখা, মজবুত আদর্শের বুনিয়াদ খাড়া করিয়া সেই আদর্শের পিছনে বিপ্লবী জনতাকে সমবেত করা।.... সৈনিক জনগণের হইয়া লড়াই করিয়া যাইবে এবং বাধা বা আঘাত যে কোনো দিক হইতেই আসুক বীরের মতো তাহার সামনা-সামনি হইবে।

ভাষা আন্দোলনে: আদি পর্বে

১৯৪৮ সালের মার্চে ঢাকায় ভাষা আন্দোলন তথা আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার সংগ্রামের সূচনা হলেও এ-সংক্রান্ত ভাবনাচিন্তা বিভাগ-পূর্বকালেই হয়। ১৯৪০ সালে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব পাসের পরবর্তী পর্যায়ে অনেক বুদ্ধিজীবী এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান প্রবন্ধও লেখেন। দেশ বিভাগ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, এ নিয়ে রেনেসাঁ আন্দোলনের নায়করা চিন্তাভাবনা করেছিলেন দেশ বিভাগের বহু আগে, ১৯৪২ সালেই। ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের মর্মানুযায়ী, পূর্ব পাকিস্তান একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে, এটা ধরে নিয়েই আমাদের বুদ্ধিজীবীরা বিভাগপূর্বকালেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে কলম ধরেছিলেন। পাকিস্তান-পূর্বকালেই মুজীবুর রহমান খাঁ তাঁর ‘পাকিস্তান’ শীর্ষক গ্রন্থে, হাবীবুল্লাহ বাহার ও তালেবুর রহমানের পাকিস্তান সম্পর্কিত বইয়ে এবং ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল হক, ফররুখ আহমদ, মাহবুব জামাল জাহেদী এবং আরো অনেকের প্রবন্ধে রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গ আলোচিত হয় (দ্রষ্টব্য: ভাষা আন্দোলনের আদি পর্ব/আবদুল হক, বাঙালী মুসলমানের মাতৃভাষাপ্রীতি/মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ)। রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে সেকালেই একটি অত্যন্ত মূল্যবান প্রবন্ধ লেখেন আবুল মনসুর আহমদ (দ্রষ্টব্য, পূর্ব পাকিস্তানের জবান, মাসিক মোহাম্মদী, কার্তিক ১৩৫০)।

কিন্তু ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের দিল্লি কনভেনশনে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব পরিবর্তনের ফলে এবং পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায়, বিভাগোত্তরকালে, ১৯৪৮ সালেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যাটি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই তমদ্দুন মজলিস এবং সাপ্তাহিক সৈনিক ভাষা আন্দোলনের স্বপক্ষে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার লড়াইয়ে শরিক হয়।

সাপ্তাহিক সৈনিকের আত্মপ্রকাশের অনেক আগে থেকেই তমদ্দুন মজলিসের ভাষাবিষয়ক চিন্তা ও সংগ্রামের শুরু। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে একটি পুস্তিকা তমদ্দুন মজলিসের পক্ষ থেকে অধ্যাপক আবুল কাসেমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে এটাই প্রথম পুস্তিকা। এতে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে প্রবন্ধ লেখেন ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ ও অধ্যাপক আবুল কাসেম। জোরালো যুক্তির অবতারণা করে প্রবন্ধকাররা এ অভিমত ব্যক্ত করেন যে উর্দুর মতো বাংলাও অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হওয়ার সম্পূর্ণ উপযুক্ত। এ পুস্তিকায় আবুল কাসেমের প্রবন্ধ ও তমদ্দুন মজলিসের প্রস্তাবে বলা হয়:

১. বাংলা পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন, আদালত ও অফিসাদির ভাষা হইবে।

২. পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের রাষ্ট্রভাষা হইবে দুইটি—বাংলা ও উর্দু।

৩. উর্দু হইবে দ্বিতীয় ভাষা। ইংরেজী হইবে পূর্ব পাকিস্তানের তৃতীয় ভাষা বা আন্তর্জাতিক ভাষা। বিদেশে চাকরি ও উচ্চতর বিজ্ঞান শিক্ষার জন্যই ইহার প্রয়োজন হইবে।

