সমৃদ্ধির পথে যাত্রা ও কিছু শঙ্কা

আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগের কথা। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ঢাকা আসতে হলে ভোরবেলা আজানের আগে ঘুম থেকে উঠতাম। চিঁড়া বা মুড়ি খেয়ে অথবা পান্তাভাত খেয়ে রওনা দিতাম রেল স্টেশনের উদ্দেশে। ছয়-সাত মাইল রাস্তা। মায়ের চুম্বন কপালে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া—আধো আলো, আধো আঁধার। মাথায় বই-জামাকাপড় ভর্তি একটা স্যুটকেস, অধিকন্তু এতে আছে মায়ের হাতে তৈরি নাড়ু, মোয়া, গুড়, চিঁড়া ইত্যাদি। কবে আবার বাড়ি ফিরব। গাড়ি সাড়ে ১০টায় কিন্তু তা কখন আসে কেউ জানে না। ভৈরবে গিয়ে ইঞ্জিন বদলানো, নরসিংদী-টঙ্গী হয়ে শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যাবেলা ফুলবাড়িয়া স্টেশন

আজ থেকে ৫০-৬০ বছর আগের কথা। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ঢাকা আসতে হলে ভোরবেলা আজানের আগে ঘুম থেকে উঠতাম। চিঁড়া বা মুড়ি খেয়ে অথবা পান্তাভাত খেয়ে রওনা দিতাম রেল স্টেশনের উদ্দেশে। ছয়-সাত মাইল রাস্তা। মায়ের চুম্বন কপালে নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়া—আধো আলো, আধো আঁধার। মাথায় বই-জামাকাপড় ভর্তি একটা স্যুটকেস, অধিকন্তু এতে আছে মায়ের হাতে তৈরি নাড়ু, মোয়া, গুড়, চিঁড়া ইত্যাদি। কবে আবার বাড়ি ফিরব। গাড়ি সাড়ে ১০টায় কিন্তু তা কখন আসে কেউ জানে না। ভৈরবে গিয়ে ইঞ্জিন বদলানো, নরসিংদী-টঙ্গী হয়ে শেষ পর্যন্ত সন্ধ্যাবেলা ফুলবাড়িয়া স্টেশন (করপোরেশন অফিস)। বাড়ি থেকে স্টেশনে এসেছি হেঁটে—রিকশার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। কিন্তু জগন্নাথ হলে মাথায় স্যুটকেস করে কীভাবে যাই। সম্মানের প্রশ্ন। আট আনা (৫০ পয়সা) মাত্র রিকশা ভাড়া। এসেই মাকে পৌঁছার সংবাদ দেয়া জরুরি। কীভাবে? টেলিফোন নেই, সেলফোন নেই। একমাত্র ব্যবস্থা চিঠি, টেলিগ্রাম অথবা ব্যক্তি মারফত। কেউ জানে না কবে সে চিঠি মায়ের কাছে পৌঁছবে। বাবা থাকতেন বেশ দূরে চাকরিতে। চিঠি প্রথম যাবে থানা (উপজেলা) সদরে। সেখান থেকে দেড়-দুই মাইল দূরে সাব-পোস্ট অফিস—বেতাল-এ। মা নিয়মিত লোকমারফত খবর নিতেন চিঠি এসেছে কিনা। ডাকপিয়ন সপ্তাহে মাত্র একদিন আমাদের গ্রামে চিঠি বিলিতে আসত। সেদিন তার কাছে অনুসন্ধান, কোনো চিঠি আছে কিনা। সেই চিঠি মা নিজে ধীরে ধীরে পড়তেন, বোঝার চেষ্টা করতেন কখন ঢাকা পৌঁছলাম, পথে কোনো কষ্ট হয়েছে কিনা। ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া করছি কিনা। কত প্রশ্ন তার মনে। আমি কিন্তু ঢাকায় এসে অন্য জগতে। যে ঘরে থাকি তাতে বিদ্যুৎ আছ, স্নানের জন্য বাথরুম আছে। চলাফেরার জন্য রয়েছে রিকশা, মুড়ির টিনের মতো বাস ও বেবি ট্যাক্সি (থ্রি হুইলার)। বলা যায় গ্রামের তুলনায় আরামের এক জীবন। শুধু গ্রামটা মিস করি। বাড়ির পাশে আড়িয়াল খাঁ নদীতে আমরা ছেলেরা দল বেঁধে স্নান করতাম। নদীতে যাওয়ার পথে ক্ষেতের টমেটো খেতাম। সাঁতরে নদীর ওপারে গিয়ে কৃষকের মিষ্টি আলু, তরমুজ নিয়ে এসে ভাগ করে খেতাম। এক প্যান্ট, এক গামছা কোনোমতে নাকে-মুখে দুটো ভাত দিয়ে রওনা দিতাম স্কুলের