বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীর সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি

ইন্দিরা গান্ধীর জন্ম ১৯ নভেম্বর, ১৯১৭; বঙ্গবন্ধুর ১৭ মার্চ, ১৯২০। ইন্দিরা বয়সে প্রায় আড়াই বছরের বড়। তাদের প্রথম দেখা ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। তাদের সম্পর্ক সূত্রটি সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন মুজিবের দেশের এক কোটি রাষ্ট্রদূত, তারা শরণার্থী হিসেবে ইন্দিরার দেশে আশ্রয় পেয়েছিলেন। বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হওয়া, এক বস্ত্রে দেশছাড়া, প্রতিটি ক্ষুধার্ত মানুষ ছিলেন তাদের দেশের একেকজন এক্সট্রা-অর্ডিনারি অ্যাম্বাসেডর।

ইন্দিরা গান্ধীর জন্ম ১৯ নভেম্বর, ১৯১৭; বঙ্গবন্ধুর ১৭ মার্চ, ১৯২০। ইন্দিরা বয়সে প্রায় আড়াই বছরের বড়। তাদের প্রথম দেখা ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। তাদের সম্পর্ক সূত্রটি সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন মুজিবের দেশের এক কোটি রাষ্ট্রদূত, তারা শরণার্থী হিসেবে ইন্দিরার দেশে আশ্রয় পেয়েছিলেন। বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হওয়া, এক বস্ত্রে দেশছাড়া, প্রতিটি ক্ষুধার্ত মানুষ ছিলেন তাদের দেশের একেকজন এক্সট্রা-অর্ডিনারি অ্যাম্বাসেডর। ইন্দিরার হাতে তাদের লেত্রে দ্য ক্রান্স বা কূটনৈতিক প্রশংসাপত্র দাখিল করতে হয়নি, তাদের চোখের ভাষাই বহন করছিল তাদের পরিচিতি। ইন্দিরা তাদের গ্রহণ করেছিলেন এমন এক সময়, যখন তার নিজের দেশের অর্থনীতিই নড়বড়ে, লাখ লাখ মানুষ নিরন্ন, বাবা জওহরলালের এক সময়ের ঘনিষ্ঠজন তাদের দুর্বিনীত ভ্রাতুষ্পুত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বদ্ধপরিকর। সে সময়কার ভারতীয় আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিলে ইন্দিরা কিংবা মুজিব কারো প্রতিই সুবিচার করা হবে না।

এক কোটি মানুষ শরণার্থী হয়ে একটি দেশেই আশ্রয় পেয়েছে, এমন নজির পৃথিবীতে আর নেই। এক কোটি মানুষ ফিরে স্বদেশে এসেছেন, এমন নজিরও কোথাও নেই।

আমার বিবেচনায় মুজিব-ইন্দিরা সম্পর্ক মূল্যায়নে একটি সূচক পর্যালোচনা করাই যথেষ্ট—মুজিব চাইলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী চলে গেল।

মুজিব-ইন্দিরার পারস্পরিক সমঝোতা ও সম্পর্কের এর চেয়ে বড় উদাহরণ মাথা খুঁড়েও কোনো গবেষক বের করতে পারবেন না।

ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে ম্যান্ডেট দিয়েছিল, বিস্ময়কর সেই ম্যান্ডেট থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন। গত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের জন্য জনগণ আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যান্ডেটের তুলনায় তা কিছুই নয়।

মুজিব-ইন্দিরা প্রথম সাক্ষাৎ

১৯৭১-এ ইন্দিরা গান্ধী যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী না থাকতেন, তাহলে প্রধানমন্ত্রী থাকতেন সম্ভবত মোরারজি দেশাই কিংবা চরণ সিং কিংবা জগজীবন রাম (যদিও জগজীবন রামের মতো হরিজনকে নেহরুর চেয়ারে মেনে নেয়ার মতো মানসিকতা ভারতে তখন বিরাজ করেনি)। রামস্বামী কামরাজ কিংবা গুলজারিলাল নন্দাও প্রধানমন্ত্রী পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে ছিলেন। পরের পাঁচজনের যে কেউ প্রধানমন্ত্রী আসনে থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মতো বিশাল ঘটনাটি নিঃসন্দেহে আরো পিছিয়ে যেত। তাদের মধ্যে যিনিই প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসুন না কেন, অন্তর্দলীয় দ্বন্দ্ব ও আঞ্চলিক ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াইয়ে তাকে একটি দুর্বল সরকারের নেতৃত্ব দিতে হতো। তাদের কেউই রক্ষণশীল চরিত্র নিয়ে দেশীয় সংকট পাশ কাটিয়ে অথবা মোকাবেলা করে, নিক্সনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সংকট নিয়ে মাথা ঘামানোর মতো অবস্থায় থাকতেন না। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে, বিশ্বজনমত পক্ষে এনে, একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু কৌশলগত যুদ্ধ জিতে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ইন্দিরা গান্ধী যেমন সর্বোচ্চ সম্ভব সহযোগিতা করেছেন, তেমনি পাকিস্তানকে দুই খণ্ড করে ভারতের পূর্ব সীমান্তকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ আক্রমণের ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করেছেন।