৪. শাসনকার্য ও বিজ্ঞান শিক্ষার সুবিধার জন্য আপাতত কয়েক বছরের জন্য ইংরেজী ও বাংলা উভয় ভাষাতেই পূর্ব পাকিস্তানের শাসন কাজ চলিবে [দ্রষ্টব্য: পুস্তিকার প্রথম অধ্যায়]।

‘সৈনিক’-এর ভূমিকা: ’৪৮-’৫০

উপরোক্ত পুস্তিকায় দেশবাসীর প্রতি ভাষা আন্দোলনকে গণ-আন্দোলনে পরিণত করার এবং প্রত্যেককে এ আন্দোলনে যোগ দেয়ার আহ্বান জানানো হয়। সে সময়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পত্রপত্রিকার মধ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত আবদুল ওয়াহেদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘ইনসাফ’ এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত আবুল মনসুর আহমদ সম্পাদিত দৈনিক ‘ইত্তেহাদ’ ভাষা আন্দোলনে বিশেষ সমর্থন জোগায়। সাপ্তাহিক সৈনিক পরিণত হয় ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিকে।

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের মার্চের ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনে তমদ্দুন মজলিস পালন করে সক্রিয় ও গৌরবময় ভূমিকা। ১৯৪৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদপত্রে প্রকাশের জন্য অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া (প্রথম সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক ও তখনকার তমদ্দুন মজলিস কর্মী); অধ্যাপক আবুল কাসেম, অধ্যাপক রেআত খাঁ, অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম, আজিজ আহমদ, আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী (তখনকার সাপ্তাহিক ইনসাফের সম্পাদক), এম আবুল খায়ের, নঈমুদ্দীন, অলি আহাদ এবং আরো অনেকে যে বিবৃতি দেন, তা পরবর্তীকালে সাপ্তাহিক সৈনিকে প্রকাশিত হয়। বিবৃতিটি নিম্নরূপ:

‘আমরা পূর্ব পাকিস্তানের জনসাধারণের নিকট আবেদন জানাইতেছি যে, তাঁহারা যেন বাংলা ভাষার স্বীকৃতির জন্য আগাইয়া আসেন। আমাদের মাতৃভাষাকে কোণঠাসা করিবার একটি সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র চলিতেছে—তাহার বিরুদ্ধে আমাদের এখন হইতে তৎপর হওয়া অবশ্য কর্তব্য হইয়া পড়িয়াছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় এখানের সংবাদপত্র ও শিক্ষিত সমাজ এখনো এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবহিত বলিয়া মনে হয় না। আমরা এই দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি। আমাদের মনে রাখা উচিত, প্রদেশব্যাপী এক আন্দোলন গড়িয়া তোলা ছাড়া বাংলা ভাষা যথাযোগ্য স্থান পাইবে না।

‘আরো একটি বিষয়ে আমরা পূর্ব পাকিস্তানের হিতাকাঙ্ক্ষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি। সমস্ত প্রদেশব্যাপী আন্দোলন করিতে আমাদের অনেক অর্থের দরকার। বাংলা ভাষার প্রচার করিতে ইতিপূর্বে তমদ্দুন মজলিসের অনেক আর্থিক ক্ষতি হইয়াছে। ইহা বিবেচনা করিয়া তমদ্দুন মজলিসের কেন্দ্রীয় পরিষদ একটি “বাংলা ভাষা প্রচার তহবিল” খুলিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছেন। এই ফাণ্ডে মুক্তহস্তে দান করিবার জন্য আমরা সকলের নিকট সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাইতেছি। বিভিন্ন পত্রিকায় চাঁদাপ্রাপ্তির হিসাব ও চাঁদাদাতার নাম প্রকাশ করা হইবে। অর্থাদি পাঠাইবার ঠিকানা: অধ্যাপক আবুল কাসেম, ট্রেজারার, বাংলা ভাষা প্রচার তহবিল, ১৯ নং আজিমপুর রোড, ঢাকা।’