দিকে, তাও দল বেঁধে। পথে পথে বন্ধুদের তুলে নিয়ে যাওয়া। কাঁচা রাস্তা, বাড়ির উঠানের ওপর দিয়ে রাস্তা, ক্ষেতের আইল বর্ষাকালে বন্যার জল ভেঙে যেতাম স্কুলে। নদীর পাড়ে স্কুল। ওপার থেকে আসবেন আমাদের শিক্ষকরা ও বহু ছাত্র। পালতোলা নৌকা। নৌকাভর্তি ছাত্র ও সাধারণ কৃষক। ঠিক বেলা ১১টায় স্কুল। সব ছাত্র লাইন ধরে দাঁড়াতাম ড্রিল করার জন্য। জাতীয় সংগীত গেয়ে পাঠকক্ষে যেতাম সবাই। পড়াশোনায় ফাঁকি দিলে এল টাইপের স্কুলের মাঠে রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। অথবা কম শাস্তির ক্ষেত্রে শ্রেণীকক্ষে কান ধরে বেঞ্চের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। হলের ঘরে শুয়ে শুয়ে এসব ভাবি, আর ভাবি ছাত্ররা সব অপরিচিত। সারা বাংলাদেশ থেকে তারা এসেছে। বন্ধুত্ব হতে অনেক বাকি। মন টেকে না। মন বইতে বসে না। ক্লাসে বসেও বাড়ির চিন্তা, মায়ের চিন্তা।

চোখ বুঝলেই গ্রাম। কাদামাটির রাস্তা, গুরুর গাড়ি চলছে। রিকশা চলে পেছন দিক থেকে আরেকজনের ঠেলায়। কলুরা চলছে পণ্য নিয়ে ঘোড়ায় করে। মা-মেয়েরা বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি যায় গরুর গাড়ি করে। দুদিকেই পর্দা। হাট-বাজারে মানুষ যায় হেঁটে। মাথায় পাটের বোঝা, ধানের ছালা। কারো কারো হাতে একটা মুরগি, এক হালি ডিম, ডজন খানেক কলা। ছোট পরিবারের সওদা। সপ্তাহে বড় বাজার মাত্র একদিন—বৃহস্পতিবার। দশ গ্রামের লোক আসে। বাজার বসে সকালের দিকে। যতই দিন যায় ততই বাজারে লোকসমাগম বাড়ে। বাজার চলে রাত ১১-১২টা পর্যন্ত। কেরোসিনের কুপি বাতিতে বাজার আলোকিত। বড় বড় দোকানে ‘হ্যাজাক’ লাইট। সাদা কেরোসিনে এটা জ্বলে। মাঝে মাঝে পাম্প দিতে হয়। পাট, ধান, চাল, শাকসবজি, মসলাপাতি সবই বেচাকেনা হয় হাটে। আছেন লুঙ্গি-শাড়ির ব্যবসায়ীরা, তাঁতিরা। মাটির তৈজসপত্র বিক্রির জন্য আছে বাজারে নির্দিষ্ট এক জায়গা। সেখানে কলসি, পাতিল ইত্যাদি পাওয়া যায়। সুতাররা নিয়ে আসে খরম, যা আমাদের বাল্যকালে খুবই জনপ্রিয় ছিল। প্যাক-কাদার গ্রামীণ রাস্তাঘাট, উঠোন ইত্যাদি। জুতার ব্যবহার কোথায়? ১৯৬০-৬২ সালের দিকে এল স্পন্সের জুতা, কী কদর তার? কিন্তু সেই জুতা অথবা রাবারের জুতা, চামড়ার জুতা থাকে হাতে। কাঁচা রাস্তা, ধুলাবালিতে ভর্তি। গন্তব্যস্থলে গিয়ে সেই জুতা পায়ে দেয়া। ছেলেরা স্কুল থেকে ধুলা উড়িয়ে খেলতে খেলতে বাড়ি যেতাম। এটাই আনন্দ। আশপাশে তখন খোলা জায়গা ছিল, কোথাও কোথাও ছিল খেলার মাঠ। ‘জাম্বুরা’, ‘খরের বল’ ইত্যাদি দিয়েই আমরা খেলতাম ফুটবল। কোথাও কোথাও ছিল চামড়ার বল। তখন ক্রিকেটের কথা আমরা শুনিনি। খেলা আমাদের ফুটবল, দাঁড়িয়াবান্ধা, হা-ডু-ডু, ঘুড়ি ওড়ানো, কুস্তি। গ্রামে গ্রামে ফুটবল খেলার প্রতিযোগিতা ছিল। পুরস্কার হিসেবে ছিল ‘শিল্ড’। এ নিয়ে কত হইচই। সাঁতার প্রতিযোগিতা ছিল। নৌকাবাইচ হতো। ভীষণ লম্বা লম্বা নৌকা। ২০-৪০ জন মাঝি ও তার সহকারী। বর্ষায় যখন জলে টান পড়ত তখন স্কুল-কলেজের ছেলেরা আমরা নৌপথে ‘পিকনিক’ যেতাম। এসবে মেয়েদের অংশগ্রহণ ছিল না। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়তেই তাদের লেখাপড়া শেষ। যারা হাইস্কুলে পড়তে চাইত তাদের কারো সঙ্গে স্কুলে যেতে হতো। তবে এসব উদাহরণ খুবই কম। ধনী-শিক্ষিত পরিবারের কোনো কোনো মেয়ে হাইস্কুলে পড়ত। ওই তখনই তাদের হয়ে যেত বিয়ে। একটা থানায় কয়টা হাইস্কুল ছিল—একটি বা দুটি? তখন প্রথম বিভাগ ছিল অবাক করা রেজাল্ট। এ বিভাগে পাস করলে দশ গ্রামের গার্জিয়ানরা ছেলেটাকে দেখতে আসত। দোয়া আশীর্বাদ করত। পরীক্ষায় অকৃতকার্যরাই ছিল অনেক বেশি। আর কলেজগামী ছাত্র ছিল খুবই কম। এক কিশোরগঞ্জ জেলায় কলেজ ছিল মাত্র দুটি। ছাত্র পাওয়া যেত না। ভালো ছেলে হলে তার খরচ বহন করত কলেজ কর্তৃপক্ষ। ‘জায়গিরের’ ব্যবস্থা ছিল। দেশের লোক অধিকাংশই বিত্তহীন, নিম্নবিত্ত। পেশাহীন, দোকানদার, ছোট ছোট কৃষকের সন্তান। ধনীলোক কয়টা এবং কোথায়? লাখ টাকার মালিক হলে ওই মালিকের বাড়িতে ‘ঘি’-এর বাতি জ্বলত এবং তা ছিল শিখা অনির্বাণের মতো। ছোট ছোট বাজার টিনের ঘর। অল্প-স্বল্প স্থায়ী দোকান। হাটের দিন অস্থায়ী দোকানে বাজার বসত। আমাদের কটিয়াদী বাজার ছিল নদীর তীর ঘেঁষে। পণ্য সব আসত ভৈরব বাজার থেকে। কেউ কেউ পণ্য আনত ঢাকা থেকে। বড় বড় পানশি নৌকা। পালতোলা নৌকা। মাঝিরা বইঠা ধরত। মাল্লারা দাঁড় টানত। অপূর্ব এক দৃশ্য। বেদে সম্প্রদায়ের নৌকা ছিল। বাজারের ঘাটে থাকত। ধানের নৌকা সিলেটি। চারদিকে জল আর জল। মানুষ চলাচল করছে নৌকায়। শত শত নৌকা। নিজেদের নৌকা। ঘাট পারাপারের জন্য ছিল খেয়ানৌকা। এর জন্য পয়সা দিতে হতো। বর্ষাকালে নদী ও জলের খেলা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যেত। ভৈরব থেকে পণ্য আসত, নিয়ে আসত পাইকারি ব্যবসায়ীরা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাড়িতে (ট্রেড ক্রেডিটে) বিক্রির পরে পাওনা পরিশোধ। ব্যাংক নেই, ‘বিকাশ’ নেই। টাকা পরিশোধ করতে হতো ক্যাশে। বড় বড় মহাজন থেকে পণ্য আসত পাইকারি দোকানদারদের হাতে। তারা পণ্য দিত গ্রামের আনাচকানাচের ছোট ছোট মুদি দোকানদারকে। ব্যবসায়ীদের হালখাতা হতো পয়লা বৈশাখে। ভীষণ আয়োজন দোকানে দোকানে। মিষ্টি, একজন কত খাবে? ছোট ছোট দোকানিরা পয়লা বৈশাখে মহাজনের সঙ্গে তাদের দেনাপাওনা শেষ করত। কোনো জের (ব্যালান্স) টানত না। লাভক্ষতি হিসাব ওই দিনেই। তাই আনন্দের মিষ্টি খাওয়া। ১৬টা রসগোল্লায় হতো এক সের। দাম মাত্র এক টাকা। আমরা যখন স্কুলের টিফিন খেতাম তখন সময়টা ছিল দেড়টা। একটা মুড়ির মোয়া এবং জ্বাল দিতে দিতে একদম হলুদ হওয়া রঙের এক কাপ দুধ ও সড়ের দাম ছিল চার আনা বা পঁচিশ পয়সা। কামার, কুমার, তাঁতি, জেলে, কৃষক, ছোট ছোট ব্যবসায়ী—মিলেই ছিল গ্রাম এবং গ্রামের বাজার। গ্রামগুলো ছিল অনেকটা পেশাভিত্তিক গ্রাম। যেমন সংখ্যাগুরুর পাড়া দাসপাড়া, কুমারপাড়া ইত্যাদি। থানা সদরের দোকানদাররা ছিল হিন্দু সমাজের বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর লোক যেমন সাহা, বণিক, দে, দত্ত, পাল, মোদক ইত্যাদি। বাকিতে বেচাকেনা চলত কিন্তু দোকানদাররা অন্তত বাকি পছন্দ করত না। দোকানে দোকানে টানানো থাকত ‘আজ নগদ কাল বাকি’, ‘বাকির নাম ফাঁকি’। ধান, পাট, চালের বাজার ছিল বড় বাজার। অনেক টাকার বাজার। এখানে কৃষকদের দুর্দশার কোনো অন্ত ছিল না। প্রথমেই মালের ক্রেতা থাকত না। গ্রামে ফসল ছিল মাত্র