বঙ্গবন্ধুর জাপান সফরে সূত্রপাত বন্ধনের

তাকাশি হায়াকাওয়া (১৯১৭-৮২) জাপান বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। হায়াকাওয়ার তাত্পর্যপূর্ণ এ ভূমিকা পালনের বিষয়টিকে বিশেষ সম্মান ও গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ ও উদ্বোধন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকাশি হায়াকাওয়া একটানা ৪০ বছর জাপানের জাতীয় সংসদ ‘ডায়েট’-এ নির্বাচিত সদস্য ছিলেন এবং ‘ফাদার অব দ্য ডায়েট’ উপাধিতে ভূষিত

তাকাশি হায়াকাওয়া (১৯১৭-৮২) জাপান বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। হায়াকাওয়ার তাত্পর্যপূর্ণ এ ভূমিকা পালনের বিষয়টিকে বিশেষ সম্মান ও গুরুত্বের সঙ্গে অনুসরণ ও উদ্বোধন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকাশি হায়াকাওয়া একটানা ৪০ বছর জাপানের জাতীয় সংসদ ‘ডায়েট’-এ নির্বাচিত সদস্য ছিলেন এবং ‘ফাদার অব দ্য ডায়েট’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি তিন দফায় মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। ১৯৭২ সালের ৬ জুন জাপান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন এবং কিছুকাল পরে জাপান বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হলে হায়াকাওয়া তার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন এবং আমৃত্যু এর নেতৃত্বে ছিলেন।