১৯ নং আজিমপুর রোডই ছিল তমদ্দুন মজলিস ও সাপ্তাহিক সৈনিক অফিস। বাংলা ভাষা ও ভাষা আন্দোলনের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় পাকিস্তান সরকার এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একশ্রেণীর মানুষের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সাপ্তাহিক সৈনিক গোড়াতেই ছিল সচেতন এবং এ পত্রিকা সংবাদ, প্রতিবেদন, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ, প্রবন্ধ, কবিতা, কার্টুন ইত্যাদির মাধ্যমে ১৯৪৮-৪৯ সালেই বাংলা ভাষার পক্ষে এবং শাসন কর্তৃপক্ষের শোষণ-বঞ্চনানীতির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।

১৯৪৯ সালে ‘সৈনিক’ প্রকাশিত হয় ৪৮ নং কাপ্তান বাজার থেকে। ১৯৪৯ সালের ৯ ডিসেম্বর সংখ্যায় আবদুল গফুর (পরবর্তীকালে তমদ্দুন মজলিসের সাধারণ সম্পাদক ও সৈনিকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক) ‘বাংলা হরফের ওপর কোনো শয়তানী হামলা বরদাশত করা হইবে না’ শীর্ষক এক সংবাদ নিবন্ধে বলেন:

পূর্ব পাকিস্তানের তমদ্দুনের গলা টিপিয়া মারিবার জন্য এক শয়তানী চক্রান্ত শুরু হইয়াছে। বাজারে জোর গুজব, ঢাকাতে আগামী ১৪ই ডিসেম্বর কেন্দ্রীয় শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের যে সভা বসিবে তার একটি প্রস্তাবে বাংলা ভাষায় আরবী হরফ প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হইবে। গুজবটি সত্য হইলে, কর্তৃপক্ষকে আমরা হুঁশিয়ার করিয়া দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে করি। বাংলা ভাষার জন্য আরবী হরফ গ্রহণ যে কতটা অবৈজ্ঞানিক ও জাতীয় জীবনের প্রগতির পক্ষে কতটা মারাত্মক হইবে, তাহা লইয়া দেশের হিতকামী শিক্ষাবিদ ও ভাষাবিদগণ সৈনিকে ও অন্যান্য পত্রিকায় ঢের আলোচনা করিয়াছেন।

উপরোক্ত সুদীর্ঘ সংবাদ-নিবন্ধ ছাড়াও ‘সংস্কৃতি হত্যার ষড়যন্ত্র’ শিরোনামে এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে ‘সৈনিক’ হরফ বদলানোর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। তাতে বলা হয়:

এই সুচতুর ষড়যন্ত্রকে যে সার্থক হইতে দেওয়া হইবে না, পূর্ব বাংলার জাগ্রত জনতার পক্ষ হইতে সে কথা আজ তীব্রস্বরে ঘোষণা করিবার সময় আসিয়াছে। ভাষা আন্দোলনের বন্যায় পূর্ববঙ্গের জাগ্রত বিক্ষুব্ধ জনমতের কাছে সরকার নতি স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিল, এ কথাও স্মরণ করাইয়া দিবার প্রয়োজন আছে। লিপি পরিবর্তনের চোরাপথে সাড়ে চার কোটি লোকের মাতৃভাষাকে কতল করিবার এই পরিকল্পনাকে সহজে সফল হইতে দেওয়া হইবে একথা মনে করিলে বিরাট ভুলই করা হইবে।

উর্দু হরফ গ্রহণের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সৈনিকের ভূমিকা এবং তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সারা দেশের ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহলে তা আন্দোলন ও প্রতিবাদের তরঙ্গ সৃষ্টি করে। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন কলেজে, ফজলুল হক হল ও অন্যান্য হলে এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে দৃঢ় ও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলা হয়: ‘উর্দু হরফে বাংলা লিখিতে দেওয়া হইবে না।’