দুটো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনটি। বোরো ফসল তখন ছিল না। নগদি ফসল বলতে বোঝাত আমন, আউশ ও পাট। গ্রামাঞ্চলে বিনিময় প্রথা চালু ছিল। ফসলের বদলে ফসল, পণ্যের বদলে পণ্য। অর্থাৎ লেনদেন নগদে নয়। গ্রামাঞ্চলের লোকদের মধ্যেও বেচাকেনার প্রবণতা ছিল কম। গাছে আছে, আম আছে, কাঁঠাল আছে এসব ছেলেমেয়েরা কুড়িয়ে কুড়িয়ে খেতেই পারে। কৃষকদের অনেকেই একটা-দুইটা ডিমের দামও নিতে চাইত না। অর্থাৎ বাজার ব্যবস্থা সেভাবে চালু হয়নি। চাহিদা-সরবরাহের ধারণা তখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। কিন্তু এর অর্থ মানুষ, সাধারণ কৃষক দারিদ্র্যের ঊর্ধ্বে ছিল? তারা কি স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল? মোটেই নয়। তখনকার দিনে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী। বছর বছর কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসের দিকে মঙ্গা হতো। বহু লোক না খেয়ে মারা যেত। এসব অভাব-অনটনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক শ্রেণীর মহাজন, যারা গ্রামে উচ্চসুদে মানুষকে ধার দিত। টাকা বা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে মহাজনরা জমি লিখিয়ে নিত। সাধারণ কৃষকদের ওপর নির্যাতন করত। এ মুদি ব্যবসা আরো শক্তিশালী হয় দুটো কারণে। গ্রামাঞ্চলে তখন কোনো ব্যাংকঋণের ব্যবস্থা ছিল না, কৃষি ঋণের ব্যবস্থা ছিল না। কারণ গ্রামে কোনো ব্যাংক শাখাই ছিল না। কৃষি ব্যাংকের আঞ্চলিক অফিস ছিল মহকুমা (বর্তমান জেলা) সদর পর্যায়ে, যেখান থেকে ঋণ প্রাপ্তি এক কঠিন ব্যাপার ছিল। কৃষি ঋণের জন্য স্বর্ণ জামানত হিসেবে দিতে হতো। স্বাধীনতার পর তার কোনো হদিস মেলেনি। ব্যাংক তো দূরের কথা, আজকালকার মতো এনজিও ছিল না—যারা উচ্চসুদে হলেও ঋণ দিত। এসবের অনুপস্থিতিতে গ্রামবাংলায় মহাজনরা এক নির্মম শোষণের ব্যবস্থা কায়েম করে। এ অত্যাচার থেকে কৃষকরা শেষ পর্যন্ত কিছুটা রেহাই পায় ১৯৪৭ সালের পর, যখন প্রজাস্বত্ব আইন করে কৃষকের জমি ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। মহাজনি ব্যবস্থাকে সুদের ব্যবসা বলা হতো। এরাই ছিল টাকাপয়সার মালিক। এদের শোষণ-অত্যাচারের ওপর বহু কাহিনী আছে। রবীন্দ্রনাথ জমিদার হয়েও এদের ভালো চোখে দেখেননি। অনেকের মতে, দেশ বিভাগের অন্যতম প্রধান দায়ী গোষ্ঠী হচ্ছে এ মুদি ব্যবসায়ী মহাজনরা। তখনকার সময় মানুষ যারা পারত তারা তিন বেলায়ই ভাত খেত। আটার রুটির প্রচলন ছিল না। ওই রুটি খেত রোগীরা, যেমন আঙুর ইত্যাদি খেত রোগীরা। লোকেরা রোগী দেখতে গেলে আঙুর, বেদানা ফল নিয়ে যেত। ফলের গাছে ভর্তি ছিল বাড়িঘর। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় মাসে ভাতের ওপর চাপ পড়ত কম। আম-কাঁঠাল, জাম, চিঁড়া-মুড়ি খেয়েই পেট ভরত। এক সের দুধের দাম ছিল চার আনা-পাঁচ আনা (২০-২৫ পয়সা)। একটা বড় মোরগের দাম পড়ত বড়জোর বারো আনা-এক টাকা। কিন্তু এর পরও এসব খেতে পারত খুব কম লোকই। লোকের হাতে ক্যাশ ছিল না। গ্রামে কাজ ছিল না। লোক তখন শহরমুখীও ছিল না। ধনীরা বাদে যারা চলে কিনে খেত তারাই সাধারণভাবে ছিল দরিদ্র। চায়ের প্রচলন ছিল সীমিত। এক গ্রাম, দুই গ্রাম