বাংলাদেশের শরণার্থীর বোঝা কাঁধে নিয়ে, বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে ভারতের অভ্যন্তরে স্থান দিয়ে, সর্বোপরি মুক্তিবাহিনী গঠনে সার্বিক সহায়তা দিয়ে ইন্দিরা গান্ধী অকংগ্রেসীয়দের সমালোচনার মুখে যেমন ছিলেন, নিজ দলের রক্ষণশীলরাও তাকে ছাড় দেননি। নিক্সন-কিসিঞ্জারের হুমকি ও রূঢ় আচরণের মুখেও তিনি অনড় ছিলেন।

মুজিব-ইন্দিরা প্রথম দেখার দিনটি বরং নিউইয়র্ক টাইমস প্রতিবেদন থেকে আংশিক ভাষান্তর করে উপস্থাপন করি:

নয়াদিল্লি ১০ জানুয়ারি

শেখ মুজিবুর রহমান উত্ফুল্ল ভারতীয় জনতার উদ্দেশে বললেন, তার এবং তাদের দেশ ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধুত্বের বন্ধনে চিরদিনের জন্য আবদ্ধ থাকবে।

তার অনুসারীরা পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশ ঘোষণা করেছে। নয় মাসের বেশি সময় পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে আটক থাকার পর নিজ দেশের মানুষের সঙ্গে পুনর্মিলনের উদ্দেশ্যে ঢাকা যাওয়ার পথে কয়েক ঘণ্টার জন্য নয়াদিল্লিতে যাত্রা বিরতি দিয়েছেন। তিনি তার যাত্রা বিরতি সম্পর্কে বললেন, আমাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধুকে ব্যক্তিগতভাবে আমার কৃতজ্ঞতা জানাতে এটুকু তো আমি করতেই পারি।

তিনি বললেন, আমাদের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে ভারতের জনগণ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, আমরা কখনো তা ভুলব না।

দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সঙ্গে

শেখ মুজিব ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী যাদের আগে কখনো দেখা হয়নি, সানন্দে এয়ারপোর্ট থেকে জনসভা স্থল ও প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে যাওয়ার পথে এবং এয়ারপোর্টে ফেরার পথে পরস্পরের ও পরস্পর উভয় দেশের জনগণের প্রশংসা করলেন।

মোটরক্যাডে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে যাওয়ার পথে হাড় কাঁপানো শীতে আট মাইল দীর্ঘ পথে হাজার হাজার মানুষ হাততালি দিয়েছে আর নিচু উচ্চতায় উড়ে যাওয়া একটি উড়োজাহাজ থেকে তাদের ওপর গোলাপ পাপড়ি বর্ষণ করা হয়েছে। শেখ মুজিবকে মুক্তি দেয়ার পর দুদিন আগে পাকিস্তান সরকার তাকে লন্ডন পাঠিয়ে দিয়েছে, সেখান থেকে ব্রিটিশ রয়াল এয়ারফোর্সের কমেট উড়োজাহাজ তাকে বহন করে যথাসময়ে সকাল ৮টায় নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে।

তিনি যখন জাহাজ থেকে বেরিয়ে এলেন, ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে তাকে স্বাগত জানানো হলো, তিনি ডান হাত নেড়ে জবাব দিলেন। নিকটবর্তী মাঠে গোলন্দাজ কামান থেকে তাকে ২১ বার তোপধ্বনির স্যালুট করা হলো এবং গোলন্দাজ সৈনিকরা টারমাকের আনুষ্ঠানিকতার জন্য অবস্থান নিল।

শেখ মুজিবের পরনে খোলা নেহরু কলার কালো স্যুটের ওপর কালো কোট। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি এবং অন্যান্য ভারতীয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশনের কর্মকর্তারা তাকে অভিবাদন জানাল, মিসেস গান্ধী ও অন্যরা তাকে গাঁদা ফুলের মালা পরিয়ে দেন।

জাতীয় সংগীত বেজে উঠল

একটি গুর্খা ব্যান্ড যখন ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত বাজাচ্ছে, বাঙালি নেতা একটি ছোট প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে স্যালুট করে সম্মান জানান। দুই দেশের জাতীয় সংগীতই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা।

১৫০ জন সেনা সদস্যের গার্ড অব অনার পরিদর্শন করে শেখ মুজিব ৫ মিনিটের একটি ভাষণে ভারতের জনগণের কাছে, মহাময়ী প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন, কারণ তারাই এ সফরকে সফল করে তুলেছেন—অন্ধকার থেকে আলোর দিকে সফর, বন্দিদশা থেকে মুক্তির সফর, হতাশা থেকে আশার সফর।