ব্যাপক আন্দোলন ও প্রতিবাদের মুখে পূর্ববঙ্গ সরকারের এক প্রেসনোটে বলা হয়:

‘ঢাকা, ১৩ ডিসেম্বর (১৯৪৯)—পূর্ব পাক সরকারের অদ্যকার প্রকাশিত এক প্রেসনোটে বলা হয়: বাংলা ভাষা প্রচলিত বাংলা হরফে লিখা হইবে অথবা আরবী হরফে লিখা হইবে, ইহা এই প্রদেশের জনগণের স্বাধীন মতামতের ওপরই সম্পূর্ণ নির্ভর করে।’ প্রেসনোটটিতে আরো প্রকাশ:

‘পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্টা বোর্ডের অধিবেশনে বাংলা ভাষায় আরবী হরফ চাপাইয়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হইতেছে বলিয়া বাহিরে যে খবর রটিয়াছে, তাহা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব ছাড়া আর কিছুই নয়।’

কিন্তু এরপর সাপ্তাহিক সৈনিক উর্দু হরফ প্রবর্তনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখে এবং এ-সংক্রান্ত খবর, প্রতিবেদন ও প্রতিবাদী প্ৰবন্ধ প্রকাশ করে। ১৯৪৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর সৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত শিক্ষা ও বাণিজ্য সচিব ফজলুর রহমানের কাছে চট্টগ্রামের ছাত্রদের খোলা চিঠিতে বলা হয়:

‘অর্থাভাবের দোহাই দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যখন প্রাইমারী স্কুলে তালা দেওয়া হচ্ছে, তখন ৩৫,০০০/= টাকা ব্যয় করে আরবী হরফ প্রবর্তন করে পূর্ব পাকিস্তানের তামদ্দুনিক প্রগতিকে ধ্বংস করা কি জাতিদ্রোহিতা তথা রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়?’

উল্লেখ্য, ফজলুর রহমান তখন ছিলেন কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও বাণিজ্যমন্ত্রী। সৈনিকের ৯ ডিসেম্বরের (১৯৪৯) সংখ্যায় ‘ইহা কি সত্য’ শিরোনামের এক খবরে বলা হয়:

ইহা কি সত্য যে ভাষা কমিটির রায় প্রকাশের পূর্বেই উর্দু হরফ চালু করিবার উদ্দেশ্যে ৩৫,০০০/= টাকা ব্যয়ে প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে কতকগুলো ট্রেনিং সেন্টার খুলিবার আয়োজন হইতেছে? অর্থাভাবের অজুহাত দেখাইয়া যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষালয় তালাবদ্ধ করিয়া দেওয়া হইতেছে, সেখানে এইসব অকারণ অর্থ অপব্যয় কি জঘন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা নয়?

বাংলার বদলে উর্দু হরফ প্রবর্তনের বিরুদ্ধে ১৯৫০ সালের ১৯ নভেম্বর সংখ্যা সৈনিকে প্রকাশিত হয় ‘দোপেয়াজা’র আঁকা একটি আকর্ষণীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ কার্টুন। ‘হরফ খেদা অভিযান’ ক্যাপশনে প্রকাশিত এই কার্টুনটিতে দেখা যাচ্ছে যে কয়েকজন লোক ছুরি হাতে বাংলা বর্ণমালাকে আক্রমণ করছে এবং সেগুলো বইয়ের খোলা পাতা থেকে প্রাণভয়ে পালাচ্ছে।

উল্লেখ্য, দোপেয়াজা অর্থাৎ প্রবীণ শিল্পী কাজী আবুল কাসেমের আঁকা বহু সাড়াজাগানো কার্টুনই সাপ্তাহিক সৈনিকে সেকালে প্রকাশিত হয়। সৈনিকের দ্বিতীয় বার্ষিকী সংখ্যায় (১৯ নভেম্বর ১৯৫০) ‘হুঁশিয়ারী’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে হাসান ইকবাল (পরবর্তীকালে তিনি সৈনিকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন) বলেন:

পূর্ব বাংলাকে কোণঠাসা করার এই ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। পাকিস্তান কায়েম হবার পর থেকেই করাচির প্রতিক্রিয়াশীল মহল থেকে একটা সুচিন্তিত পরিকল্পনা মারফত এই ষড়যন্ত্রের শুরু করা হয়েছে। এই সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে পূর্ববঙ্গের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে প্রয়াস পেয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের বীভৎস রূপ আমরা দেখেছি: কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বাজেটে, মূলনীতি প্রস্তাবে, বাংলা হরফকে তাড়ানোর চেষ্টায়, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা না করার বেলায়। পূর্ববঙ্গের সাংস্কৃতিক, আর্থিক এবং রাজনৈতিক ইত্যাদি সকল দিকেই এই ষড়যন্ত্রের সুতীক্ষ্ণ ছুরি চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে।

শুধু বাংলা হরফ বদল এবং উর্দু হরফ প্রবর্তনের বিরুদ্ধেই নয়, আরবীকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার বিরুদ্ধেও সাপ্তাহিক সৈনিক ১৯৪৯-৫০ সালেই আন্দোলন শুরু করে। ১৯৫০ সালের ২৮ মে সংখ্যায় ‘বাংলা ভাষা ও হরফ হত্যার নতুন ষড়যন্ত্র’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় এক সুদীর্ঘ সংবাদ প্রতিবেদন। আবদুল গফুরের লেখা এই প্রতিবেদনে বলা হয়:

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় (১৯৪৮ সালের মার্চ) বাংলাকে প্রাদেশিক অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে গ্রহণ ও কেন্দ্রের অন্যতম ভাষা হিসেবে সুপারিশের যে ওয়াদা (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দীন সাহেব কর্তৃক স্বাক্ষরিত ওয়াদাপত্রে) প্রাদেশিক সরকার করেছিলেন, সে ওয়াদাও ভঙ্গ করবার প্রবৃত্তি বর্তমান সরকারের মধ্যে প্রবল হয়ে উঠেছে। শোনা যাচ্ছে উর্দুকে পূর্ববঙ্গের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে চালানোর পথ সাফ করার উদ্দেশ্যে, চিঠি-পত্রাদি যথাসম্ভব উর্দুতে আদান-প্রদানের সিদ্ধান্তও নাকি ইতিমধ্যেই গৃহীত হয়েছে।.... কিন্তু এই সংস্কৃতি হত্যার চক্রান্তের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের সুস্পষ্ট জনমত ও অন্তর্দাহী বিক্ষোভের খবর কর্তৃপক্ষ রাখে।

সৈনিকের ভূমিকা: ১৯৫০-৫২

১৯৫০-৫১ সালের দিকে ‘সৈনিক’-এর সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন আবদুল গফুর। গোড়া থেকেই তিনি তমদ্দুন মজলিস ও সৈনিক সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তা পূর্ববর্তী আলোচনা এবং তাঁর বিভিন্ন লেখা থেকে স্পষ্ট। পরবর্তী পর্যায়েও সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ বাংলা ভাষাবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে আন্দোলনে একাত্ম ও সোচ্চার। ১৯৫২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সংখ্যা সৈনিকে প্রকাশিত ‘উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করিবার চক্রান্তকে রুখিয়া দাঁড়াইতে হইবে: নাজিমউদ্দীনের বক্তৃতায় প্রদেশব্যাপী বিক্ষোভ’ শিরোনামের খবরে বলা হয়:

গত ২৭ জানুয়ারি তারিখে ঢাকা পল্টন ময়দানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবে একমাত্র উর্দু’ এবং ‘উর্দু হরফে বাংলা লিখনের চেষ্টা সাফল্যমণ্ডিত হইতেছে’ বলিয়া যে উক্তি করেন তার বিরুদ্ধে ঢাকা এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য স্থানে বিক্ষোভ শুরু হইয়াছে।