খুঁজলে হয়তো একটি পরিবারে চা খাওয়ার চল ছিল। এরই মধ্যে শীতকালে গ্রামে গ্রামে মেলা বসত। পণ্য বিনিময় বেচাকেনা যেমন এতে চলত, তেমনি থাকত সেখানে আনন্দের উপকরণ। আমাদের অঞ্চলে প্রতি বছর আসত সার্কাস, যা ছিল খুবই আকর্ষণীয় জিনিস। সার্কাসের হাতি, বাঘ ছেলেমেয়েদের জন্য ছিল আনন্দের বিষয়। জমিদার মহাজন শ্রেণীর ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাড়িতে শীতকালে ‘যাত্রার’ আসর বসত। নাটক হতো। রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তী হতো, যেমন হতো স্কুলে। গ্রামের মানুষ দুঃখ-কষ্টের মধ্যেই তাদের নিজেদের মতো করে আনন্দের ব্যবস্থা করে নিয়েছিল। কবির লড়াই ছিল। হিন্দুদের ছিল নানা পর্ব, অনুষ্ঠান। সেটা ভোগ করত হিন্দু-মুসলমান সবাই। যেমন ঈদে আনন্দ করত সব সম্প্রদায়ের লোক। সুখ-দুঃখের মধ্যেই ছিল সম্প্রীতি-সদ্ভাব। গ্রামে সালিসি ব্যবস্থা ছিল। মুরব্বিরা বিচার করতেন। সবাই তা মেনে নিত। গ্রামে শৃঙ্খলা রক্ষিত হতো। কোথায় দারোগা-পুলিশ? অল্পে তুষ্ট লোকজন গ্রামবাসীর মধ্যে দারিদ্র্য থাকলেও তাদের মধ্যে ছিল শক্তিশালী ‘পরলোক চিন্তা’, যা সমাজকে ধরে রাখতে সাহায্য করত।

ওপরে চিত্রিত গ্রামবাংলা কি ৫০-৬০ বছর পর আজও একই অবস্থায় আছে? আগামী বছর আমাদের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। এই সময়ে আমরা কেবল গ্রামবাংলাকে বরণ করব? বলা বাহুল্য, ৫০-৬০ বছর আগের চোখ দিয়ে দেখলে আজকের বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ অচেনা একটা দেশ বলে মনে হবে। উন্নততর প্রযুক্তি, রেমিট্যান্স, তৈরি পোশাক শিল্প, চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, জাতীয় উৎপাদনে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি, যোগাযোগ ব্যবস্থার বিস্ময়কর উন্নতি আমাদের গ্রামবাংলাকে এক উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আজ মানুষ অভাবে নেই, সবাই ভাতে-কাপড়ে আছে। দেশে ‘মঙ্গা’ বলতে কিছু নেই। দারিদ্র্য কমেছে প্রশংসাজনক হারে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় দেখা যাচ্ছে সারা দেশে এখন মাকড়সার জালের মতো বিস্তৃত রাস্তাঘাট। তিন-চার-ছয় ঘণ্টায় দেশের যেকোনো অঞ্চলে পৌঁছা যায়। তবে তা সড়কপথে। দক্ষিণবঙ্গ ছাড়া অন্যত্র নদীপথ এখন ধীরে ধীরে অচল হচ্ছে। নদী, খাল-বিল-জলাশয় ধীরে ধীরে বিলীন হচ্ছে। পালতোলা নৌকার পরিবর্তে এসছে মেশিনচালিত নৌকা। মাঝি-মাল্লার পেশা ক্ষীয়মান। জেলেরা কর্মচ্যুত। নদী তীরের বাজার স্থানান্তরিত হয়ে ভেতরে চলে যাচ্ছে প্রধান প্রধান রাস্তার পাশে। বড় বড় আন্তঃজেলা সড়ক ঘিরে গড়ে উঠছে নতুন হাট-বাজার, প্রশাসনিক অফিস-আদালত। ডজন ডজন সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীতে মুখর উপজেলা সদর। একদম গ্রামের লোকেরা বসতি গাড়ছে উপজেলা শহরে। এখানে এখন টিনের তৈরি দোকান নেই। প্রায় সবই দালান। কুপি বাতি/হ্যাজাক বাতির বদলে গ্রামের বাজার এখন উজ্জ্বল বিদ্যুতের আলোতে, যেমন গ্রামের বাড়িঘরে চলছে ফ্যান। গ্রামবাসীকে বিয়ের বাজার ছাড়া সাধারণ বাজার-সওদা করার জন্য ঢাকায় আসতে হয় না। সব দ্রব্যসামগ্রী উপজেলার বাজারেই পাওয়া যায়। দোকানদারকে