১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে অবর্ণনীয় ক্ষয়ক্ষতির সংবাদে এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের জনগণ তাকাশি হায়াকাওয়ার চিন্তাচেতনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। জাপানের ডায়েটে প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে হায়াকাওয়া বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি সংগ্রামের প্রতি জাপানি জনগণ ও সরকারের সমর্থন সম্প্রসারণের নেপথ্যে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে যে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে হায়াকাওয়া তার প্রতি জাপান সরকারের উদ্বেগ প্রকাশ এবং বিশেষ করে জাপানি জনগণ এর প্রতিবাদ জানানোর প্রেক্ষাপট তৈরিতে সাংগঠনিক উদ্যোগ নেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জাপানি মিডিয়ায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যার্থে অর্থ সংগ্রহে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি জাপানিদের সমর্থন সমন্বয়ে জাপানের বুদ্ধিজীবী, শিল্প মালিক, শ্রমিক, ছাত্রসমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমেরিকা বলয়ের দেশ হওয়া সত্ত্বেও উন্নত বিশ্বের শিল্প সমৃদ্ধ দেশগুলোর মধ্যে জাপানই প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি। হায়াকাওয়া লিখেছেন, ‘যে সময় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে সে সময় থেকেই আমি আর আমাদের দলের সংসদ সদস্য ও সরকারি নেতাদের নিয়ে কীভাবে এবং কত তাড়াতাড়ি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া যায় সেজন্য জোর প্রচেষ্টা চালাই। আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রী সাতোর সরকার বাংলাদেশকে অনেক দেশের অনেক আগেই স্বীকৃতি দিয়ে বিশেষ বুদ্ধিমত্তা ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছিল। বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত ইমেজ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের অয়োময় ত্যাগ স্বীকারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন প্রধান প্রেরণা ও বিবেচনার বিষয় হিসেবে কাজ করে। প্রধানমন্ত্রী সাতো তদানীন্তন পাকিস্তান আমল থেকেই তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি গভীর আগ্রহ বোধ করতেন এবং সহমর্মী ছিলেন। আমেরিকার ছত্রচ্ছায়ায় থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাপান সরকার সরাসরি সমর্থন দানে সক্ষম না হলেও বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি জাপানি নেতারা ও জনগণের সমর্থন দানের বিষয়ে সাতো সরকারের পরোক্ষ সম্মতি ও সমর্থন ছিল বলেই দেখতে পাই ১৯৭১ সালে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে মুজিবনগর সকারের প্রতিনিধি দলের জাতিসংঘের সদর দপ্তরে প্রবেশ ও বিভিন্ন অধিবেশনে অংশগ্রহণের অনুমতি (পাস) সংগ্রহে জাতিসংঘে জাপানের স্থায়ী প্রতিনিধির দপ্তরে কর্মরত কূটনীতিক কাউন্সেলর জাপানি কূটনীতিক তাকেও ইগুচি সহায়তা করেছিলেন। মহানুভব এ কূটনীতিক পরে ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োজিত হয়েছিলেন। অবসর গ্রহণের পর টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময় টোকিও দূতাবাসে আমাদের আমন্ত্রণে এসে তিনি আমাকে সেসব দিনের কাহিনি শুনিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সাতো সকারের সময় জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আরেকজন কূটনীতিক বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের প্রতি বিশেষ সহমর্মিতা পোষণ করেছিলেন, বাংলাদেশের স্বীকৃতি দানের ক্ষেত্রে দ্যোতকের ভূমিকা পালনে করেছিলেন তাকাশি অয়ামাদা। তিনি পাকিস্তান আমলে ১৯৬১-৬৩ সালে করাচিতে জাপানি দূতাবাসে দায়িত্ব পালন সূত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সংগ্রামের আন্দোলনের বিষয়াদি বিশেষভাবে অবহিত ছিলেন, যার কারণে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জাপান সরকারের পরোক্ষ সমর্থনদানে কূটনৈতিক তত্পরতা চালানোর ক্ষেত্রে বিশেষ গঠনমূলক ভূমিকা রেখেছিলেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ফিরে এলে জাপানি মিডিয়া বিশেষ করে আশাহি শিমবুন, জাপান টাইমস প্রভৃতি প্রভাবশালী পত্রিকা সম্পাদকীয় নিবন্ধে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের আহ্বান জানাতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী সাতোর প্রচ্ছন্ন প্রেরণায় একটি বেসরকারি জাপানি প্রতিনিধি দল ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশে প্রেরিত হয়। এ প্রতিনিধি দলে নেতৃত্ব দেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোসের আজাদ হিন্দ ফৌজের জাপানি কমান্ডার ইন চিফ লে. জেনারেল (অব.) ইয়াইচি ফুজিওয়ারা, সদস্য ছিলেন কেইসুকে ইতো (যিনি জাপন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল হয়েছিলেন পরবর্তীকালে) ও কাতসুইয়া কাওয়ানো। বঙ্গবন্ধু এ প্রতিনিধি দলকে স্বাগত জানিয়েছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক সম্মান ও জাপানের প্রতি তার গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মহিমায়। এ প্রতিনিধি দল দেশে ফিরে অবিলম্বে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানের আহ্বান জানায়। জাপানের আরেক প্রধানমন্ত্রী (১৯৭৬-৭৮) তাকেও ফুকুদা তখন পরররাষ্ট্রমন্ত্রী, তাকাশি হায়াকাওয়া, তাকাশি অয়ামাদা তারা সবাই মিলে প্রধানন্ত্রী সাতোকে বাংলাদেশকে ১০ ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতিদানের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে ক্ষেত্র প্রস্তুত করে দেন। স্বীকৃতি দানের পর পরই বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার ও বাংলাদেশের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ও সর্বসহায়ক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, বিকাশ ও সুদৃঢ়করণের আশ্বাস দেন, যেটি অদ্যাবধি শুধু বহালই নেই, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাকাশি অয়ামাদাই নিযুক্ত হন বাংলাদেশে প্রথম জাপানি রাষ্ট্রদূত, যিনি পরবর্তী জাপানি প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকার নির্দেশে ও আমন্ত্রণে জাপানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সফর আয়োজনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

স্বীকৃতিদানের এক মাসের মধ্যে ঢাকায় জাপানি দূতাবাসের কার্যক্রম শুরু হয় এবং ১৩-১৪ মার্চ হায়াকাওয়ার নেতৃত্বে তিন সদস্যের জাপানি সংসদীয় প্রতিনিধি দল প্রথম বাংলাদেশ সফরে আসেন। দেশে ফিরে ২৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী সাতোর কাছে পেশ করা রিপোর্টে তিনি প্রস্তাব রাখেন (ক) বাংলাদেশকে ১০ মিলিয়ন ডলারের জরুরি অনুদান অবিলম্বে প্রদান এবং (খ) পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের হিস্যা আদায়ে জাপানের মধ্যস্থতা। তার সুপারিশ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সাতোর নির্দেশে ২৮ মার্চ ১৯৭২ জাপান বাংলাদেশে প্রথম অর্থনৈতিক সার্ভে মিশন পাঠায়।