নাজিমউদ্দীনের বিবৃতির প্রতিবাদ করে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিসের ঢাকা শহর কেন্দ্রের আহ্বায়ক মাহফুজুল হক (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মরহুম ডক্টর মাহফুজুল হক) ও বিশ্ববিদ্যালয় তমদ্দুন মজলিসের সম্পাদক শাহাবুদ্দীন খালেদ সংবাদপত্রে যে যুগ্ম বিবৃতি দেন তা-ও ওই সংখ্যা সৈনিকে প্রকাশিত হয়। নাজিমউদ্দীনের বক্তৃতার পরিপ্রেক্ষিতে যে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়, তার বিবরণ দিতে গিয়ে সাপ্তাহিক সৈনিকের উক্ত সংখ্যায় লেখা হয়:

২৯শে তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের এক প্রতিবাদ সভা হয়। ৩০ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রগণ প্রতীক ধর্মঘট পালন করেন এবং বিভিন্ন শিক্ষায়তনের ছাত্রদের সহযোগে এক বিরাট শোভাযাত্রা বাহির করিয়া বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। ৩১ তারিখে নাজিমউদ্দীনের ভাষা সম্পর্কিত ঘোষণার প্রতিবাদে আন্দোলন গড়িয়া তুলিবার উদ্দেশ্যে পূর্ব পাক মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে বার লাইব্রেরী হলে আহুত এক সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পূর্ব-পাক ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ, তমদ্দুন মজলিস, নিখিল পূর্ব-পাক ছাত্রলীগ, যুবলীগ, ইসলামী ভ্রাতৃসংঘ প্রভৃতি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ জন প্রতিনিধি সমবায়ে একটি ‘কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। জনাব কাজী গোলাম মাহবুব এই কমিটির আহ্বায়ক নির্বাচিত হন। সর্বদলীয় সভায় বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের অফিসাদির ভাষা ও কেন্দ্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের জন্য খাজা নাজিমউদ্দীন বিগত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় (১৯৪৮ সালের মার্চে) আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যে চুক্তি স্বাক্ষর করিয়াছিলেন তাহা ভঙ্গ করিবার জন্য তীব্র নিন্দা প্রকাশ করা হয় এবং অবিলম্বে তাঁহার ভাষা সম্পর্কিত উক্তি প্রত্যাহার করিয়া বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকার করিয়া লইবার দাবী জানানো হয়। উর্দু হরফে বাংলা লিখিবার চক্রান্তের বিরুদ্ধেও এক প্রস্তাবে সরকারকে সতর্ক করিয়া দেওয়া হয়। অপর দুই প্রস্তাবে শেখ মুজিবের আশু মুক্তির দাবী এবং ৪ঠা ফেব্রুয়ারীর ধর্মঘটের প্রতি সমর্থন জানান। [দ্রষ্টব্য, সৈনিক, ৩ ফেব্রুয়ারি, ’৫২]

১৯৫২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংখ্যা সৈনিকে সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে ছাত্র-আওয়াজ: ৪ ফেব্রুয়ারী ধর্মঘট পালন: ঢাকায় দশ সহস্র ছাত্র-ছাত্রীর মিলিত মিছিল।’ আলোচ্য খবরের বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে বলা হয়:

উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা এবং আরবী অক্ষরে বাংলা ভাষা প্রচলন করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শহরের সকল স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীগণ ধর্মঘট পালন করেন। বেলা ১১টা হইতে শহরের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা শোভাযাত্রা সহকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জমায়েত হয়।

এই সংখ্যায় সম্পাদকীয় নিবন্ধে সাপ্তাহিক সৈনিক বলে:

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়ে গেছে। এই সমস্ত তর্ক-বিতর্ক হতে দুটো বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, একমাত্র উর্দু রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না এবং পাকিস্তানের বৃহত্তর জনসমষ্টি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পেতে চায়। বিগত ভাষা আন্দোলনের (১৯৪৮ সালের মার্চ) মাধ্যমে যে দুর্জয় জনমত আত্মপ্রকাশ করে আমলাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে থর-থর করে কাঁপিয়ে তুলেছিলো তাতে উপরিউক্ত অভিমত অত্যন্ত স্পষ্ট করে ধরা দিয়েছিলো। সে দুর্জয় গণআন্দোলনের জোয়ারে আজকের পাক উজিরে আজম নাজিমউদ্দীন বাংলাকে কেন্দ্রের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সুপারিশ করতে জাগ্রত জনতাকে ওয়াদা দিয়েছিলেন।

