লুব্ধক তারা

শেগুফতা বখত চৌধুরী ছিলেন আমার চাকরিজীবনে লুব্ধক তারার মতো। অনেক দূরের কিন্তু দেদীপ্যমান। তিনি যখন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, আমি তখন ঢাকা বিমানবন্দরে এয়ারফ্রেট ইউনিটে কর্মরত অতি কনিষ্ঠ কর্মকর্তা—সহকারী কালেক্টর। একসময় আমার কালেক্টর (নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা) পরিবর্তন হয়। আগের

শেগুফতা বখত চৌধুরী ছিলেন আমার চাকরিজীবনে লুব্ধক তারার মতো। অনেক দূরের কিন্তু দেদীপ্যমান। তিনি যখন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান, আমি তখন ঢাকা বিমানবন্দরে এয়ারফ্রেট ইউনিটে কর্মরত অতি কনিষ্ঠ কর্মকর্তা—সহকারী কালেক্টর। একসময় আমার কালেক্টর (নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা) পরিবর্তন হয়। আগের কালেক্টরের সঙ্গে আমার কাজের সম্পর্ক ছিল চমত্কার। নতুন কালেক্টর এসে আমাকে মৌখিক নানাবিধ নির্দেশ দিতে থাকেন, যা আইনগতভাবে বৈধ ছিল না। আমি সে নির্দেশগুলো লিখিত আকারে দেয়ার অনুরোধ, পালনে অপারগতা জ্ঞাপন করি এবং উপায়ান্তর না দেখে অগ্রাহ্য করি। আমার কিছু সিদ্ধান্তে তার কিছু ব্যবসায়ী বন্ধুর স্বার্থহানি ঘটে। তাই নতুন কালেক্টর আমার প্রতি নাখোশ হন। তিনি আমাকে শাসাতে থাকেন। আমি তাতে গা না লাগিয়ে আইন, বিধি ও আমার বিবেক ও বিবেচনা অনুযায়ী কাজ করতে থাকি। অতঃপর নতুন কালেক্টর আমাকে তারই অধীনে নারায়ণগঞ্জে বদলি করে দেন। আমি কিছুটা হতাশ হলেও দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিই।

কিছুদিন পর আমি তিনটি সামরিক (তখন সামরিক শাসন ছিল) ও বেসামরিক তদন্তকারী সংস্থা থেকে হাজিরা ও আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাব দেয়ার নোটিস পাই। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল আমি দুর্নীতিপরায়ণ, অদক্ষ ও অবাধ্য। আমার বিরুদ্ধে আনা মূল দুর্নীতির অভিযোগটি আমার সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগেই সংঘটিত ও নিষ্পন্ন হয়েছিল! অভিযোগকারী কর্মকর্তা কালেক্টর বাহাদুর স্বয়ং। আমি যথারীতি জবাব দিই ও শুনানিতে হাজির হই। তদন্তকারী কর্মকর্তারা আমার জবাব পড়ে ও শুনানি শেষে আমার কাছে জানতে চান, আমার বিরুদ্ধে কালেক্টরের অভিযোগের আসল কারণ কী। আমি বলি, স্যার, আপনারা তাকে জিজ্ঞেস করুন।

যা হোক, এরই মধ্যে আমি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য নির্বাচিত হই। শৃঙ্খলা কার্যক্রম চলমান থাকায় এতদিন তা প্রক্রিয়া করা হচ্ছিল না। একদিন শুনলাম আমার উচ্চশিক্ষার নথিটি চেয়ারম্যানের কক্ষে আছে। ক্লাস শুরু হতে আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি। তাই আমি তত্কালীন চেয়ারম্যান শেগুফতা বখত চৌধুরীর সাক্ষাত্কার প্রার্থনা করি। একান্ত সচিব জানান, তিনি আমার সঙ্গে দেখা করবেন না। ভগ্ন মনোরথ হয়ে বাসায় চলে যাই। মনে মনে বলি, উচ্চশিক্ষা বা বিদেশযাত্রা আমার কপালে নেই! বাসায় ফিরে আমার একান্ত সহকারী (পিএ) রিজওয়ানের ফোন পাই। স্যার, আপনার নথিটা চেয়ারম্যান সাহেবের রুম থেকে বের হয়েছে। তবে সিলগালা করা। মন্ত্রী সাইদুজ্জামান সাহেবের কাছে যাচ্ছে। আমি এবার মনে করলাম চাকরি বুঝি গেল!