১৯৭৩ সালের অক্টোবরে জাপানে বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শীর্ষ পর্যায়ের প্রথম সফরের সময় বাংলাদেশ জাপান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ক্ষেত্রে অবিসংবাদিত সুযোগ সৃষ্টি হয়। ২৩ অক্টোবর ১৯৭৩ সন্ধ্যায় টোকিওতে তার সম্মানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী কাকুই তানাকা ও তার স্ত্রী প্রদত্ত Banquet ভাষণে বঙ্গবন্ধু দুই দেশের সম্পর্কের পটভূমি তুলে ধরেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে জাপানের সরকার ও জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনদানের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দুই দেশের কূটনৈতিক, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহায়তা সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। প্রত্যুত্তরে কাকুই তানাকা বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা, জাপান সরকারের সমর্থন এবং জাপানি জনগণের ভালোবাসা নিবেদন করেন।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন এশিয়ার জাপান ও বাংলাদেশ (যে দুই দেশের জাতীয় পতাকায় সবিশেষ মিল লক্ষ করা যায়) এ দুই দেশের মধ্যে মৈত্রী প্রতিষ্ঠার প্রথম রূপকার। বাংলাদেশ থেকে জাপানে বঙ্গবন্ধুর শীর্ষ সফরের সময় জাপান-বাংলাদেশ আর্থিক সহযোগিতাi দিগন্ত উন্মোচিত হয়। যমুনা সার কারখানা, কর্ণফুলী সার কারখানা, যমুনা সেতুসহ কয়েকটি বড় বড় প্রকল্প জাপানি অর্থায়নে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গৃহীত হয়। পরবর্তী সময়ে হায়াকাওয়া স্মৃতিচারণ করেছেন—

‘জাপান সফরের সময় শেখ মুজিবুর রহমান স্বভাবগতভাবেই ইচ্ছা প্রকাশ করে কয়েকবার বলেন, তিনি জাপানের মডেলে তার বাংলাদেশকে গড়ে তুলবেন। তাকে স্বাগত জানিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী তানাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সম্পর্কে মন্তব্য করেন, তিনি যেন আমাদের হিরোভূমি ইতো (হিরোভূমি ইতো জাপানের গৌরবোজ্জ্বল মেইজি যুগের প্রধান জাতীয় নেতা ছিলেন)। এ প্রেক্ষিতে জাপান চেম্ব্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট শিগেও নাগানো তত্ক্ষণাৎ বলেন, না , তিনি বরং একাধারে হিরোভুমি ইতো ও তাকামোরি সাইগো (তাকামোরি সাইগো ছিলেন মেইজি জাপানের আরেক অবিসংবাদিত স্থপতি)। এসব মহাজন মন্তব্যের স্মৃতি এখনো আমার কাছে সজীব। এমনকি ওহিরার মতো স্বল্পভাষী জাপানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, যিনি বিমানবন্দরে তাকে বিদায় জানাতে গিয়েছিলেন, আমাকে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আজকের পৃথিবীর প্রধান তিনজন রাজনৈতিক নেতার একজন। এভাবে ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের মধ্যে ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত আত্মিক সম্পর্কের পাশাপাশি জাপান ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রগাঢ় ভালোবাসা ও বন্ধনের সূত্রপাত হয় শেখ মুজিবের জাপান সফরের সময়।’

১৯৭৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর হায়াকাওয়া সস্ত্রীক বাংলাদেশ সফরে এলে রাষ্ট্রাচার উপেক্ষা করে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্যদের নিয়ে পদ্মা গেস্ট হাউজে তার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও সম্মান প্রদর্শনে আসার ঘটনাটিকে জাপান-বাংলাদেশের মধ্যে সুদূরপ্রসারী সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সোপান বলে জাপানের কূটনৈতিক মহলে মনে করা হয়।