‘তদানীন্তন পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী নাজিমউদ্দীন বর্তমানে পাক উজিরে আজম। ১৯৪৮ সালের সেই ওয়াদাকে তিনি আজ হয়তো ইচ্ছে করেই ভুলে গেছেন। তাই যে ঢাকার বুকে তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার ওয়াদা দিয়েছিলেন, সেই ঢাকাতেই তিনি ঘোষণা করেন: একমাত্র উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে। ওয়াদা ভঙ্গ করা লীগ নেতাদের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় দাঁড়িয়েছে। আজ নাজিমউদ্দীনও নতুন করে ওয়াদা ভঙ্গ করে পূর্ববঙ্গের জনতার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার নতুন নজীর স্থাপন করলেন।

‘কিন্তু জাগ্রত জনতা এই বিশ্বাসঘাতকতার সমুচিত জওয়াব দেবার জন্য তৎপর হয়ে উঠছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীতে নতুন করে দিকে দিকে আন্দোলনের ঢেউ উঠেছে। আমরা এই গণআন্দোলনকে মোবারকবাদ জানাই। [রাষ্ট্রভাষা, ১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ সংখ্যা দ্রষ্টব্য ]

উল্লেখ্য, ১৯৪৮ সালের মার্চে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যে আন্দোলন সূচিত হয়, ঢাকায় ধর্মঘট, মিছিল ইত্যাদি চলে তাতেও তমদ্দুন মজলিস পালন করে অন্যতম অগ্রণীর ভূমিকা। এ আন্দোলনের ফলেই সরকার ভাষা আন্দোলনের দাবি মেনে নিতে রাজি হয় এবং প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীনের সঙ্গে সংগ্রাম পরিষদের দুবার বৈঠক অনুষ্ঠানের পর সংগ্রাম পরিষদ ও সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ প্রসঙ্গে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পুস্তিকায় অধ্যাপক আবুল কাসেম লিখেছেন:

‘নাজিমউদ্দীন সাহেবের সাথে সংগ্রাম পরিষদের দুইটি বৈঠক হয়। বহু বাদ-প্রতিবাদের পর নাজিমউদ্দীন সরকার ও সংগ্রাম পরিষদের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিটি ছিল নিম্নরূপ:

১. বাংলা ভাষাকে পূর্ব বাংলার সরকারী ভাষা, শিক্ষার মাধ্যম ও আদালতের ভাষা হিসেবে গ্রহণ করা হইবে।

২. বাংলাকে কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার জন্য পূর্ব বাংলার আইন পরিষদে প্রস্তাব পেশ করিয়া গণপরিষদে পাঠানো হইবে।

৩. ভাষা আন্দোলনের সময় ধৃত সমস্ত ছাত্র ও অন্যান্য নাগরিকদের বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া হইবে।

৪. আন্দোলনে জড়িত কোনো ছাত্র বা কর্মচারীকে কোনো রকম শাস্তি দেওয়া চলিবে না।

৫. ভাষা আন্দোলনের সময় যে যে পত্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করা হইয়াছিল তাহা অবিলম্বে উঠাইয়া লওয়া হইবে।

৬. চুক্তির প্রথম ধারাকে কার্যকরী করার জন্য অবিলম্বে আইন পরিষদে ইহাকে প্রস্তাবানুসারে পাস করাইয়া লইতে হইবে এবং এ জন্য একটি ভাষা কমিটি গঠন করিতে হইবে।’