আমার পিএ রিজওয়ান নথিটি অনুসরণ করতে থাকে। একসময় সে জানাল, নথিটি আবার সিলগালা হয়ে এনবিআরে ফিরে যাচ্ছে। যা হোক, আমার বিদেশে উচ্চশিক্ষার নথিটি অনুমোদন লাভ করে।

ভাবলাম, বিদেশ যাওয়ার আগে ধন্যবাদ দিয়ে যাই। আবার সাক্ষাত্প্রার্থী হলাম। এবারো তার একান্ত সচিব জানালেন, স্যার বলেছেন দেখা করার প্রয়োজন নেই।

বহুদিন পর অন্য আরেকটি বিষয়ের তদন্ত প্রসঙ্গে নথিটি আমার দেখার সুযোগ হয়। দেখলাম, শেগুফতা বখত চৌধুরী নিজের সুন্দর হস্তাক্ষরে ফুল স্কেপ কাগজে আড়াই পাতা নোট লিখেছেন। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, তদন্ত বিবরণ, এর অসারতা বিষয়ে লিখেছেন ও আমার অন্যায় বদলির জন্য কালেক্টরকে ভর্ত্সনা করেছেন। অভিযোগ প্রত্যাহার করে আমাকে বিদেশে উচ্চশিক্ষার অনুমতির জন্য সুপারিশ করেছেন।

আমাদের সঙ্গে সভায় তার দাপ্তরিক আলোচনা শুনেছি। তিনি সবার কথা শুনেছেন। ব্যাখ্যা চেয়েছেন। কিন্তু তিনি কী সিদ্ধান্ত দেবেন, কেবল তিনিই তা জানতেন!

এমন নির্লিপ্ত অথচ বস্তুনিষ্ঠ ও প্রশংসাবিমুখ কর্মকর্তা চাকরিজীবনে আমি আর কখনো পাইনি!

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে চাকরির মেয়াদ শেষে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের চতুর্থ গভর্নর নিযুক্ত হন এবং ১৯৮৭-৯২ মেয়াদে সেখানে কর্মরত ছিলেন। আমি সরকারি চাকরিতে যোগদানের আগে কিছুদিন বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরিরত ছিলাম। সেখানে আমার ব্যাচমেটরা যারা পরবর্তীকালে ডেপুটি গভর্নর হয়েছিলেন তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সফল। তার নির্লিপ্ত পেশাদারিত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য ছিল আদর্শস্বরূপ। পেশাগত জীবনে ধীর, স্থির, মেধা, দক্ষতা ও মননশীলতায় ছিলেন অনন্য। আর্থিক খাতের কর্ণধার হিসেবে তিনি উদ্ভূত সমস্যাদি দায়িত্বশীলতার সাথে মোকাবেলা করেন।

চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর আবারো তিনি জনসেবার ডাক পান। তিনি ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিল্প, বাণিজ্য, পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৩১ সালে হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন শেগুফতা বখত চৌধুরী। তার বাবা ছিলেন দেওয়ান মামুন চৌধুরী এবং দাদা ছিলেন খান বাহাদুর ওয়াসিল চৌধুরী। তিনি সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাগ্নে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে স্নাতক ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্ট থেকে জনপ্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

সম্প্রতি ১১ নভেম্বর এ কৃতী মানুষটির জীবনাবসান ঘটে। আমার প্রার্থনা আল্লাহ্ আপনি স্যারকে আপনার

 

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান: সাবেক সচিব

আরও