এ সফরের সময় হায়াকাওয়ার নেতৃত্বে সফরকারী জাপানি প্রতিনিধি দলের কাছে যমুনা নদীর ওপর সেতু নির্মাণে জাপানি সহায়তার আহ্বান করা হয়। এ সফরের এক পর্যায়ে প্রতিনিধি দল ভোলায় গেলে সেখানে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ (১৯৪৩) এবং তত্কালীন কৃষিমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ (১৯২২-২০০৫) হায়াকাওয়াকে মি. বাংলাদেশ নামে অভিহিত করলে তিনি অভিভূত হন। স্মৃতিকথায় তিনি উল্লেখ করেছেন এ যেন নিজের নির্বাচনী এলাকায় সংবর্ধিত হচ্ছি। পরবর্তী সময়ে জাপানের জনগণ ও সরকারের কাছে তিনি মি. বাংলাদেশ হিসেবেই আমৃত্যু পরিচিতি পেয়ে গর্ববোধ করেছেন এবং যখনই জাপানের কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কিংবা যেকোনো সহায়তার ব্যাপারে দেনদরবার বা নেগোসিয়েশনের প্রসঙ্গ উপস্থিত হয়েছে তিনিই বলতে গেলে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন। পরে ১৯৭৭ সালে ঢাকায় জাপানি বিমান হাইজ্যাক ঘটনার সফল সমাপ্তিতে হায়াকাওয়া সাহেব জাপান সরকার ও জনগণের পক্ষে কৃতজ্ঞতা জানাতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সে সুুবাদে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের (১৯৩৬-৮১) সময়ে জাপান বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন প্রাণ পায় ও উচ্চতায় উন্নীত হয়। ১৯৮২ সালে তার তিরোধানের পর আমরা জাপানের সঙ্গে যখনই কোনো দেনদরবার করতে গেছি হায়াকাওয়ার অনুপস্থিতি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার খবর পেয়ে বিচলিত বিমর্ষ হায়াকাওয়া টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসে এসে অনুরোধ জানান যে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র পিতৃমাতৃহারা শেখ রাসেলকে তিনি পেতে চান। ১৯৭৩-এ বঙ্গবন্ধুর জাপান সফরের সময় শেখ রাসেল (১৯৬৪-৭৫) ও শেখ রেহানা (১৯৫৭) জাপান সফর করেছিলেন। হায়াকাওয়া জানতেন না পিতার সঙ্গে শেখ রাসেলও নিহত হয়েছেন। ২৬ আগস্ট ১৯৭৫ টোকিওতে জাপান বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত শোকসভায় হায়াকাওয়া বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে যে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন তা তার স্মৃতিকথায় সংযোজিত হয়েছে। বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রতি জাপানের জনগণ ও সরকারের গভীর শ্রদ্ধা ফুটে উঠেছে তাতে।

‘আমার অন্তরঙ্গ ও অত্যন্ত সম্মানিত বন্ধু রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি ছিলেন জাতির পিতা এবং জনগণ যাকে আন্তরিকভাবে বঙ্গবন্ধু বলে সম্বোধন করত, ১৫ আগস্ট কতিপয় সামরিক কর্মকর্তা কর্তৃক সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানে ৫৬ বছর বয়সে সপরিবারে নিহত হয়েছেন। এ হূদয়বিদারক সংবাদটি যখন আমি পাই তখন এক অবর্ণনীয় শোকে ও বেদনায় আমি মুহ্যমান হয়ে পড়ি।

শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ছিল মূলত জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতা অর্জনের জন্য উৎসর্গীকৃত। তিনি নিজের জীবনকে পাখির পালকের মতো হালকা মনে করতেন। তিনি জীবনে আটবার গ্রেফতার হন, কারাগারে কাটান সাড়ে ১০ বছর, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার সহযোগীদের পরিবর্তে তিনি নিজেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হন, সেখানে ফাঁসিতে ঝোলার ২ ঘণ্টা আগে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান, তিনি এভাবেই জাতীয় বীর হিসেবে এক সগৌরব জীবনের অধিকারী হয়ে জাতির পিতার সম্মানে সমাসীন হন।’

মেধা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করে দেশের প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করে ঢাকায় লক্ষ জনতার সামনে তিনি এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তার সেই বক্তৃতার ভাষা আমাকে আপ্লুত করে। এখনো তা আমার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল। তিনি বলেছিলেন, ‘যে মুহূর্তে আমি বুঝব জনগনের স্নেহ ও ভালোবাসা আমার ওপর নেই সে মুহূর্তেই আমি পদত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকব। তবে আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের সব মানুষের মুখে হাসি না ফোটানো পর্যন্ত আমি আমার জীবন উৎসর্গ করে যাব।’