তিনি বললেন, ‘আমি শেষ পর্যন্ত আমার স্বপ্নের সোনার বাংলায় ফিরে যাচ্ছি, আমি লক্ষ লক্ষ বিজয়ীর হাসির সূর্যালোকে ফিরে যাচ্ছি, আমি ফিরে যাচ্ছি মুক্ত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে।’

শেখ মুজিবকে ফ্যাকাশে ও ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার ছয় ফুট লম্বা, একদা বলশালী শরীর এখন শুকনো, তার সহযোগীরা বলেছেন, কারাগারে তিনি ৪০ পাউন্ডেরও বেশি ওজন হারিয়েছেন। কিন্তু তার কণ্ঠ নিজস্ব আবেগ ও অনুভূতি হারায়নি, তবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।

এয়ারপোর্টের অনুষ্ঠানের পর শেখ মুজিব জনসমাবেশে ইংরেজিতে বলতে শুরু করে দিলেন। তিনি কেবল ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান’ বলতে না বলতেই জনতা চিত্কার করে তাকে বাংলায় বলতে অনুরোধ জানায়। হেসে তিনি তার মাতৃভাষায় বক্তৃতা শুরু করলে জনতা চিত্কার করে তাতে সন্তোষ প্রকাশ করে।

তিনি তাদের ভাই ও বোন বলে সম্বোধন করেন এবং তাদের কাছে, ইন্দিরা গান্ধীর কাছে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। কারণ তারা পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে তার দেশ থেকে বিতাড়িত করেছেন এবং তার মুক্তি ত্বরান্বিত করেছেন।

তিনি ইন্দিরার ভারতের সঙ্গে অনন্ত মৈত্রীর কথা বলেন।

ইন্দিরা ওরিয়ানা ফেলাসিকে দেয়া সাক্ষাত্কারে পাকিস্তানের কল্যাণের কথাও বলেছেন। আমেরিকা সবসময় ভেবেছে তারা পাকিস্তানকে সাহায্য করছে। যদি তা না করত পাকিস্তান শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারত। যে সামরিক শাসন গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে, তাকে সাহায্য করা মানে দেশকে সাহায্য করা নয়। সে দেশের সামরিক শাসনই পাকিস্তানকে পরাজিত করেছে। আমেরিকা সমর্থিত সামরিক শাসন। কখনো বন্ধুরা খুব বিপজ্জনক। বন্ধুদের দেয়া সাহায্যের ব্যাপারে সতর্ক হতে হয়।

কূটনীতিবিদ শশাঙ্ক ব্যানার্জি লিখেছেন, সে মুহূর্তে ইন্দিরা গান্ধীর সর্বোচ্চ উদ্বেগ বাংলাদেশী নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে কীভাবে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা যায়। তার জীবন রক্ষা করার জন্য তিনি যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত ছিলেন। এ ইচ্ছের কথা তিনি তার ‘কিচেন ক্যাবিনেটে’র অন্তত একজন সদস্যের সঙ্গে আলাপ করেছিলেন। আর সেই মানুষটি হলেন ‘র’-এর প্রধান রাম নাথ কাও। তিনি আসলে অবহিত ছিলেন যে পাকিস্তানের সামরিক আদালত বিচার করে মুজিবকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এবং সে রায় তার কাছে হস্তান্তর করেছে।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী যদি তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে বাংলাদেশকে একটি এতিম রাষ্ট্রে পরিণত করত, তা হতো মিসেস গান্ধীর জন্য ভয়াবহ এক দুঃস্বপ্ন। ভারত মনেপ্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন ও সহযোগিতা করেছে, তাই মুজিবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ভারতের জন্য অকল্পনীয় বিপর্যয়—একটি স্বপ্নভঙ্গ। কাজেই মুজিবের স্বার্থে, তার পরিবারের স্বার্থে, বাংলাদেশের স্বার্থে এবং নিজের স্বার্থে তার জীবন রক্ষা করতে ভারত সম্ভাব্য সব চেষ্টা চালিয়ে গেছে।

ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি বা ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চুক্তি নিয়ে অনেক অপপ্রচার ছিল কিন্তু কূটনৈতিক প্রটোকল সম্পর্কে যারা অবহিত, তারা জানেন এ চুক্তির ১২টি অনুচ্ছেদের একটিও বাংলাদেশের অবস্থানকে হেয় করে না। ভারতে এবং বাংলাদেশেও সমালোচনা আছে ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর ইন্দিরা প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেননি, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেন সহাস্যে নতুন সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পুপুল জয়কারের লেখা ইন্দিরাজীবনীতে এ প্রশ্নের জবাব তিনি দিয়েছেন—তিনি তো তখন নিজেই জীবন আশঙ্কায় ছিলেন। সেই আশঙ্কাই সত্যি হয়েছে কিছুটা দেরিতে, ৩১ অক্টোবর, ১৯৮৪।

 

ড. এম এ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা

আরও