এখন মালের জন্য ঢাকা, নরসিংদীর বাবুরহাট অঞ্চলে আসতে হয় না। পাইকার, বড় বড় ব্যবসায়ীরা পণ্য পৌঁছে দেয় দোকানে দোকানে। এর জন্য সুন্দর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। দরদামের হিসাব মোবাইল ফোনে। মুহূর্তে মুহূর্তে সংবাদ। ডাকঘর রয়েছে অচল। ডাকপিয়নের দেখা নেই। ‘টরে-টক্কা’ করে টেলিগ্রাম পাঠানো বন্ধ। ক্যামেরার দোকান, ঘড়ির দোকান গ্রামের বাজারে আগে ছিল কম, এখন তা নেই। ক্যামেরা, ঘড়ি, খবর আদানপ্রদান সবই চলে মোবাইলে। হাতে হাতে মোবাইল, ঘরে ঘরে মোবাইল। দেশ-বিদেশ এখন গ্রামবাসীর মুষ্টির মধ্যে। বিশাল বিশাল দোকান গড়ে উঠেছে। যে বাজারে, উপজেলা সদরে সোনার কোনো দোকান ছিল না, সেখানে এখন ডজন ডজন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সোনার দোকান। আলো ঝলমল দোকান। ক্রেতা কারা? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রেমিট্যান্স প্রাপক পরিবারের মহিলারা। রাত-দিন এখন মহিলাদেরও বাজার-সওদা করতে দেখা যায়, যা ৫০-৬০ বছর আগে ছিল অসম্ভব ঘটনা। উপজেলাসহ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে ডজন ডজন স্কুল-কলেজ হওয়ায় তাতে ছাত্রছাত্রী শত শত। মেয়েরা সেখানে এগিয়ে। স্কুল-কলেজে মেয়েরা সংখ্যায় প্রচুর, তারা ফলও ভালো করে। পর্দানশীল অবস্থাতেই তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া-আসা করে। একা একাই। এটা অকল্পনীয় ঘটনা। আগে বাজার ছিল সাপ্তাহিক। এখন দৈনিক। কী নেই বাজারে? ঢাকার বাজারে যা পাওয়া যায় তাই পাওয়া যায় গ্রামের বাজারেও। পাকিস্তান আমলে ইট, বালি, সিমেন্ট ও রডের দোকান ছিল না। এখন এসব দোকান আছে, আছে টাইলসের দোকান। গ্রামের বাড়ি-ঘর এখন প্রায় সব পাকা, বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রাপক আঞ্চলগুলোতে। সুন্দর-সুন্দর বাড়িঘর। পাকা বাড়ির সঙ্গে সঙ্গে পয়োব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে, পানীয় জল প্রাপ্তির সুব্যবস্থা হয়েছে। প্রায় বাড়িতেই টিউবওয়েল। কৃষিকাজ এখন হয় মেশিনে মেশিনে। জমি চাষ, ফসল লাগানো, নিড়ানি, কীটনাশক ছড়ানো, ধান কাটা, গাছ থেকে ধান আলাদা করা, ধান শুকানো, ধান থেকে চাল করার কাজ এখন প্রায় ক্ষেত্রেই হয় মেশিনে। মা-খালা-মাসিরা প্রায় কর্মমুক্ত। গ্রামে শ্রমিকের অভাব। মানুষ যারা পারে তারাই ঢাকামুখী, শহরমুখী; যেখানে মজুরি বেশি। গ্রামাঞ্চলে এখন ভাগচাষী কম। এখন জমির মালিকরা ‘কনট্রাক্টে’ কাজ করায়। ধান ভানার ঢেঁকিও অচল। একে ঘিরে গ্রামীণ যে গীতের সৃষ্টি হয়েছিল তা আজ বিলীন হতে চলেছে। গ্রামে গ্রামে ধাইমা বলে অনেক মহিলা ছিলেন, উপজেলা শহরে হাসপাতাল হওয়ায় এখন তাদের আর দেখা যায় না। গ্রামে মেয়েরা, বিধবারা, ছেলেরা মাঠে মাঠে গরু-ছাগল চড়াত, তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা করত। এখন মাঠে মাঠে আর গরু-ছাগল দেখা যায় না। গরু-ছাগল পালন এখন খামারি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। রাখালের বাঁশির সুর এখন কবিতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মাছ চাষ হয় এখন। এর জন্য নতুন নতুন পুকুর খনন করা হচ্ছে। এটা এখন ভালো ব্যবসা। জেলেরা