হায়াকাওয়া শোকগাথায় আরো স্মরণ করেন—

‘দুই বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে জাপানে আসেন। জাপানের সরকার ও জনগণ গণমানুষের এ নেতা ও মহান ব্যক্তিত্বকে অত্যন্ত সমাদরে ও শ্রদ্ধায় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। অনেক কিছু আয়োজনের মধ্যে টোকিওতে জাপান বাংলাদেশ সমিতি আয়োজিত সংবর্ধনা সভার কথা আমার স্মৃতিতে এখনো সমুজ্জ্বল। সানফ্লাওয়ার জাহাজে হাস্যোজ্জ্বল শেখ মুজিব, তার পুত্র ও কন্যার তৃপ্তির হাসি এবং আমার নিজের নির্বাচনী এলাকা ওকায়ামা প্রিফেকচারে তিনি উত্ফুল্ল জনতার যে গণসংবর্ধনা পেয়েছিলেন তার ছবি আমার চোখে এখনো ভাসছে।’

হায়াকাওয়া আরো উল্লেখ করেন—

দেশ ও জাতির প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান ও তার মন অনুধাবন করার জন্য অনেক কিছু বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজন হবে, উপর্যুপরি বন্যা, মূল্যস্ফীতি ও আরো কিছু সমস্যা, যার সঙ্গে যোগ হয় কিছু শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতার দুর্নীতি, এসব কারণে সবার মুখে হাসি ফোটানোর সেই প্রতিশ্রুতি-প্রত্যয় পূরণ না করেই স্ব্বাধীন জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠার মাত্র চার বছরের মাথায় তাকে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো, যদিও অনেক কিছুই এখনো স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের তাত্পর্য এবং এ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায় অর্থনৈতিক অবস্থানের দিক দিয়ে ব্যাপক ব্যবধান সত্ত্বেও এশিয়ার এ দুটি দেশের সরকার ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান সুসম্পর্ক সুদৃঢ়করণ ও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা সম্প্রসারণের ঐকান্তিক ইচ্ছা অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য স্বার্থ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের আধুনিক পর্যায়ে প্রাধান্য পেলেও বর্তমান সম্পর্কের ভিত্তি সুদীর্ঘ সময়ের গভীরে প্রথিত। ওইসিডি সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শিল্পোন্নত জাপানই সর্বপ্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার সময় জাপান তখনো মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির প্রভাব বলয়েরই একটি দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তির বদৌলতে জাপান ওকিনাওয়া দ্বীপের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় সে বছর। ১৯৭২ সালেই জাপানের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের বিরোধ প্রশমিত হয়ে সিনো জাপান কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীনও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে পাকিস্তানের মিত্র দেশ হিসেবে বিপরীত অবস্থানে ছিল। ঠিক এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাপানের সরকার ও জনগণের সমর্থন এবং বিজয়ের অব্যবহিতপর বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের সিদ্ধান্ত নিয়ে জাপান নিঃসন্দেহে তাত্পর্যবাহী ও সুদূরপ্রসারী কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। বাংলাদেশের সাথে জাপানের মিত্রতা ও সখ্য গড়ে তোলা এবং একে সুসংহতকরণের ক্ষেত্রে শীর্ষ পর্যায়ে বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (১৯২০-৭৫) এবং তত্কালীন তিন জাপানি প্রধানমন্ত্রী ১৯৬৪-৭২ সালে ইসাকু সাতো (১৯০১-৭৫), ১৯৭২-৭৪ সালে কাকুই তানাকা (১৯১৮-৯৩) ও ১৯৭৪-৭৬ সালে তাকেও মিকির (১৯০৭-৮৮) মধ্যকার চমত্কার সম্পর্ক ও ভূমিকা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।

জাপানিদের কাছে ‘চান্দ্র বাসো’ নামে খ্যাত নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আজও জাপানে বিশেষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। এখনো তার দেহভস্ম টোকিও শহরের রিংকিয়োজি মন্দিরে সংরক্ষিত আছে। বিচারপতি ড. রাধাবিনোদ পাল জাপানিদের কাছে বাংলাদেশ-জাপান মৈত্রী ও বন্ধুত্বের সেতু হিসেবে বিবেচিত ও স্মরণীয় হয়ে আছেন।

 

মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: সরকারের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের সাবেক কমার্শিয়াল কাউন্সেলর

আরও