উপরোক্ত চুক্তিতে একপক্ষে স্বাক্ষর করেন খাজা নাজিমউদ্দীন এবং অন্যপক্ষে সংগ্রাম পরিষদ। অধ্যাপক আবুল কাসেম, বদরুদ্দীন উমর এবং অন্যান্যের লেখা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে এই ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়েছিল গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ফেডারেশন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের ছাত্র সংসদের সমবায়ে। পরবর্তীকালে চুক্তির শর্ত খেলাপ করে খাজা নাজিমউদ্দীন ১৯৫২ সালের গোড়ায় যে বক্তৃতা দেন, তার প্রতিবাদে দেশব্যাপী বিক্ষোভ সূচিত হয় এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতেই লিখিত হয় সৈনিকের উপরোক্ত জোরালো সম্পাদকীয় নিবন্ধ। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় দৈনিক আজাদ ছিল কলকাতায়। উল্লেখ্য, ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ বলে যে ঘোষণা দেন, সে সময়ে ‘সৈনিক’ আত্মপ্রকাশ করেনি। তবে কলকাতায় থাকলেও দৈনিক আজাদ ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়েই এ আন্দোলনে ছাত্র-জনতার বিজয়কে অভিনন্দিত করে সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলেন :

জনমতের জয় হইয়াছে। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার যে দাবীতে পূর্ব পাকিস্তানে স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভ জাগিয়া উঠিয়াছিল, পূর্ববঙ্গ গবর্ণমেন্ট তা অকুণ্ঠ চিত্তে মানিয়া লইয়াছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ প্রভূত শ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন: আন্দোলনের কর্মসূচিতে আমরা বিশেষ করিয়া তাহাদিগকে অভিনন্দন জানাইতেছি। [মোবারকবাদ, দৈনিক আজাদ, ১৭ মার্চ ১৯৪৮]

কিন্তু জনমতের এই ‘জয়’ই কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক পরবর্তীকালে বানচাল হয়ে যায়। ১৯৫২ সালে পুনরায় ব্যাপক আন্দোলন সূচিত হয় এবং পরিণামে আন্দোলন ব্যাপকতা পায়। ’৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সংঘটিত হয় ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের শোকাবহ ঘটনা।

১৯৫২ সালে ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন ও ২১ ফেব্রুয়ারির শোকাবহ ঘটনার সময় পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নূরুল আমীন। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় যেমন ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়ও তেমনি তমদ্দুন মজলিস পালন করে অবিস্মরণীয় ভূমিকা। ১৯৪৮ সালের ২৪ নভেম্বর আত্মপ্রকাশের সময় থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ ভাষা আন্দোলনের পক্ষে এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে কীভাবে লড়াই করেছে, উপরোক্ত আলোচনা থেকেই তা স্পষ্ট হবে। বায়ান্নর ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণের এবং কয়েকজনের শহীদ হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার পর ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সৈনিক-এর ‘শহীদ সংখ্যা’। লাল কালিতে ও লাল বর্ডার দিয়ে প্রকাশিত এ সংখ্যায় খবরের শিরোনামগুলো ছিল নিম্নরূপ:

১. শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে রাজধানী ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত: মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে নির্বিচারে পুলিশের গুলীবর্ষণ : বৃহস্পতিবারেই ৭ জন নিহত: ৩ শতাধিক আহত: ৬২ জন গ্রেফতার: শুক্রবারেও বহুসংখ্যক লোক হতাহত। রক্তের বিনিময়ে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার শপথ বিঘোষিত।

২. আপনার রক্ত দিন/ ৩. তমদ্দুন মজলিসের প্রতিবাদ/ ৪. ৭ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত/ ৫. রক্তাক্ত ঐতিহাসিক ২১শে ফেব্রুয়ারীর পূর্ণ বিবরণ

পত্রিকার দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় প্রকাশিত খবর ও প্রতিবেদনের শিরোনাম:

১. রক্ত-রাঙা দিন/ ২. পুলিশের নৃশংস গুলীতে যাঁরা শহীদ হয়েছেন/ ৩. যারা সংগ্রাম করেছেন/ ৪. শহরে কারফিউ

[সূত্র: মাসিক অগ্রপথিক, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৩, ৮ বৰ্ষ ২ সংখ্যা। এখানে ঈষৎ সংক্ষেপিত রূপে সংকলিত হলো।]

আরও