জাল ছেড়ে এখন মাছের খামারিদের কর্মচারী। গ্রামের তাঁতি, জেলে, কামার, কুমার, মাঝি-মাল্লারা এখন পেশা বদলে ব্যস্ত। তাদের কাজ নিয়ে নিয়েছে বিদেশী পণ্য। দেশী কাপড়ের বাজার বন্ড সুবিধায় আমদানীকৃত কাপড় দখল করে নিয়েছে। কামারের তৈরি দা, খন্তা, কুড়ালের বাজার নিয়ে নিয়েছে চীনা পণ্য। উমাচরণ কর্মকারের জিনিস মাপার নিক্তির স্থলে বসেছে বিদেশী মেশিন। এতে ওজন ও দাম একসঙ্গে পাওয়া যায়। কর্মচ্যুত পেশাজীবীরা নতুন নতুন কাজে ব্যবহূত হচ্ছে। যুবকরা ধরছে মোটরসাইকেল। এটা এখন কিস্তিতে কেনা যায়। শত শত, হাজার হাজার যুবক মোটরসাইকেলকে পরিবহনের অঙ্গ করেছে। সস্তায় দ্রুত যাত্রীদের তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেয়। যাত্রীদের বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। চালু হয়েছে ‘ভটভটিয়া’, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার গাড়ি। এসবের সেবা মানুষ সহজেই পেয়ে যাচ্ছে। গ্রামের মানুষ, ছেলেমেয়ে সবাই এখন ২০-৩০ মাইল দূরে নেমন্তন্ন খেয়ে রাতের বেলায় বাড়ি পৌঁছে যেতে পারে। এখন লেনদেন বড় সহজ। কিছুদিন আগেও লেনদেন হতো ‘ক্যাশে’ অথবা ব্যাংকের মাধ্যমে—পে অর্ডার, ডিমান্ড ড্রাফটে। এখন এসব উঠে গেছে। এখন ‘বিকাশ’ ও ‘বিকাশের’ মতো সেবায় মুহূর্তের মধ্যে টাকা চলে যায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। খরচও সহনীয় পর্যায়ে। এতে আবার আছে নিরাপত্তাও। কোনো পণ্যের বাজার কোথায় কী রকম তার খবর পাওয়া যায় মিনিটে মিনিটে। ঘরে বসে জিনিসপত্র প্রাপ্তির ব্যবস্থাও গ্রামে গ্রামে হচ্ছে। আগে চা আমরা রফতানি করতাম। এখন আমদানি করতে হয়। কারণ সবাই এখন চা খায়, অনেক ক্ষেত্রে গ্রামে কফির দোকানের ব্যবস্থাও হয়েছে। আটার রুটি এখন সকালের নাশতা। যুবক ছেলেরা বাড়িতে নাশতা করতে চায় না। বাজারে চায়ের দোকানে, খাবারের

দোকানে তারা নাশতা সাড়ে। স্কুল-কলেজ হয়েছে যথেষ্ট, কিন্তু লেখাপড়ায় ইদানীং দেখা যাচ্ছে অনাগ্রহ। বিশেষ করে ছেলেদের মধ্যে। তারা বিদেশে যেতে চায়। মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, কানাডা ইত্যাদি দেশে। সেখানে রোজগার বেশি। অষ্টম-নবম শ্রেণীতে উঠলেই তারা দালালের পেছনে ঘোরে বিদেশ যাবে বলে। বস্তুত এর ফলে গ্রামে কাজের লোকের অভাব হচ্ছে। তারা পড়াশোনাও করবে না, জমিতে কাজও করবে না। মানুষ সবাই ‘ডলার’কে চিনেছে। এক ডলার মানেই ৮৫-৮৬ টাকা। টাকাই টাকা। বিদেশী রোজগারে দুই-চার-ছয় বছরে বাড়ির চেহারা বদলে দেয়া যায়। ঘরে ঘরে ডলার, বিশেষ করে যে গ্রাম থেকে বিদেশে গেছে লোকজন। আমরা ছোটবেলা ১০০ টাকা তো 

দূরের কথা ১০ টাকার নোটও দেখিনি। চার আনা, আট আনা ও এক টাকা পর্যন্তই ছিল আমাদের দৌড়। এখন হাতে হাতে ডলার, হাতে হাতে ৫০০, ১০০০ টাকার নোট। একান্ত দরিদ্রদের কথা বলছি না। তারা আছে এরই মাঝে। টাকাওয়ালাদের আরেকটি জগৎ গড়ে উঠেছে। ধনাঢ্য ব্যক্তিরা গ্রামাঞ্চলে বড় বড় বাড়িঘর  বানাচ্ছে। একদম ঢাকার মতো। সপ্তাহে দুদিন ছুটি। প্রাইভেট গাড়ি নয়, পাজেরো জিপ নিয়ে তারা গ্রামে যায়। যারা নির্বাচন করবে তারা টাকা দুই হাতে বিলায়। সবাই এখন রাজনীতিবিদ। গ্রাম পর্যায়ের নির্বাচনও দলের ভিত্তিতে হওয়ায় সবাই ‘রাজনীতি’ করে। তাই দলীয় কোন্দলও হয়। কিন্তু গ্রামের সালিসি ব্যবস্থা উঠে গেছে। বিচার-আচার চলে গেছে এক শ্রেণীর মাস্তানের হাতে। তাদের কাজ হলো যতসব অবৈধ কাজ করা। প্রশাসন তাদের কাছে অসহায়। এরা খেলাধুলা পর্যন্ত করে না। কেউ কেউ খেলাধুলায় উৎসাহ দেখায়। তবে আমাদের চিরায়ত খেলাধুলা উঠে যাচ্ছে। সবাই পাগল ক্রিকেট খেলা নিয়ে। জনপ্রিয় ফুটবল খেলা আজ অবাঞ্ছিত। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ার ফলে মানুষ সকালে ঢাকায় এসে রাতে বাড়ি যেতে পারে। গ্রামের ‘ডেমোগ্রাফিক’ একটা ‘পরিবর্তন’ হয়েছে। সংখ্যালঘুদের অনেকেই দেশত্যাগ করেছেন। অনেকে শহরবাসী হয়েছেন। ফলে গ্রামে এক ধরনের ভূমি সংস্কার হয়েছে। যাদের জমিজমা কিছুই ছিল না, তাদের অনেকের কিছু জমি হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হয়েছে, কৃষকদের ছেলেরা কৃষিতে যেতে চায় না। কৃষিকাজে টাকা নেই। বুদ্ধিমান কৃষকরা চিরায়ত ফসল উৎপাদনের বদলে নতুন নতুন শাকসবজি, ফলমূল উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে।

এতে আয় বেশি। দেশে আগে ছিল দুটো ধানি ফসল ও পাট চাষ। এখন আমাদের তিনটি ধানি ফসল—বোরো, আমন, আউশ। বোরো নতুন ফসল, অথচ এখন প্রধানতম ফসল। পাটের উৎপাদন কমছে, কিন্তু ধানের উৎপাদনের অসামান্য সাফল্য আমাদের। শাকসবজি, ফলমূল, হাঁস-মুরগি, মাছ-মাংস উৎপাদনের দিকে কিছু উদ্যোক্তা যাওয়ায় এসব উৎপাদনে আমাদের সাফল্য আসছে। এসব উৎপাদনে ব্যাংক এখন টাকা দিচ্ছে সহজ শর্তে। প্রতি বছর এর জন্য একটা বাজেট থাকে। এখন গ্রামাঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের শাখা আছে। আছে শত শত এনজিও। এদের সুদের হার বেশি হলেও তাদের একটা বাজার আছে। এছাড়া রেমিট্যান্স প্রাপক পরিবারগুলোর মধ্যে কেউ কেউ ঋণের ব্যবসায় ঢুকছে—এটা নতুন প্রবণতা। বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল এ নতুন গ্রাম অবশ্য সমস্যামুক্ত নয়। ঢাকা শহরের যত খারাপ দিক সবই গ্রামে অনুপ্রবেশ করছে। ভালো দিক ঢুকছে কম। উচ্ছৃঙ্খলতা বাড়ছে, মুরব্বিদের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব দেখা দিচ্ছে, মাদকের দিকে তরুণরা ঝুঁকছে। রেমিট্যান্স প্রাপক পরিবারের অশিক্ষার হার বাড়ছে। আবার বাড়ছে গ্রামীণ বৈষম্যও। যারা রেমিট্যান্সের বাজার ধরতে পারেনি তারা দরিদ্র থেকে যাচ্ছে। যারা ধরতে পেরেছে তাদের জীবন ধারণের মান উন্নত হয়েছে। কিন্তু গ্রামতান্ত্রিক উদারতার অনুপস্থিতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সর্বত্র এখন ‘শহর শহর’ ভাব। উপজেলা শহরেও ‘কিন্ডারগার্টেন স্কুল’। গ্রামাঞ্চলের ভাবসাবও তা-ই। ভালো-মন্দ মিলিয়ে গ্রাম এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও ‘ক্যাশ’ গ্রামকে এক স্তর থেকে অন্য স্তরে নিয়ে যাচ্ছে। ভাত-কাপড়, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, গৃহায়ণে আর্থিকভাবে উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ পরিবর্তন শেষ পর্যন্ত আমাদের কোনদিকে নিয়ে যায়, তা-ই দেখার বিষয়।


ড. আরএম দেবনাথ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক

আরও